শাহাদতের মৃত্যুই ছিলো শহীদ প্লাবনের একমাত্র স্বপ্ন

মিজানুর রহমান মিজান#

আসসালামু আলাইকুম।
– ওয়ালাইকুম আসসালাম; কেমন আছো প্লাবন?
আলহামদুলিল্লাহ…ভালো, তুমি কেমন আছো?
আলহামদুলিল্লাহ। পরীক্ষার রেজাল্ট কবে?
– আগামী মাসের শেষের দিকে হতে পারে … এভাবেই ২০০৫ সালের মে মাসে এক ইসলামি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শহীদ প্লাবনের সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে দু’জন দুই দিকে চলে গেলাম। কিন্তু সেই যে প্লাবন চলে গেলো, আর তার সাথে কথা হলো না, এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্টও হয়েছিল কিছুদিন পর কিন্তু সেই রেজাল্টের খবর পাওয়ার আগেই আল্লাহ তাকে শহীদি ঈদগাহে শামিল করেছেন। আসলে শহীদেরা তো এভাবেই চলে যায়, শহীদেরা জীবিত কিন্তু আমরা বুঝতে পারি না। মহান রাব্বুল আলামিন বলেছেন, ‘যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তাদেরকে তোমরা মৃত বলো না, বরং তারা জীবিত। কিন্তু তোমরা তাদের দেখতে পাও না।’ (সূরা আল বাকারা : ১৫৪)

