শাহাদাতে উদ্দীপ্ত জীবন খোঁজে প্রভুর সান্নিধ্য । ইয়াসিন মাহমুদ

শাহাদাতে উদ্দীপ্ত জীবন খোঁজে প্রভুর সান্নিধ্য । ইয়াসিন মাহমুদমুখোমুখি সত্য-মিথ্যার বিজয়ীর এক ক্রান্তিলগ্নে অনিবার্য হয়ে ওঠে প্রতিবাদ কিংবা প্রতিরোধ। যারা আল্লাহকে ভালোবাসে তারা তো দ্বীন বিজয়ের পক্ষে আমৃত্যু লড়ে যান। অব্যাহত চেষ্টায় নিজেকে সঁপে দেন। অন্যদিকে যারা দ্বীনকে ব্যর্থ করতে; মুছে ফেলতে চান তারাও মাটি কামড় দিয়ে টিকে থাকতে চায় যুদ্ধের ময়দানে। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন- যারা ঈমানদার তারা জিহাদ করে আল্লাহর রাহে। পক্ষান্তরে যারা কাফির তারা লড়াই করে শয়তানের পক্ষে। সুতরাং তোমরা জিহাদ করতে থাকো শয়তানের পক্ষাবলম্বনকারীদের বিরুদ্ধে। নিশ্চয় শয়তানের কৌশল অত্যন্ত দুর্বল। (সূরা আন নিসা : ৭৬)
বুকফাটা ক্রন্দন আর আর্তনাদ যেন থামছেই না। নির্যাতিতের নিঃশ্বাসে ভারী হয়ে উঠছে আকাশ-জমিন। অনবরত রক্ত ঝরছে নিরপরাধ বনি আদমের। আহত হৃদয়ের রক্তক্ষরণে ভিজে যাচ্ছে সবুজ জমিন। প্রকম্পিত খোদার আরশ। আর বার বার তাগিদ আসছে হে! মুমিনরা, তোমরা জাগলে না। রাত পোহাবার কত দেরি? আল্লাহ তায়ালা এ সম্পর্কে বলেন- তোমাদের কী হয়েছে? তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করছো না কেন? অথচ দুর্বল-অক্ষম, শিশুরা চিৎকার করে বলছে, হে আমাদের রব! জালিম অধিবাসীদের এ দেশ থেকে আমাদের বের করে নাও। আর আমাদের জন্য তোমার নিকট হতে একজন পৃষ্ঠপোষক অধিপতি নিয়োগ কর, এবং আমাদের জন্য তোমার নিকট হতে একজন সাহায্যকারী বানিয়ে দাও। (সূরা নিসা :৭৫)
আমাদের সমাজব্যবস্থার কলুষিত দৃশ্য দেখে কেউ স্থির থাকার কথা নয়; হৃদয়বান মানুষই কেঁদে ফেলবেন নিশ্চিত। কিন্তু কেঁদে কেঁদে চোখ ভাসালেই কি দায়িত্ব শেষ! এমতাবস্থায় একজন মুমিনের দায়িত্ববোধ সম্পর্কে প্রিয় নবী সা. এক নির্দেশনায় বলেছেন- হযরত আবু সাঈদ খুদরি (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসূল সা. বলেছেন- তোমাদের মধ্যে কেউ কোন অন্যায় দেখলে তা সে যেন তার হাত দ্বারা প্রতিহত করে। যদি তা সম্ভব না হয় তা তার মুখ দ্বারা প্রতিহত করবে, তাও যদি না করতে পারে তাহলে অন্তর দিয়ে তা ঘৃণা করবে। আর এ হচ্ছে (অন্তর দিয়ে প্রতিহত করা) দুর্বলতম ঈমান। (মুসলিম : ৪৯)
জিহাদ মানে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। রক্তপাত, হাঙ্গামা ও মারামারির নাম নয়। ইসলাম ও মুসলমানকে কুপোকাত করতে আজ একটি মিশন হাতে নেয়া হয়েছে; যার ফলে কেউ আর সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার কাজে সম্পৃক্ত না থাকে। জঙ্গিবাদের অপবাদে বিরত রাখা হচ্ছে সমাজ সংস্করণের শুদ্ধি কর্মসূচি। অথচ জিহাদ মানেই হলো- মানুষের মনগড়া মতবাদকে বাদ দিয়ে আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসূল সা. প্রদর্শিত বিধানের আলোকে সমাজের ঘুণেধরা ব্যবস্থা ও রুগ্নতাকে পরিশোধন করার একটি পদক্ষেপ। জিহাদ মানে নিজেকে একজন খাঁটি মুমিন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাও বটে। নিজের ভেতরের সকল কুপ্রবৃত্তিকেও তাড়িয়ে নতুন করে কোরআন- হাদিসের আলোকে সাজানোর নিয়তও জিহাদ। আমরা যে সমাজে বসবাস করছি তার প্রতিটি অলিতে গলিতে রয়েছে নিজেকে ধ্বংসের মুখে ফেলে দেয়ার কৌশল। এ সকল কাজ থেকে বিরত থাকাও জিহাদ। হ্যাঁ, আমরা নিজেরাই যদি শুধু ভালো থাকি তাহলে এ সমাজ পুরোটাই ভালো হয়ে যাবে না। প্রয়োজন সমাজকে বদলানোর উদ্যোগ। সমন্বিত প্রচেষ্টায় সেটা সম্ভব। আর এই সমাজব্যবস্থায় আল্লাহর দ্বীন কায়েমের কর্মসূচিতে খোদাদ্রোহী গায়ে আগুন জ্বলে উঠতে পারে। আপনি যেমন দ্বীন প্রতিষ্ঠার কর্মসূচিতে অটল ঠিক তেমনি তারাও দ্বীন ধ্বংসের কর্মসূচিতে সারাক্ষণ পেরেশান। তবুও একজন মুমিন কখনো কারো চোখরাঙানিতে তাঁর জীবনের মিশন ও ভিশন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারে না। বরং সে আল্লাহর রাহে তার জীবনকে বিলায় এমন ইতিহাস কেবল মুমিনদেরই রয়েছে।
