শিশু গৃহকর্মীর ওপর নির্মমতা ক্ষমাহীন বর্বরতা । মুহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত

শিশু গৃহকর্মীর ওপর নির্মমতা ক্ষমাহীন বর্বরতাসম্প্রতি বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও সোস্যাল মিডিয়ায় গৃহকর্মী নির্যাতন বিষয়ক কয়েকটি খবর জনমনে আলোড়ন ও উদ্বেগ সৃষ্টি করে। প্রতিটি নির্যাতনের ঘটনাই সোস্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। সমাজের সকল স্তরের মানুষ গৃহকর্মী নির্যাতন বিশেষ করে শিশু গৃহকর্মীদের ওপর নির্মম নির্যাতনকারীদের ধিক্কার দিতে থাকে। রোগা, দরিদ্র, নিঃস্ব শিশু, সারা গায়ে জখম, ক্ষতবিক্ষত শরীর, কালো জমাটবাঁধা রক্তের দাগ। নির্মম নির্যাতনে ফুলে ওঠা চোখ, দেহে গরম খুন্তি দিয়ে ছেঁকা দেয়া সাদা শফেদ চামড়ার দাগ। হাসপাতালের বেডে শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরানো কিংবা পুরনো কাপড়ে ঢাকা শিশুশ্রমিকের লাশের ছবি। এ সবই এখন পত্রিকার পাতা, টিভি আর সোস্যাল মিডিয়ার নিত্যনৈমিত্তিক খবর। এদের বেশির ভাগই গৃহশ্রমিক। এদের ওপর নির্যাতন নির্মমতার কোনো শেষ নেই। সাধারণত ৮-১০ বছর বয়সী শিশু থেকে শুরু করে ১৬-১৭ বছর বয়সী গৃহকর্মী দেখা যায় শহরের বিভিন্ন বাসা বাড়িতে। এদের মধ্যে মেয়েশিশুর সংখ্যাই বেশি। ছোটদের মধ্যে ছেলে শিশুও রয়েছে।

গত ১ নভেম্বর ‘ক্ষমাহীন বর্বরতা’ শিরোনামে দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের এমনই একটি খবরের শিরোনামে আমার চোখ আটকে যায়। অনলাইন নিউজ ভার্সনে বাংলাদেশ প্রতিদিন যে ছবিটি ব্যবহার করে তা ছিল এক কথায় বিবেক নাড়া দেয়া গা-শিউরে ওঠার মত ছবি। ছবিতে দেখা যায় একজন গৃহকর্মী মুমূর্ষু অবস্থায় হুইল চেয়ারে মাথা নিচু করে বসে আছে। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতনের চিহ্ন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। খবরে বিস্তারিত যা বলা হয়েছে তা হচ্ছে, রাজধানীর খিলগাঁওয়ে এক মানবাধিকারকর্মীর বাসায় নির্যাতনের শিকার ‘হাওয়া আক্তার’ নামে ১৪ বছরের এক গৃহকর্মীকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। বিকালে দক্ষিণ বনশ্রী এলাকার বাসা থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। পরে গুরুতর আহতাবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় গৃহকর্তা ও মানবাধিকারকর্মী শরীফ চৌধুরীকে আটক করা হয়। ঢামেক সূত্র জানায়, হাওয়া ৪ মাস আগে তার মামাতো বোনের মাধ্যমে প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা বেতনে দক্ষিণ বনশ্রীর ১১ নম্বর রোডের ৪৩ নম্বর বাসার ৬ তলায় শরীফ চৌধুরীর বাসায় কাজ নেয়। সেখানে বিভিন্ন কাজের অজুহাতে (না পারায়) তার সারা শরীরে লোহার খুনতি দিয়ে ছেঁকা দিতেন বাসার গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রী। এমনকি ওই বাসায় কাজে যোগ দেয়ার পর থেকে স্বজনদের সঙ্গে হাওয়াকে যোগাযোগ করতেও দেয়া হতো না। টানা চার মাস তার কোনো খোঁজ না পেয়ে খিলগাঁও থানা পুলিশের শরণাপন্ন হন স্বজনরা। পরে নির্যাতনের এ সংবাদ পেয়ে মেয়েটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে পুলিশ।