স্কুলে বন্ধুপ্রিয় প্লাবন
পলাশবাড়ী এসএম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলো শহীদ প্লাবন। আমিও একই স্কুল ও একই ক্লাসে পড়ার কারণে হয়ে যায় বন্ধুত্ব। স্কুলে মেধাবী ছাত্রদের মধ্যে প্লাবন ছিলো মিশুক প্রকৃতির ও স্পষ্টবাদী। তার সাথে ফেলে আসা স্মৃতিগুলো আমাকে দাওয়াতি কাজের ক্ষেত্রে এখনও প্রেরণা জোগায়। আমাদের বাড়ির গাছের আম স্কুলে নিয়ে বন্ধুদের খাওয়ানোর কথা ভাবতামই না। কিন্তু প্লাবনের চিন্তা ছিলো আলাদা। তার চিন্তা ছিলো, তার গাছের আম আমাদের ক্লাসের সব বন্ধুকে খাওয়াবে। একদিন ঘটে গেলো তেমনি একটি ঘটনা। সেই সময় ছিলো নভেম্বর মাস। টিফিন শেষে প্লাবন ফিরলো একটা ব্যাগ হাতে। আর ব্যাগের ভেতর ছিলো কিছু কাঁচা আম। আমরা তো সবাই অবাক। নভেম্বর মাসে কাঁচা আম পেয়ে সবাই তো কাড়াকাড়ি শুরু করে দিলো, সবাই বলল কাঁচা আম কোথায় পেলি? কোথা থেকে এলো, এ রকম নানান প্রশ্ন। প্লাবন উত্তর দেয়ার আগেই ক্লাসে চলে আসেন মাওলানা আব্দুল হামিদ স্যার। ক্লাসে ঢুকেই দেখেন সবার হাতে আম। স্যার তো রীতিমত অবাক। স্যার বললেন, কিরে প্লাবন আম কোথায় পেলি?
প্লাবন তখন বললÑ স্যার, এটা আমার বাসার গাছের আম। উঠোনের একটা গাছে বছরে তিনবার আম ধরে। গাছের আম শেষ হতেই আবার মুকুল চলে আসে। তাই আমি ভেবেই নিয়েছি, আল্লাহ আমাকে এই গাছটি বোনাস হিসেবে দিয়েছেন। তাই আমি আমার বন্ধুদেরকে বোনাসের অংশ বিতরণ করলাম। স্যার খুশি হয়ে প্লাবনের জন্য দোয়া (প্রশংসা) করলেন। তবে সেই গাছটি আর নেই। প্লাবন শহীদ হওয়ার পর গাছটিতে আর আম ধরে না। তাই গত বছর গাছটি কেটে ফেলা হয়।
শহীদ রেজবুল হক প্লাবন ছিলো ইবাদতের প্রতি সচেতন। আমরা যখন ক্লাস নাইনে পড়ি, তখন সে আমাদের ক্লাসের সবাইকে নিয়মিত নামাজের দাওয়াত দিত। স্কুলে আমাদের ক্লাস চলাকালীন সময়ে জোহরের নামাজের সময় হতো, আমরা কেউই ক্লাস বাদ দিয়ে নামাজের জন্য যেতাম না। কিন্তু প্লাবন কিছুতেই মানবে নাÑ সে বলল, আমরা নামাজের জন্য সবাই মিলে স্যারের কাছে ছুটি চাইব, স্যার তখন ছুটি দিতে বাধ্য হবেন।
যেই কথা সেই কাজ। আমরা যারা সম্মতি দিয়েছি, ক্লাসের মধ্যে নামাজের সময় একসাথে দাঁড়িয়ে গেলাম। অনীল স্যার বললেন; কী হলো তোদের? প্লাবন বলল, স্যার আমরা নামাজে যাবো। স্যার বললেন, ক্লাস শেষ করে নামাজ পড়ে নিও। প্লাবন বলল, এখন মসজিদে জামায়াতে নামাজ পড়বো এই অনুরোধেই স্যার নামাজের জন্য ছুটি দিলেন। এভাবে তার নেতৃত্বে আমরা জোহরের নামাজ মসজিদে গিয়ে পড়তাম। কিন্তু তারপরও প্লাবনের মনে কষ্ট ছিল। কারণ আমাদের স্কুলের ভেতরে বিশাল মসজিদটি তালা দেয়া থাকত। আমরা বাইরের মসজিদে নামাজ পড়তাম। প্লাবন বলত এতো বড় স্কুলের কয়েকজন মাত্র নামাজ পড়লাম, বাকিদের নামাজ কই গেলো? তারা কি বাড়ি গিয়ে নামাজ পড়বে…?
এই কথা বলতেই আমাদের মাথায় বুদ্ধি এলো। হামিদ স্যারের সাথে কথা বলে আমরা বিভিন্ন ক্লাসের ছাত্রদেরকে সাথে নিয়ে হেডস্যারের কাছে আবেদন জানালাম। আমাদের পক্ষে প্লাবন মসজিদ চালু করার ব্যাপারে বক্তব্য তুলে ধরলো। স্যার চাপে পড়ে পরের সপ্তাহ থেকে মসজিদ খুলে দিতে বাধ্য হলেন। এরপর শুরু হলো নতুন দাবি। সে দাবি হচ্ছে, টিফিনের সময় নামাজের ব্যবস্থা। আলহামদুলিল্লাহ। সে দাবি আদায়েও আমরা সফল হলাম। এক মাস পর দেখা গেলো, জোহরের নামাজের সময় স্কুলের শতশত ছাত্র এক সাথে জামায়াতে নামাজ আদায় করছে। আর সেই সাথে স্কুলে দাওয়াতি কাজের সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয়ে গেলো।
এভাবে স্কুলে সব ছাত্রের কাছে প্লাবন ছিল প্রিয় থেকেও প্রিয়, আর আমরাও বন্ধুরা মিলে তার সাথে ভালো কাজগুলো করার সুযোগ পেয়েছিলাম।
গত বছর খোঁজ নিয়ে দেখলাম, স্কুলে আর জোহরের নামাজের জামায়াত হয় না। কোন এক লম্বা ছুটিতে মসজিদের দরজা বন্ধ হয়ে গেলে তারপর আর খোলে না। তখনি মনে হয়ে গেলো শহীদ রেজবুল হক প্লাবনের কথা। আজ যদি প্লাবন এই স্কুলে থাকত! তাহলে হয়তো মসজিদের দরজা বন্ধ থাকত না। সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে যেতাম। প্লাবন ইকামত দিত আর আল্লাহু আকবার বলে নামাজ শুরু করতেন হামিদ স্যার।
শুধু ফরজ ইবাদতই নয়, নফল ইবাদতের প্রতিও প্লাবন ছিল সদাসচেতন। রমজানে শবেকদরের রাতে অনেকেই মসজিদে বালিশ নিয়ে যেত। অর্ধেক রাত ইবাদত আর বাকি অর্ধেক রাত ঘুম। প্লাবন এটাকে পছন্দ করত না। পলাশবাড়ী ছাত্রশিবিরের সাবেক সেক্রেটারি তাজুল ইসলাম মিলন ভাইকে প্লাবন বলতো, ভাইয়া আমরা তো মসজিদে আসি নামাজের জন্য। সেখানে আবার বালিশ কেন? আল্লাহকে ডাকতে, আল্লাহকে পেতে এতো অবহেলা কেন…?  বাড়িতে ডিস সংযোগ নেয়ার কথা শুনে প্লাবন এর বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ করেছিলো। কারণ শহীদ প্লাবন জানত, বাড়িতে ডিস সংযোগ চালু হলে ভারতীয় নোংরা সংস্কৃতি তার বাড়িতে প্রবেশ করবে।

শহীদ প্লাবনের ইচ্ছা
শহীদ প্লাবনের পেশাগত ইচ্ছা ছিলো বড় হয়ে ডাক্তার হবে। এ দেশের অসহায় দরিদ্রদের ফ্রি চিকিৎসা করবে। প্লাবন যখন তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র, তখন প্লাবনের মা বøাডক্যান্সারে আক্রান্ত হন। সেই সময় ডাক্তার সঠিক রোগ নির্ণয় করতে না পারায় প্লাবনের মা নাফিসা আক্তার প্লাবন এবং তার ছোট বোন রিপাকে রেখে মহান আল্লাহর ডাকে চলে যান।
প্লাবন বলত, আমার মা ভুল চিকিৎসায় মারা গেছেন, তাই আমি ডাক্তার হয়ে মায়ের নামে হাসপাতাল করে গরিব-দুঃখীদের ফ্রি চিকিৎসা করবো। আর যেন কেউ ভুল চিকিৎসায় মারা না যায়। আর তাই সে পড়ালেখার প্রতি কখনোই অবহেলা করতো না। ২০০৫ সালে এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষার ফলপ্রার্থীদের নিয়ে শিক্ষাশিবির অনুষ্ঠানে তৎকালীন শিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মোকসেদুল কামাল বাবু ভাই সকলের উদ্দেশে প্রশ্ন করেছিলেন- এইবার পরীক্ষায় এ+ পাবে কে কে?
শুধুমাত্র প্লাবনই সেদিন হাত তুলে বলেছিল, কেউ না পেলেও আমি এ প্লাস পাবো ইনশাআল্লাহ। প্লাবন এ প্লাস ঠিকই পেয়েছিল। কিন্তু সেই রেজাল্ট তার দেখার ভাগ্য হয়নি। আল্লাহ হয়তো চেয়েছিলেন তার প্রিয় বান্দাকে নিজেই এই ফলাফল জানাতে। আর তাই রেজাল্টের আগেই তাকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন…
শাহাদতের মৃত্যুই ছিলো শহীদ প্লাবনের একমাত্র স্বপ্ন। প্রেরণার বাতিঘর নামে একটি বইয়ে শহীদ আবদুল মালেক ভাইয়ের জীবনী পড়ে শহীদ রেজবুল হক প্লাবনের মধ্যে শাহাদতের আকাক্সক্ষার জন্ম নিয়েছিল। প্লাবনের কথাবার্তা, আচার-আচরণের মধ্যেই তার বহিঃপ্রকাশ হতে থাকে। বইটি পড়া শেষ করে প্লাবন বলছিল আমিও যদি শহীদ আবদুল মালেক ভাইয়ের মত শহীদ হতে পারতাম! তাহলে কতই না ভালো হতো। ঘটনা কিন্তু তাই ঘটেছিল, মালেক ভাইয়ের মতো প্লাবনকেও মাথায় আঘাত করে থেঁতলে দেয়া হয়েছিল।
প্রাইভেট পড়ার সময় প্লাবন শুনতে পেল, শিবিরের সাথে ছাত্রদল নামধারী ক্যাডারদের সংঘর্ষ চলছে। স্যার বলছিলেন প্লাবন, আজকে তো শিবির মেরে সাফ করে দিলো, রাস্তায় বের হবি না কিন্তু!
শাহাদতের পিয়ালা পান করার জন্য যে পিপাসার্ত, এই কথা শুনে সেকি কখনও নীরব থাকতে পারে? পারে না। শহীদ প্লাবনও নীরব থাকেনি। স্যারকে সে উত্তম জবাব দিয়েছিল।
বলেছিলÑ স্যার, শিবির আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করে না। কোনদিন মুখোমুখি হইনি। আজ হবো আল্লাহ চাহে তো শহীদ হয়েই যাবো। এই কথা বলে প্লাবন মাগরিবের নামাজ পড়েই ছুটে চলে যায় ঘটনাস্থলে। আর মাগরিবের কিছুক্ষণ পরই শহীদ প্লাবন হায়েনাদের কাছে আহত হয়।