শাহাদাত একজন মুমিনজীবনের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য হওয়া উচিত। পরীক্ষার মাধ্যমে যেমন একজন শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন নির্ণয় করা হয়; চূড়ান্ত করা হয় তার ফলাফল। তেমনি শাহাদাতই একজন মুমিনজীবনের চূড়ান্ত সফলতা। এই দুনিয়া খেল তামাশার; আমরা কেউই এখানে চিরস্থায়ী নই। আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অন্যান্য কাজের মাঝে সময় বের করে যেমন খেলাধুলা করি। আমাদের জীবনটাও এমনই। খেলাধুলাকে যেমন আমাদের আবশ্যিক বিষয় হিসেবে নেই না; ঠিক খেল তামাশার এই দুনিয়াও আমাদের আবশ্যিক নয়। তবে এই দুনিয়াই আমাদের শস্যক্ষেত্র। আমাদের পরকালীন জীবনকে সাজানোর একটি প্লাটফর্ম। একজন শহীদের মর্যাদা কতটুকু সে সম্পর্কে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন- যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদের মৃত মনে করো না। প্রকৃতপক্ষে তারা জীবিত এবং আল্লাহর নিকট থেকে রিজিকপ্রাপ্ত। (সূরা আলে ইমরান : ১৬৯)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন- তোমরা যদি আল্লাহর পথে নিহত (শহীদ) হও কিংবা মরে যাও তবে আল্লাহর যে রহমত ও দান তোমাদের নসিবে হবে, তা এই (দুনিয়াদার) লোকেরা যা কিছু সঞ্চয় করেছে তা থেকে অনেক উত্তম। (সূরা আলে ইমরান : ১৫৭)
মহানবী সা. একজন শহীদের মর্যাদা সম্পর্কে বলেছেন- আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, আমি নবী সা.কে বলতে শুনেছি, সেই পবিত্র সত্তার শপথ করে বলছি, যার মুষ্টির মধ্যে আমার প্রাণ! যদি কিছু সংখ্যক মুসলমান এমন না হতো যারা আমার সাথে জিহাদে অংশগ্রহণ না করাকে আদৌ পছন্দ করবে না এবং যাদের সবাইকে আমি সওয়ারি জন্তুও সরবরাহ করতে পারবো না (অর্থাৎ যারা জিহাদে অংশগ্রহণ করতে চাইবে, তাদের সবাইকে) বলে আশঙ্কা হতো, তাহলে আল্লাহর পথে যুদ্ধরত কোন ক্ষুদ্র সেনাদল থেকেও আমি দূরে থাকতাম না। যার হাতে আমার প্রাণ! সেই মহান সত্তার শপথ করে বলছি, আমার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয় হচ্ছে, আমি আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে যাই অতঃপর জীবন লাভ করি এবং আবার শহীদ হয়ে যাই, তারপর আবার জীবন লাভ করি এবং আবার শহীদ হই, পুনরায় জীবন লাভ করি এবং পুনরায় শহীদ হই। (বুখারি শরিফ)
পরশ্রীকাতরতা বরাবরই আমাদের স্বভাবের প্রধানতম একটি বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের ভালো আমরা কোনোভাবেই সহ্য করতে পারি না। এমন অনেক ঘটনার সাক্ষী হয়তো আমরা অনেকেই। কোন শাহাদাতের ঘটনা ঘটলে এমনটি উচ্চারিত হয় অনেকের মুখে- আহা! লোকটা এতো তাড়াতাড়ি চলে গেলো। বেঁচে থাকলে অনেক কিছু করে ফেলতো। সাজানো সংসারটা ভেঙে গেলো তার। এমন প্রলাপকারী শুভাকাক্সক্ষীদের শোকবার্তায় ভরে যায় শোকবই। একজন শহীদকে ক্ষতিগ্রস্তের তালিকাভুক্ত করে থাকি। অথচ মহান আল্লাহ যে, একজন শহীদের জন্য কতশত নেয়ামত প্রস্তুত করে রেখেছেন জান্নাতে আমরা তা কয়জন জানি?
আর যারা অন্যায়ভাবে নির্মম ও পৈশাচিকভাবে যাকে হত্যা করে তারা তো উল্লাসে ফেটে পড়ে। মনে হয় সবচেয়ে গৌরবময় কাজটি করে ফেলেছেন। আসলে কি তাই? তারা হয়তো মনে করে থাকে, যাহোক একজনকে তো সরিয়ে দিলাম। নিস্তব্ধ হয়ে যাবে তাঁর সাথীরা। আর মাথা উঁচু করে কেউ সামনে আসতে পারবে না। বস্তুত শাহাদাতবরণকারী ব্যক্তিটি যে একাই নয়; রয়েছে তাঁর অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী। প্রিয়জন হারানোর বেদনায় ভেঙে যায় তাদের বুক। এ সম্পর্কে হাদিস শরিফে এসেছে- রাসূল সা. বলেছেন- মুসলমানদের মধ্যে সম্প্রীতি একটি দেহের মতো। যখন দেহের কোন অংশ ব্যথা পায়, তখন তার জন্য সারা দেহ অনিদ্রা ও জ¦রে আক্রান্ত হয়। (বুখারি-৬০১১, মুসলিম ২৫৮৬, আহমদ ১৭৮৯১)
আর যারা দুনিয়ায় সাময়িক ক্ষমতার বাহাদুরিতে প্রভাব আর প্রতিপত্তির বলয়ে মানুষের প্রতি অবিচার করে। মানুষ হত্যা করে তাদের পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহর হুঁশিয়ারিÑ যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করবে, তার শাস্তি জাহান্নাম। সেখানেই সে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন। তার ওপর অভিসম্পাত করবেন। এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত করে রাখবেন। (সূরা নিসা: ৯৩)
একজন শহীদ যেমন আল্লাহর রহমত প্রাপ্ত হন তেমনি প্রিয় কাফেলার কর্মীদের কাছে হয়ে ওঠেন অনুপ্রেরণার ও অনুকরণীয়। শহীদের রক্তভেজা জমিন দিন দিন হয়ে ওঠে উর্বর। শত শত্রুতার পরও রুখতে পারে না গতিপথ। কবি মতিউর রহমান মল্লিক বলেছেন-
আল কুরআনকে ভালোবেসে প্রাণ দিয়েছিলো যারা
আজকে দেখো সামনে এসে
রক্তমাখা শহীদ বেশে ফের দাঁড়িয়েছে তারা।
মিথ্যার সাময়িক দাপটে তটস্থ হওয়ার কিবা আছে? এতো কালবৈশাখী ঝড়। একটু পরেই থেমে যাবে। কিন্তু শহীদি ঈদগাহর প্রতিটি কর্মী থামতে জানে না। বাধার পাহাড় মাড়িয়ে সামনে চলাই যাদের শপথ। কী চমৎকার বলেছেন, সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদুদী রহ.। দেখুন, আপনার সময়ের ও আপনার জীবনের কোন ঘটনা আছে কি সেই বাণীতেÑ ‘মিথ্যার প্রাবল্য দেখে ঘাবড়ে যাবেন না। সেতো কখন প্রবল বেগে আসে আবার পানির বুদবুদের ন্যায় বিলীন হয়ে যায়। চিন্তা হওয়া উচিত আপনার সততা, দৃঢ়তা ও বলিষ্ঠতার। কেননা, মিথ্যার মোকাবেলা করার দায়িত্ব আল্লাহর।’
শহীদেরা শুধু একাই বিস্তৃত সবুজাভ বাগানে থাকতে চান না; প্রিয় সাথীদেরকেও রাখতে চান খুব কাছে কাছে সেই প্রতিশ্রুতিও আল্লাহ তাদেরকে দিয়েছেন। জীবনের ভয়; ভীতি, অকারণ লাভ-ক্ষতির সমীকরণকে পিছে ফেলে নির্মাণ করি চিরস্থায়ী জীবনের আবাসন। শাহাদাতই হোক জীবনের পরম পাওয়া। কবি গোলাম মোহাম্মদের মতো আমরাও যেন সেই সাহসী উচ্চারণ বুকে ধারণ করতে পারি-
সেই সংগ্রামী মানুষের সারিতে
আমাকেও রাখিও রহমান
যারা কোরআনের আহবানে নির্ভীক
নির্ভয়ে সব করে দান।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply