শিক্ষাকার্যক্রমে করোনার প্রভাব উত্তরণের উপায় -ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

করোনার ভয়াবহ ছোবলে গোটা মানবজাতি অনিশ্চয়তার মধ্যে নিপতিত। উন্নত রাষ্ট্রগুলো প্রাথমিক ধাক্কা সামলে নিয়ে এখন খানিকটা গুছিয়ে উঠতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা। চলমান করোনা পরিস্থিতিতে সুরক্ষামূলক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষাকার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। কবে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালা খুলবে, শিক্ষার্থীদের কলতানে ভরে উঠবে শিক্ষাঙ্গন সে বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত। এইচএসসিসি পরীক্ষা কবে সংঘটিত হবে- এ অনিশ্চয়তা উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে অভিভাবক মহলে। শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সৃষ্টি করেছে অস্বস্তি। এমনিতেই গোটা শিক্ষাকাঠামো বৈষম্যদুষ্ট ও কার্যত বিভক্ত হয়ে পড়েছে। গ্রাম-শহর ও ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শিক্ষার মাধ্যমভিত্তিক বিভাজন সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক বৈষম্যকেও উসকে দিয়েছে। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো বিদেশি ভাবধারায় চলছে। ফলে একটি ভোগসর্বস্ব, স্বার্থপর নগরকেন্দ্রিক এলিট শ্রেণির উদ্ভব ঘটছে। অন্যদিকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আশ্রয় বাংলামাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো নকল, শিক্ষাবাণিজ্য ও সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘরে পরিণত হচ্ছে। মানহীন শিক্ষায় জারিত মূল্যবোধহীন নাগরিক হিসেবে বেড়ে উঠছে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থী। এ পরিচর্যাহীন শিক্ষাব্যবস্থা থেকেই বেরিয়ে এসেছেন দেশের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, আইনজীবী, আমলা, সাংবাদিক কিংবা আজকের প্রতিষ্ঠিত যে কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষ। তার উপর করোনার ভয়াবহ আগ্রাসনে শিক্ষাব্যবস্থাপনায় আরো অন্ধকার ঘনীভূত হতে চলেছে। ইতোমধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান অনলাইনে শিক্ষাকার্যক্রমের মাধ্যমে ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ মঞ্জুরি কমিশনও অনলাইনে পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণ, মূল্যায়ন ও নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়ে একটি গাইডলাইন প্রকাশ করেছে।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও অনলাইন শিক্ষার বিষয়টি ভেবে দেখা হচ্ছে। স্কুল পর্যায়ের ছাত্রছাত্রছাত্রীদের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য সংসদ টিভির মাধ্যমে ক্লাস চালু করা হয়েছে। সরকারি পোর্টাল শিক্ষক বাতায়নের মাধ্যমে তাদের আগে থেকে রেকর্ড করা কনটেন্ট ইউটিউবে দেয়া হচ্ছে। অনেকে ব্যক্তিগত ইউটিউব চ্যানেলেও কনটেন্টগুলো দিয়ে থাকেন। বাংলাদেশ বেতারকে পার্টনার করে একটি উদ্যোগ নিয়েছে সরকার যাতে যুক্ত থাকবে এফএম ও কমিউনিটি রেডিওগুলো। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত ক্লাসের শিক্ষকদের মাধ্যমে শুরু হবে এই বেতার কার্যক্রম। কলেজ পর্যায়ে বিভিন্নপর্বে চালু হয়েছে অনলাইন ক্লাস। কোন কোন কলেজ প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার ল্যাবে স্টুডিও স্থাপন করেছেন এবং অনলাইনে ক্লাস চালিয়ে যাচ্ছেন। কেউবা নিজ বাসায় বসেই জুম সফটওয়ারে অনলাইনে ক্লাস নেয়ার চেষ্টা করছেন। অনলাইনে পরীক্ষা নেয়ার প্রয়াসও চোখে পড়ছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সহ কিছু কিছু উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে অনলাইন কার্যক্রমে পুরোপুরিভাবে মনোযোগী হয়ে পড়েছেন। কিন্তু তা কতটা ইতিবাচক ভূমিকা পালনে সফল হবে সেটাই বিবেচ্য বিষয়।

