রক্তে রঞ্জিত ক্যাম্পাস বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শাহাদাতই ছিল যাদের স্বপ্ন

মো: বায়েজিদ হক রনি

কথা ছিল সবার সাথে মিলেমিশে বিজয় দিবস উদযাপন করা হবে। হবে প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ। এ উপলক্ষে আগের দিনই কেনা হলো ব্যাট বল, স্ট্রাম্প ইত্যাদি ক্রীড়াসামগ্রী। ঈশা খাঁ হলের মাঠে এসবেরই পরিকল্পনা হলো সবাইকে সাথে নিয়ে। তখন কেউ চিন্তাই করতে পারেনি কী ঘটতে চলেছে আগামী কয়েক ঘণ্টা। কারণ একদিকে এই গঠনমূলক পরিকল্পনার বিপরীতে চলছে আরেকটি ধ্বংসাত্মক, আরেক হিংস্র খুনের পরিকল্পনা ইসলামী ছাত্রশিবিরকে ক্যাম্পাস থেকে চিরতরে নিঃশেষ করার পাঁয়তারা। শওকত ভাই যখন স্কুল বিভাগের কর্মীদের নিয়ে তার সেই চিরচেনা হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে বিজয় দিবস উদযাপনের কথা চিন্তা করছে তখনই তার খুনিরা তাকে শেষ করারও পরিকল্পনা করছিল। তার অপরাধ ছিল তিনি সবার সাথে মিশে ক্যাম্পাস ও তার আশপাশে প্রতিটি লোকের ভাই হয়ে গিয়েছিলেন। তার চারিত্রিক আলোয় সমাজের সুবিধাবঞ্চিত সন্তানেরা বাঁচার নতুন স্বপ্ন বুনত। তিনি ছিলেন সকলের চোখের মণি। তাকে যেন কেউই চোখের আড়াল হতে দিত না। সেই স্কুলজীবন থেকেই মেধার স্বাক্ষর রেখে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হওয়ার পর একজন দক্ষ কৃষিবিদ হওয়ার স্বপ্নে ভর্তি হন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরিবারের কেউই তা সহজে মেনে নিতে পারছিলেন না শুধু তার ভগ্নিপতি ছাড়া। মানবেই বা কেন? এ যে মায়ের কলিজার টুকরা নাড়ির ছেঁড়া ধন তার একজন এতিম ছেলে। সুদূর বরিশাল থেকে ময়মনসিংহে এত দূরে তার এই চোখের মণিকে ছেড়ে দিতে ঘোর আপত্তি ছিল বটে। শওকত ভাইও নাছোড়বান্দা শেষ পর্যন্ত ভর্তি হলেন। ইসলামী আন্দোলনে দাওয়াত তিনি আগেই পেয়েছিলেন। ভর্তি হয়ে অতি অল্প সময়ের মাথায় সংগঠনের কর্মী এবং তার তিন মাসের মাথায় সংগঠনের সাথী শপথ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে সংগঠনের সর্বোচ্চ শপথ নিয়ে সদস্য হিসেবে সর্বশেষ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ছাত্রকল্যাণ সম্পাদক এবং শহীদ নাজমুল আহ্সান হলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ঈমানের চেতনায় উদ্দীপ্ত শওকত ভাই তার শাহাদাতের পূর্বে সংগঠনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দৃঢ়সঙ্কল্প নিয়ে শাখার দায়িত্বশীলকে বলেছিলেন, ‘জীবনের শেষ রক্তবিন্দু থাকতে সন্ত্রাসীদের কাছে মাথা নত করব না।’ ১৯৯৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে যখন সবাই ঘুমন্ত ঠিক তখনই ইসলামী আন্দোলনের দুশমন, ছাত্র নামধারী সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী মেতে উঠে এক হিংস্র খুনের নেশায়। ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঘুমন্ত কর্মী বাহিনীর ওপর যখন হামলা চালায় একের পর এক গুলি এবং বোমা বর্ষিত করতে থাকে তখন সবাই মনে করেছিল এ মনে হয় বিজয় দিবসের আতশবাজি চলছে। ইতোমধ্যে ছাত্রশিবিরের কর্মী ভাইয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়স্থ ঈশা খাঁ ও শাহজালাল হলে একত্রিত হয়। সন্ত্রাসীরা রাতভর হলে অবস্থানরত শিবিরকর্মীদের ওপর হামলা চালাতে থাকে। এ খবর শওকত ভাইয়ের কানে পৌঁছলে তিনি আর ঠিক থাকতে পারলেন না। দ্বীনি ভাইদের সাহায্যার্থে করিম ভবন এলাকা থেকে ঈশা খাঁ হলের উদ্দেশে ছুটলেন। কিন্তু খুনের নেশায় হিংস্র নরপিশাচ গুণ্ডা বাহিনী তার ওপর হামলে পড়ে। নির্মমভাবে একের পর এক আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করে ঘটনাস্থলেই শহীদ করে ক্যাম্পাসের সকলের প্রিয় শওকত ভাইকে। জীবিত থাকতে যিনি সকলের কানে কুরআনের বাণী ছড়িয়েছেন আজ আল্লাহর দরবারে চলে গিয়েও জান্নাতের সুবাস ছড়িয়ে গেলেন। তাই তো তার শাহাদাতের পর প্রায় এক সপ্তাহ নাগাদ তার শাহাদাতের স্থান থেকে জান্নাতের সুবাস ছড়াতে থাকে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফোটা আরেক জান্নাতি গোলাপ শহীদ আলাউদ্দীন। তিনিও ছিলেন তার পিতা-মাতার একমাত্র পুত্রসন্তান। বাবা-মা আদর করে তাকে বাবু বলে ডাকতেন। চরিত্র, মেধা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, খেলাধুলা প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল তার কৃতিত্বপূর্ণ পদচারণা। কিশোর জীবনেই ইসলামী আন্দোলনের সুশীতল স্পর্শ পেয়ে ধন্য হন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আন্দোলনের একজন যোগ্য সংগঠক হিসেবে সদস্য শপথ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রশিক্ষণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। অত্যন্ত সহজ সরল কিন্তু মজবুত ব্যক্তিত্বের অধিকারী আলাউদ্দীন ভাই ছিলেন ক্যাম্পাসে সহপাঠী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিকট অত্যন্ত প্রিয় মানুষ। ইসলামী আন্দোলনের জন্য অকাতরে দানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে দিয়েছেন তিনি। তার সাথে নাস্তা করে কেউ আগে বিল পরিশোধ করেছে এমন ঘটনা ক্যাম্পাসে ঘটেনি। শাহাদাতের কিছু দিন পূর্বে সংগঠন যখন এক কঠিন অর্থনৈতিক সঙ্কটে, সদস্য বৈঠকে যখন এ বিষয়ে নিয়ে আলোচনা চলছে তখন তার মনে এক পড়ে বাড়ি থেকে বাবা মাসের খরচের এক হাজার টাকা পাঠিয়েছেন। তিনি তৎক্ষণাৎ পুরো টাকা সংগঠনের বায়তুলমালে দান করেন। সদস্যরা জিজ্ঞেস করে আপনি পুরো টাকা দিয়ে দিলে পুরো মাস আপনি কিভাবে চলবেন? আলাউদ্দীন ভাই বেশ বলিষ্ঠভাবেই উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আল্লাহই আমার ব্যবস্থা করবেন।’ শহীদ আলাউদ্দীন শুধু মাল দিয়েই নয় বরং সংগঠনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ছিলেন অনড় এবং দৃঢ়প্রত্যয়ী। জীবন দিয়ে তিনি তা প্রমাণ করে দিয়েছেন। দুর্বৃত্তরা যখন তাকে একাকী শাহজালাল হলে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছিল, রক্ত পিপাসুরা যখন শত শত আগ্নেয়াস্ত্র ও বোমা নিয়ে নিরস্ত্র আলাউদ্দীনকে শেষ করার জন্য এগিয়ে এসেছিল, হলের গার্ড কর্মচারীরা আলাউদ্দীন ভাইকে এসে বলল, ‘আপনি পালিয়ে যান, আমরা সহয়তা করব।’ আলাউদ্দীন ভাই দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন, ‘এখান থেকে জীবিত আলাউদ্দীন পালিয়ে যাবে না, যদি প্রয়োজন হয় আলাউদ্দীনের লাশ যাবে।’ এর কিছুক্ষণ পরই ১৬ ডিসেম্বর সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে ঘাতকেরা একটি নির্মম বুলেটে আঘাত করে আলাউদ্দীন ভাইকে। গুলিবিদ্ধ আলাউদ্দীন ভাইকে হাসপাতালে নেয়ার পর পরই বেলা ১১টায় শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করে সবাইকে কাঁদিয়ে নিজে হাসতে হাসতে আল্লাহর দরবারে হাজিরা দেন।
খুনিদের রক্তের নেশা তখনও কাটেনি। এরপর এই ঘাতক বাহিনী এগিয়ে আসে ঈশা খাঁ হলের দিকে যেখানে আরও বেশ কয়জন শিবিরের মুজাহিদ ভাইয় অবস্থান করছিলেন। ডিসেম্বরের কনকনে শীত ও ঘন কুয়াশা তখনও পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে আচ্ছাদন করে রেখেছিল। এরই মাঝে খুব সন্তর্পণে তারা পুরো ঈশা খাঁ হলকে সশস্ত্র অবস্থান নিয়ে ঘিরে ফেলে। শুরু হয় তুমুল গুলি বর্ষণ। একে একে আহত-গুলিবিদ্ধ হতে থাকে শিবির কর্মীরা। এ যেন এই পশুদের বিজয়ের উল্লাস। খুব আশা নিয়ে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার কৃতী ছাত্র মঞ্জুরুল কবীর। ইসলামী আন্দোলনের পতাকাতলে আসার পর তার জীবনে আসে আমূল পরিবর্তন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তিনি স্বপ্ন দেখেন তিনি আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়েছেন, পর পর দুই বার একই স্বপ্ন দেখার পর তিনি ভাবলেন আন্দোলনের আনুগত্যের শপথ না নিয়ে শহীদ হলে তো তার চলবে না। তাই তিনি শপথ গ্রহণ করার জন্য ব্যাকুলভাবে কুরআন, হাদিস, ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়ন শুরু করেন। মঞ্জুরুল কবীর ভাইয়ের মাঝে ছিল শাহাদাতের তীব্র আকাক্সক্ষা। তাই শপথের কন্টাকে যখন সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মতিউর রহমান আকন্দ ভাই তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি সাথী কেন হতে চাও? মঞ্জুরুল কবীর ভাই তখন দৃঢ়ভাবে উত্তর করলেন, ‘আমি শহীদ হওয়ার জন্য সাথী হতে চাই।’ সত্যিই তো আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাকে স্ব^প্নের মাধ্যমে সেভাবেই তৈরি করেছিলন। চূড়ান্তভাবে তৈরি করার জন্য স্বয়ং রাসূল (সা) তার সাথে স্বপ্নযোগে সাক্ষাৎ করেন (সুবহানাল্লাহ)। মঞ্জুরুল কবীর ভাই চূড়ান্তভাবে তৈরির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটি নিয়ে তার পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ করে আবার ক্যাম্পাসে ফেরত আসেন। আসার আগেই তিনি তার মা, ভাই-বোনদের বলে আসেন তার স্বপ্নের কথা। এও বলেন আল্লাহ তাআলা তাকে শহীদ হিসেবে কবুল করবেন। তাই তার শাহাদাতের পর কেউ যাতে বিচলিত না হয় সে জন্য সান্ত্বনাও দিয়ে আসেন। দেখিয়ে দিয়ে আসেন তাকে দাফন করার জায়গা যেখানে তাকে পরবর্তীতে সমাহিত করা হয়। তার ডায়েরি থেকে আমরা জানতে পেরেছি এখানেই সাক্ষাৎ হয়েছিল রাসূল (সা) এবং শহীদ মঞ্জুরুল কবীরের। ঈশা খাঁ হলকে ঘিরে গুণ্ডা বাহিনীর এমন তাণ্ডবের এক পর্যায়ে খুনিদের একটি বুলেট বিদ্ধ করে প্রিয় মঞ্জুরুল কবীরের পিঠে যা তার বুক চিরে বেরিয়ে যায়। মঞ্জুরুল কবীর লুটিয়ে পড়েন। আশ্রয় নেন হলের পাশে করিম ভবন এলাকায় সেলিম ভাইয়ের বাড়িতে। ফিনকি দিয়ে তখনও রক্ত বেরুচ্ছে। বাড়ির মহিলারা বালিশ দিয়ে চেপে ধরে বুকে যাতে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়। চেষ্টা চলে তাকে হাসপাতালে নেয়ার। কিন্তু এ কী! খুনিরা এবার ঘেরাও করে বাড়িটা। হাসপাতালে তো নেয়াই যাবে না বরং মঞ্জুরুল কবীরের শিরচ্ছেদ করে তার মাথাটা নাকি নিয়ে যাবে এই রাক্ষসেরা। শাহাদাতের জন্য পরিপূর্ণভাবে প্রস্তুত মঞ্জুরুল কবীরের তখন মনে পড়ে শেষমোড়ে একটি দোকানদার তার নিকট হতে ২৮টি টাকা পাবে। তিনি তখন কাতরভাবে আশপাশের লোকদের উদ্দেশে বলছিলেন, ‘শেষমোড়ের অমুক দোকানদার আমার কাছ থেকে ২৮ টাকা পাবে, আপনারা দয়া করে আমার পক্ষ থেকে টাকাটি পরিশোধ করে দেবেন।’ এরপর আর কোন কথা বলেননি। কালেমা শাহাদাত পাঠ করে হাসতে হাসতে মঞ্জুরুল কবীর ভাইও আল্লাহর দরবারে চলে গেলেন।
১৯৯৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরকে রাঙিয়ে ইসলামী আন্দোলনের পথকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য মসৃণ করে চিরবিদায় নিয়েছিলেন আমাদের শহীদ শওকত হোসেন তালুকদার, শহীদ আলাউদ্দীন, শহীদ মঞ্জুরুল কবীর। তাঁদের রেখে যাওয়া পথে চলতে গিয়ে তারপরের বছরই ১৯৯৬ সালের ৪ মার্চ বাকৃবি-তে আরও রক্ত ঢেলেছেন শহীদ হাসান জহির ওয়ালিয়ার, শহীদ আব্দুল খালেদ হামিদ, শহীদ আব্দুল ওয়াহেদ।
বাংলাদেশে কৃষি শিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। ‘প্রকৃতি কন্যা’ নামে খ্যাত চিরসবুজ এই ক্যাম্পাসে ইসলামী ছাত্রশিবিরের যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৭ সালে। ১৯৭৮ সাল থেকে এটি শিবিরের সদস্য শাখা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। শাহাদাত, ত্যাগ, কোরবানি, পঙ্গুত্ব, অন্ধত্ব বরণ ইত্যাদি ঘটনা এই ক্যাম্পাসে আন্দোলনের কাজকে করেছে মসৃণ ও গতিময়। তাইতো আজও আমাদের শহীদ ভাইদের রেখে যাওয়া কাজ আঞ্জাম দিতে গিয়ে আমরা বলি-
সত্যের সেনানীরা নেবে নাকো বিশ্রাম
আমাদের সংগ্রাম চলবেই অবিরাম।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল : [email protected]
web : www.baushibir.org

SHARE

Leave a Reply