‘শিল্পে বাঁচি, শিল্প বাঁচাই’ -হারুন ইবনে শাহাদাত

অবশেষে দেশের শিল্পী কলাকুশলীরা জাগলেন। তারা একজোট হয়েছেন। দেশের টেলিভিশন শিল্পীদের সাথে নিয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের লক্ষ্যে গঠিত হয়েছে সম্মিলিত প্ল্যাটফর্ম ফেডারেশন অব টেলিভিশন প্রফেশনাল অর্গানাইজেশন (এফটিপিও)। এ সংগঠনের ব্যানারে ‘শিল্পে বাঁচি, শিল্প বাঁচাই’ স্লোগান ধারণ করে রাজপথে নেমেছেন শিল্পী, কলাকুশলী ও নির্মাতারা। সম্প্রতি তারা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পাঁচ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সমাবেশ করেছেন। নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষা পাবে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিশ্বাস সংরক্ষিত হবে। দেশ বাঁচবে বাঁচবে দেশের শিল্প। গত ২ ডিসেম্বর ২০১৬ দৈনিক জনকণ্ঠ এক প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘এফটিপিওর দেয়া ৫ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- দেশের বেসরকারি টিভি চ্যানেলে বাংলায় ডাব করা বিদেশী সিরিয়াল ও অনুষ্ঠান প্রচার বন্ধ করা, টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণ ক্রয় ও প্রচারের ক্ষেত্রে এজেন্সির হস্তক্ষেপ ব্যতীত চ্যানেলের অনুষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে হবে, টেলিভিশন শিল্পের সর্বক্ষেত্রে এআইটির ন্যূনতম ও যৌক্তিক হার পুনর্নির্ধারণ করতে হবে, দেশের টেলিভিশন শিল্পে বিদেশী শিল্পী ও কলাকুশলীদের অবৈধভাবে কাজ করা বন্ধ করতে হবে এবং ডাউনলিংক চ্যানেলের মাধ্যমে বিদেশী চ্যানেলে দেশীয় বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধ করতে হবে।’ জনকণ্ঠের এ প্রতিবেদনটিতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বাংলায় ডাব করা বিদেশী সিরিয়াল প্রদর্শনের বিষয়ে বেসরকারি টিভি চ্যানেল এনটিভির অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান মোস্তফা কামাল সৈয়দ জনকণ্ঠকে বলেন, বিদেশী সিরিয়াল ডাব করে চ্যানেলে প্রচারের ক্ষেত্রে মূলত কোনো সুষ্ঠু নীতিমালা নেই। যদি নীতিমালা থাকত তাহলে আর এ নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হতো না। আর বিদেশী সিরিয়াল প্রচারের বিষয়টি শুরু হয়েছে বিটিভি থেকে। আলিফ লায়লা কিংবা সোর্ড অব টিপু সুলতানের মতো বিদেশী সিরিয়াল প্রচারিত হয়েছে বাংলাদেশ টেলিভিশনে। সেই ধারাবাহিকতায় এখন বিভিন্ন বেসরকারি চ্যানেলেও সুলতান সুলেমান বা এ ধরনের কিছু বিদেশী সিরিয়াল প্রচারিত হচ্ছে। এ ধরনের সিরিয়াল অনেক সময় দর্শকের কাছে জনপ্রিয় হয় এবং সে কারণে প্রদর্শনকারী চ্যানেলটিও বিজ্ঞাপন পাওয়ার স্বার্থে সেটি চালানোয় আগ্রহী হয়। তবে এ বিদেশী সিরিয়াল প্রদর্শনের ক্ষেত্রে আমাদের দেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির পরিপন্থী অনেক কিছুই প্রদর্শিত হয়। এমনকি এই ডাবিংয়ের উচ্চারণেও ব্যাপক ত্রুটি রয়েছে। আমরা যে ভাষায় কথা বলি তেমন ভাষার বদলে অনেক সময় কলকাতার প্রচলিত বাংলা উচ্চারণে ডাবিং হয় এসব সিরিয়াল। এ ছাড়া এসব সিরিয়ালে নৈতিকতার বিষয় বলে কিছু থাকে না। বিষয়বস্তু ভালো হলে আপত্তির কিছু ছিল না। কিন্তু এসব সিরিয়ালের বিষয়বস্তুর মধ্যে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের চরিত্র কিংবা ব্যক্তি ও সামাজিক আদর্শিকতার প্রতিফলন থাকে না। আমরা বাইরের ভালো কিছু গ্রহণ করব না- এই মতবাদের বিশ্বাসী নই। তবে সেটা হতে হবে মানসম্পন্ন এবং আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ওয়ার্ল্ড ক্ল্যাসিক সিরিজগুলো এখানে দেখানো হয় না। তাই এ ধরনের মানহীন বিদেশী ডাবিং সিরিয়াল প্রদর্শনের ব্যাপারে কম নজর দিয়ে আমাদের ভালো অনুষ্ঠান নির্মাণের আগ্রহী হতে হবে, যা কিনা দর্শককে একই সঙ্গে বিনোদন দেবে এবং আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও অনুসরণ করবে।
দীপ্ত নামের একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে বর্তমানে তুরস্ক থেকে আমদানিকৃত সুলতান সুলেমান নামে একটি সিরিয়াল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। উসমানীয় সাম্রাজ্যের দীর্ঘকালব্যাপী রাজত্ব বিস্তারকারী শাসক প্রথম সম্রাট সুলাইমানের জীবনগাঁথা, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, হেরেমখানার দাসীদের প্রতি আসক্তি, সাম্রাজ্য ধরে রাখার যুদ্ধÑ এমন নানা বিষয় এসেছে এ সিরিয়ালে। এ সিরিয়ালটি প্রদর্শনের বিষয়ে দীপ্ত টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী উরফী আহমদ জনকণ্ঠকে বলেন, মূলত দর্শকদের বিনোদনের কথা চিন্তা করেই আমরা এ সিরিয়ালটি আমদানি করেছি। এ সিরিয়ালের গল্পটা আমাদের কাছে ভালো ও মানসম্পন্ন বলে মনে হয়েছে। বর্তমানে টিভি চ্যানেলে বিদেশী সিরিয়াল প্রদর্শনের আন্দোলন এবং এর প্রচার বন্ধ করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাদের আন্দোলনের ফলে এখন হঠাৎ করে এ সিরিয়ালটি প্রদর্শন বন্ধ করে দিলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবো। কারণ আমরা অর্থ খরচ করে এ সিরিয়ালটি আমদানি করেছি। এ ছাড়া দেশের টিভি চ্যানেলে বাংলায় ডাবিংকৃত বিদেশী সিরিয়ালের প্রদর্শন বন্ধের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি নির্দেশনা আসেনি। যদি তেমন নির্দেশনা আসে তাহলে আমরাও এ সিরিয়াল প্রচার বন্ধ করে দেবো। তবে এখন যারা আন্দোলন করছেন তাদের সব টিভি চ্যানেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। সেটা করা হলে দুই পক্ষই চুক্তির মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু সমাধান খুঁজে পাবে।
টেলিভিশন শিল্পী ও কলাকুশলীদের পাঁচ দফা দাবি আদায়ের আন্দোলন প্রসঙ্গে খ্যাতিমান অভিনয়শিল্পী সৈয়দ হাসান ইমাম বলেন, ডাবকৃত বিদেশী সিরিয়াল ও অনুষ্ঠান প্রচার বন্ধ করা উচিত। এসব সিরিয়াল বন্ধ হলে আমাদের টেলিভিশন শিল্পের কোনো ক্ষতি হবে না। আমাদের দেশের দুই-একটি চ্যানেল আছে যারা এগুলো চালায়। দেশের ৫ শতাংশ মানুষ হয়ত দেখে বাকি ৯৫ শতাংশ মানুষ এগুলো পছন্দ করে না। অনেক ক্লায়েন্ট ও এজেন্সি শিল্পী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্দেশক ও প্রযোজকদের ওপর তাদের মতামত চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। এটা খুব অমানবিক। দেশের টেলিভিশন শিল্পে বিদেশী শিল্পী ও কলাকুশলীদের অবৈধভাবে কাজ বন্ধ করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের শিল্পীরা অন্য দেশে গিয়ে কাজ করতে গেলে ওয়ার্ক পারমিটসহ ট্যুরের বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা মেনে কাজ করে, কিন্তু বিদেশী শিল্পীরা কোন নিয়মনীতি ছাড়াই আমাদের দেশে নাটক বা অন্যান্য মাধ্যমে কাজ করে থাকে। এটা বন্ধ হওয়া উচিত। পরবর্তী কর্মসূচি সম্পর্কে তিনি বলেন, আগে দেখব সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়। পরবর্তীতে আমরা অন্য কর্মসূচি দেবো।
এ প্রসঙ্গে অভিনয়শিল্পী আবুল হায়াৎ বলেন, আমাদের দেশের টিভি চ্যানেলে বাংলায় ডাব করা বিদেশী সিরিয়াল বন্ধ হলে টিভি শিল্পের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রথমত আমাদের সরকারকে বুঝতে হবে এর থেকে আমরা কী লাভবান হচ্ছি? বিদেশে নাটকের একটি সিকোয়েন্স করতে কমপক্ষে পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় হয়। সেক্ষেত্রে আমাদের দেশে ব্যয় হয় বড়জোর পঞ্চাশ হাজার টাকা। এ বৈষম্য থেকে আমাদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে এগুলো বন্ধ করা উচিত। আমাদের দেশে অনেক বেশি টাকা দিয়ে বিদেশী শিল্পীদের কাজ করানো হচ্ছে, আমাদের দেয়া হচ্ছে খুবই কম। অসঙ্গতির কারণে আমাদের মধ্যে বিরোধ বাড়ছে। বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোতে বিদেশী শিল্পী ও কলাকুশলীদের অংশগ্রহণের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, বিদেশী শিল্পীরা এ দেশে কাজের ক্ষেত্রে কতটা নীতিমালা মানছে, তাদের কাছ থেকে আদৌ কোনো লভ্যাংশ আসছে কিনা, সরকারের তা পর্যবেক্ষণ করা উচিত। টিভি চ্যানেল মালিকদের সঙ্গে কোনো বৈঠক হয়েছে কি-না? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, চ্যানেল মালিকরা আমাদের শত্রু না। তাদের কাছে আমাদের জীবন-জীবিকা। আমাদের সঙ্গে তেমন কোনো বৈঠক এখনও হয়নি। তবে বসতে হবে। এসব বিষয়ে চ্যানেল মালিকরা নিয়মের মধ্যে আসুকÑ এটাই চাই। সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ আলোচনা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, সবে আমাদের আন্দোলন শুরু হলো। অবশ্যই সরকারের সঙ্গে বসতে হবে। তিনি বলেন, ডিস চ্যানেলে রাত-দিন চব্বিশ ঘণ্টা দেখানো হয় বিদেশী সিনেমা। সরকারি অনুমতি ছাড়া টিপু সুলতানসহ আরও অনেক সিরিয়াল দেখানো হয়। এগুলো বন্ধ করতে হবে।
নাটকে পারিশ্রমিক তারতম্য সমস্যার সমাধানে প্রযোজকদের প্রতি অনুরোধ জানান নাট্যব্যক্তিত্ব ড. ইনামুল হক। তিনি বলেন, পারিশ্রমিক নিয়ে সমন্বয়হীনতার অভাব রয়েছে। এ ব্যাপারে সবার একটা শৃঙ্খলার মধ্যে আসা উচিত। বাংলায় ডাবকৃত বিদেশী সিরিয়াল বন্ধের দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ দাবি যৌক্তিক। এতে আমাদের দেশের টেলিভিশন শিল্পের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না। এখন সময় বদলাচ্ছে। আমাদের দেশেও এ ধরনের সিরিয়াল বানানো সম্ভব। বিদেশ থেকে সবকিছু আসার ফলে আমাদের দেশের ডিরেক্টর, প্রযোজকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। মোটকথা, আমরা দেশের জন্য কী করতে পারছিÑ এটা আগে ভেবে দেখতে হবে। আমরা সব নিয়ম ঠিকমতো ইউটিলাইজ করতে পারছি কি না দেখা উচিত।
অভিনেতা ও নির্দেশক মামুনুর রশীদ বলেন, এ ভূখণ্ডের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ-ভাবনা ও চেতনাকে সুরক্ষিত রাখতেই আমাদের এ আন্দোলন। আমরা আমাদের কিছু দাবি সরকারের কাছে তুলে ধরেছি, আর কিছু দাবি চ্যানেল কর্তৃপক্ষের কাছে। আমরা চাইছি আমাদের দাবিগুলো শিগগিরই মেনে নেয়া হোক।
এফটিপিওর সদস্যসচিব নির্মাতা গাজী রাকায়েত বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য একটাই, আমাদের একতার শক্তিটি আমরা দেশবাসীকে দেখাতে চাই। দুর্যোগের মুহূর্তে আমরা একসঙ্গে চলব। তবে আমাদের আন্দোলন কোনোভাবেই সরকারবিরোধী বা চ্যানেলবিরোধী নয়। আমরা সবাই মিলে আমাদের টেলিভিশন মাধ্যমকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, যা হবে এক নতুন উদাহরণ। চ্যানেল মালিকদের প্রতি এই নির্মাতা বলেন, ‘আপনারা ব্যবসা করবেন ভালো কথা, কিন্তু ব্যবসার পাশাপাশি শিল্পকেও ভালোবাসুন।
বর্তমানে আন্দোলনরত এফটিপিওর অন্তর্ভুক্ত সংগঠনগুলো হলো টেলিভিশন প্রোগ্রাম প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, টেলিভিশন নাট্যশিল্পী ও নাট্যকার সংসদ, সহকারী পরিচালক সমিতি, শুটিং হাউজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন, ডিরেক্টরস গিল্ড, টেলিভিশন লাইট হাউজ অ্যাসোসিয়েশনস, অভিনয়শিল্পী সংঘ, প্রযোজনা ব্যবস্থাপক সমিতি, টেলিভিশন মেকাপ আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, অডিও ভিজ্যুওয়াল টেকনিক্যাল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন, ক্যামেরাম্যান অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, টেলিভিশন লাইট ক্রু অ্যাসোসিয়েশন ও টেলিভিশন নাট্যকার সংঘ। শিল্পী ও কলাকুশলীদের এ আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে স্যাটেলাইট চ্যানেলÑ চ্যানেল আই, এটিএন বাংলা, এনটিভি, আরটিভি, বাংলাভিশনসহ বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেল।’
বাংলাদেশে স্যাটেলাইট টিভির সূচনা ১৯৯২ সালে। এর আগে ১৯৬৪ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশে চালু ছিল শুধু বিটিভি। ১৯৯২ সাল থেকে প্রধানত টেলিস্টার-১০ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে অনেক বাংলাদেশী টিভি চ্যানেল অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে আসছে। এগুলোর মধ্যে কোনো কোনোটি অন্যান্য স্যাটেলাইটও ব্যবহার করছে। বাংলাদেশী এসব টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান, বিশেষ করে নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গানের ভিডিও পশ্চিম বাংলার মানুষের কাছে জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও ভারত সরকার তাদের দেশে বাংলাদেশী টিভি চ্যানেলগুলার ওপর এক অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে। অথচ বাংলাদেশে অবাধে চালু আছে প্রচুরসংখ্যক বিদেশী টিভি চ্যানেল, যার মধ্যে ৯০ শতাংশই ভারতীয়। গণমাধ্যমে খবর এসেছে, বাংলাদেশে প্রচুরসংখ্যক ভারতীয় টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠানের ডাউনলিঙ্ক করা হচ্ছে অবৈধভাবে। বাংলাদেশী ক্যাবল অপারেটরেরাও তথ্য মন্ত্রণালয়, বিটিআরসি বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ থেকে অনুমোদন না নিয়েই বিদেশী টিভি চ্যানেলের সিগন্যাল ডাউনলিঙ্ক করছে।
সাপ্তাহিক ব্লিটজ পত্রিকার ২০১৪ সালের এক জরিপে দেখানো হয়েছে ভারতীয় চ্যানেলগুলোর কোনটি বাংলাদেশ থেকে প্রতি মাসে কত আয় করছে। এই তালিকা মতে, স্টার প্লাস ১৯৫ হাজার ইউএস ডলার, স্টার মুভিজ ১১৮ হাজার ডলার, জি স্টুডিও ৯৪ হাজার ডলার, জিটিভি ৬৭ হাজার ডলার, সনি ১২৩ হাজার ডলার, সেটম্যাক্স ৭২ হাজার ডলার, স্টার গোল্ড ৬১ হাজার ডলার, জি সিনেমা ৯৫ হাজার ডলার, স্টার স্পোর্টস ৭০ হাজর ডলার, বিএইউ পাঁচ হাজার ডলার, স্টার জলসা ১৭ হাজার ডলার, জি প্রিমিয়ার ৩৯ হাজার ডলার, জি অ্যাকশন ২৯ হাজার ডলার, জি কাফে ১৯ হাজার ডলার, জি বাংলা ১৭ হাজার ডলার, সাব টিভি ছয় হাজার ডলার, তারা টিভি ছয় হাজার ডলার, তারা মিউজিক ছয় হাজার ডলার, স্টারওয়ান ২৩ হাজার ডলার এবং স্টারওয়ার্ল্ড ২৩ হাজার ডলার।
গত ২ ডিসেম্বর ২০১৬ দৈনিক নয়া দিগন্তের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বেসরকারি কয়েকটি টেলিভিশন মালিকের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে একটি জালিয়াতচক্র ১০০ কোটি টাকার বেশি বিদেশে পাচার করেছে ভারতীয় চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যমে।’ নয়া দিগন্তের এ প্রতিবেদনটিতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ‘গত ৫ নভেম্বর ঢাকা ক্লাবে মিডিয়া ইউনিটের আলোচনা সভায় উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরেন কোনো কোনো বেসরকারি টেলিভিশন মালিক। এখানে জানানো হয়, বাংলাদেশের কোনো টিভি চ্যানেল ভারতের কোথাও চালাতে হলে রাজ্যভেদে ৫ থেকে ১০ কোটি টাকা ল্যান্ডিং ফি দিতে হয়। অথচ ভারতের চ্যানেলগুলো বাংলাদেশে চলছে অনুমোদন ছাড়াই। ল্যান্ডিং ফি তো দূরের কথা কোনো কোনো চ্যানেল মন্ত্রণালয় থেকে লিখিত অনুমতি নিলেও অনেকের তা-ও নেই। এ ছাড়া বাংলাদেশে দেখা যায় এমন অনেক ভারতীয় চ্যানেল যা ভারতেও সম্প্রচার হয় না। শুধু বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন সেক্টরের টাকা আত্মসাতের জন্যই গড়ে উঠছে ভারতীয় এসব চ্যানেল। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন খাতের টাকা বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের গণমাধ্যম শিল্পীরাই বিদেশী অনুষ্ঠান প্রচারের ক্ষেত্র ল্যান্ডিং ফি নির্ধারণের দাবি জানান। ওই অনুষ্ঠানে সাংবাদিক নেতা মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল বলেন, বাংলাদেশের টাকা দিয়ে বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য বিদেশী চ্যানেলগুলো অনুষ্ঠান তৈরি করছে। সেগুলো বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য প্রচার হচ্ছে। অথচ এগুলোর কোনো অনুমোদন নেই। অভিনেতা শহীদুজ্জামান সেলিম বলেন, ভারতের টিভি বাংলাদেশে চলবে আর বাংলাদেশের টিভি ভারতে চলবে না, এটি হতে পারে না। অথচ সেটি হচ্ছে। বিজয় টিভির পরিচালক মহিবুর হাসান চৌধুরী বলেন, বিজ্ঞাপনের নামে বিদেশে ১০০ কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। ইমার মহাসচিব রঞ্জন কুমার দত্ত বলেন, এরই মধ্যে ১০০ কোটি টাকা বিজ্ঞাপনের নামে পাচার হয়েছে। পরিচালক গাজী রাকায়েত বলেন, আমরা এখনো নিজের সংস্কৃতিকে সিস্টেমের মধ্যে আনতে পারিনি। বিদেশী অপসংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করছি। নিজের সংস্কৃতিকে সিস্টেমের মধ্যে এনে বিদেশে টাকা পাচার বন্ধ করতে হবে। একাত্তর টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক ও ‘মিডিয়া ইউনিটির’ আহ্বায়ক মোজাম্মেল বাবু বলেন, আইনের ফাঁকে বাংলাদেশের টাকা মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। যারা এ কাজে জড়িত তাদের আইনের আওতায় নিতে হবে। বাংলাদেশের মিডিয়া জগৎ অপসংস্কৃতি দখল করার মাধ্যমে দেশে সাংস্কৃতিক চেতনাশূন্যতা তৈরি করার চেষ্টা চলছে। এর মাধ্যমে দেশের যুবসমাজকে মস্তিষ্কশূন্য করে দেয়ার মাধ্যমে জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ, মাদকাসক্তি, অনৈতিকতা ও ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ করানো হচ্ছে। এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান বলেন, আমাদের দেশের বিজ্ঞাপন যারা বিদেশের চ্যানেলে নিয়ে যাচ্ছে, তাদের নভেম্বর পর্যন্ত সময় দেয়া হলো। এর পর থেকে যেন তারা আর কোনো রকম বিজ্ঞাপন বিদেশী চ্যানেলে না দেয়। তারপরও যদি সেটি করা হয়, তাহলে আমরা সম্মিলিতভাবে তা প্রতিরোধ করব। অনুষ্ঠানের শুরুতে একাত্তর টিভির প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু জানান, কিছু বিদেশী চ্যানেল অনুমোদনহীনভাবে বাংলাদেশে ডাউনলিংক দিয়ে চালানো হচ্ছে। এসব চ্যানেলে বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে একটি জালিয়াতচক্র বিদেশী চ্যানেলের নামে দেশ থেকে টাকা পাচার করছে। তিনি বলেন, ‘বিজ্ঞাপনের যে টাকা দেশের বাইরে পাঠানো হচ্ছে তা মানিলন্ডারিং। তিনি বলেন, বিষয়টি তথ্যমন্ত্রী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানকে বোঝানোর চেষ্টা করছি।’ এ সময় তিনি চারটি দাবির কথা তুলে ধরেন। এগুলো হলো- অবৈধ ডাউনলিংক চ্যানেল বন্ধ করা, দেশীয় বিজ্ঞাপন বিদেশী চ্যানেলে প্রচার বন্ধ করা, বিজ্ঞাপন প্রচারের নামে মানিলন্ডারিং বন্ধ করা ও সন্ত্রাস দমন।
