শিক্ষাব্যবস্থায় সর্বত্র বিপর্যয়

ড. আবদুল লতিফ মাসুম#

শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড- এ আপ্তবাক্যটির সাথে আমরা সবাই পরিচিত। বিগত বছরগুলোতে শিক্ষার যে বেহাল দশা হয়েছে তা শিক্ষার সাথে সম্পর্কিত লোকজন, বিশেষত শিক্ষকেরা ভালো করেই জানেন। একজন শিক্ষক হিসেবে উচ্চশিক্ষার নিম্নযাত্রার কথা আমার জানা। যেহেতু উচ্চশিক্ষা হচ্ছে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের পর্যালোচনা স্তর, তাই ব্যক্তিগত ও বস্তুগত অভিজ্ঞতা স্বাভাবিকভাবেই অতিক্রম করতে হচ্ছে। প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থা বিপর্যস্ত। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা শুভঙ্করের ফাঁকিতে পরিণত হয়েছে। উচ্চশিক্ষা রাজনীতির ভয়ঙ্কর আবর্তে নিপতিত। যারা এই জাতির ভবিষ্যতের চিন্তা করেন, তারা শিক্ষার সার্বিক চিত্রপট পর্যবেক্ষণ করে আঁতকে উঠছেন। কিন্তু তাতে কী আসে-যায়? ‘তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই।’ সোনার হরিণের জন্য সোনার ছেলেদের লেলিয়ে দেয়া হয়েছে।

’৭২ থেকে ’৭৫-এর পুনরাবৃত্তি
একসাগর রক্তের বিনিময়ে যখন স্বাধীনতা অর্জিত হলো, তখন প্রফেসর মোজাফফর আহমেদের মতো শিক্ষাবিদ জাতির বৃহত্তর স্বার্থে শিক্ষাবছরের ক্ষতি মেনে নেয়ার আহ্বান জানালেন। কিন্তু সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের কাছে হয়তো ত্যাগের চেয়ে ভোগের আহ্বানই শ্রেয় বিবেচিত হলো। ১৯৭২ থেকে ’৭৫ পর্যন্ত পরিচিত হলো অবাধ নকলের সময় হিসেবে। টুকিটাকির পরিবর্তে পাঠ্যপুস্তক টেবিলের ওপর চলে এলো। প্রকাশ্য দিবালোকে কোনোরকম রাখঢাক না করে অনুষ্ঠিত হলো নকলের নির্লজ্জ মহড়া। নকলে বাধা দেয়ার অভিযোগে অনেক শিক্ষককে লাঞ্ছিত হতে হলো। একজন আপসহীন অধ্যক্ষ, প্রফেসর এ বি এম আবদুল লতিফকে হেলিকপ্টার পাঠিয়ে উদ্ধার করতে হয়েছিল। ইতিহাসের নাকি পুনরাবৃত্তি ঘটে। কারণ, ইতিহাসের শিক্ষাই হচ্ছে, ‘ইতিহাস থেকে কেউ শেখে না।’ অপ্রিয় হলেও সত্য, বাংলাদেশের মানুষকে অঘোষিত বাকশালসহ অনেক কিছুরই পুনরাবৃত্তি দেখতে হচ্ছে। শিক্ষার ক্ষেত্রেও ’৭২ থেকে ’৭৫-এর পুনরাবৃত্তি ঘটছে। নকল স্বমহিমায় ফিরে এসেছে। ডিজিটালের নামে চলছে ডিগবাজি। আবারও সেকালের মতো শিক্ষাঙ্গন পরিণত হয়েছে রণক্ষেত্রে। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা পর্যন্ত সর্বত্র বিপর্যয়।

কলেজে ভর্তি নিয়ে ডিজিটাল ডিগবাজি
ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেয়ার গল্প শুনেছেন; এবার দেখলেন বাস্তবে। মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর কলেজগুলো সাধারণত নিজ নিজ নীতিকৌশল অনুযায়ী ভর্তির ব্যবস্থা করে থাকে। কর্তৃত্ববাদী আদর্শব্যবস্থায় লালিত শিক্ষামন্ত্রী চাইলেন কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত ভর্তিপদ্ধতি। অনেক দিন ধরে কার্যকর যে, তা ভর্তিপদ্ধতি নাকচ করে আকস্মিকভাবেই তিনি ‘অনলাইনে’ ভর্তির ঘোষণা দিলেন। তাও আবার পাঁচটি বিকল্পের ভিত্তিতে। কলেজগুলোতে অনলাইনে ভর্তির ব্যবস্থা আছে কি না তা না জেনেই ডিজিটালের ঘোষণা দিলেন। ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো। দীর্ঘসূত্রতা, ব্যাপক ভুলভ্রান্তি এবং অভিভাবকদের জন্য হয়রানিমূলক এ ব্যবস্থা সুফল বয়ে না এনে কুফলই বয়ে নিয়ে এলো। ১১ লাখ ভর্তিচ্ছুক ছাত্রের এ ভর্তিপ্রক্রিয়া ছিল জটিল, কঠিন আর কারিগরি অক্ষমতাদুষ্ট। দায়িত্বপ্রাপ্ত বুয়েটকে এ নিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছে। অনেক কলেজে অনলাইনে প্রেরিত তালিকা প্রকাশ করতে অনেক সময় লেগে যায়। চার দিন পর ১০.৩৯ লাখ ছাত্রের ভর্তি বার্তা প্রকাশিত হলেও বাস্তবে বাকি থেকে যায় আরো প্রায় ৭৫ হাজার ছাত্রের ভর্তির বিষয়টি। ভর্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নিয়েও ঘটে বিপত্তি। উচ্চাভিলাষী শিক্ষা মন্ত্রণালয় ১ জুলাই ক্লাস শুরু করতে বললেও ভর্তি তখনো নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে শেষ করা যায়নি। অনেক কলেজে ঘটে আরেক ধরনের বিপত্তি। ১০ বছর ধরে পড়াশোনা করা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। কিন্তু তা পায়নি অনেকে। তাই মনোকষ্টে কেঁদে ফেলে অনেকে। চ্যানেলগুলোতে এ রকম দৃশ্য দেখা যায়। আবার বাড়ির কাছের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুযোগ না পেয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে অনেককে অনেক দূরের কলেজে ভর্তি হতে হয়েছে। মানুষের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপকারী এ ব্যবস্থা বাতিল করা উচিত। বর্তমান বিকেন্দ্রীকরণের যুগে কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা অচল, অগ্রহণযোগ্য ও অসুবিধাজনক। তবে অনলাইনে কলেজভিত্তিক ব্যবস্থা ক্রমে ক্রমে চালু করা যায়। তবে প্রয়োজন ভবিষ্যতে এই কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা বাতিল হওয়া।

শিক্ষার প্রাথমিক পর্ব
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা এখন বিপর্যস্ত। স্বাধীনতার পর থেকে যে ধারাবাহিকতায় প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হচ্ছিল, তা ছিল মন্দের ভালো। প্রাথমিক পর্যায়ে মান নিশ্চিত করার জন্য যে সমাপনী পরীক্ষার আয়োজন করা হয়েছে, এর উদ্দেশ্য মহৎ ছিল। কিন্তু বাস্তবায়ন কৌশলের ভুলে তা প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তিকে নষ্ট করে দিয়েছে। বহির্বিশ্ব তথা দাতাদেশগুলোকে তুষ্ট করার জন্য ভয়ানক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। স্কুলগুলোকে শতভাগ পাসের নির্দেশ দেয়া হলো। এর ফলে শিক্ষকেরা পড়াশোনার পরিবর্তে ভালো ফল দেখানোর চেষ্টায় সার্বিকভাবে মনোযোগী হয়ে ওঠেন। এ কারণে কচিকাঁচা প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের শিক্ষক কর্তৃক নকল প্রদানের ঘটনাও ঘটেছে। স্থানীয় স্কুলগুলোর পারস্পরিক প্রতিযোগিতায় শিক্ষার মূল লক্ষ্যই পরিত্যক্ত হয়। এ ছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সরকারি নানা ধরনের কাজে, যেমনÑ নির্বাচন, আদমশুমারি বা কৃষিশুমারির মতো অনেক কাজে ব্যস্ত রাখা হয়। এ ধরনের কার্যক্রমের ব্যাপকতা এত বেশি যে, তারা এ থেকে পরিত্রাণ চান।
s2
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা
বিনষ্ট প্রাথমিক শিক্ষার কুফল দেখা দিয়েছে মাধ্যমিক পর্যায়ে। স্কুলগুলোতে শিক্ষাব্যবস্থায় যে আধুনিকায়ন ঘটেছে তার সাথে সঙ্গতি রেখে শিক্ষক প্রশিক্ষণ হয়নি। ইংরেজি শিক্ষকের তীব্র অভাব সর্বত্র। কম্পিউটার দেয়া হয়েছে অনেক বিদ্যালয়ে, কিন্তু কম্পিউটার শিক্ষক নেই। আর থাকলেও এর চর্চা নেই। শিক্ষার্থীদের কোনো শিক্ষা না দিয়েই কম্পিউটার বিষয়ে নম্বর দিয়ে দেয়া হচ্ছে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শ্রেণিশিক্ষা এক রকম উবে গেছে। এগুলো যেন সারা বছরই পরীক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা (পিএসসি), নি¤œ মাধ্যমিক পরীক্ষা (জেএসসি) এবং মাধ্যমিক পরীক্ষা (এসএসসি) নিয়ে স্কুলগুলো এতই ব্যস্ত থাকতে হয় যে, শিক্ষকেরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পরিবর্তে পরীক্ষার ব্যবস্থাপনা নিয়েই বেশি ব্যস্ত। সবচেয়ে সর্বনাশের খবর হলো, শিক্ষার্থীদের শেখানোর পরিবর্তে ফলাফল ভালো করার চেষ্টায় ব্যাপৃত রয়েছেন শিক্ষকেরা। এর সাথে যোগ হয়েছে নকলের মহা-উৎসব। নির্বাচনে কারচুপির মতো কারসাজি চলে পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতে। ‘ওপরে ফিটফাট, ভেতরে সদরঘাট’। বাহির থেকে মনে হবে পরীক্ষা সুষ্ঠু হচ্ছে, অথচ ভেতরে ‘শান্তিপূর্ণ’ পরিবেশে খোলামেলাভাবেই নকল চলছে। কোনো কোনো পরিদর্শনকারী ম্যাজিস্ট্রেটকে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে ম্যানেজ করার অভিযোগও জানা গেছে। আজো যেসব নীতিবান, আদর্শবান শিক্ষক নকল প্রতিরোধ করতে চাচ্ছেন, তাদেরকে জীবন দিতে হয়েছে, অপমানিত কিংবা নানাভাবে নিগৃহীত হতে হয়েছে। সরকারি দলের কর্তাব্যক্তিদের ছেলেমেয়ে যদি পরীক্ষার্থী হয়, তাহলে তো কথাই নেই! এ ধরনের নেতানেত্রী যখন তখন হলে প্রবেশ করছেন। শিক্ষক এবং প্রশাসন তাদের কাছে অসহায়।
প্রতি বছর পাসের হার বাড়ানো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মানসিক রোগে পরিণত হয়েছে। এই কৃত্রিম প্রবৃদ্ধি দ্বারা কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে চান। অপর দিকে এই হিসাব দেখিয়ে বিদেশে সুনাম কুড়াতে চান। শিক্ষার হার বাড়ানোর এই অর্থহীন চেষ্টায় গোটা শিক্ষাব্যবস্থার অবমূল্যায়ন হচ্ছে। উত্তরপত্র মূল্যায়নে যে প্রথাগত ব্যবস্থা ছিল, এর অবসান ঘটেছে। আগে শিক্ষকেরা সতর্কতার সাথে যথার্থ মূল্যায়ন করতেন। এখন অলিখিত নির্দেশ হচ্ছে, ভুল-শুদ্ধ যাই লেখা থাকুক না কেন, নম্বর দিতে হবে। কোনো পরীক্ষক যদি ফেল করান, তাহলে তার পরীক্ষক ক্ষমতা বাতিল করা হচ্ছে। এই আত্মপ্রতারণা ও শুভঙ্করের ফাঁকির মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে শিক্ষার উল্লম্ফন ঘটছে বটে, তবে শিক্ষামানের সর্বনাশ ঘটছে। আজকাল লেখাপড়ার বদলে আছে পাসের ফিরিস্তি।
এ ছাড়া বইপত্রের নিম্নমান, অসংখ্য ভুল, অসঙ্গতি, এমনকি অসমাপ্ত বই পরিবেশন করা হচ্ছে। দলবাজি এতই প্রকট আকার ধারণ করছে যে, সাহিত্য, ইতিহাস, ভূগোল সর্বত্র বিসদৃশভাবে এবং অপ্রাসঙ্গিকভাবে নেতানেত্রীর গুণগান অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা ক্ষেত্রে নিরঙ্কুশ দলীয় আধিপত্য কায়েম হয়েছে। সর্বত্র এমপি-মন্ত্রীদের সুপারিশে ক্ষমতাসীন দলীয় স্থানীয় নেতানেত্রীদের বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রধান হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। এরা শিক্ষকদের বিদ্যালয় পরিচালনা করতে দিচ্ছেন না। শিক্ষক নিয়োগে জ্ঞানের পরিবর্তে প্রাধান্য পাচ্ছে অর্থের প্রতিযোগিতা। ফলে শিক্ষাদান প্রক্রিয়া সর্বনিম্ন মানে পৌঁছেছে। বিদ্যালয়গুলোতে ভিন্নমতাবলম্বী শিক্ষকদের ছলে বলে কৌশলে বিদায় করা হচ্ছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের একজন প্রতিষ্ঠিত প্রধান শিক্ষককে বাধ্যতামূলক ছুটি দেয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক এসএসসি পরীক্ষায় ওই স্কুলে ফলাফল বিপর্যয় ঘটে।

প্রশ্নপত্র ফাঁস
ক্ষমতাসীন সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হচ্ছে প্রশ্নপত্র ফাঁস। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা থেকে শুরু করে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক সব পর্যায়ে প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে বিগত বছরগুলোতে। বস্তুত বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে যত পরীক্ষা গৃহীত হয়েছে- বিসিএসের জন্য পিএসসি পরীক্ষা, মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরগুলোর নিয়োগ পরীক্ষা; এমন কোনো পরীক্ষা নেই যেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি। মজার ব্যাপার, ফাঁস হওয়া প্রশ্ন বাতিল করে যে পরীক্ষা নেয়া হয়েছে তার প্রশ্নও ফাঁস হয়েছে। ফটোকপির দোকানে এসব প্রশ্ন পাওয়া যায়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরীক্ষাগুলোর প্রশ্নপত্র যখন বছরের পর বছর ফাঁস হতে থাকে তখন তারা তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হন। প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী উল্টো ধমক দিলেন : সব ঝুট হ্যায়! এমনকি প্রশ্নপত্র ফাঁসের কথা বললে শাস্তির হুমকি দিয়েছেন।

উচ্চশিক্ষা বিপর্যয়
উচ্চশিক্ষার নিম্নযাত্রা নিয়ে একটি প্রতিবেদনমূলক নিবন্ধ সাম্প্রতিক প্রকাশিত হয়েছে জনপ্রিয় একটি দৈনিকে। এতে বলা হয় : লন্ডন-ভিত্তিক সাপ্তাহিক টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই) শিক্ষার মান, গবেষণাসহ বিভিন্ন মানদন্ডে ২০১৫ সালে এশিয়ার যে ১০০টি মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা প্রকাশ করেছে, তার কোথাও বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই। সাংহাই-ভিত্তিক অ্যাকাডেমিক র‌্যাংকিং অব ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি ২০১৩ সালে বিশ্বের ৫০০টি মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা দিয়েছে, তাতেও বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ঠাঁই পায়নি। একই সময়ে কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি নামে আরেকটি সংস্থা ৩০০ এশীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যে মানক্রম করেছে, তাতে বাংলাদেশের একমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঠাঁই পেয়েছে। এই তালিকায় ভারতের ১১টি এবং পাকিস্তানের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। আর শীর্ষ ১০০টির মধ্যে একা চীনেরই রয়েছে ২১টি। এ প্রতিবেদনগুলো থেকে সহজেই বোঝা যায়, উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের কী শোচনীয় অবস্থা! কেন এই দুরবস্থা, তা নিয়ে জাতীয় স্বার্থে সমীক্ষা প্রয়োজন। খুব সংক্ষেপে আমরা যদি এর কারণগুলো নির্ণয় করতে চাই, তাহলে দেখব- ১. উচ্চশিক্ষার অতিমাত্রিক রাজনীতিকীকরণ তথা দলীয়করণ। এ কাজটি সব সরকারের আমলে সব সময় হয়ে থাকলেও বর্তমান সরকারের আমলে এটি সীমা লঙ্ঘন করেছে। ২. বেতনভাতার অপর্যাপ্ততা, গবেষণার সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি, পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে যথেষ্ট মূল্যায়নের অভাব। ৩. ব্যক্তিসঙ্ঘাত এবং গোষ্ঠীগত কোন্দল। ৪. মেধাবীদের বিদেশপ্রীতি। ৫. প্রকৃত একাডেমিক পরিবেশের। ৬. অপছাত্ররাজনীতি। ক্ষমতাসীন দলের ‘সোনার ছেলে’দের অনুপস্থিতি দাপটে এই সময়ে বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ অথবা অচল।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গ
১৯৯২ সালে বিএনপি সরকারের আমলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দেশের বিপুল সংখ্যক, স্নাতক পর্যায়ের সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা সুচারুরূপে সম্পন্ন করার জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন ওইসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিতে অপারগ হচ্ছিল, তখন বোর্ড স্টাইলে পরীক্ষা সমন্বয়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছিল। যথার্থ নেতৃত্বের অভাব, দুর্নীতি এবং ব্যবস্থাপনা ত্রুটির দরুন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সেশনজটে পড়ে। বর্তমান সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে- কলেজগুলো আবার ফেরত যাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। এই বারোয়ারি ভাগের মাধ্যমে আসলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়টি তার অস্তিত্ব ও কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলবে। সরকারি ও বেসরকারি স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষা বিপর্যস্ত হবে। মাথাব্যথা করলে যেমন মাথা কেটে ফেলা যায় না, ঠিক তদ্রুপ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ভাগাভাগি করে নিলে মূল সমস্যার সমাধানে আসা যাবে না।

বুয়েট পরিস্থিতি
এ মুহূর্তে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেহাল অবস্থা। ‘একে একে নিভিছে দেউটি’। উপাচার্য অপসারণ আন্দোলন সব সময়ই এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করে রাখছে। বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় ‘সোনার ছেলে’দের দ্বন্দ্ব-বিগ্রহে ক্ষতবিক্ষত। আবার কোনোটি বা সরকারি দলের শিক্ষকদের দ্বন্দ্ব কোন্দলে বিপর্যস্ত। হারাধনের শেষ ছেলেটির মতো বুয়েট ছিল এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। বিশ্বব্যাপী বুয়েটের একটি তুলনামূলক ভালো অবস্থান রয়েছে। ক্ষমতাসীনদের যেন কোনো ভালোই সয় না। বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর বুয়েটের চিরাচরিত নিয়ম ভঙ্গ করে দলীয় ভিসি নিয়োগ দেয়া হয়। ‘সোনার ছেলে’রা ঠুনকো অভিযোগে অপমান করছে শিক্ষকদের। সম্ভ্রম রক্ষায় শিক্ষকেরা নামছেন আন্দোলনে। এই অস্থিতিশীলতার ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ ঘটনায় ছাত্ররা অযৌক্তিকভাবে পরীক্ষা পেছানোর জন্য আক্রমণাত্মক আন্দোলন শুরু করে। অথচ এর আগে পরীক্ষা পেছানোর এ রকম আন্দোলন দেখা যায়নি। কর্র্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে গত ২৫ জুন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে। খোঁজ নিলে হয়তো দেখা যাবে, এর পেছনে সদাসন্ত্রাসী, না-পড়–য়া সোনার ছেলেরা রয়েছে।
আমরা দেখতে পেলাম, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ক্ষমতাসীন সরকারের অদূরদর্শিতা, অপব্যবস্থা এবং সরকারের শিক্ষার্থী অংশ দ্বারা কী বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। ’৭২-’৭৫ সময়কালেও একই বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছিল। তখন বন্দুকযুদ্ধ, ডাকসুর ব্যালটবাক্স ছিনতাই এবং শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে শিক্ষার সর্বত্র বিপর্যয় সৃষ্টি করা হয়েছিল। গোটা জাতির জন্য দুর্ভাগ্য, সেই একই শক্তি শিক্ষাঙ্গনের সর্বত্র সেই সময়কার সবগুলো বিপর্যয় ফিরিয়ে এনেছে। এ বিপর্যয় বাংলাদেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে আরো সর্বনাশের দিকে ধাবিত করবে। আমরা যারা বিশ্বাস করি ‘জ্ঞানই শক্তি’; তাদের কর্তব্য হচ্ছে, এই আঁধার বিদূরিত করে জ্ঞানের সার্বভৌমত্ব বা সুপ্রিমেসি অব নলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিপর্যয় প্রতিরোধ করা। জ্ঞানের সমাজ বা ‘নলেজ সোসাইটি’-এর প্রতি আমাদের সতত ভালোবাসা এবং দেশের প্রতি কর্তব্যবোধ আমাদেরকে কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছে দেবে। তাই জাতীয় কবি নজরুলের ভাষায় আমাদের আন্তরিক প্রার্থনা, ‘চক্ষে জ্বলুক জ্ঞানের মশাল, বক্ষে দেশপ্রেম।’
লেখক : প্রফেসর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply