শিক্ষা ও অপশিক্ষার সমীকরণ । নাবিউল হাসান

শিক্ষা ও অপশিক্ষার সমীকরণ । নাবিউল হাসান“Education is the backbone of a nation” বা ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড’ প্রবাদবাক্যটির সাথে আমরা সকলেই পরিচিত। আমরা জানি মানুষ লেখাপড়া শিখে বিনয়ী হয়। অন্যের ভালো-মন্দ ও সুখ-দুঃখে অংশীদার হওয়ার জন্য তৎপর থাকে। সমাজ থেকে অশিক্ষা কুশিক্ষা দূর করার চেষ্টা তাদের বিচলিত করে। শিক্ষিত মানুষের কাছে সাধারণ মানুষ এমন কোন অনৈতিক কাজ আশা করে না যা চোর-ডাকাত অশিক্ষিত লোকেরা করে থাকে। কিন্তু আমরা আজ কী দেখছি? আমাদের চারপাশে ঘুরে ফিরে কোন চিত্র চোখে পড়ে? আমরা কি একশ্রেণীর শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কাজ দেখে হতবাক হয়ে যাচ্ছি না? আমরা দেখতে পাচ্ছি আমাদের সমাজের বড় বড় পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা এমন সব কাজ করছেন যা ভাবাই যায় না এসব কোনো ভদ্র বা শিক্ষিত লোকের কাজ। কোন কৃষক, শ্রমিক, মজুর অথবা অশিক্ষিত ছোট পেশার লোকদের ঘুুষ নেয়ার সুযোগ নেই। একজন দাগি সন্ত্রাসীকে ‘নির্দোষ’ বলে রায় দেয়া ও একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে আইনের মারপ্যাঁচে অপরাধী বানানোর ক্ষমতাও অশিক্ষিতদের নেই। পারমাণবিক অস্ত্রের সাহায্যে লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা করা অক্ষরজ্ঞানহীন লোকের কাজ নয়। কুবুদ্ধি আর ষড়যন্ত্রের ফ্যাকরায় বিশ্বের শান্তিকামী দেশগুলোতে স্নায়ুযুদ্ধ বাধিয়ে দেয়ার সাধ্য সাধারণ কোনো মানুষের নেই। এসব অপকর্ম করতে পারে শুধু মেধাবী শিক্ষিতরা। জ্ঞানের ভারত্বে তাদের মানবিক চিন্তা এতো নিচু হয়ে গেলে শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড হয় কিভাবে? প্রবাদ বাক্যটি কি তাহলে ভুল? সরাসরি এই কথা বলার দুঃসাহস আমার নেই। আরো একটু খতিয়ে দেখা প্রয়োজন আমাদের সমস্যাটি কোথায়?
শিক্ষার ইংরেজি প্রতিশব্দ Education। অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে যার সংজ্ঞা- Education means a process of teaching, training and learning, especially in schools, or colleges, to improve knowledge and develop skills.
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘মানবধর্ম’ নামক গ্রন্থে বলেছেন, ‘মানুষের অভ্যন্তরীণ সত্তার পরিচর্যা করে খাঁটি মানুষ বানানোর প্রচেষ্টাই হচ্ছে শিক্ষা।’
হারম্যান হর্নের মতে, ‘শিক্ষা হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে মুক্ত সচেতন মানবসত্তাকে সৃষ্টিকর্তার সাথে উন্নত যোগসূত্র রচনা করার একটি চিরন্তন প্রক্রিয়া, যেমনটি প্রমাণিত রয়েছে মানুষের বৃদ্ধিবৃত্তিক, আবেগগত ইচ্ছাশক্তি সম্বন্ধীয় পরিবেশ।’
কবি ও দার্শনিক আল্লামা ইকবাল বলেছেন, ‘মানুষের খুদির বা রূহের উন্নয়নই আসল শিক্ষা।’
একজন শিক্ষার্থী তার ছাত্রজীবন থেকে Morality, Religiosity, Truthfulness, Honesty, Kindness, Sympathy, Charity, Value of time, লোভে পাপ পাপে মৃত্যু, যেমন কর্ম তেমন ফল, দুর্জন বিদ্বান হলেও পরিত্যাজ্য, কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক কে বলে তা বহুদূর…, সবার উপর মানুষ সত্য তাহার ওপর নাই, চকচক করলেই সোনা হয় না, পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি বিষয়ক Eassy, Paragraph, Composition,, ভাব সম্প্রসারণ, সারাংশ, প্রবন্ধ, নিবন্ধ মুখস্থ করতে অনেক পরিশ্রম করে থাকে। অথচ শিক্ষাজীবন পার হওয়ার পর এসবের কোনো কার্যকর ব্যবহার তাদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায় না। বরং তারা স্বার্থের লোভে মিথ্যাবাদী, অসৎ, নিষ্ঠুর, দুষ্ট চরিত্রের হতে দ্বিধাবোধ করে না। তারা রাতদিন পরিশ্রম করে Air pollution, sound pollution water pollution, Environment pollution সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান লাভ করেও রাস্তাঘাটে গাড়ির ভ্যাপু জোরে জোরে বাজায়, রিকশাওয়ালা-গাড়ি চালকদের সাথে দুর্ব্যবহার করে, নিজেদের ব্যবহৃত উচ্ছিষ্ট দিয়ে পরিবেশ নোংরা করে। তারা smoking, terrorism, Draug addiction এর বিরুদ্ধে যথেষ্ট সময় ব্যয় করে মুখস্থ করে কিন্তু ছাত্রজীবন শেষ না হতেই সিগারেট টানা ও চাঁদাবাজির দৃশ্য দেখলে আশ্চর্য হতে হয়। তারা শুধু এমনটি করেই ক্ষান্ত হয় না বরং শিক্ষক লাঞ্ছিত, মেয়েদের উত্ত্যক্ত, শিক্ষাবাণিজ্য, ভর্তিবাণিজ্য ও সহপাঠী হত্যা করতেও কিছু মনে করে না। এমনকি রাজনৈতিক দলের অন্ধ আনুগত্য করতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করে। এরা শিক্ষা নামক মূল্যবান সম্পদটিকে কলঙ্কের ছাপ লেপন করিয়েছে। সম্প্রতি নয়ন বন্ড গ্রুপের রিফাত হত্যা, এর আগে বদরুল কর্তৃক খাদিজাকে কোপানো, ছাত্রলীগ কর্তৃক বিশ্বজিৎ হত্যার দৃশ্য বিশ্ববিবেককে চরমভাবে নাড়া দিয়েছে। এইসব কিছুই ভিডিও হয়েছে বলে আমরা দেখতে পেয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের চোখের অগোচরে কত যে দুর্ঘটনা ঘটছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। একটি সমাজের অর্থনীতি উন্নত হলে বা শিল্পের উন্নতি হলে দেশের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির পরিচয় বহন করে। তার মানে সমাজের সবকিছু ঠিক আছে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে সমাজে বসবাসরত মানুষের মধ্যে মানবিক চেতনা জাগ্রত হয়েছে কিনা; সামাজিক মূল্যবোধ শুভ বুদ্ধির উদয় হয়েছে কিনা; সমাজের বখাটেদের উৎপাত বন্ধসহ সর্বোপরি মানবিক বোধসম্পন্ন সমাজ গড়ে উঠেছে কিনা এদিকগুলো অবশ্যই ভাবার বিষয়। আমাদের সমাজ কতটা এগিয়েছে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের চোখে সামাজিক অবক্ষয়ের এক ভয়াবহ চিত্র ভেসে ওঠে। যে চিত্র হতাশার ও আশঙ্কার, কারণ সামাজিক অবক্ষয় দিনে দিনে চরম আকার ধারণ করেছে। খুন, গুম, ধর্ষণ, বন্দুকযুদ্ধ, নারী নির্যাতন ক্রমাগত বেড়েই চলছে। যৌতুক, এসিড নিক্ষেপ, বখাটেদের উৎপাতে স্কুল-কলেজগামী মেয়েরা আজ ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হচ্ছে। আজ আমরা এতটাই নিরাশ যে স্কুলে পরিমল ও মাদরাসায় সিরাজের মতো শিক্ষকদের হাত থেকে আমাদের মেয়েরা নিরাপদ আছে কিনা সে চিন্তায় প্রহর গুনি। বাবার বয়সী এসব শিক্ষক সন্তানের মতো মেয়ের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকায়। সুস্থ চিন্তা ও শুভ বুদ্ধির বিপরীতে দিনে দিনে আমরা অন্ধকারেই নিমজ্জিত হচ্ছি। আমাদের সমাজ যদি সুন্দর সুস্থ সংস্কৃতির পরিবর্তে অসুস্থ সংস্কৃতি কুরুচিপূর্ণ বিকৃত মানুষদের দখলে চলে যায় তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ তরুণ প্রজন্ম কোথায় যাবে?
অধ্যাপক গোলাম আযমের মতে, ‘মানুষকে যারা আত্মবিহীন এক জড়পদার্থ মনে করেন, তারা শিক্ষাব্যবস্থাকে তৈরি করার বেলায় মানুষের শুধু বস্তুগত প্রয়োজনের (Material need) দিকেই লক্ষ্য রাখেন। আর মানুষের প্রকৃত পরিচয় উপলব্ধি করতে অক্ষম হওয়ার ফলে সে ব্যবস্থায় মানুষকে অন্যান্য জীবের ন্যায়ই দেহসর্বস্ব মনে করে গড়ে তোলা হয়। পাশ্চাত্য সভ্যতা ধর্মনিরপেক্ষ ও আল্লাহবিমুখ বলে তার পক্ষে মানুষকে আত্মাপ্রধান হিসেবে চিনবার সুযোগ হয়নি। ডারউইন মানুষকে বানরের উন্নত সংস্করণ প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। এ মতাদর্শের বিশ্বাসীরা মানুষকে অন্যান্য পশুর ন্যায় গড়ে তুলবার উপযোগী শিক্ষাপদ্ধতির প্রচরণ করেছেন। এ শিক্ষা দ্বারা মনুষ্যত্বের বিকাশ অসম্ভব। আবার যারা মানুষকে আত্মসর্বস্ব মনে করেন অথবা তারা জৈবিক প্রয়োজনের দিকে মনোযোগ না দিয়ে কেবল আধ্যাত্মিক উন্নতির উদ্দেশ্যে শিক্ষার প্রচরণ করেন, তারাও মানুষের উপযোগী প্রকৃত শিক্ষা দিতে অক্ষম। এ শিক্ষা মানুষকে যতই খোদাভীরু ও ধর্মপ্রাণ হওয়ার অনুপ্রেরণা দান করুক, বাস্তব জীবনে বস্তুগত প্রয়োজনের তাগিদ তাকে ঈমানের বিপরীত পথে যেতে বাধ্য করে। তাই এই প্রকার শিক্ষাও মানুষের স্বভাবের বিপরীত। তাই যে শিক্ষা মানুষের আত্মা ও দেহকে এক সুন্দর সামঞ্জস্যময় পরিণতিতে পৌঁছিয়ে এ জগতের রূপ-রস-গন্ধকে নৈতিকতার সীমার মধ্যে উপভোগ করার যোগ্যতা দান করে, সেই শিক্ষাই মানুষের প্রকৃত শিক্ষা। যে শিক্ষা প্রাকৃতিক শক্তিসমূহকে মানবতার উন্নতি ও নৈতিকতার বিকাশে প্রয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করে, তাই মানুষের উপযোগী শিক্ষা। আর জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম উন্নতি দান করা সত্ত্বেও যে শিক্ষা মনুষ্যত্ব ও আত্মার উন্নতিকে ব্যাহত করে তা প্রকৃতপক্ষে মানব-ধ্বংসী শিক্ষা, তাকে কিছুতেই মানুষের উপযোগী শিক্ষা বলা চলে না।’ (‘ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার রূপরেখা’ থেকে)
দেশের বড় বড় বিদ্যাপীঠ থেকে যারা উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে DC, SP, SI, Magistrate, Advocate, শিক্ষাবিদ, সচিব, চিন্তাবিদ, মানবাধিকারকর্মী হয় তাদের দুর্ব্যবহারে রিকশাচালক, দিনমজুর অথবা বাবার বয়সী মুরুব্বিদের বোবাকান্না শোনা যায়। আধুনিক থেকে অত্যাধুনিক যুগে মুুরুব্বিদের সম্মান প্রদর্শন করার চিন্তায় যেন ঘুণ পোকা ধরেছে। এসব Modern কিংবা Altra Modern Civilization-এর লোকজন Love Marraige করলেও দাম্পত্য জীবনে নীরব ঘাতকের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। এসব কিছুর মূলে রয়েছে আমাদের চরম ব্যর্থতা আর কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্র। আমরা ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার সাথে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বয় সাধন করতে পারিনি। তাই নৈতিকতার চরম অবক্ষয় থাকা সত্ত্বেও বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ছাত্রদের হাতে সনদ তুলে দিচ্ছে। যারা বাস্তবিক অযোগ্য ও অনৈতিক চরিত্রের অধিকারী। ফলে তারা মানুষের কল্যাণের বিপরীতে অকল্যাণ সাধন করছে। আধুনিক বা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় ন্যায়নীতির ভয়াবহ অনুপস্থিতির কারণে বিচারকের কাছে মানুষ সঠিক বিচার পায় না। শাসকের কাছে সুশাসন আশা করে ব্যর্থ হচ্ছি আমরা। প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তার রয়েছে চরম সঙ্কট। সমাজে শিক্ষিত অঙ্গনের সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়মের সয়লাব। ফলে কোথাও প্রকৃত কোনো মূল্যবোধের শিক্ষা আশা করা যেন আকাশ-কুসুম চিন্তা করার নামান্তর। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্র নৈতিক চরিত্র গঠনের শিক্ষা আজ উপেক্ষিত। দেশের সচেতন তরুণ প্রজন্ম আজ শিক্ষক, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সমাজপতিসহ বয়োজ্যেষ্ঠদের মূল্যবোধ সম্পর্কে জোরালোভাবে আপত্তি ও প্রশ্ন তুলছেন। দিন দিন আমাদের মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় কিভাবে ঘটছে তা নানা সংস্থার প্রতিবেদন থেকে উঠে আসছে নিয়মিত। দুর্নীতি বিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, বিশ্বজুড়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ এবার আরো খারাপ অবস্থানে গেছে। আমাদের শিক্ষক, শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে প্রশাসন যন্ত্র, রাজনীতি পর্যন্ত এভাবে যদি মূল্যবোধের চরম সঙ্কটে ভুগে তবে এ জাতির কী হবে? প্রশাসনে এখন খোলামেলা দুর্নীতি হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে মূল্যবোধের বাণীটুকুই শুধু অবশিষ্ট আছে। শিক্ষকসমাজ আজ প্রাইভেট-কোচিং ব্যবসাকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের একশ্রেণীর শিক্ষক দ্বারা ছাত্রীরা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অযোগ্য ব্যক্তিরা রাজনৈতিক পরিচয়ে স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন। সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও আলোকিত ব্যক্তিগণ চাকরির অভাবে নাকানি-চুবানি খাচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়। বিচার বিভাগে ঘুষ, দুর্নীতি তো বলার অপেক্ষা রাখে না। সাধারণ মানুষের এখন আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ উঠেই গেছে। এখন ফাঁকিঝুকি দিয়ে যতটুকু পারা যায় আইনকে নিজের মতো ব্যবহার করছে সবাই। সমাজে অবৈধপথে অর্থ কামানোর তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে এখন। প্রত্যেক জায়গায় দলাদলি, গ্রুপিং-লবিং, কোন্দল, অতিমাত্রায় দলীয় রাজনীতির চর্চা ও আনুগত্য, পদ পাওয়ার লোভ আজ সমাজকে করেছে কলুষিত। পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস শিক্ষাব্যবস্থাকে যেন ধ্বংস করে ছাড়ছে। শিক্ষকসমাজের মধ্যে যদি মূল্যবোধের অবক্ষয় দেখা দেয় তাহলে জাতির ভবিষ্যৎ শুধু অন্ধকারই নয় একদিন ধ্বংস হয়ে যাবো আমরা।

আজকাল শিক্ষার সাথে যেন রাজনীতির সম্পর্ক অতি জোরালো। রাজনীতি ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কথা যেন ভাবাই যায় না। এতে করে আমরা নাকি ‘সভ্য’ হচ্ছি। যুবসমাজের যখন শিল্প-সংস্কৃতি, খেলাধুলা ও পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা তখন রাজনীতিতে ক্ষমতা দখলের লড়াই এবং দুর্বৃত্তায়নে একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতা ও সরকারি আমলা যুবসমাজকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। সরকার এদের কর্মসংস্থানে ব্যর্থ হওয়ায় দেশে বেকার বাড়ছে। আমাদের জাতীয় রাজনীতির অপকৃষ্টি, নেতিবাচকতা, সন্ত্রাস, দলীয়করণের অন্যায় অবিচার প্রসার প্রবণতা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গ্রাস করে ফেলছে। পাশ্চাত্যের স্টাইলে যেভাবে গড়ে উঠছে আমাদের সমাজব্যবস্থা। নৈতিক শিক্ষার তো নামমাত্র নেই বরং নগ্নতা, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা, মাদক আমাদের যুবসমাজকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে। নৈতিক অবক্ষয় মানুষের সামাজিক ও পারিবারিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। একের পর এক এমন লোমহর্ষক ঘটনা দেখে জাতি শিউরে উঠছে। তিন বছরের শিশু থেকে ৯২ বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত এ দেশে ধর্ষণের শিকার হয়। সন্তানরা তার গর্ভধারিণী মাকে হত্যা করছে। কখনো রাস্তার পাশে ফেলে যাচ্ছে। বৃদ্ধ বাবাকে কুপিয়ে আহত করছে। স্কুলগামী ছাত্ররা বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়িত হচ্ছে। আগামী দিনের তরুণ প্রজন্ম অল্প বয়সেই নেশা ও অনৈতিকতায় পা দিচ্ছে। যা প্রতিদিনই মিডিয়ার কল্যাণে দেশবাসী দেখছে। প্রতিটি মা-বাবা তাদের সন্তানদের নিয়ে এখন গভীর শঙ্কাবোধ করছেন। এ এক ভয়াবহ অবস্থা। অথচ আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে পাসের হার বাড়ছে। লক্ষণীয় বিষয় এসব ভয়াবহ অবক্ষয়ের নজির যারা স্থাপন করেছে তারা প্রায় সবাই শিক্ষিত। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে আজ তরুণদের আলোর পথ দেখানোর যেন কেউ নেই। সমাজের সর্বত্র অনিয়ম মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আমাদের বিচারব্যবস্থা প্রতিনিয়ত হতাশ করে দেশের নাগরিকদের। বাংলাদেশের র‌্যাব ও পুলিশ কোট-কাস্টডির তোয়াক্কা না করে বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারের নামে ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে হত্যা করছে মানুষকে। এর মাধ্যমে সরকারি দলের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে দায় থেকে বাঁচানো ও একজনের মাধ্যমে অন্যদের খালাস করার নাটক। এই শাক দিয়ে মাছ ঢাকার উদ্দেশ্য সবাই বুঝলেও বলার মতো সাহসী ব্যক্তি দেশে আজ নাই। এ পদ্ধতির হত্যার মধ্য দিয়ে যদিও নয়ন বন্ডের মত ক্রিমিনালদের হাত থেকে আমরা সাময়িক মুক্তি পেতে পারি। কিন্তু এর দ্বারা কস্মিনকালেও রাষ্ট্রকে সন্ত্রাসীমুক্ত করা যাবে না।
দেশে ভয়াবহ কোনো অনৈতিক ঘটনা ঘটলে এদেশের বুদ্ধিজীবী মহল ও গণমাধ্যম তা নিয়ে তুলাধুনা করছেন ঠিকই কিন্তু এসব সমস্যার সঠিক সমাধান তারা কেউ দেয় না। আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে শিক্ষার হার বাড়ার পরও শুধুমাত্র নৈতিক শিক্ষার অভাবেই সামাজিক অবক্ষয় এই ভয়ানক আকার ধারণ করেছে। মানুষ ঘরে বাইরে অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। নৈতিক শিক্ষাকে বাদ দিয়ে এ সমস্যা সমাধানের অন্য পথের সন্ধান তামাশা ছাড়া কিছু নয়। সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের উচিত সন্তানদের আধুনিক শিক্ষার সাথে সাথে নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা। আর নৈতিক শিক্ষার একমাত্র পথ কুরআনের আলোকে নিজেদের ও আগামী প্রজন্মকে গঠন করা। এখন আমরা আর শুধু শুধু Education is the backbone of a nation বলতে চাই না বরং আমাদের স্লোগান হওয়া উচিত Moral education is the backbone of a nation.তথা নৈতিক শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান দুরবস্থার জন্য কে দায়ী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে অতীতের দিকে দৃষ্টি ফেরাতে হবে- একসময় গোটা দুনিয়ার আধিপত্য বিস্তারকারী ব্রিটিশ শাসকরা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বিষ প্রয়োগ করে আমাদের চেতনা ও বিশ্বাসকে হত্যা করে ফেলেছে। ১৯৩৭ সালে ব্রিটিশ গবেষক ড. ম্যাকলে যে শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করেছিল অদ্যাবধি আমরা সেটিরই অনুসরণ ও অনুকরণ করছি। তিনি এ সিলেবাস প্রণয়ন করে বলেছিলেন, “এ শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা এমন এক জাতি তৈরি করবো যারা রক্তে মাংসে হবে ভারতীয় আর চিন্তা চেতনায় হবে ইংরেজ।” আমরা কি ভেবে দেখেছি তাদের দেখানো পদ্ধতি আমরা অনুসরণ করছি অথচ তারা এত উন্নত আর আমরা কেন এত অনুন্নত জাতিতে পরিণত হয়েছি। এর প্রকৃত কারণ এ ছাড়া আর কিছুই নয় যে, তারা আমাদের জন্য সিলেবাস প্রণয়ন করে আমাদেরকে কোণঠাসা অবস্থায় রেখে দিয়েছে, যাতে আমরা কোনদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস না পাই। তারা নাগরিকের মৌলিক অধিকার শিক্ষাকে হরণ করে নিয়ে গেছে। কেননা আমাদের দেশে একজন ছাত্র তার প্রকৃত মেধার বিকাশ সাধন করতে যে বিষয়টি তার অনুকূলে সেটি গ্রহণ করা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাকে চাকরির জন্য BCS এর সিলেবাস সমাপ্ত করার কাজে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। ইচ্ছা আর অনিচ্ছা সত্ত্বেও অভাবের তাড়নায় বা চাকরিপ্রত্যাশায় প্রকৃত গবেষণা বাদ দিয়ে বাংলা, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞান, বিজ্ঞান, গণিত সব বিষয়ে অল্প করে হলেও জানতে বাঁধা ধরা নিয়ম করা হয়েছে। ফলে মানসিকভাবে উন্নত চিন্তাধারার ব্যাঘাত ঘটিয়ে একজন সাহিত্যিককে তার গবেষণা থেকে, বিজ্ঞানীকে তার আবিষ্কার থেকে বেরিয়ে আসতে হচ্ছে। ওদিকে ব্রিটিশরা নিজেদের চিন্তা ও গবেষণাকে সুবিধামত পরিশীলিত গতিধারায় প্রবাহিত করে চলেছে। অন্য দিকে তারা আমাদের বিষয়ভিত্তিক যে অধ্যায় বা বিভাগগুলো সন্নিবেশিত করেছে সেখানেও ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে মারাত্মক বিষ। কেননা তারা ইসলাম শিক্ষা, ইসলামের ইতিহাস আরবি ও অন্যান্য সকল বিষয়ে অনুন্নত ও অনৈতিক বিষয়াবলী সংযোজন করে ভালো বিষয়গুলোকে বিয়োজন করেছে। ইসলাম শিক্ষা বইটি অবহেলিতভাবে পাঠ্যপুস্তকের অন্তর্ভুক্ত করে ছাত্রদের মনে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে তোমরা ইসলাম সমন্ধে জানছোই তো। কিন্তু ক্লাসের স্যারেরা অঙ্ক, ইংলিশ ও অন্যান্য বিষয়গুলোর পড়া জোর তাগিদ দিয়ে আদায় করলেও ইসলাম শিক্ষাকে ঐচ্ছিক বিষয়ের মতো অবহেলা করে। ফলে ফাঁকিবাজি করে এ বিষয়ে পাস করলেও M.A শেষ করেও একজন ছাত্র পবিত্র কুরআন শুদ্ধভাবে তিলাওয়াত করতে পারে না। ইসলামের ইতিহাস পড়তে গিয়ে বিকৃতির শেষ নেই, কারণ যাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে এ বই লিখা হয়েছে তারা P.K Hitti I R.A Nicholson যারা ধর্মীয় দিক দিয়ে খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী। ফলে ইসলামের ইতিহাস অধ্যয়ন করেও কোন ছাত্র বা ছাত্রী সাহাবীদের মতো চরিত্র গঠন করার অনুপ্রেরণা লাভ করতে ব্যর্থ। আরবি শিখতে গেলে জাহেলি যুগের নোংরা কবি ইমরুল কায়েসের উলঙ্গপনা কবিতা আর আখতাল এবং মুতানাব্বির মদের বর্ণনা ছাড়া ভালো চরিত্র গঠন করার উৎসাহ পাওয়া যায় না। অংকের বেলায় সুদকষা আর দুধের সঙ্গে পানির মিশ্রণ দুর্নীতি শেখার দুর্দান্ত গাইডবুক। দর্শন পড়ে সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করে বসছে অন্ধ দার্শনিকেরা। সামাজিক বিজ্ঞান আর রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ইসলামী অনুশাসনের অনুপস্থিতির জন্য আজকাল সমাজবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা দেশকে সুপথে পরিচালনা করতে পারছে না। তারা দেশ থেকে অরাজকতা, ক্ষমতার জবরদখল, অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে। এভাবে শিক্ষার উপকরণ ও পরিবেশকে ধর্মনিরপেক্ষ করে জাতিকে উচ্ছৃঙ্খল, বর্বর, কুৎসিত, বেহায়া ও অসভ্য জাতিতে পরিণত করা হচ্ছে। বর্তমান শিক্ষার মাঝে মানবতার করুণ আর্তনাদ আর সভ্যতার মাঝে অশান্তির গুঞ্জন ধ্বনি বারবার অনুরণিত হচ্ছে। শুধু তাই নয়: সভ্যতার ধরাছোঁয়া থেকে মুক্ত হয়ে যারা অন্দরমহলে বাস করেন তাদের চিত্রও খুব একটা সুবিধার নয়। এককালে রাগের বশবর্তী হয়ে যারা ইংরেজি শিক্ষাকে হারাম ঘোষণা করে শুধু ধর্মীয় শিক্ষায় জীবন গঠন করতে বদ্ধপরিকর হয়েছিলেন; তাদের অন্দরমহল থেকেও নিষ্পাপ বাচ্চার বিকৃত লাশ বের হয়ে আসে। শিশু নির্যাতন, নারী নির্যাতন, হিল্লা- তালাকের মতো জঘন্য বিষয়গুলোকে জায়েজ করে নিচ্ছে অবলীলায়। মিলাদ, মাজার, পীর-মুরিদির ব্যবসার মতো কুসংস্কার থেকে বের হয়ে আসতে চাইছে না এখনো। হিংসার আগুনে প্রজ্বলিত হয়ে এক শ্রেণীর আলেম আরেক শ্রেণীর আলেমকে কাফের ফতুয়া দিচ্ছে নির্দ্বিধায়। দেশে অনৈসলামিক আইন পাস হলে এই শ্রেণীর আলেমদের কোনো মাথাব্যথা নেই কিন্তু কোট-প্যান্ট-টাই পরে কেউ ইসলাম নিয়ে গবেষণা করলে তাদের কলিজায় আঘাত লাগে। এইসব অবস্থা দেখলে স্বাভাবিকভাবেই ইসলামী লেবাসধারীদের কেউ সভ্য বলতে চাইবে না।
ইসলামের স্বর্ণালি যুগের প্রতি লক্ষ্য করলে আমরা এ থেকে উত্তরণের একমাত্র সমাধান খুঁজে পাই। মহানবী হয়রত মুহাম্মদ (সা) মক্কায় থাকতেই যায়েদ বিন সাবিতকে ইবরানি ও সুরইয়ানি ভাষা আয়ত্ত করতে নির্দেশ দেন। যখন আমাদের দেশের আলেমরা ইংরেজি শিক্ষা হারাম ঘোষণা করেছিল তখন মনে হয় তারা এই ইতিহাস ভুলেই গিয়েছিলেন। মদিনায় হিজরতের পর মহানবী (সা) আহলে সুফ্ফা গঠন করেন। যাতে ৭০ থেকে ৮০ জনের একটি বাহিনী জ্ঞানার্জনে মগ্ন ছিলেন। তাদের সিলেবাস ছিল আসমানি ঐশীগ্রন্থ পবিত্র আল কুরআন আর শিক্ষক ছিলেন মুহাম্মদ সা. নিজেই। সেই আসমানি গ্রন্থের প্রথম আয়াতটি হলো-
“পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাটবাঁধা রক্তপিণ্ড থেকে।” Read by the name of Allah, who created you Created man from a clinging substance.(সূরা আলাক : ১-২)
যেখানে সৃষ্টিকর্তার পরিচয় ও ভয় অন্তরে জাগ্রত করে শিক্ষা অর্জন হয় না সেখানে নৈতিকতা বা আদর্শ হতে পারে ভ্রান্ত। তাই মহান আল্লাহ তার পরিচয় ও ক্ষমতার কথা উল্লেখ করেই জ্ঞানার্জন করা মানুষের জন্য বাধ্যতামূলক করেছেন। আর পৃথিবীকে জানতে হলেও পড়তে হবে ও শিখতে হবে। নইলে আল্লাহর ক্ষমতা ও তার হুকুম মানার আগ্রহ অন্তরে জাগ্রত হবে না। সেজন্য মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন-
“বল, যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি কখনও সমান হতে পারে? নিশ্চয়ই বুদ্ধিমান লোকেরাই উপদেশ গ্রহণ করে।” Say, Are those who know equal to those who do not know? only they will remember (Who one) people of understanding. (সূরা জুমার: ৯নং আয়াতের শেষাংশ)
জানা বা জ্ঞানার্জনকে ইসলাম সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। আর তাইতো মহানবী (সা) হিজরতের ২য় বছরে বদর যুদ্ধের ৭০ জন বন্দী কাফির সৈন্যের মধ্যে যারা শিক্ষিত তাদের এ মর্মে মুক্ত করেন যে, তারা দশজন করে মুসলিম অক্ষরজ্ঞানহীন লোককে শিক্ষাদান করবে। এভাবে শিক্ষাকে ইসলাম গুরুত্ব দিয়েছে যেন মহান আল্লাহর ক্ষমতা সৃষ্টিকৌশল সম্পর্কে মানুষ জেনে পৃথিবীতে শান্তির আবাসভূমি বানাতে পারে। আমাদের পাঠ্যবইয়ের সিলেবাসে যদি হযরত লুকমান (আ)-এর ছেলেদের দেয়া সেই উপদেশ বাণীগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হতো তবে চরিত্রগঠনের একটি মাইলফলক পেয়ে যেত আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরা। যেখানে উল্লেখ আছে আল্লাহর ক্ষমতা ও নম্র মানুষের গ্রহণীয় ও বর্জনীয় দিকসমূহ-
“হে বৎস! কোন কিছু (পাপ-পুণ্য) যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয়, অতঃপর তাকে কোন পাহাড়ের মধ্যে অথবা আকাশের কোন স্থানে নতুবা জমিনের কোন ভিতরে, আল্লাহ তাও মুহূর্তের মধ্যে হাজির করতে সক্ষম। নিশ্চয়ই আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী ও সব বিষয়ের খবর রাখেন।” O my son! (said Luqman), “If there be (but) the weight of a mustard-seed and it were (hidden) in a rock, or (anywhere) in the heavens or on earth, Allah will bring it forth: for Allah understands the finest mysteries, (and) is well-acquainted (with them). (সূরা লুকমান : ১৬নং আয়াত)
এভাবে মহান আল্লাহর ক্ষমতা ও তার পরিচয় সম্পর্কে শিক্ষা দেন হযরত লুকমান (আ) তাঁর সন্তানদের উপরোক্ত আয়াতের পূর্বে এবং পরে আরো অনেক মূল্যবান উপদেশ বর্ণনা করা রয়েছে। এ ছাড়াও সূরা হুজরাতে, সূরা মুমিনুনে, সূরা আনফালে এবং অন্যান্য অনেক সূরা ও আয়াতে উপদেশ সংক্রান্ত আলোচনা আছে। গোটা কুরআনুল কারীমই নৈতিক চরিত্রকে সমুন্নত করার গাইডবুক। পৃথিবীর সমস্ত বুদ্ধিজীবী, দার্শনিক, সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক, গবেষক ও সমাজসেবক যদি পবিত্র কুরআন বুঝে বুঝে অধ্যয়ন করতো তাহলে কেউ নাস্তিক থাকতো না।
পবিত্র কুরআনুল কারিমকে বলা হয় Storehouse of knowledge বা জ্ঞানের অফুরন্ত ভাণ্ডার। যার অধ্যায়গুলোর নাম সুন্দরভাবে বিন্যস্ত। এখানে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য রয়েছে সূরা শামস (সৌরজগৎ), সূরা আল ক্বমার (চন্দ্রজগৎ), সূরা আল বুরুজ (নভোমন্ডল), সূরা আল-নাজম (নক্ষত্রজগৎ)। পদার্থবিজ্ঞানীদের জন্য সূরা দুখান (ধূম্রকুঞ্জ), সূরা আয যারিয়াত (ধূলিঝড়), সূরা আল-হাদিদ (লোহা)। প্রাণিবিজ্ঞানীদের জন্য সূরা আন-নামল (পিপঁড়া), সূরা আন-নাহল (মৌমাছি), সূরা আল বাকারা (গাভী), সূরা আল-আনয়াম (গবাদিপশু)। সূরা আল-আনকাবুত (মাকড়াসা)। দার্শনিকদের জন্য সূরা আল-মা’ আরিজ (উর্ধ্বারোহণ), সূরা মুরসালাত (কল্যাণকামী বাতাস), সূরা আদিয়াত (দ্রুতগামী ঘোড়া)। ব্যবসায়ীদের জন্য সূরা আত-তাগাবুন (লাভ-ক্ষতি), সূরা আল-মুতাফফিকিন (ওজনের ব্যবহার)। রাজনীতিবিদদের জন্য সূরা আশশুরা (জাতীয় সংসদ), সূরা সফ (দল), সূরা সফফাত (দলসমূহ), সূরা মূলক (রাজত্ব)। কবিদের জন্য সূরা আশ-শুয়ারা (কবিগণ)। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের জন্য সূরা আল-আলাক (জমাট রক্তপিণ্ড), সূরা আত তীন (ডুমুর জাতীয় ফলবিশেষ) ও অন্যান্য অনেক আয়াতে বিভিন্ন বর্ণনা। এভাবে মানুষের সকল চাহিদা ও অভাবকে পূরণ করার সমস্ত কলাকৌশল এই সকল আয়াত ও সূরার সঠিক গবেষণার উপর সমাধান দেয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআন অন্যান্য জীবের সাথে মানুষের যে পার্থক্য করে তা হচ্ছে, ‘মানুষ নৈতিক জীব’ আর অন্যান্য জীব নৈতিকতার বন্ধন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। ভালো ও মন্দ, সৎ ও অসৎ, সত্য ও মিথ্যার বিচার করার ক্ষমতা মানুষ ছাড়া আর কোন জীবের মধ্যে দেখা যায় না। মিথ্যাই যার সম্বল, সেই মানুষটিও কিন্তু ‘মিথ্যা বলা অন্যায়’ বলে স্বীকার করে। মিথ্যা বলাকে ভালো কাজ মনে করলে সে ‘মিথ্যুক’ উপাধিতে ভূষিত হওয়া পছন্দ করতো। ভালো-মন্দের বিচারজ্ঞান মানুষকে অন্যান্য জীব থেকে আলাদা করেছে। নৈতিক দিকগুলোকে উন্নত করার চেষ্টা না করলে পবিত্র কুরআন বলে-
“তারা পশুর ন্যায়; বরং পশুর চেয়েও নিকৃৃষ্ট।” (সূরা আরাফ: ১৭৯নং আয়াতের অংশ বিশেষ) নৈতিকতার অবনতির ফলে যখন কেউ মিথ্যা বলে তখন সে কুকুরের চেয়েও অধম হয়ে পড়ে। কেননা কুকুর মিথ্যা বলতে পারে না। তাই বস্তুগত শক্তির সঠিক ব্যবহার নৈতিকতার ওপরই নির্ভরশীল। একটি ছুরি নৈতিকতাসম্পন্ন ব্যক্তির হাতে ব্যবহৃত হলে তা মানুষের উপকারই করবে। কিন্তু নৈতিকতার অভাব হলে এ ছুরিই তাকে ডাকাতে পরিণত করবে। নৈতিকতার বিকাশ ব্যতীত আধুনিক বিশ্ব এতো প্রচণ্ড বস্তু শক্তির অধিকারী হয়েছে বলেই আজ মানবজাতি এতো বড় সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছে।
ইসলামী শিক্ষাকে বাদ দিয়ে আমাদেরকে শুধু বৈষয়িক শিক্ষায় সম্পূর্ণ সময় ব্যয় করা নেহাত বোকামি। ইদানীং ইউরোপ ও আমেরিকার অধিবাসী পাশ্চাত্যের জাতিসমূহের অনুকরণে মুসলিম বিশ্বে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত করছে সেগুলোতে এমনই হচ্ছে। এর ফলে ছাত্ররা কল্যাণকর জ্ঞান ও নেক আমল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলার সতর্কতা হচ্ছে-
‘কখনো না, বরং তোমরা দুনিয়ার জীবনকে ভালোবাস। আর তোমরা ছেড়ে দিচ্ছ আখিরাতকে।’ (সূরা কিয়ামাহ : ২০-২১)
মানবজাতিকে পথ দেখাতে হলে শুধু শুধু আধুনিক শিক্ষা যেমন যথেষ্ট নয় তেমনি আধুনিক শিক্ষা বাদ দিয়ে অন্যকিছু দিয়ে সমাধানে আসা সম্ভব নয়। সন্তানের নৈতিক চরিত্রগঠনের জন্য আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি অবশ্য অবশ্যই আমাদের ইসলামী শিক্ষা তথা ধর্মীয় শিক্ষার ব্যাপক অনুশীলন করতে হবে। তবে এই শিক্ষাব্যবস্থা হতে হবে সেকেলে মুরুব্বিদের গোঁড়ামিমুক্ত ও কোণঠাসামুক্ত। খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে, উসমানী-আব্বাসী শাসনামলে যেমন গবেষণাধর্মী শিক্ষাব্যবস্থা চালু ছিল বর্তমানে আমাদের সেভাবেই চালু রাখতে হবে গবেষণার দ্বার। আল্লাহ প্রদত্ত ওহির সিলেবাস অনুকরণ ও অনুসরণ করে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সা. এর সাহাবী-তাবেয়ী ও পরবর্তী অনুসারীগণ মুসলিম সমাজে যে বিপ্লব সাধন করেছিলেন তাতে ঈষান্বিত হয়ে মুশরিকরা দীর্ঘদিন ধরে তাদের ষড়যন্ত্রের জাল বুনা আরম্ভ করেছিল। ইসলামের সেই স্বর্ণালি যুগে শাসন ক্ষমতার নৈপুণ্যে হযরত আবু বকর রা ও হযরত ওমর রা. যেমন বিশ্বখ্যাতি অর্জন করে ঠিক তেমনি জ্ঞান-বিজ্ঞানে হযরত জাবির ইবনে হাইয়ান (রহ) পরবর্তীতে আল-খাওয়ারিজমী, ইবনে সিনাসহ অসংখ্য আদর্শ পণ্ডিতকে পৃথিবীবাসী উপহার হিসেবে পেয়েছিল। যে শিক্ষাব্যবস্থার ফলে শুধুমাত্র মহান রবকে ভয় করে এমন একটি আদর্শবাদী জাতিগঠন হয়েছিল যারা দুর্নীতিকে কখনো প্রশ্রয় দিতো না। শান্তির অনাবিল সমীরণ চতুর্দিকে প্রবাহিত হতো। নিরাপত্তার বেষ্টনীতে ছিল শুধু আল্লাহর ওপর একান্ত ভরসা। পৃথিবীর সর্বত্রই মহান রবের নিয়ামত ও বরকতে সাঁতার কাটতো পৃথিবীবাসী।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, প্রেরণা

SHARE

Leave a Reply