গৃহকর্মী হাওয়া আক্তারের এ খবরটি একটি মাত্র খবর নয়। বাংলাদেশে প্রতিদিনই এরকম শতশত হাওয়া আক্তারের বীভৎস নির্যাতনের খবর মিডিয়ার মাধ্যমে জানা যাচ্ছে। গত ১৭ অক্টোবর বরিশালে লামিয়া নামে এক শিশু গৃহকর্মীকে নির্মম নির্যাতনের অভিযোগে আশরাফুল ইসলাম নামে এক এনজিও কর্মকর্তার স্ত্রীকে আটক করে পুলিশ। চোখ ফোলা ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় লামিয়াকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পলাতক থাকায় গৃহকর্তা আশরাফুলকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। শিশু গৃহকর্মী লামিয়াকে উদ্ধারের খবর ফলাও করে প্রচার করে দেশের সকল টিভি মিডয়া। সেদিন টিভিতে শিশু গৃহকর্মী লামিয়ার ওপর নির্যাতনের বর্ণনা শুনে চোখে পানি ধরে রাখতে পারিনি। লামিয়ার চোখ ফোলা বীভৎস চেহারার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়েও থাকতে পারিনি। তার ওপর এতই ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়েছে যে তার দিকে তাকালে যে কারো চোখেই অবলীলায় পানি আসবে। যমুনা টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, নির্যাতনের কারণে ক্ষতবিক্ষত ১০ বছরের শিশু লামিয়ার শরীর। কথা ছিল ভর্তি করা হবে স্কুলে, দেয়া হবে তিন বেলা খাবার। খাবার না পেলেও নির্মম নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে মা-হারা শিশুটিকে। বন্দিদশা থেকে উদ্ধারের পর হাসপাতালে ভর্তি করেছে পুলিশ। যমুনা টেলিভিশনকে লামিয়া বলছিল, তাকে প্রথমে থাপ্পড় মারা হয়, তারপর রুটি তৈরি করার বেলুন দিয়ে পেটানো হয়, মারতে মারতে বেলুন ভেঙে গেলে বেত দিয়ে মারা হয়। তাকে লাথি মারা হতো। ফ্লোরে ফেলে বুকের ওপর পা দিয়ে মাড়ানো হতো। হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, নির্যাতনের ফলে রক্তক্ষরণ হয়েছে লামিয়ার মাথায়।

টিভি রিপোর্টে শিশু গৃহকর্মী লামিয়াকে নির্মম নির্যাতনের কথা তারই মুখে শুনছিলাম আর ভাবছিলাম এমন বর্বরতা মানুষের পক্ষে কিভাবে সম্ভব? একটি নিষ্পাপ শিশুকে পায়ের নিচে ফেলে মাড়ানোর সময় এনজিও কর্মকর্তার একটুও কি বুক কাঁপেনি? লোহার খুন্তি দিয়ে হাওয়া আক্তারকে ছেঁকা দেয়ার সময় একটুও কি মানবাধিকার কর্মীর হৃদয় কাঁপেনি? এরা কিসের মানবাধিকারকর্মী, কিসের এনজিও কর্মকর্তা। এদেরকে তো মানুষ ভাবতেই লজ্জা হয়। দু’মুঠো ভাতের জন্য নিষ্পাপ এ শিশু কিশোরীরা নিজেদের দুরন্তপনা শৈশব-কৈশোরের স্বাদ-আহলাদ বাদ দিয়ে নিজের মা-বাবাকে ছেড়ে নিজের ঘর ছেড়ে গৃহকর্মীর কাজে নিয়োজিত। এদের কেউ কেউ এতিম, কেউ নিঃস্ব। তাই বলেই কি এদের ওপর এত নির্যাতন? যেসব বাসায় গৃহকর্মীদের ওপর এমন নির্মমতা চলে সেসব বাসার মানুষগুলো দেখি সবাই উচ্চ শিক্ষিত। এরা পড়াশোনা করে সার্টিফিকেট অর্জন করেছে মাত্র, কারণ এদের পড়াশোনা এদেরকে মানবতা মনুষ্যত্ব কিছুই শেখায়নি। একজন শিক্ষিত মানুষ কিভাবে একটা শিশুর পুরো শরীরে খুন্তির ছেঁকা দিতে পারে। অট্টালিকায় বসবাস করা মানুষদের কাছে তার সন্তান যেমন দামি। একজন নিঃস্ব গরিব মানুষের কাছেও তার সন্তান হীরের টুকরোর চাইতেও দামি। আজ অপরের সন্তান বলে, দু’মুঠো খাবার দেই বলে গৃহকর্মীদের ওপর কথায় কথায় নির্যাতন চারিত্রিক দেউলিয়াত্ব আর মানবের ভেতর বসবাস করা পশুত্বের বহিঃপ্রকাশ।

