শিক্ষার দুরবস্থা ও শঙ্কার ঘূর্ণাবর্তে স্বপ্নের বাংলাদেশ -রাশেদুল ইসলাম

যেকোনো অশিক্ষিত মানুষও তার সন্তানকে নিজের চাইতে অধিক শিক্ষিত করে গড়ে তোলার ব্যাপারে ব্যাপক চেষ্টা করে, চিন্তা ফিকির করে। নিজের জীবনের ভুলগুলো তার সন্তান যেন না করে, এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করে। নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের কথা বাদ দিয়ে সন্তান মানুষ করতে যা যা প্রয়োজন, তার সব করার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। আর যারা শিক্ষিত, তারাতো মেপে মেপে পদক্ষেপ নেয় সন্তানের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে। এই সংস্কৃতি আবহমানকাল ধরেই চলে আসছে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে। কিন্তু এবার অভিভাবকদের সব চিন্তায় বিরাট এক বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে লকডাউন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সরকারি সিদ্ধান্ত।
যখন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক লেভেলে পড়াশোনা করতাম, তখন একটি বিশেষ ভালো লাগার বা আনন্দের বিষয় ছিলো স্কুল ছুটি হওয়া বা বন্ধ হওয়া। একবার বন্যা হয়েছিলো। সম্ভবত ১৯৯৮ এর বন্যার সময়ের কথা। আমাদের প্রাইমারি স্কুলের আঙিনা ও ক্লাসরুমে পানি উঠে যায়। প্রচুর আনন্দ হচ্ছিলো, কয়েকদিন স্কুলে যেতে হবে না বলে। সেবার ৭ দিনের বন্ধের মধ্যে চার-পাঁচ দিন পেরুতেই স্কুলে না যেতে পারা বন্ধুদের সাথে দেখা না করতে পারার কষ্টে কেঁদেছিলাম। পরদিন কলাগাছের ভেলা নিয়ে স্কুলের কাছাকাছি গিয়ে দেখি আমার মতো আরো কয়েক বন্ধু মানসিক কষ্টে স্কুলঘর থেকে বানের পানি গেলো কিনা, দেখতে চলে এসেছে।
আমার মতো একই অনুভূতি হয়তো পনেরো মাস ধরে বন্ধ থাকা সারাদেশের সকল স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বন্ধুদের। ১৯৯৮ সালের বন্যায় আমাদের স্কুল বন্ধের পরিস্থিতিতে যেমন শিক্ষকরা প্রতিদিনই স্কুল দেখতে আসতেন, বর্তমানে শিক্ষক-ছাত্র কারোরই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানমুখী হওয়ার সুযোগ নেই। সরকারের কড়া নির্দেশ; ঘর থেকে বেরুনো যাবে না। কঠোর লকডাউন চলছে, শুধুমাত্র এবং একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে!

ঘর থেকে কি সত্যিই বেরুনো যাচ্ছে না?
২০২০ এবং ২০২১ সালের করোনাকালীন অবাস্তব লকডাউনের বিষয় নিয়ে একটা জিনিস লিখলে বাস্তব হবে। তা হচ্ছে গল্প-উপন্যাস। কারণ, আজব ধরনের লকডাউন চলে বাংলাদেশে। বিকাল ৫টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলা রাখা যাবে। যেনো করোনা সন্ধ্যায় তার থাবা বসানোর জন্য ওঁৎ পেতে বসে থাকে। সারাদিন তার ঘুমানোর সময় নির্ধারণ করা আছে। এরকম একটা উপন্যাস পড়েছিলাম- কিশোর তরুণদের প্রিয় ম্যাগাজিন কিশোরকণ্ঠে। ‘জঙ্গলবাড়ির ড্রাকুলা’ নামে। ড্রাকুলা সন্ধ্যার পর লোকালয়ে যাকে পায়, তার ঘাড় মটকে রক্ত শুষে নেয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে লোকসমাগম ঘটে আর তা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ আছে! মানুষ তার নিত্যপ্রয়োজনীয় যতো কাজ আছে, সব করছে। বাজার-ঘাটতো করছেই, বিয়ে-শাদি, জানাজার মতো জনসমাগম হয় এমন কাজও স্বাভাবিক নিয়মেই চলছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কাজ যেগুলোয় একাধিক ব্যক্তির উপস্থিতি প্রয়োজন। স্বাস্থ্যবিধি বলে যা বোঝানো হচ্ছে, সেখানে তার পরিপূর্ণ ব্যবস্থা ছাড়াই একত্র হচ্ছেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরব ও ভুটানের প্রতিনিধির সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। এই সাক্ষাৎ-পরবর্তী সাংবাদিকদের সামনে ব্রিফিং সবাই মিডিয়ায় দেখেছেন।
শুধু ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার বেলায় বাধা দিতে হবে? এ এক আজব খেলা চলছে দেশে। ছাত্র-ছাত্রীরা নিজ দায়িত্বে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাতে বাধা দেয়ার সরকারি কোনো আয়োজন তো চোখে পড়ছে না!

কবে খুলবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান?
তারিখের পর তারিখ বদলানো হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার। চূড়ান্ত তারিখ যেনো আর কোনোদিন আসবে না! বাড়ি থেকে দূরে যাদের প্রতিষ্ঠান, তারা খোলার তারিখ পেয়ে নিজেদের প্রস্তুতি নেয়ার জন্য আর আবেগ বোধ করছে না। অথচ আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামার বা উইন্টার ভ্যাকেশনের শেষ কয়েকদিন নির্ঘুম কাটাতাম। কবে কিভাবে যাবো, তার প্রস্তুতি নিয়ে অনেক চিন্তা করতাম। ক্ষেত্রবিশেষে ছুটি শেষের নির্ধারিত তারিখের আগেই ক্যাম্পাসে পৌঁছে গেছি।
এবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার চূড়ান্ত তারিখ আসার পরও শিক্ষার্থীরা দ্বিধায় থাকবে বলে মনে হচ্ছে। এতোবার তারিখ পরিবর্তন দেখে দেখে ছাত্র-ছাত্রীরা ক্লান্ত। সময় আর কাটে না!

শিক্ষার্থীরা অফুরন্ত সময় কাটায় কী করে?
এই যে অফুরন্ত সময় শিক্ষার্থীদের হাতে, তারা তা কেমন করে কাটাবে, তার কোনো রূপরেখা কি রাষ্ট্রের পরিকল্পনা বিভাগ কিংবা শিক্ষা অধিদফতরের আছে? আবহমানকাল থেকে শিক্ষার্থীদের ছুটি কাটানোর অমোঘ কিছু জায়গা হলো- নানু-দাদুর বাড়ি, খালা-ফুপুর বাড়ি বা এরকম কোনো আত্মীয়স্বজনের বাড়ি অথবা কয়েক দিনের জন্য পরিবারসহ দূরের কোনো অবকাশযাপন কেন্দ্রে। এবারের এতো লম্বা সময় কাটানোর জায়গার বিষয়ে সরকার কিছু ভেবেছে কি? কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যা যা করছে। পত্রিকার পাতা খুললে, টেলিভিশন চ্যানেলের বিশেষ বুলেটিন দেখলে কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করলেই যে দু’টি সংবাদ দেখে আঁতকে উঠতে হয়, তা হলো- এক, গেইম খেলতে খেলতে কিংবা গেইম খেলায় পারিবারিকভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে কিশোর-কিশোরীর আত্মহত্মা। দুই, কিশোর গ্যাংয়ের কতিপয় কিশোর তরুণ ছিনতাই করাকালে আটক।
এর বাইরেও আরো নতুন নতুন অপরাধচক্রের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় কিংবা পরিবারকে চাপ দিয়ে জোর করে ক্যামেরা কিনে টিকটক-লাইকি ফানি ভিডিও তৈরি করছে। যেখানে বিনোদনের আড়ালে অবাধে ছেলে-মেয়েরা অন্যায় অনাচারের সাথে লিপ্ত হয়ে যাচ্ছে এবং ক্ষেত্রবিশেষে অপরাধের চূড়ান্ত রূপ হিসেবে ধর্ষণ ও পাচারের মতো জঘন্য কাজ করে ফেলছে। ইদানীং এসব বিষয় নিয়ে অভিভাবকদের পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসনও হতাশা প্রকাশ করেছে।
ইন্টারনেট হাতে হাতে পৌঁছে দিলেই কাজ শেষ?
এবারের বাজেট পর্যালোচনায় একটা আলোচনা খুব তুঙ্গে, তা হলো- সারাদেশের সকল শিক্ষার্থীকে ইন্টারনেটের আওতায় নিয়ে আসা। আমরা জানি ইন্টারনেট এক অবাধ বিচরণের জায়গা। বলতে গেলে- দে হ্যাভ নো বাউন্ডারি। বিশ্বব্যাপী তথ্যের সহজ আদান-প্রদানের মাধ্যম হলো ইন্টারনেট। কী তথ্য আদান প্রদান হচ্ছে, তার একটা ট্র্যাকিং পদ্ধতি প্রতিটি রাষ্ট্রে সরকারি নির্দিষ্ট সংস্থার কাছে আছে। কিন্তু বিশ্বের সব দেশের সেই সংস্থা কি কার্যকর? না, তা নয়। এক্ষেত্রে উন্নত বিশ্ব এবং নৈতিকতার ব্যাপারে সচেতন রাষ্ট্র এবং সেদেশের সরকার ও নাগরিকগণ উদ্যোগ নিতে পেরেছে মাত্র। আমাদের উপমহাদেশে ইন্টারনেটের সেইফ ব্যবহার কোনো দেশেই নেই। এশিয়া মহাদেশের উন্নত অর্থনীতি এবং কঠোর আদর্শবাদী জনগোষ্ঠীর কয়েকটি রাষ্ট্র ছাড়া এই উদ্যোগ অধিকাংশের নেই। তার মধ্যে চীন, জাপান, তাওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, উত্তর কোরিয়া, সৌদি আরব, কাতারের নাম উল্লেখ করার মতো। চীন, তাইওয়ান, উত্তর কোরিয়া তো নিজস্ব প্রযুক্তির মাধ্যম ব্যবহারে অনন্য।

সেইফ ইন্টারনেট বাংলাদেশে কতটুকু সেইফ!
সেইফ ইন্টারনেট নিয়ে আলোচনা করতে হলে প্রথমেই যে বিষয়টি সামনে রাখতে হবে, তা হলো স্মার্টফোন এবং কম্পিউটারের যথাযথ ব্যবহার এবং ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ। এরপর আমাদেরকে বিবেচনা করতে হবে, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর বয়স ও ম্যাচুরিটি। পরিণত বয়সের একজন শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে লিগ্যালি ইথিকস-কেন্দ্রিক যেকোনো বিষয় বুঝিয়ে দিয়ে তার নিয়মিত ফলোআপ করাই অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট। এই লিগ্যাল ইথিকস রাষ্ট্রীয় হতে পারে, হতে পারে ধর্মীয়। বিশেষ করে আমাদের দেশে যেহেতু ইসলামিক অনুশাসন মেনে চলার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক আগ্রহ আছে, তাই পর্দার ব্যাপারে খেয়াল রাখা এক্ষেত্রে অতীব জরুরি। এবার শিক্ষার্থী যদি পরিণত বয়সের না হয়ে থাকে, তাহলে সেইফ ইন্টারনেট ব্যবহারের আবশ্যকীয় নিয়ম হচ্ছে অভিভাবকের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা। কথাটা এখানেই। আমাদের দেশের মোট শিক্ষার্থীর কতজন অভিভাবক ইন্টারনেট চালাতে পারেন। বিশেষ করে সন্তানের চেয়ে অভিজ্ঞ কতজন?
আমি যদি আমার পরিবারের পরিসংখ্যান আপনাদের সামনে হাজির করি খুব আঁতকে ওঠার মতো বিষয় হবে। আমার বড় দুই ভাই-ভাবী ও দুই বোন-ভগ্নিপতির কেউই ইন্টারনেট ব্যবহারে পূর্ণ পারদর্শী নয়। আমি দূর থেকে ভাতিজা-ভাগ্নে-ভাগ্নিদের শুধুমাত্র মোটিভেট করতে পারি, নিয়মিত খোঁজ রাখা তো সম্ভব নয়। আমার চিন্তা ভুলও হতে পারে; দেশের গ্রামগঞ্জের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের ক্ষেত্রে এমনটা হচ্ছে। লকডাউনে সন্তানকে স্মার্টফোন কিংবা কম্পিউটারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, ইন্টারনেট সংযোগ নিতে বাধ্য হয়েছেন। শুধুমাত্র এবং একমাত্র ব্যবহারবিধি এবং সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রণটা হাতে নেই। এমতাবস্থায় যা হওয়ার তাই হচ্ছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার দাবি কেন গণ দাবিতে পরিণত হচ্ছে না?
কোনো জাতির শিক্ষিত সমাজ যদি চুপ থাকে, তাহলে সে জাতির উপর যতো ক্ষতিকর বিষয়ই আপতিত হোক না কেন, তার কোনো প্রতিবাদ হবে না। বিশেষ করে এই শিক্ষিত সমাজের মধ্যে যারা উচ্চশিক্ষিত এবং বুদ্ধিজীবী, তাদের ভূমিকা মুখ্য। এককথায় নেতৃস্থানীয় শিক্ষিতরাই সমাজের যেকোনো সমস্যা সহজে অনুধাবন করতে পারে এবং তার উত্তরণে যৌক্তিক দাবি পেশ করতে পারে এবং সেই দাবি আদায় করিয়ে নিতে পারে।
বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান বিবেচনায় আপনি দু’টি বিষয়ে চূড়ান্ত কথা বলতে পারেন। এক. এখানে খুব বেশি পরিমাণ নৈতিক চিন্তায় গড়ে ওঠা চিন্তাশীল মানুষ নেই। দুই. অধিকাংশ শিক্ষিত মানুষ আসলে জ্ঞানপাপী। তাই যদি না হবে, পনেরো মাস যাবৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের বিপরীতে জাতির সামনে যৌক্তিক চিন্তা উপস্থাপন করে আন্দোলনে নামা ছাড়া তো কোনো উপায় থাকার কথা না।
আসলে সমাজের সকল মানুষের কল্যাণে কাজ করার জন্য বিবেকবান এবং যোগ্যতাসম্পন্নদের মহান আল্লাহ মর্যাদাসহ যে মহান দায়িত্ব দিয়েছেন তার ব্যাপারে উদাসীন হলে এমন হয়। ইসলাম নিয়ে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতন হওয়া ছাড়া আসলে উপায় নেই। সমাজে যারা ম্যাটারফ্যাক্ট, তাদের মাঝে ইসলাম বিষয়ে সচেতন করাই যে বর্তমান সময়ে এক বিশেষ এজেন্ডা, তা বুঝতে কারো বাকি থাকার কথা না। এ ব্যাপারে আমাদের অগ্রগতি ছাড়া এরকম অনেক যৌক্তিক দাবি গণ দাবিতে পরিণত করা দুরূহ।

শিক্ষকরা প্রতিষ্ঠান খোলার দাবি তুলছেন না কেন?
দরিদ্র সমাজের একটা কমন ন্যাচার হচ্ছে, খেয়ে পরে বাঁচতে পারলেই চলে। আমাদের শিক্ষক সমাজের অবস্থা অনেকটা সেরকম। যে শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র প্রয়োগ করে লম্বা লম্বা ম্যাথ করান, রাত জেগে প্রস্তুতি নিয়ে পরদিন বড় বড় থিওরি পড়ান, টানা কয়েকদিন তাকরার করে তুল্লাবদের ফারায়েজ বুঝান তারাই আজ অবসরে অনলাইন ব্যবসা করেন, মাছের খামার চালান, ইউটিউবে কন্টেন্ট ক্রিয়েট করেন।
দ্বিতীয়ত, নেমক খেয়ে নেমকহারামি করি কেমনে! ভাবটা এমন। সরকারের চাকর হয়ে সরকারের বিরোধিতা হয়, এমন কাজ করা যাবে না যদিও তা রাষ্ট্রের জন্য সার্বিক ক্ষতির কারণ হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সেরা শিক্ষকদেরও একই কাতারে দেখা যাচ্ছে অধিকাংশ। সমাজব্যবস্থার প্রতি কোনো দায় অনুভব করছেন না তারা। শিক্ষকতার মতো মহান পেশাকে শুধুমাত্র অর্থ উপার্জনের মাধ্যম মনে করছেন। যেহেতু বেতন বন্ধ হয়নি, বরং বসে বসেই বেতন পাওয়া যায় এবং সময়গুলো সাংসারিক অন্যান্য কাজে লাগানো যাচ্ছে, তাই এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো ফুরসত খুঁজছে না তারা।

বুদ্ধিজীবী মহলের কোনো দায় নেই এক্ষেত্রে?
সমাজের চিন্তকমহলের সংজ্ঞা আজ পরিবর্তন হয়ে গেছে। ফ্যাসিবাদকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যদি আপনি খুব যৌক্তিক তত্ত্ব উপস্থাপন করতে পারেন, তাহলে আপনাকে বুদ্ধিজীবী হিসেবে সরকারিভাবে গণ্য করা হবে। আপনার জীবনে নীতি নৈতিকতার বালাই থাকুক আর নাই থাকুক। আপনি পিএইচডি গবেষণা চুরি করে ডিগ্রি অর্জন করলেও চলবে।
অপর দিকে যারা প্রকৃতই জাতিকে নিয়ে ভাবেন, জাতির জন্য নিজের সময় শ্রম চিন্তা ঢালেন, তাদেরকে কোণঠাসা করে রাখা হয় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের থাবায়। তাদের কণ্ঠ উচ্চকিত হতে দেয় না। কিন্তু দায়িত্ববানরা রক্তচক্ষুকে ভয় পায় না বলেই জানি। আগামীর প্রজন্ম প্রকৃত বুদ্ধিজীবীদের ডাকের অপেক্ষায় থাকে। এগিয়ে আসার বিষয়টি তাদেরকে সমাজের প্রতি দায় হিসেবে নিতে হবে।

ছাত্রসংগঠনগুলোর নির্বিকার ভূমিকার শেষ কোথায়?
একমাত্র বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ছাড়া আজ পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার দাবিতে ধারাবাহিকভাবে অন্য কোনো ছাত্রসংগঠনকে কর্মসূচি গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। এটা একদিক থেকে আজব ঘটনা এবং অন্য বিবেচনায় বিস্ময়ের। ছাত্রসংগঠনগুলোর অধিকাংশই যে লেজুড়বৃত্তি করে, এটা এবারের করোনায় প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের এমন ঘোরতর বিপদ দেখেও তারা নির্বিকার। দায় এড়ানোর মতো করে কিছু কর্মসূচি রাখলেও তা আসলে ব্যানার-সর্বস্ব।
বস্তুত এসময় সারাদেশের সকল ছাত্রসংগঠন মিলে একযোগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার দাবিতে ভূমিকা রাখা জরুরি ছিলো। তাহলে সরকার তার একপেশে আচরণ প্রতিষ্ঠা করতে পারতো না। আর ছাত্রসংগঠনগুলো যে ছাত্রদের কল্যাণে কাজ করে, তা বলার নৈতিক সাহস নিশ্চিত করতে পারতো। আমি মনে করি এখনো সেই সুযোগ রয়েছে। জাতীয় এই সঙ্কটকালে সকল ছাত্রসংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন জোরদার করার এখনই মোক্ষম সময়। তা নাহলে শিক্ষার্থীদের প্রতি এহেন অনীহার কারণে ছাত্রসংগঠনগুলোর দিক থেকে সবাই মুখ ফিরিয়ে নিবে এটাই স্বাভাবিক।

দীর্ঘমেয়াদে পড়াশোনা বন্ধ থাকলে ক্ষতির ধরন কেমন হতে পারে?
শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক প্রবণতা হচ্ছে পড়াশোনার ব্যাপারে উদাসীনতা। গত বছরের শুরুর দিক থেকে চলমান লকডাউনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা সেই উদাসীনতায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। নিয়মিত জবাবদিহির ব্যবস্থা না থাকায় এই অবস্থা আরো পাকাপোক্ত হয়েছে যেন।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, সচেতন শিক্ষার্থীরা এই পরিস্থিতিতে বসে নেই। লকডাউনকে তারা সুযোগ হিসেবে নিয়েছে। সে বুঝে ফেলেছে যে, আগত যেসব প্রতিযোগিতায় (পরীক্ষা) তাকে অংশ নিতে হবে, সেখানকার প্রতিযোগীদের অধিকাংশই খরগোশের মতো ঘুমাচ্ছে।
হিরোশিমায় অ্যাটম বোমা বিস্ফোরণে ভঙ্গুর অবস্থা পরবর্তী সময়ে জাপানের তৎকালীন শিক্ষার্থীরা যদি শোকতাপ পালন করে একটু অবসর গ্রহণ করতো, তাহলে তারা ক্যাসিও, হোন্ডা, সনির মতো প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারতো না।
আমরা শিক্ষার্থীরা ঠিক এভাবে চিন্তা করছি না। বর্তমান অফুরান সময়কে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে পারছি না। ফল হিসেবে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। নি¤েœ কিছু ক্ষতির খাত তুলে ধরা হলো-

শিক্ষার্থীদের মেধার ক্ষতি : ইতোমধ্যে উচ্চমাধ্যমিকে অটোপাস করিয়ে দেয়া হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদেরও অটোপাসের সংবাদ দেওয়া হচ্ছে। আগত আরো কিছু বোর্ড পরীক্ষার কাছাকাছি সময়ে এরকম অটোপাসের বহর তৈরি হচ্ছে। এরকম অটোপাস যে পড়াশোনার বিশাল সুযোগ তৈরি করছে না যার মাধ্যমে নিজেদেরকে তৈরি করবে, এটা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।
মাধ্যমিক স্তরের ক্লাসগুলোর গত বছরের সকল পরীক্ষার ক্ষেত্রে ঘরে ঘরে প্রশ্ন পৌঁছে দিয়ে অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে ক্লাস উতরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ বছরো তা চলমান আছে।
ছাত্র-ছাত্রীরা এসব অটোপাস অটো প্রমোশনকে মজা হিসেবে নিচ্ছে। প্রতি বছরের ন্যায় কেউ তাকে মেধাস্থান নিয়ে কথা বলছে না। আর যারা নতুন তারা ধরে নিচ্ছে, এটাই পড়াশোনার নিয়ম। বই দেখে দেখে বাসায় বসে বসে প্রশ্নের উত্তর লিখতে হবে। ফল হিসেবে প্রতিযোগিতাহীন মেধাহীন প্রজন্ম গড়ে উঠছে। মেডিক্যাল কলেজের প্রথম বর্ষ ভর্তি পরীক্ষায় টিকতে না পেরে আত্মহত্যার মতো বেহুদা কাজ করে ফেলছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্র নিজেকে অথর্ব বিবেচনা করে ট্রেনের নিচে লাফ দিয়ে মারা যাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যাতায়াতের সুযোগ বন্ধ থাকায় গবেষকগণ তাদের চিন্তাভাবনার জগতে স্থবিরতা দেখতে পাচ্ছেন। পুনরায় পড়াশোনা চালু করে গবেষণার অগ্রগতি আনতে নিঃসন্দেহে দীর্ঘসূত্রতার শিকার হবে! বলা যায় জাতি দীর্ঘমেয়াদে গবেষণা কাজ হতে বিরত হয়ে গেছে।
আসলে সর্বস্তরের শিক্ষার্থীরা মেধার চর্চা বিষয়টি ভুলে যাচ্ছে দিন দিন। তারা বই খাতা নিয়ে সময় কাটানোর পরিবর্তে খেলাধুলাসহ অলস সময় পার করছে। দীর্ঘদিনের পড়াশোনাহীন জীবন মেধাহীনতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

মনস্তত্ত্বের ক্ষতি : ছাত্র-ছাত্রীরা মানসিকভাবে চরম ক্ষতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাদের মনস্তত্ত্ব গড়ে উঠছে অলসতার আদলে। পড়াশোনা ছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবেই কোনো কাজ নির্ধারণ করা হয় না আমাদের দেশে। ফলে মানসিক বন্ধ্যত্ব নিয়ে নতুন প্রজন্ম বেড়ে উঠছে। দীর্ঘদিন চিন্তাভাবনাহীন কাজহীন থাকায় কর্মদক্ষতা হারাচ্ছে তারা। চরম মানসিক হতাশাগ্রস্ততা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।

নৈতিকতার ক্ষতি : টানা দুই বছর ধরে বাসায় বসে বই দেখে অ্যাসাইনমেন্ট লেখার মাধ্যমে পরীক্ষা দেয়ার প্রবণতা তাকে নকলের মতো অনৈতিকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও দেখা যাবে তারা এই চর্চা অব্যাহত রাখার উদ্যোগ নিতে চাইবে। আজ যেমন শিক্ষকরা মহা সমারোহে বই দেখে দেখে পরীক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করেছে, শিক্ষকদের মধ্যে যারা উদাসীন তারা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও এই মারাত্মক প্রজন্ম বিধ্বংসী কাজ থেকে বেরুতে পারবে না। ১৯৯৬ সাল পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সারাদেশে এই জাতিবিধ্বংসী নকল ব্যবস্থার সয়লাব হয়েছিলো, আবারো তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে বলে আমরা দেখতে পাচ্ছি।
ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে শুধুমাত্র কিছু পড়া বুঝে নিতে যায় বিষয়টি এমন নয়। পাশাপাশি আমাদের মহান শিক্ষকদের সান্নিধ্যে থেকে তারা নৈতিকতার শিক্ষা লাভ করে থাকে। আর এই নৈতিকতার পাঠগুলো শিক্ষকগণ নিয়মিতভাবে এবং ধারাবাহিকভাবে দিয়ে থাকেন। আজ দুই বছর ধরে আমাদের দেশের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা সেই নৈতিক মোটিভেশন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। ফলাফল হিসেবে আমরা দেখতে পাচ্ছি- সমাজ-রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতার ব্যাপারে বেখেয়াল ভাব।
পিতা-মাতা সন্তানকে সার্বক্ষণিক ঘরে আটকে রাখতে পারছে না। বাইরে অফুরান এই সময়ে সন্তান কী করছে তার খোঁজ নেয়া কঠিন হচ্ছে। ফলে তারা যে জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক কাজে, এসব বাবা-মার অজানাই থেকে যাচ্ছে।

সামাজিক ক্ষতি : একজন শিক্ষার্থী শুধুমাত্র পুঁথিগত বিদ্যা অর্জন করে নিজেকে গোছাবে, এটাই তার কাজ নয়। সিনিয়র নাগরিকগণ তাকে দিয়ে সামাজিক সৌন্দর্য সৌষ্ঠব নিশ্চিত করে যুগ যুগ ধরে টিকিয়ে রাখার পরিকল্পনা করে। পড়াশোনার বাইরে থাকায়, নৈতিকতার নিয়মিত পাঠ বর্জিত এবং লাগামহীন জীবন পরিচালনা করায় একজন শিক্ষার্থী সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি তার চিন্তায় আনতে পারছে না। এজন্য আমরা দেখতে পাচ্ছি সামাজিক বন্ধনে ফাটল। বস্তুতান্ত্রিক চিন্তার সম্প্রসারণে শুধুমাত্র নিজেকে নিয়ে ভাবা। এভাবে আমরা সামাজিকভাবে এক ভঙ্গুর জাতি হতে চলেছি।

রাষ্ট্রীয় ক্ষতি : একটি রাষ্ট্র নিয়মিতভাবে মেধার মূল্যায়ন করে যুবকদের রাষ্ট্র পরিচালনার সহায়কশক্তি হিসেবে নিয়োগ করে থাকে। বর্তমান স্থবির পরিস্থিতিতে এই কাজ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ আছে। রাষ্ট্র উদ্যমী প্রজন্মের নতুন নতুন চিন্তার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শিক্ষা খাতে বাজেটের একটা অংশ মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। ফলে শিক্ষা অধিদফতর তার কার্যকারিতা হারাচ্ছে। রাষ্ট্রের শিক্ষা বিভাগের সাথে জড়িত বিভিন্ন জনগোষ্ঠী তাদের নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে মুক্ত থাকছে। যার কারণে তারা চিন্তাভাবনাহীন হয়ে মানসম্মত শিক্ষা বিষয়টি ভুলতে বসেছে। রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকার রাজস্ব বেকার খরচ হচ্ছে।

ভ্যাকসিন নাকি ডিডজটাল ডিভাইস জরুরি?
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে সচেতন নাগরিকদের সবাই শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের ভ্যাকসিনেশন নিশ্চিতের যৌক্তিকতা তুলে ধরছে। এই জাতীয় মতামত উপেক্ষা করে সরকার সকল শিক্ষার্থীর হাতে ডিজিটাল ডিভাইস তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এতে করে শিক্ষার্থীদের জীবনকে চরম হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। একদিকে শরীরের ইমিউনিটি ক্যাপাসিটি ধরে রাখার রাষ্ট্রীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে, অপরদিকে ডিজিটাল ডিভাইস নামক জ্বলন্ত আগুন কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিয়ে পুড়ে ছাই করার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে। কোনটি জরুরি কোনটি অ-দরকারি, তার জ্ঞান যেন আজ সরকারের নেই!

স্বপ্নের বাংলাদেশ ও চলমান শিক্ষাকার্যক্রম
বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবেদন পেশ করা হয়েছে। বিষয়টির সত্যাসত্য যাচাই করা এই প্রবন্ধের বিষয় নয় কিংবা এর উপর বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতি নির্ভরশীল নয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন মূলত এদেশের অপার সম্ভাবনাময় রিসোর্সের ওপর নির্ভরশীল।
আমরা যারা আগামীর সুন্দর বাংলাদেশ গড়া নিয়ে স্বপ্ন দেখি। তারা এখনকার সময়ের শিক্ষার্থী। শিক্ষাই আমোদের ধ্যানজ্ঞান। পরিশীলিত জ্ঞানার্জন করে আমরা জাতিগঠনে পরিব্যাপ্ত। এই গণ্ডির মধ্যে কোনো কালো শকুনের স্থান নেই। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যারা বিধ্বংসী পরিকল্পনা করবে, তারা মূলত এদেশের কীট। আমরা তাদের দুরভিসন্ধি কখনোই বাস্তবতায় রূপান্তর করতে দিতে পারি না।
চলমান শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে আমাদের ইচ্ছে রয়েছে নতুন স্বপ্ন বুনার। যে স্বপ্নের বুনিয়াদ গড়বো নৈতিকতার সমন্বয়ে। সেই নৈতিকতা এক বিপ্লবী আন্দোলনে পরিণত হবে একদিন। এমনকি আজকের যারা ধ্বজাধারী শক্তি, তাদেরকে আমরা উন্নত নৈতিক চরিত্র দ্বারা প্রতিহত করবো ইনশাআল্লাহ।
লেখক : সম্পাদক, ছাত্রসংবাদ

SHARE

Leave a Reply