অনলাইন শিক্ষাপদ্ধতি : সমস্যা ও সম্ভাবনা
বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে অনলাইনে পাঠদানের বিষয়ে অনেকগুলো দিক বিবেচনার দাবি রাখে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করেই একটি সর্বজনীন অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রম প্রণয়ন করা উচিত। শহর বা নগরের সাথে প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চল বা দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলের আধুনিক প্রযুক্তিগত সুবিধার অনেক পার্থক্য এখনো দৃশ্যমান। প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেমন অনলাইন শিক্ষায় সরাসরি কথোপকথন সমস্যা, কথোপকথনের ব্যবস্থায় নির্দিষ্টসংখ্যক ব্যক্তির অংশগ্রহণ, অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ, প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের অভাব, ই-লার্নিং এ অনভ্যস্ততা, দুর্বল ইন্টারনেট ব্যবস্থা, ইন্টারনেট ব্যবহারের ব্যয়বহুলতাসহ নানা ধরনের সমস্যা বিদ্যমান। অনলাইন শিক্ষার জন্য ইন্টারনেট এবং অনলাইনে পাঠদানের প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্তসহ নানা উপাদানসমূহ নিশ্চিত করার কোন ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি।
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা এ জাতীয় ই-লার্নিংয়ে তেমন স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। তারা গতানুগতিকেই থাকতে অভ্যস্ত। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজের অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে এ ধরনের ধারণা বিদ্যমান। অনেক শিক্ষকও এখনো এ পদ্ধতিতে অভ্যন্ত নয়। সকলের কাছে বিষয়টি সর্বজনীন হয়ে উঠতে না পারলে সেখানে শতভাগ ফল আশা করা দুরূহ। তা ছাড়া একজন শিক্ষক যখন সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন তখন তিনি সহজেই শিক্ষার্থীর কাজ মূল্যায়ন করতে পারেন এবং ক্লাসকে নিয়ন্ত্রণও করতে পারেন। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের চাহিদামাফিক সমস্যার সমাধান করতে পারেন এবং নিজেকে পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে আকর্ষণীয়ভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারেন। কিন্তু অনলাইন পদ্ধতিতে ধারণকৃত ক্লাসে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র স্থাপনের অভাবে ক্লাসের গতিশীলতা সরাসরি পাঠদানের চেয়ে অনেকগুণে হ্রাস পায়। আর অনেক সফটওয়ারে অধিক সংখ্যক ছাত্রছাত্রীদের সরাসরি সম্পৃক্ত করে শ্রেণিকার্যক্রম চালানো খুবই কঠিন। বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় জুম সফটওয়ার বা ওয়েবসাইট স্ট্রিমইয়ার্ড। সরাসরি এ পদ্ধতিতে মিটিং বা কনফারেন্স করার যে সুবিধা তা ক্লাস পদ্ধতিতে সুবিধা নেয়া যায় না। এ রকম আরো সফটওয়ার বা ওয়েবসাইট আছে। বাংলাদেশের সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তা সহজে প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো মেলে না। এখনো প্রত্যন্ত অঞ্চলের কিছু কিছুু মানুষ বিদ্যুৎ সুযোগ সুবিধার বাইরে আছে। শিক্ষক যে জায়গা থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে অনলাইন শিক্ষা শুরু করেছেন, কিন্তু দেখা গেলো ঠিক সময় প্রত্যাশিত শিক্ষার্থীর কাছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ নেই। এটি একটি অতি সাধারণ সমস্যা।
অনলাইন শিক্ষা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে অনেকটা ব্যয়বহুলও বটে। এ শিক্ষাব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন স্মার্টফোন, ল্যাপটপ ও ইন্টারনেটের মতো প্রযুক্তিগত সুযোগ সুবিধা। দেশের অনেক দরিদ্র শিক্ষার্থীর নিকট তা এখনো নাগালের বাইরে। প্রযুক্তির সুবিধা নিশ্চিত করতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎপ্রবাহের পাশাপাশি ইন্টারনেটে সংযুক্ত থাকার জন্য ডাটা কিনতে হয়। এই ডাটা কেনা বিষয়েও এখানে মোবাইলফোন কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন আছে। পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় আমাদের দেশের ইন্টারনেট ব্যয় অনেক বেশি। গ্রামীণ পর্যায়ে এখনো ব্রডব্র্যান্ড লাইন বা ওয়াইফাই লাইনের সুযোগ পৌঁছেনি। বাধ্য হয়ে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর ডাটা কিনতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী গ্রামীণ জনপদের মানুষ এবং অনেকেই গরিব অসচ্ছল পরিবারের মেধাবী সন্তান। বর্তমান করোনা, আমফান, সামুদ্রিক লঘুচাপ, বন্যাসহ নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সবাই বেকার ও মানবেতর জীবন যাপন করছে। ইন্টারনেট ক্রয় করা সবার পক্ষে সম্ভবপর নয়। সেইসাথে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নেটওয়ার্ক অত্যন্ত দুর্বল যা দিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার প্রায় অসম্ভব।
ইতোমধ্যে লক্ষণীয় যে, অনলাইন ক্লাসে অনেক ছাত্র অনুপস্থিত থাকে। কারণ অনেক সময় ক্লাস স্কিপ এবং বাফারিং হয়। ক্লাস বোঝা যায় না। তা ছাড়া তাত্ত্বিক ক্লাসগুলো অনলাইনে পাঠদান করা সম্ভব হলেও ব্যবহারিক ক্লাস অনলাইনে পাঠদান করা সম্ভব নয়। যারা শিক্ষা দেবেন তারাইবা কতটুকু এই কাজে দক্ষ? তারা হোয়াইট বোর্ডের দিকে ক্যামেরা তাক করে পড়াচ্ছেন আর এদিকে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে চ্যাটে মগ্ন। সুতরাং চ্যালেঞ্জটা কেবল প্রযুক্তিরই নয় বরং পদ্ধতিরও। প্রযুক্তির চেয়ে প্রয়োজন হলো দক্ষ পদ্ধতি।
করোনার কারণে বিশেষ ক্ষতির শিকার হেফজ অধ্যয়নরত কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। নিয়মিত তিলাওয়াত এবং চর্চা না থাকলে কুরআন মাজিদ ইয়াদ রাখা কঠিন বিষয়। তাই হেফজ শিক্ষার্থীদের শিক্ষা পরিস্থিতি নিয়ে বাড়তি উদ্বেগ পরিবারের সদস্যদের। অনেক হেফজ বিভাগেও ভিডিও মাধ্যম ব্যবহার করে ছাত্রদের সবক এবং পেছনের পড়া শোনা হচ্ছে। করোনার এই সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। রাজধানী এবং জেলা শহরের প্রাইভেট মাদরাসাগুলোতে এ পদ্ধতিতে শিক্ষা পরিবেশ কিছুটা বজায় রাখা গেলেও বড় আকারে এ সুবিধাটা ছাত্ররা গ্রহণ করতে পারছে না। বাংলাদেশে প্রযুক্তির বিকাশ এখনও পুরোপুরি হয়ে ওঠেনি। হেফজ বিভাগের ছাত্রদের কুরআন শরীফ পোক্তভাবে ইয়াদ রাখতে নিয়মিত সাতসবক, আমুখতা, সবিনা, নামাযে তেলাওয়াত ইত্যাদি রুটিন অনুসরণ করতে হয়। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা তাদেরকে পরিবারের সদস্য বা আত্মীয় বা মহল্লার হাফেজ ভাইদের সহায়তা নিতে হবে।
ক্লাসে সশরীরে উপস্থিত থেকে লেখাপড়ায় আমরা অভ্যস্ত। সেই অভ্যাসকে রাতারাতি ভার্চুয়াল করে ফেললে একটা বিশাল মানসিক প্রস্তুতি দরকার দু’পক্ষেরই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের এক ভার্চুয়াল আলোচনায় শিক্ষামন্ত্রী ডা: দীপু মনি বলেছেন, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সম্পূর্ণ অনলাইন ক্লাস শুরু না করার পেছনে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বড় বাধা। আমাদের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে যে ডিজিটালাইজেশন, বিশেষ করে আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে ডিজিটালাইজেশন প্রয়োজন ছিল, তা হয়নি। তার চেয়ে বড় কথা আমাদের মাইন্ডসেটটা কিন্তু পরিবর্তন হয়নি। আমাদের অনলাইনে সমস্যা, তাই বলে আমরা অনলাইনে যাবো না? তাহলে আমাদের এই শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে কতগুলো দিন, কতগুলো মাস ঝরে যেতে দেবো? সারা বিশ্বে স্টুডেন্ট লোনের ব্যবস্থা আছে, আমাদের এখানে সেটা নিয়ে এখনও চিন্তা করব না, তা তো হয় না। আজকে যদি আমরা বলি, আমি অনলাইনে পড়াতে পারি না, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। আজকে যদি বলি, আমার এক্সেস নেই, কতদিনের মধ্যে এক্সেস দেয়া যায়, কেন এক্সেস নেই, কোথায় সমস্যা, কিভাবে আমরা সেই সমস্যা সমাধান করতে পারি।
অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থাকে জোরদার করতে বিডিইউ সম্প্রতি সোয়াট অ্যানালাইসিস নামে এক সমীক্ষা চালিয়েছে। সমীক্ষার আওতায় শিক্ষক এবং ছাত্রদের মতামত গ্রহণের মাধ্যমে বিডিইউ অনলাইন শিক্ষার শক্তিশালী ও দুর্বল দিক, সুযোগ এবং ঝুঁকি চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছে। অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বহুমুখী ইতিবাচক দিক চিহ্নিত করা হয়। পাশাপাশি অনলাইন শিক্ষার কিছু দুর্বল দিকও ফুটে উঠেছে। ভার্চুয়াল মেশিনের প্রায়শই সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ এবং ওয়েবক্যাম সুবিধার অভাব, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য পোর্টেবল ডিভাইসের অভাব, রিয়েল-টাইম পরিবেশের অভাব, কার্যকর সফটওয়্যারের অভাব, উচ্চ ইন্টারনেট ব্যয়, কম ইন্টারনেটের গতি এবং ঘন ঘন ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্নতার মতো কিছু বাহ্যিক দুর্বলতাও অনলাইন শিক্ষা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকার এবং ইউজিসির নানামুখী সমর্থন এবং সহযোগিতা আশা করা হচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবা, প্রয়োজনীয় কম্পিউটার ল্যাবসহ অন্যান্য সরঞ্জাম সমৃদ্ধ করা এবং অনলাইন ক্লাস বা দূরবর্তী শিক্ষণ পরিচালনায় সহায়তা প্রদান।

উত্তরণের উপায়

অফিস আদালত সবকিছু চলছে, বন্ধ হয়ে আছে শিক্ষাকার্যক্রম। লকডাউনে শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতি হচ্ছে, তা পুষিয়ে নেয়ার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর সপ্তাহে ছয় দিন স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করে একটি ক্লাসকে দুটি বিভাগে বিভক্ত করে সকাল থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা যেতে পারে।
ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি। ডিজিটাল দক্ষতা বলতে যান্ত্রিক উপায়ে তথ্য ও যোগাযোগের প্রযুক্তিগত উপায়গুলো ব্যবহার করতে পারা। গণমাধ্যমের কল্যাণে বহু মানুষ অনলাইনে খবর পড়েন এবং খবরের ভিডিও দেখেন। অনেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মোবাইলের ক্রেডিট রিচার্জ ও বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেন। ফলে বলা যায়, বাংলাদেশের বহু সাধারণ মানুষ ডিজিটাল দক্ষতা অর্জন করেছে। কিন্তু শিক্ষাকার্যক্রমের জন্য শিক্ষার্থীরা ডিজিটাল দক্ষতা কতখানি অর্জন করেছে, তা আলোচনা সাপেক্ষ।
শিক্ষার্থীদের জানা দরকার কিভাবে প্রয়োজনীয় ডিজিটাল কনটেন্ট খুঁজতে হয়। যেকোনো বিষয়ে ইন্টারনেটে প্রচুর তথ্য আছে। তবে তথ্যের সত্যতা নিয়ে রয়েছে সন্দেহ। শিক্ষার্থীদের নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট থেকে তথ্য বা কনটেন্ট খুঁজতে হবে। যেমন, অ্যাকাডেমিক জার্নাল থেকে কোনো বিষয়ের ওপর নির্ভরযোগ্য প্রবন্ধ খুঁজতে হলে শিক্ষার্থীদের উচিত হবে গুগল স্কলার সাইটে যাওয়া। একইভাবে গুগল বুকস ও আমাজন সাইটগুলো থেকে বিশ্বের বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত বইগুলোর কিছু পাতা ফ্রিতে দেখা যাবে। তা ছাড়া বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কিছু বিখ্যাত জার্নালের পিডিএফ ভার্সনে প্রবেশাধিকার আছে। শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত আইডি ব্যবহার করে অনলাইনে নির্দিষ্ট বইয়ের সফট কপিও পড়তে পারে।
শিক্ষার্থীদের জানা দরকার কিভাবে ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করতে হয়। ইন্টারনেটের কল্যাণে শিক্ষার্থীরা এখন বহু সাইট থেকে ডিজিটাল রিসোর্স সম্পর্কে জানতে পারে। যেমন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বহু শিক্ষক কোনো বিষয়ের ওপর তাদের লেকচারের ভিডিও ইউটিউবে আপলোড করেন। একজন শিক্ষার্থীকে ডিজিটাল তথ্য উপভোগ করার পাশাপাশি তা তৈরি করার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। যেমন, কোনো শিক্ষকের লেকচারের ভিডিও দেখে বা অডিও শুনে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হয়। এর উপকারিতা আরো বাড়তে পারে যদি শিক্ষার্থীরা অডিও বা ভিডিও উপভোগ করার পর নিজেই অডিও বা ভিডিও ফাইল তৈরি করে সেগুলো সহপাঠীদের শেয়ার করতে হবে।
করোনা পরিস্থিতিতে শ্রেণিকক্ষে বসিয়ে পরীক্ষা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। অনলাইনে কুইজ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ও নির্ধারিত বিষয়ের ওপর অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করা যেতে পারে। যেহেতু ডিজিটাল লেখা খুব সহজে কপি ও অন্যকে শেয়ার করা যায়, সেহেতু শঙ্কা থাকে, কেউ অন্যের ডিজিটাল কনটেন্টকে নিজের বলে ব্যবহার করতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এই প্ল্যাগারিজম বা নকল একটি শাস্তিমূলক অপরাধ। সুতরাং শিক্ষার্থীদের সতর্ক থাকতে হবে নিজের ডিজিটাল কনটেন্টের প্রতি মালিকানা সৃষ্টি করতে, যাতে কেউ কপি করতে না পারে। নিজের ডিজিটাল কনটেন্টের প্রতি মালিকানা সৃষ্টি করার একটি সহজতম উপায় হচ্ছে নিজের তৈরি ফাইল বা কনটেন্টের জন্য পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা; যেমনটি আমরা নিজের মোবাইলের ও ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের পাসওয়ার্ড ব্যবহার করি। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য এটা খুব সহজতর নয়।
সরকারের পক্ষ থেকে আশার বাণী শোনানো হচ্ছে যে, ২০১৩-২০১৪ অর্থবছর থেকে সারাদেশের বিদ্যালয় এবং মহাবিদ্যালয়ে তথ্য ও প্রযুক্তি অধিদফতর থেকে ৪৬৭৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৭টি কম্পিউটার, ১টি প্রজেক্টর, ১টি প্রিন্টার, ১টি স্ক্যানার এবং ছয় মাসের জন্য ফ্রি ইন্টারনেটসহ প্রতিষ্ঠা করেছে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব। সেই সঙ্গে প্রতিটি ল্যাবের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং তিনজন শিক্ষক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং তথ্য প্রযুক্তি অধিদফতরের উদ্যোগে আইসিটি ইন এডুকেশন লিটারেসি অ্যান্ড ট্রাবলশুটিং প্রশিক্ষণে ৪১টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে। আরও ৫,০০০ ল্যাব স্থাপনের লক্ষ্যে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় সারাদেশে প্রায় ৩৫,০০০ মাল্টিমিডিয়া ক্লাস রুম এবং ১২৯টি বিশেষায়িত ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষা স্তরে ও তথ্য প্রযুক্তি প্রসারে এরকম যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। আপাতত এসব উপযোগকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষা সম্প্রসারণে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখা সম্ভব।
এমন আশার দিকের পাশাপাশি বলা যায়, আপৎকালীন মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে যথেষ্ট উজ্জ্বল কিংবা সংবেদী ভূমিকা পালনে সমর্থ হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই পেশাদারিত্ব, দায়বদ্ধতা এমনকি দেশপ্রেমের অভাবও অনুভূত হয়েছে। বিশেষ করে, স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বয়হীনতা, অভ্যন্তরীণ বিরোধ, ব্যক্তিগত উচ্চাকাক্সক্ষা অথবা স্বার্থদ্বন্দ্ব কোনো কোনো ক্ষেত্রে দৃষ্টিকটুভাবে সামনে এসে পড়েছে। করোনার দীর্ঘসূত্রতার কথা ভেবে আমাদের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভাবার সময় এখনই। সেই সঙ্গে দরকার মানসিকতার পরিবর্তন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিগগিরই চালু করলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হবে না। পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে। করোনাকালীন ক্ষয়ক্ষতিকে নিয়তির লিখন হিসেবে মেনে নিয়ে কারিকুলাম অসম্পূর্ণ রেখে কোনোভাবেই পরের ক্লাসে উত্তীর্ণ দেখানোর সিদ্ধান্তও নেয়া যাবে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই ছুটি কমিয়ে এনে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে হবে। প্রয়োজনে অ্যাকাডেমিক সেশনের মেয়াদ বাড়াতে হবে। ক্লাস শুরু না হওয়া পর্যন্ত স্কুল, কলেজ এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেট নেটওয়ার্কে অর্থনৈতিক সাপোর্ট দেয়া যেতে পারে। শিক্ষাব্যবস্থাকে গতিশীল করার জন্য এমন প্রণোদনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা সময়ের দাবি। শিক্ষার্থীরা যেহেতু এখন বাসায় অবস্থান করছে, সেহেতু অভিভাবকদের নজর রাখতে হবে তারা যেন পড়াশোনার মধ্যে থাকে। ইন্টারনেটের অবাধ সুযোগে তারা কেউ যাতে বিপথগামিতার দিকে পা না বাড়ায় সেদিকেও তীক্ষè দৃষ্টি রাখতে হবে।
বাংলাদেশ করোনামুক্ত হলেও অনলাইন নির্ভরতার রেশ পুরোপুরি কাটবে বলে মনে হয় না। যে ডিভাইস একবার হাতের মুঠোয় তালুবন্দি হয় তা বের করা কঠিন। ইতোমধ্যে শোনা যাচ্ছে, দেশের শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা ও পরিমার্জন করে ২০২২ সাল নাগাদ ১ম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত নতুন বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে যাবে। যুগের চাহিদা, এমনকি করোনাকালের শিক্ষাপদ্ধতি কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত থাকছে। প্রযুক্তিনির্ভর অন্যান্য ব্যবস্থার মতোই হয়তো অনলাইন শিক্ষাটাও এক সময় ‘অতি স্বাভাবিক’ একটি কার্যক্রম হয়ে উঠবে। কল্পনা করা হচ্ছে- শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক সক্রিয় থাকবেন অদৃশ্য বাহনে, কন্টেন্টের মাধ্যমে। জেলা-উপজেলায় গড়ে উঠবে ইন্টারনেট প্লাটফর্ম। মূলস্রােতে সংযুক্ত হবে দেশের বিপুল তারুণ্য। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সংযোগ সময়কে সহজেই সংরক্ষণ করা যাবে। ছকে বাঁধা শিক্ষকের কমফোর্ট জোন থেকে শিক্ষকও নিজেকে সরিয়ে নেবেন। কোচিং-গাইড নির্ভরতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবলুপ্ত হবে। ছাত্রছাত্রীর মননশীলতার বিকাশ হবে অনায়াস, স্বাচ্ছন্দ্য ও টেকসই। করোনামুক্ত বিশ্বে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের একটি আইডি পাসওয়ার্ড থাকবে। যেখানে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার নম্বর, পুরো কোর্সের পরিকল্পনা এবং লেকচার প্রেজেন্টেশন বছরের শুরুতেই পেয়ে যাবে। সময়মত ফলাফল প্রকাশ হবে। সেশনজট নামক শব্দটি অভিধান থেকে মুছে যাবে। শিক্ষার্থীরা এগিয়ে যাবে বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। কিন্তু স্বপ্ন-কল্পনার সাথে আমরা কতটা খাপ খাইয়ে ইতিবাচক ফলাফল তুলে আনতে পারবো সেটাই বিবেচ্য বিষয়। তবে করোনাকালীন অবসরে আপাতত নিজেকে গুছিয়ে নিতে পারি। বিশেষত, পুঁথিগত অ্যাকাডেমিক শিক্ষার বাইরে অন্যান্য বিষয়ে নিজেদের মেলে ধরতে পারি। আত্মগঠন প্রয়াস, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারিক শিক্ষার পাশাপাশি স্বপ্নবিনির্মাণের উপযোগী বইপত্র পড়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করার প্রয়াস চালাতেই পারি; এবং এটাই হবে করোনকাল অতিবাহিত করার বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশল।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক; প্রফেসর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply