শিক্ষা বিস্তার ও নিরক্ষরতা দূরীকরণ : রাসূলের (সা) পদ্ধতি

জুবায়ের হুসাইন

নিরক্ষরতা বা মূর্খতা একটি জাতির জন্য বিরাট অভিশাপ। নিরক্ষরতা জাতিকে সামগ্রিক উন্নতি ও অগ্রগতির পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। অক্ষরজ্ঞান না থাকলে ব্যক্তি তার কর্মপন্থা ও মানুষ হিসেবে জীবনযাপনের প্রণালী ও নিয়মনীতি ইত্যাদি ব্যাপারে যথার্থ ধারণা লাভ করতে সক্ষম হয় না। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বিষয়টির গুরুত্ব অধিক। আর সুখের কথা, মহানবীর (সা) এ ধরায় আগমন ঘটেছিল বিশ্বমানবতার শান্তি ও কল্যাণের বাহক হিসেবে বিশ্ববাসীর উন্নতি ও অগ্রগতির সকল পথ উন্মুক্ত করে দেয়ার জন্য। এ মহান লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি নিজেকে একজন সফল নেতা হিসেবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। মানবীয় সফলতার সকল ক্ষেত্রে যথাযথ দিকনির্দেশনা দানের মাধ্যমে তিনি গোটা উম্মতকে একটি ফলপ্রসূ ও পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা উপহার দিয়ে গেছেন।
শিক্ষাই জাতির মেরুদ-। তাই মহানবী (সা) শিক্ষার ব্যাপারে তাঁর উম্মতকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছেন। সাথে সাথে আদর্শ শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে নিরক্ষরতা দূরীকরণেও জাতিকে যথার্থ দিকনির্দেশনা দান করেছেন।
মহানবী (সা) ছিলেন উম্মি। আরবি উম্মি শব্দের অর্থ নিরক্ষর। মনে রাখা দরকার যে, উম্মি আর মূর্খ কখনো এক কথা নয়। উম্মি বলা হয় এমন ব্যক্তিকে যিনি প্রচলিত পদ্ধতিতে কোনো স্কুল-কলেজ বা মাদরাসায় লেখাপড়া করেননি। মূলত এটিও মহান আল্লাহতায়ালার হিকমত যে, তিনি মহানবীকে (সা) উম্মি বা নিরক্ষর হিসেবে প্রেরণ করেছেন যাতে পবিত্র কুরআন তাঁর রচিত বলে কেউ সন্দেহ পোষণ করতে না পারে এবং দুনিয়ার কোনো মানুষ যাতে তাঁর ওপর শেষ্ঠত্বের দাবিদার হতে না পারে। তাই বলা যায়, দুনিয়ায় প্রচলিত পদ্ধতিতে লেখপড়া করেননি বলে তিনি উম্মি হলেও স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ছিলেন তাঁর সরাসরি শিক্ষক। আর তিনি ছিলেন আল্লাহতায়ালার বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সফল ছাত্র। আল্লাহপাকের দেয়া সে শিক্ষার আলোকেই মহানবী (সা) শিক্ষা ও জ্ঞান বুদ্ধির শীর্ষ আরোহণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, “হে নবী! আমি আপনাকে এমন সব জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছি যা আপনি জানতেন না এবং আপনার পূর্বপুরুষরাও জানত না।” (সূরা আন’আম : ৯২) প্রিয়নবী (সা) নিজেই ইরশাদ করেন, “আমি বিশ্বাবাসীর শিক্ষকরূপে দুনিয়ায় প্রেরিত হয়েছি।”
শিক্ষার বিস্তার ও প্রসারে রাসূল (সা) অসাধারণ ভূমিকায় অকুণ্ঠ স্বীকৃতি শুধু তাঁর অনুসারী ভক্তবৃন্দের মুখনিঃসৃত বক্তব্য থেকেই নয় বরং ইসলামের ঘোরবিরোধী এবং ইসলামের প্রতিপক্ষদের সারিতে অবস্থানকারী অনেক নিরপেক্ষ গবেষকের স্বীকারোক্তিতেও এর প্রমাণ মেলে। এ ক্ষেত্রে টমাস কারলাইলের একটি উক্তি অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য। টমাস কারলাইল বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘মুহাম্মদ (সা) ছিলেন একজন নিরক্ষর মানুষ। কোনো শিক্ষকের সামনে তিনি বসেননি কোনোদিন, প্রচলিত পন্থায় তিনি কোনো আক্ষরিক জ্ঞান অর্জন করেননি, অথচ তাঁরই মুখনিঃসৃত প্রতিটি বাক্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের অসাধারণ ও বৈচিত্র্যময় উপকরণ। প্রয়োজন ছাড়া তিনি কোনো কথাই বলতেন না এবং তখন তিনি নীরব থাকতেন। যখন কোনো কথা বলতেন তখন তা হতো বুদ্ধিদীপ্ত ও বিচক্ষণতা সমৃদ্ধ।’ (খরভব ড়ভ ঃযব ঐড়ষু চৎড়ঢ়যবঃ)
শিক্ষার প্রতি মহানবীর (সা) অনুরাগ ও তা বিস্তারে তিনি কতটুকু আগ্রহী ছিলেন, বদর যুদ্ধ-পরবর্তী একটি ঘটনা থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। বদর যুদ্ধে যেসব কাফির সৈন্য মুসলিম সৈন্যদের হাতে বন্দী হয় তাদের মধ্যে এমন কিছু লোক ছিল যারা লেখাপড়া জানতো, নবী করিম (সা) তাদের মুক্তিপণ স্থির করলেনÑ দশটি ছেলেকে অক্ষরজ্ঞান দান করা। অর্থাৎ তারা প্রত্যেকে দশজন করে মুসলিম সন্তানকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত লেখাপড়া শেখাবে। এরপর তারা মুক্ত হয়ে যাবে।
এখানে লক্ষণীয় যে, মহানবী (সা) মুক্তিপণ হিসেবে মোটা অঙ্কের অর্থ-সম্পদ বা অন্য কিছুও নির্ধারণ করতে পারতেন। বিশেষ করে মুসলমানদের আর্থিক সঙ্কটের সে মুহূর্তে এমনটা করাই ছিল স্বাভাবিক এবং যুক্তিযুক্ত। কিন্তু মুসলিম জাতির মহান শিক্ষক বিশ্ববাসীর মুক্তির মহান বার্তাবাহক প্রিয়নবী (সা) অর্থের লোভ করেননি। শিক্ষাকে তিনি অর্থের ওপরে প্রাধান্য দিলেন। এমনকি শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে তিনি কট্টর ইসলামবিদ্বেষীদেরকেও শিক্ষকের মহান মর্যাদা দানে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করলেন না। বরং জীবনের সর্বপ্রথম সুযোগেই তিনি শত্রুদের দ্বারা মদিনার প্রাথমিক শিক্ষা চালু করে দিলেন এবং এ ব্যাপারে তিনি সকলকে ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করলেন। মূলত শিক্ষা বিস্তার ও নিরক্ষরতা দূরীকরণে নবী করিমের (সা) এ অসাধারণ ভূমিকার ফলেই তৎকালীন আরবের চরম মূর্খ ও বর্বর জাতিকে তিনি বিশ্বের দরবারে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বস্তুতপক্ষে শিক্ষা মানে হচ্ছে সুশিক্ষা বা আদর্শ শিক্ষা, তৎকালীন আরব সমাজে মূলত এই আদর্শ শিক্ষারই অভাব ছিল প্রকট। তাই সে যুগে ইমরুল কায়েসের মতো প্রতিভাবান কবি-সাহিত্যিক বর্তমান থাকা সত্ত্বেও তা ইতিহাসের পাতায় জাহিলি যুগ হিসেবেই খ্যাতি লাভ করে। কারণ তাদের শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সাহিত্যে আদর্শ ও নৈতিকতার কোনো বালাই ছিল না। মহানবী (সা) এই বিষয়টি খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হন এবং বুঝতে পারলেন এ অধঃপতিত জাহিলি জাতিকে একমাত্র নৈতিক ও আদর্শ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পারলেই তারা একটি সভ্যসমাজে পরিণত হতে পারে। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি মূলত দু’টি ধারায় শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করেন। প্রথমত, শিক্ষার গুরুত্ব, তাৎপর্য ও ফজিলত বর্ণনা করার মাধ্যমে তিনি তৎকালীন আরব জাতিসহ অনাগত ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষিত হয়ে গড়ে ওঠার জন্য উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করেন। দ্বিতীয়ত, বহুবিধ বাস্তবমুখী কর্মসূচি প্রণয়ন করার মাধ্যমে শিক্ষার আলো-বঞ্চিত একটি জাতিকে সুশিক্ষিত জাতিতে পরিণত করার প্রয়াস অব্যাহত রাখেন।
শিক্ষার গুরুত্ব বর্ণনা
শিক্ষা গ্রহণের বিষয়টি হৃদয়গ্রাহী করার জন্য এবং শিক্ষার প্রতি জন-মানসকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য মহানবী (সা) পবিত্র কুরআনের বাণী উদ্ধৃত করে বলেন, “যাকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ করা হয়েছে তাকে মহা কল্যাণে ভূষিত করা হয়েছে।” (সূরা বাকারা : ২৬৯) অন্য এক আয়াতে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি জ্ঞান রাখে আর যে জ্ঞান রাখে না এ দু’ব্যক্তি কি সমান হতে পারে?” আরো ইরশাদ হচ্ছে, “তোমাদের মাঝে যারা জ্ঞানী মহান আল্লাহ তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দেবেন।” (সূরা মুজাদালাহ : ১১) এ ছাড়াও শিক্ষার গুরুত্ব ও মর্যাদা বর্ণনা করতে গিয়ে মহানবী (সা) নিজে বর্ণনা করেন, “পৃথিবীতে জ্ঞানী (আলিম) ব্যক্তির দৃষ্টান্ত আকাশের তারকার ন্যায় যা পানি ও স্থলভাগকে করে আলোকিত।”
“জ্ঞান (ইলম) অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর ফরজ।”
“রাতের কিছু সময় জ্ঞান চর্চা করা সারারাত জেগে ইবাদত করার চেয়ে উত্তম।”
মূলত শিক্ষাকে ব্যাপক করার মাধ্যমে একটি সভ্য ও নিরক্ষরমুক্ত সমাজ গড়াই ছিল নবী করিমের (সা) উপরোক্ত বাণীসমূহের প্রকৃত উদ্দেশ্য।
শিক্ষা বিস্তারে বাস্তব কর্মসূচি
শিক্ষার ব্যাপক বিস্তারের লক্ষ্যে বিশ্বশান্তির অগ্রদূত, বিশ্বমানবতার মহান শিক্ষক মহানবী (সা) যেসব বাস্ত কর্মসূচি গ্রহণ করেন তা নিম্নে অতি সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো :
শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন : পবিত্র মক্কা নগরীতে ইসলামের প্রারম্ভিক সময়ে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেয়ার জন্য মহানবী (সা) ঐতিহাসিক সাফা পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত দারুল আরকামকে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে তৈরি করেন এবং সেখানে দীর্ঘ তিন বছর পর্যন্ত শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করেন। ইতিহাসে এটিই ছিল সর্বপ্রথম বেসরকারি শিক্ষাকেন্দ্র। এমনিভাবে হিজরতের আগে মদিনার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করলে তাদেরকে শিক্ষা-দীক্ষায় সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলার জন্য নবী করিম (সা) মূসা ইবনে উমাইরকে (রা) শিক্ষক হিসেবে মদিনায় প্রেরণ করেন। হজরত মুসয়াব ইবনে উমাইর (রা) মদিনায় আবু উসামা ইবনে যুরারার বাড়িতে একটি শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করে নবীজির (সা) নির্দেশ মতো সেখানে শিক্ষাকার্যক্রম চালু করেন। মদিনায় এটিই ছিল সর্বপ্রথম ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র।
হিজরতের পর প্রিয়নবী (সা) দীর্ঘ আট মাস যাবৎ আবু আইউব আনসারীর (রা) দ্বিতল ভবনের নিচ তলাকে শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে তথায় শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকেন। এটি ছিল মদিনার দ্বিতীয় ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র।
আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান : নবী করিম (সা) শিক্ষাকার্যক্রমকে অধিকতর ব্যাপক ও সার্বক্ষণিক করার জন্য সাহল ও সুহাইল নামের দুই ভাইয়ের কাছ থেকে একটি জমি খরিদ করে সেখানে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন, যা সুফ্ফা নামে সর্বাধিক পরিচিত। সেখানে তিনি সার্বক্ষণিক শিক্ষাপদ্ধতি চালু করেন। সে শিক্ষাকেন্দ্রের ছাত্রদেরকে বলা হতো আহসাবে সুফ্ফা। নিরক্ষর লোকদের জন্য শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি কার ছিল সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অন্যতম উদ্দেশ্য। সেই শিক্ষাকেন্দ্রে মহানবী (সা) নিজে শিক্ষাদানসহ সার্বক্ষণিক শিক্ষক হিসেবে হজরত সাঈদ ইবনে আ’সকে (রা) নিযুক্ত করেন। ঐতিহাসিক আল্লামা বালাজুরীর বর্ণনা মতে হিজরি দ্বিতীয় সনে মহানবী (সা) দারুল কুররা নামে আরো একটি আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কায়েম করেছিলেন। উল্লেখ্য যে, শুধু শিক্ষালয় প্রতিষ্ঠা করেই তিনি ক্ষান্ত থাকেননি, বরং দাওয়াত ও জিহাদী কর্মসূচির শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও মহানবী (সা) নিয়মিত এসব শিক্ষাকেন্দ্রের কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করতেন। শিক্ষার্থীদের মাঝে কোনো বেমানান কাজ পরিলক্ষিত হলে কিংবা কোনো বিষয়ে তাদেরকে তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত দেখলে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি তা বন্ধ করে দিতেন এবং এ জাতীয় কর্মকা-ে লিপ্ত না হওয়ার উপদেশ দিতেন। একবার কয়েকজন শিক্ষার্থীকে অকারণে হাসাহাসি করতে দেখে প্রিয়নবী (সা) সাথে সাথে তাদের মৃত্যু-পরবর্তী কঠিন অবস্থার কথা বলে হাসাহাসি থেকে বিরত থাকতে বলেন।
শিক্ষাদানপদ্ধতি : মহানবীর (সা) শিক্ষাদানপদ্ধতি ছিল অত্যন্ত সহজবোধ্য ও আকর্ষণীয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলিকে কয়েকবার উচ্চারণ করে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ছাত্রদেরকে বিষয়টি কণ্ঠস্থ করিয়ে দিতেন। আবার কখনো লিখে রাখার পরামর্শ দিতেন এবং ছাত্ররা তা লিখে রাখতেন। নবী করিম (সা) যাদেরকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করতেন তাদেরকেও তিনি এ বলে উপদেশ দিতেন যে, তোমরা শিক্ষার্থীদের মেধানুযায়ী বিষয়াবলি উপস্থাপন করবে।
শিক্ষক প্রেরণ : নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করে অশিক্ষিত ও মূর্খ জাতিকে একটি সুশিক্ষিত জাতিতে পরিণত করার জন্য মহানবী (সা) প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেন। এ লক্ষ্য অর্জনে তিনি ভ্রাম্যমাণ প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেন। এ ক্ষেত্রে তিনি দূর-দূরান্তে শিক্ষক প্রেরণ করেন। যার ফলে শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটে। হিজরি ১১ সালে মহানবী (সা) হজরত মুয়াজ ইবনে জাবালকে (রা) ইয়েমেনে প্রেরণ করেন। সেখানে গিয়ে বিভিন্ন জেলা পর্যায়ের অঞ্চল ঘুরে ঘুরে তিনি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শন করেন এবং একজন ভ্রাম্যমাণ শিক্ষকের ভূমিকা পালন করেন। এমনভাবে হজরত আবু মুসা আশ’আরীকেও (রা) একটি এলাকায় পাঠানো হয়।
প্রশিক্ষণকেন্দ্র : যারা অন্যদেরকে শিক্ষা দেবেন, তাদের আগে প্রশিক্ষণ দেয়া অতীব জরুরি। তাই মহানবী (সা) মদিনার কেন্দ্রীয় শিক্ষালয়ে একটি প্রশিক্ষণ সেল স্থাপন করেন। দূর-দূরান্তের অঞ্চলসমূহ থেকে মেধাবী যুবকদেরকে বাছাই করে মদিনায় এনে তিনি তাদেরকে প্রশিক্ষণ দানের ব্যবস্থা করেন। অতঃপর তাদেরকে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেন।
মসজিদভিত্তিক শিক্ষা : নবী করিম (সা) সাহাবায়ে কেরামকে নিজ নিজ এলাকায় মসজিদ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন এবং সেসব মসজিদকে ভিত্তি করে মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষাকার্যক্রম চালু করার নির্দেশ প্রদান করেন। ওমানের নওমুসলিমদেরকে মসজিদ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়ে নবী করিম (সা) যে চিঠি পাঠিয়েছিলেন বুখারী শরীফসহ নির্ভরযোগ্য হাদিস সংগ্রহসমূহে তার উল্লেখ পাওয়া যায়।
অন্যান্য ভাষা শেখা : প্রিয়নবী (সা) মাতৃভাষার লিখন ও পঠনে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করলেও বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে লোক নির্বাচন করে তাদেরকে অন্যান্য রাষ্ট্রের ভাষা শিক্ষা গ্রহণেরও ব্যবস্থা করেন। হযরত যায়েদকে (রা) নবী করিম (সা) হিব্রু ভাষা শেখার নির্দেশ দেন এবং মাত্র সাত দিনে তিনি হিব্রু ভাষা শিক্ষা সমাপ্ত করেন। অনুরূপভাবে হাবসী, ফার্সি, সুরইয়ানী, গ্রিক প্রভৃতি ভাষা শিক্ষারও তিনি ব্যবস্থা করেন। এ ছাড়াও মূর্খতা ও নিরক্ষরতা দূরীকরণে তিনি স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে বহুমুখী বাস্তব কর্মসূচি গ্রহণ করেন। যেমন বিভিন্ন ভাষা থেকে অনুবাদ, কাব্য ও সাহিত্যচর্চা, স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন হস্তাক্ষর প্রশিক্ষণ, শিশু শিক্ষা ও মহিলাদের প্রশিক্ষণ ইত্যাদি।

তাই দেখা যাচ্ছে, মহানবী (সা) এক বিশেষ হিকমতের জন্য উম্মি হিসেবে দুনিয়ায় প্রেরিত হলেও ইসলামের প্রারম্ভিক যুগ থেকেই শিক্ষা বিস্তার ও নিরক্ষরতা দূরীকরণে তিনি বাস্তব ও ফলপ্রসূ কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রে এক বিরাট বিপ্লব সাধিত করেন। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টার ফসল হিসেবেই গ- মূর্খতায় আচ্ছাদিত আরব জাতি অশিক্ষা, কুশিক্ষা ও নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্তি লাভ করে সুশিক্ষার সম্মানজনক আসনে সমাসীন হয়ে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হয়।
বর্তমানে আমাদের দেশে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিতের হার কম না হলেও আদর্শ ও নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিতের অভাব যথেষ্ট। যার ফলে গোটা দেশ আজ নানাদিক থেকে দুর্নীতিগ্রস্ত ও নৈতিক অবক্ষয়ে জর্জরিত। আর এখন তো শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ইসলাম ও নৈতিকতাকে সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করার হীন ষড়যন্ত্র চলছে। পর্যায়ক্রমে জাতিকে নৈতিকতা বিবর্জিত একটি বর্বর জাতিতে পরিণত করার কাজ বেশ জোরেশোরেই এগিয়ে চলেছে। এখনি এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। নইলে আগামী দিনে প্রিয় বাংলাদেশে নেতৃত্বের আসনে যারা সমাসীন হবে, তাদের দ্বার এ জাতির ভাগ্যোন্নয়নের কোনো আশা করা যাবে না।
লেখক : ব্যাংকার, সাহিত্যিক

SHARE

Leave a Reply