দৈনিক ইনকিলাবের সাংবাদিক স্টালিন সরকার গত ১৬ জুলাই ২০১৬ লিখেছেন, ‘ধর্মগত কারণে ভারতীয় সংস্কৃতিতে আকৃষ্ট হয়ে পড়া নেপাল সাহস দেখিয়ে ভারতীয় চ্যানেল বন্ধ করে দিয়েছে। নেপালের অধিকাংশ নাগরিক হিন্দু ধর্মাবলম্বী। ভারতের চ্যানেলগুলোতে হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতি প্রচার করা হয়। তারপরও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর হস্তক্ষেপের চেষ্টা এবং সীমান্তে ওষুধ, জ্বালানি, খাদ্যের ট্রাক চলাচল করতে না দেয়ায় নেপাল ভারতীয় সব টিভি চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছে। সে দেশের নাগরিকরাও একাট্টা। ভারতীয় আগ্রাসনের মুখে এবং দেশের ৯২ ভাগ মুসলমানের দেশ হওয়ার পরও আমরা কেন হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতির প্রচারক ভারতীয় চ্যানেলগুলো বর্জন করতে পারছি না? আমাদের দুর্বলতা কোথায়? নেপালিদের দেশপ্রেম আছে আমাদের নেই? নাকি আমরা নেপালিদের মতো সাহসী নই? সাহসী না হলে ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করলাম কিভাবে? বাস্তবতা হলো আমাদের দেশের জনগণ দেশপ্রেমী কিন্তু দেশে হিম্মতওয়ালা রাজনীতিকের বড়ই অভাব।’
গত ১২ ডিসেম্বর ২০১৬ দৈনিক প্রথম আলোতে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব হানিফ সংকেত লিখেছেন, ‘এই দেশ আমাদের, এই মাটি আমাদের। আকাশ সংস্কৃতির এই উন্মুক্ত আগ্রাসনে পরাজিত হয়ে গা ভাসিয়ে দেবে পরধন লোভী পরাশ্রয়ী দুর্বলেরা। কিন্তু আমাদের লোকজ সংস্কৃতির অনন্ত অক্ষয় সম্পদ এবং সামাজিকতা আমাদের জাতিসত্তার পরিচয়। এই আত্মপরিচয়ের অহংকার আমাদের বাঁচিয়ে রাখতেই হবে। আর এ জন্য প্রয়োজন শিল্পী-কলাকুশলী-চ্যানেলের মালিক সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ও ঐক্য। আসছে নতুন বছর। ভবিষ্যতে আমরা যাবতীয় অপসংস্কৃতির চর্চা, বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ ভুলে লালন করব দেশীয় সংস্কৃতিকে। সব আগ্রাসনকে দূরে ঠেলে দিয়ে দেশকে ভালোবেসে, দেশের নিজস্ব সংস্কৃতির ধারায় জেগে উঠব আমরা নিরন্তর।’
এই চাওয়া বেশি কিছু নয় কারণ জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা ২০১৪-এর তৃতীয় অধ্যায়ের সংবাদ ও অনুষ্ঠান সম্প্রচার অধ্যায়ের ৩.৪.১ অনুচ্ছেদে বলা আছে, দেশীয় সংস্কৃতি, ঐহিত্য ও ভাবধারার প্রতিফলন এবং এর সঙ্গে জনসাধারণের নিবিড় যোগসূত্র স্থাপন ও আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক ধারাকে দেশপ্রেমের আদর্শে অনুপ্রাণিত করে সংস্কৃতি বিকাশের প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে। আরেক জায়গায় ৩.৬.৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, দেশী-বিদেশী ছবি অনুষ্ঠানে অশ্লীল দৃশ্য, হিংসাত্মক, সন্ত্রাসমূলক এবং দেশীয় সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পরিপন্থী কোনো অনুষ্ঠান প্রচার করা থেকে সতর্ক থাকতে হবে। ৫.১.১২ এর অনুচ্ছেদে বলা হয়, অনুষ্ঠান বা বিজ্ঞাপন দেশের প্রচলিত আইন, রীতিনীতি, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট

SHARE