শিশু-কিশোরদের লালন পালন

ইকবাল কবীর মোহন

ইসলাম শিশুদের অধিকার ও কল্যাণের বিষয়টির ওপর যতটা জোর দিয়েছে আর কোন ধর্ম তা দেয়নি। ইসলাম শিশু-কিশোরদের শারীরিক, মানসিক, নৈতিক ও আধ্যাÍিক বিকাশকে অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্বাস করে। ইসলাম মনে করে এই প্রজন্মের উন্নত ও যথাযথ বিকাশের ওপরই একটি মর্যাদাশীল জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। একটি শিশুর জন্ম হবে একটি পরিবারে। আর সেই পরিবার তাকে সাদরে গ্রহণ করবে। তাই শুধু নয়, পরিবারটি শিশুটিকে ইসলামী শিক্ষা ও বিধানের আলোকে গড়ে তুলবে এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হাত থেকে তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব নেবে। এ কথা বলা অনাবশ্যক যে, শিশুদের ভালভাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব তাদের পিতা-মাতার। কিন্তু আজকাল কিছু কিছু পিতা-মাতা শিশুদের ভরণ-পোষণ এবং লালন-পালনকে বোঝা বলে মনে করে। কুরআন ও হাদীসে এ ব্যাপারে ¯পষ্ট নির্দেশিকা থাকা সত্ত্বেও অনেক মুসলিম পরিবার বিষয়টির প্রতি তেমন গুরুত্ব দেয় না। অনেকে আবার এটিকে তাদের জীবন বিধানের অতি প্রয়োজনীয় বিষয় বলেও ভাবতে পারে না। সকল মুসলমানের ক্ষেত্রে এটি সত্যি না হলেও কোন কোন ক্ষেত্রে বিষয়টি সত্যি। ইসলাম নির্দেশ দিয়েছে যে, মুসলিম শিশু-কিশোররা এবং তাদের পিতা-মাতা উভয়ে এমনভাবে ইসলামের বিধান মেনে চলবে যাতে মৃত্যুর পর তারা দোযখের শাস্তির মুখোমুখি না হয়। সব মুসলমানের বেলায় ইসলাম স্ব স্ব দায়িত্ব পালনকে বাধ্যতামূলক করেছে। এ ব্যাপারে মুসলমানের সতর্ক করে কুরআনে নির্দেশও এসেছে। আল্লাহ তাআলা সূরা তাহরিমের ৬ নাম্বার আয়াতে বলেছেন, ‘যারা ঈমান এনেছ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবারবর্গকে দোযখের সে আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যেথায় নিয়োজিত রয়েছে কঠোর স্বভাব ও শক্তিমান ফেরেশতারা, যারা আল্লাহ যা আদেশ করেন তাই করেন তার নাফারমানি করেন না, আর তারা তাই করেন, যা তাদেরকে করতে আদেশ করা হয়।’ শিশু-কিশোরদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার মাধ্যমে গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে গিয়ে আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) বলেছেন, ‘শিশু কিশোরদের জন্য তার পিতার পক্ষ হতে সবচেয়ে বড় উপহার এটাই যে, তিনি তাদের যথাযথ বড় করে গড়ে তুলবেন।’

শিশু-কিশোরদের কল্যাণ
উপরে উল্লেখিত কুরআন ও হাদীসের নির্দেশিকা থেকে এটা ¯পষ্ট যে, শিশু-কিশোরদের লালন-পালন ও যথাযথ গঠন ইসলামে অতি জরুরী কাজ। হামুদা আবদালতি তাঁর বই ‘ইসলাম ইন ফোকাস’Ñএ উল্লেখ করেছেন, হযরত মুহাম্মদ (সা) শিশুদের ভালবাসতেন। তিনি বলেছেন, ‘আমার মুসলিম মিল্লাত এ জন্য অন্যদের চাইতে শ্রেষ্ঠ যে তারা  শিশুদের অধিক ভালবাসতেন।’ তাই শিশুদের অধিকারের বিষয়টিকে প্রধান দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। মহানবী (সা)-এর আদেশ অনুযায়ী শিশুর জন্মের সাতদিনের মাথায় তার একটি ভাল ও সুন্দর নাম রাখতে হবে। তার মাথা মুড়িয়ে দিতে হবে এবং তার স্বাস্থ্য রক্ষার যাবতীয় স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই কাজটিকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে অতিরিক্ত কিছু করাকে ইসলাম অপছন্দ করেছে। তবে দিনটিকে আনন্দঘন ও উৎসবমুখর করার জন্য একটি ভেড়া বা ছাগল কুরবানী করা যেতে পারে এবং তার গোশত গরীবদের মাঝে বিতরণ করা যেতে পারে। মহানবী (সা) এটা অনুমোদন করেছেন যে, শিশু ছেলে হলে সে ক্ষেত্রে দুটি এবং মেয়ে হলে সে ক্ষেত্রে একটি ভেড়া বা ছাগল কুরবানী করা যায়। এই আনন্দঘন উৎসব ছাড়াও পরিবারের পিতার দায়িত্ব হচ্ছে শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য যাবতীয় বস্তুগত জিনিসের যোগান দেয়া। আর শিশুর স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে তার মা। ইসলামী দার্শনিক ও চিন্তাবিদদের অভিমত হলো, শিশুর মানসিক ও ধর্মীয় বিকাশে পিতা-মাতা অবশ্যই সঠিক দায়িত্ব পালন করবেন। নবী করীম (সা) তাই তাগিদ দিয়েছেন, যেন পিতা-মাতা শিশুর সাত বছর বয়স থেকে তারা তাকে নামাজের তাগিদ দিবেন। আর দশ বছর বয়স থেকে শিশু-কিশোরেরা যদি নামাজ পড়তে শুরু না করে তা হলে তাদের শায়েস্তা করারও নির্দেশ দিয়েছেন মহানবী (সা)। এখানে উল্লেখ্য যে, পিতা-মাতা ততক্ষণই শিশু-কিশোরদের কল্যাণের দায়িত্ব পালন করবেন যতক্ষণ না তারা সাবালক হয় অর্থাৎ তারা নিজের পায়ে দাঁড়াবার শক্তি অর্জন করে। তারপর পিতা-মাতা তার সন্তানদের সাধারণ ভরণপোষণ, খাবার, আশ্রয় এবং আলাদা থাকার ব্যবস্থা করবেন এবং তাদের নিরাপত্তার যাবতীয় ব্যবস্থা করবেন।

শিশু-কিশোরদের অধিকারসমূহ
শিশু-কিশোরদের শিক্ষা ও শারীরিক বিকাশের উল্লেখ করে নবী করীম (সা) বলেছেন, হযরত সালমান জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাদের শিশুদের প্রতি যে দায়িত্ব আছে, সেভাবে তাদেরও কি আমাদের ওপর কোন দায়িত্ব আছে?’ মহানবী (সা) বললেন, ‘হ্যাঁ আছে। পিতা-মাতার পক্ষ হতে শিশুদের প্রতি দায়িত্ব হলো, তাদের লেখাপড়া, সাতাঁরকাটা ও ধনুবিদ্যা শিখানো।’ অন্য এক হাদীসে নবী করীম (সা) প্রতিটি ঈমানদার মানুষের ওপর জ্ঞানার্জনকে অত্যাবশকীয় করেছেন। তাই শিশুদের শিক্ষিত করে তোলা আমাদের বিরাট এক দায়িত্ব। শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে মহানবী (সা) বলেছেন, ‘তোমরা দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন করো।’ শিশুদের শিক্ষা শুরু হয় তার পরিবারের পিতা-মাতার কাছ থেকে। তাই পিতা-মাতার কাজ হচ্ছে শিশুর শিক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা এবং প্রথমে তাকে কুরআন শিক্ষা দেয়া। এতে শিশু এমনভাবে বেড়ে উঠবে যাতে ইসলামই সব সময় তার জীবনের অংগ হয়ে থাকবে। তারা কোনভাবেই আর বিভ্রান্ত হবে না। কেননা তার শিক্ষার আলোই তাকে সঠিক রাস্তায় পরিচালনা করবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কতটি মুসলিম পরিবার এ মহান দায়িত্ব-কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করছে? অধিকাংশ মুসলিম পরিবারই এ মহান দায়িত্ব হতে বিমুখ হয়ে আছে। তারা তাদের শিশু-কিশোরদের প্রয়োজনীয় শিক্ষায় শিক্ষিত না করার কারণে মুসলিম সমাজ ও পরিবারে এক অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ইসলাম আলোর ধর্ম। এটা অজ্ঞতাকে কোনভাবেই পছন্দ করে না। ইসলাম চায়  পিতা-মাতা তার দায়িত্ব কর্তব্য স¤পর্কে সচেতন হোক এবং আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করুক। শিশু কিশোরদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়টিকে নিশ্চিত করার জন্য হযরত মুহাম্মদ (সা) বলেছেন, ‘তোমার বংশধরদের অন্যের ওপর নির্ভরশীল করে রেখে যাওয়ার চেয়ে তাদের অপেক্ষাকৃত সচ্ছল রেখে যাওয়া অনেক ভাল।’ আজকাল এটা খুব উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, সন্তান-সন্তুতি এখন আর পিতা-মাতার জন্য আনন্দের কোন বিষয় বলে বিবেচিত হচ্ছে না। যদিও আল্লাহ পাক পবিত্র কালামে পাকে তাদেরকে পরম রহমতের বিষয় বলে বর্ণনা করেছেন। আর এটা ঘটছে পিতা-মাতার চরম অবহেলা ও অবিবেচনার জন্য। কুরআনে পাকের সূরা ফুরকানের ৭৪ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘এবং যারা কামনা করে, হে আমাদের রব! আমাদেরকে দান করো এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্তুতি যারা হবে আমাদের জন্য নয়নের শীতলতা এবং আমাদেরকে করো মুত্তাকীদের ইমাম।’ অনেক পিতামাতাই তার সন্তানের জন্য সবকিছু করে যাচ্ছেন। কিন্তু তা তারা করছেন ভুলপথে, ভুলভাবে। সন্তান-সন্তুতিকে সুষ্ঠু ও সুন্দর আচার-ব্যবহার শিক্ষা দেয়ার প্রধান ও প্রথম দায়িত্ব মায়েদের ওপর। তাদের সত্যিকার মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার যাবতীয় দায়িত্ব পালন করবেন মায়েরা। কিন্তু তারা আজকাল অফিস আদালতের কাজকর্ম বা অন্য সামজিক ও সাংসারিক দায়িত্ব পালনে এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে, এ সব জরুরী বিষয়ে তারা সময় দিতে পারেন না। তাদের মধ্যে বস্তু জগতের চিন্তা-ভাবনা এমনভাবে পেয়ে বসেছে যে, মায়েরা তাদের পবিত্র দায়িত্ব বাসার কাজের বুয়াদের ওপর অথবা ধাত্রীদের ওপর ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকার চেষ্টা করছেন। তারাই তাদের সন্তানের খাওয়া-দাওয়া, স্কুলে আনা নেওয়াসহ যাবতীয় বিষয় দেখাশুনা করে থাকে। আর শিশু-কিশোরদের ধর্মীয় দিকটি অনেক মায়েরা আজকাল একেবারেই বাদ দিয়েছেন। এভাবে শিশু-কিশোর সন্তান-সন্ততিকে ইসলামী বিধানের আলোকে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হবার কারণে আমরা আমাদের সন্তান-সন্তুতির ভবিষ্যৎকে শুধু অবহেলাই করছি না, আমরা তাদের জীবনকেই ধ্বংস করার পথকে সুগম করছি। কেননা, একটা শিশুর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সে কতটা সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে গড়ে উঠছে তার ওপর। আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ ও সুস্থ জীবনের খাতিরে তাদেরকে পজিটিভ ও গঠনমূলক মানসিকতা নিয়ে গড়ে তোলার চেষ্টা আমাদের চালাতে হবে। আর এটা আমাদের ওপর কোন সাধারণ কর্তব্য নয়। এ দায়িত্ব ও কর্তব্য মহান আল্লাহ তাআলার প্রদত্ত একটি বড় জরুরী ও পবিত্র দায়িত্ব। আমদের সবার এ কথা মনে রাখতে হবে যে, এ দায়িত্ব পালনের জন্য শেষ বিচারের দিন আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। এ ব্যাপারে মহানবী (সা) বলেছেন, ‘তোমাদের সবাই ধর্মোপদেশকে এবং তোমাদের প্রত্যেকেকে বা তার দলের বা নির্ভরশীলদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে। পিতা হচ্ছেন পরিবারের প্রধান এবং তিনি তার দায়িত্ব স¤পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। স্ত্রীরা হচ্ছেন স্বামীর সংসারের দায়িত্বশীল। তিনি তার অধীনে যা আছে সে স¤পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন।
লেখক : সিনিয়র ব্যাংকার
প্রাবন্ধিক ও শিশু-সাহিত্যিক

SHARE

Leave a Reply