শহীদ প্লাবনের শাহাদতের প্রেক্ষাপট
২০০৫ সালের ১৩ জুন পলাশবাড়ী ছাত্রদল ও যুবদল তাদের কিছু ভাড়াটে গুন্ডা সাথে নিয়ে শুধুমাত্র তাদের আধিপত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে, পলাশবাড়ী জামায়াতের সেক্রেটারি মো: আবু বকর এবং ছাত্রশিবিরের সাবেক জেলা সভাপতি মো: আব্দুর রাজ্জাক ভাইকে কোনো ধরনের দ¦ন্দ¦ ছাড়াই হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করে।
তার প্রতিবাদে ইসলামী ছাত্রশিবির পলাশবাড়ীর চৌরাস্তায় ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে মিছিল বের করে। দ্বিতীয়বারের মত ছাত্রদল মিছিলে হামলা করতে চাইলেও ছাত্রশিবিরের ধাওয়ায় পালিয়ে যায়। ছাত্রশিবির মিছিল শেষ করে পলাশবাড়ী-গাইবান্ধা সড়কে যখন অবস্থান নিয়েছে, তখন যুবদল ও ছাত্রদলের ক্যাডাররা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তৃতীয়বার আক্রমণ করার লক্ষ্যে ত্রাস সৃষ্টি করেছে।
হিংস্র হায়েনারা যখন ছাত্রশিবিরের কর্মীদের রক্ত পান করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। ঠিক তখনই সুনীল স্যারের কাছ থেকে প্রাইভেট শেষে মাগরিবের নামাজ পড়ে শাহাদাতের প্রস্তুতি নিয়ে প্লাবন আসছিলো শিবিরের মিছিলে যোগ দেয়ার জন্য। তখন প্লাবনের সাথে ছিলো শিমুল ভাই। প্লাবন কৌশলে যুবদল ক্যাডারদের প্রস্তুতি সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিয়ে শিবিরের অফিসের দিকে আসছিল। আর যুবদল অফিসের পাশেই ছিল তার বাবার কাপড়ের দোকান। তার ধারণা তাকে কেউ সন্দেহ করবে না। কিন্তু প্লাবন হায়েনাদের চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি। প্লাবন যখন ওই পথে হাঁটছিলো, তখন সে শিমুল ভাইকে ইশারা দিয়ে ছাত্রদল ও যুবদলের ক্যাডারদের নামসহ চিহ্নিত করে দিচ্ছিল। এর মাঝেই লিয়াকত বলে উঠলো, ওই যে শিবির যায়, ধর…!! এ কথা বলেই প্রথম আঘাত করে ফরহাদ। তারপর লিয়াকত, জসিমসহ সেখানে অবস্থানরত ক্যাডাররা।
হিংস্র জানোয়ারের মতো আঘাত করতে থাকে তার মাথায়। প্লাবন তখন রাস্তায় পড়ে যায়, নিজেকে বাঁচানোর জন্য দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই নরপিশাচরা লম্বালম্বিভাবে তার মুখে আঘাত করে। এতে করে প্লাবনের মুখ থেঁতলে যায় ও তিনটি দাঁত ভেঙে যায়। এভাবে একের পর এক রুবেল, জুয়েল, রিপন, মাহফুজসহ ১৮-২০ জন প্লাবনকে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকে। আহত প্লাবন তখন রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে যায়। তখন তার গায়ে থাকা প্রিয় পিংক কালারের টি-শার্টটি রক্তে ভিজে কালো হয়ে গেছে। যখন আহত প্লাবনকে হাসপাতালের উদ্দেশে ভ্যানে উঠানো হয়, তখনও হায়েনারা শান্ত হয়নি। সেই মুহূর্তে রিপন ও বকুল ভ্যানের ওপর পুনরায় চাপাতি দিয়ে আঘাত করে প্লাবনের মাথায়। অবাক করা বিষয়টি ছিল, প্লাবনকে যেখানে আক্রমণ করেছিলো তার ৫০ গজ দূরেই ছিল প্লাবনের বাবার কাপড়ের দোকান। সংঘর্ষ চলাকালীন সময়ে দোকান বন্ধ করে তিনি দোকানের ভেতরেই ছিলেন, অথচ যে ছেলেটিকে এভাবে মারছে সে যে তারই একমাত্র কলিজার টুকরা প্লাবন তিনি তা কখনোই ভাবেননি।
আহত প্লাবনকে প্রথম পলাশবাড়ী হাসপাতালে নেয়া হয়, সেখান থেকে রংপুর মেডিক্যাল। সেই রাতেই উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। একদিন পর ১৫ জুন হাসপাতালেই আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যায় মহান রবের দরবারে। শহীদ প্লাবন চলে গেলো শহীদ আবদুল মালেক ভাইয়ের শহীদি মিছিলে। আর আমরা হারালাম প্রিয় মেধাবী ছাত্র প্লাবনকে। হাসপাতাল থেকে লাশের মিছিল নিয়ে আসা হয় বায়তুল মোকাররামের উত্তর গেটে। আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ইমামতিতে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম জানাজা। তারপর শহীদের লাশ গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে পৌঁছে রাত ১০টা ৩০ মিনিটে। শহীদের সাথে আসেন তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ড. রেজাউল করিম ভাইসহ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা। শহীদের দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয় আমাদের প্রিয় এসএম পাইলট হাইস্কুলের মাঠে। জানাজার আগে কথা বলার সময় স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, দু’টি ছ্ত্রাও যদি এ প্লাস পায় তার মধ্যে প্লাবন একটি। তারপর সেখান থেকে শহীদের গ্রামের বাড়িতে তৃতীয় জানাজা করে শহীদের মায়ের কবরের পাশে লাশ দাফন করা হয়।

ছেলে সম্পর্কে বাবার বক্তব্য
সম্ভবত দিনটি ছিল শনিবার, এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট হবে, আমিও ফলপ্রার্থী ছিলাম। ভাবছিলাম প্লাবনের রেজাল্টের কথা। রেজাল্ট প্রকাশিত হওয়ার পরই শুনতে পেলাম আমাদের স্কুল থেকে এ প্লাস পেয়েছে পাঁচজন, তার মধ্যে শহীদ প্লাবন একজন। আল্লাহতায়ালা কিন্তু তার দুটো ইচ্ছাই পূরণ করেছেনÑ ১. ভালো রেজাল্ট, ২. শহীদি মৃত্যু। রেজাল্টের পর শহীদের বাবা আজাদুল হক সরকার বলেন, আমার প্লাবন আমার গর্ব, দুনিয়াতে এই রেজাল্টের মূল্য না পেলেও আখেরাতে আল্লাহ যেন তাকে শহীদের মর্যাদা দান করেন। তোমরা যারা প্লাবনের বন্ধু আছো, প্লাবনের রেখে যাওয়া বাকি কাজের দায়িত্ব তোমাদেরকেই করতে হবে।

শহীদ প্লাবনের মামলার রায়
এ পর্যন্ত ছাত্রশিবিরের ২২২ জন শহীদ ভাইয়ের মধ্যে ২ জন শহীদ ভাইয়ের মামলার রায় হয়েছে। তার মধ্যে দ্বিতীয় রায়টি শহীদ প্লাবনের। গত ২০ মে ২০১৪ দীর্ঘ ৯ বছর পর নামেমাত্র একটি রায় দিয়েছেন আদালত। যেখানে এত বড় একটি ঘটনা, সেখানে একজনকেও মৃত্যুদন্ড দেননি আদালত। আমরা আল্লাহর কাছে বিচার চাই, আল্লাহ যেন আখেরাতেই খুনিদের বিচার করেন, আমিন।
লেখক : সাবেক সভাপতি
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির
পলাশবাড়ী উপজেলা, গাইবান্ধা

SHARE

Leave a Reply