বাংলাদেশে বহু শিশু নানা ধরনের শ্রমে নিয়োজিত। বিবিএসের এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ১৮টি খাতে ১৬ লাখ ৯৮ হাজার ৮৯৪ জন শিশু ‘শিশুশ্রমে’ নিয়োজিত রয়েছে। তাদের মধ্যে ৭ লাখ ৪৫ হাজার ৬৯০ জন মেয়েশিশু। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। এর মধ্যে ২ লাখ ৬০ হাজার শিশু মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। শিশুশ্রম বেশি দেখা গেছে কৃষিক্ষেত্রে ও কলকারখানায়, সেখানে ১০ লাখের বেশি শিশু কাজ করে। সবচেয়ে বেশি সাড়ে পাঁচ লাখ শিশু উৎপাদন খাতে বা কলকারখানায় কাজ করে। দোকানপাটে ১ লাখ ৭৯ হাজার শিশু, নির্মাণশিল্পে ১ লাখ ১৭ হাজার শিশু কাজ করে। শিশুশ্রমে নিয়োজিতদের ৫৭ শতাংশের কাজই অস্থায়ী। এক জরিপে বলা হয়েছে, গ্রামীণ শিশুদের ৭৯ শতাংশই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। তারা কখনও মাতা-পিতার সহায়তা করে। কখনও খণ্ডকালীন স্বজন ও প্রতিবেশীদের জমিতে কাজ করে। আরেক জরিপে বলা হয়, দেশে মোট শিশুশ্রমিকের ৬৬ শতাংশ কৃষিতে, ১৮ শতাংশ শিল্পখাতে, ৪ শতাংশ পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ১২ শতাংশ গৃহভৃত্য ও অন্যান্য খাতে। বিশ্ব শ্রম সংস্থা আইএলও-র ২০১৩ সালের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট শিশুশ্রমিক প্রায় ৩২ লাখ। তাদের মধ্যে ৪ লাখ ২০ হাজার শিশু গৃহকর্মে নিয়োজিত? আর গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের মধ্যে ৭৫ ভাগই হলো কন্যাশিশু। এ ছাড়া, গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের মধ্যে ১ লাখ ৪৭ হাজার শিশু শুধু রাজধানী ঢাকাতে কাজ করে। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১১১ জন গৃহকর্মী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছে। মারাত্মক জখম হয়েছে আরো অনেকে। মানবাধিকার কর্মীরা বলেছেন, গৃহকর্মী নির্যাতনের বাস্তবচিত্র আরো ভয়াবহ। কারণ, অনেক ঘটনাই পরিসংখ্যানে আসছে না।শিশু গৃহকর্মীর ওপর নির্মমতা ক্ষমাহীন বর্বরতা

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের এক গবেষণায় পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মে পর্যন্ত ৬৫ শিশু গৃহকর্মীর ওপর চালানো হয় মারাত্মক নির্যাতন। একই সময়ে ২১ শিশু গৃহকর্মীকে ধর্ষণ এবং ২১ জনকে হত্যা করা হয়েছে। মো: কামরুজ্জামান ও আব্দুল হাকিম A Review on Child Labour Criticism in Bangladesh : An Analysis -তে গৃহস্থালিতে শিশুশ্রমিক নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন। তাতে উল্লেখ করা হয় গৃহস্থালির শিশুশ্রমিকদের মধ্যে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ৬৬.৬৭%, বিনোদন থেকে বঞ্চিত ৫৩.৩৩%, গালাগালির শিকার ৩৩.৩৩%, শারীরিক নির্যাতনের শিকার ৪৬.৬৭%, চাকরিচ্যুতির হুমকি ৪৬.৬৭%, সাধ্যাতীত কাজ করতে হয় ৬৩.৩৩%, যৌন হয়রানির শিকার ১৬.৬৭%, নিরাপত্তাহীনতা ৪০.০০% এবং মানসিক তীব্র চাপে থাকে ৬৭.৬৭% শিশুশ্রমিক। ২০১৭ সালে শিশুহত্যা এবং ধর্ষণ নিয়ে ১০টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সংবাদ পর্যালোচনা করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন শিশু অধিকার ফোরাম। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালে গড়ে প্রতি মাসে শিশু হত্যা হয়েছে ২৮টি এবং ৪৯ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর এসবের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার পাওয়ার উদাহরণ নেই। বরং বিচারহীনতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা অব্যাহত রয়েছে। ২০১৭ সালের ১২ মাসে জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সংবাদ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে- মোট ৩ হাজার ৮৪৫ শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৭১০ জন শিশু বিভিন্ন ধরনের অপমৃত্যুর শিকার হয়েছে। ৮৯৪ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। বিএসএএফ ও পুলিশ সদর দফতরের তথ্যানুসারে, ২০১৮ সালে প্রথম ছয় মাসে ৩৫১ জন শিশু ধর্ষণ এবং ২১৬ জন হত্যার শিকার হয়েছে, যা মোট হত্যার ১১.১৯ শতাংশ।

শিশু শ্রমিকরা বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এর মধ্যে বেশিরভাগ নির্যাতনের খবরই গৃহস্থালির শিশু শ্রমিকদের ক্ষেত্রে। যাদের বেশিরভাগ খবরই প্রকাশিত হয় না। গৃহকর্মীদের সুরক্ষার জন্য বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ২০১৫ সালের ২১ ডিসেম্বর ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা-২০১৫’ নামে একটি নীতিমালা প্রকাশ করে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একাধিক সভায় বিভিন্ন মানবাধিকার ও অন্যান্য নেটওয়ার্কিং সংগঠন নীতিমালাটিকে আইনে পরিণত করার জন্য দাবি জানিয়ে এলেও এটিকে এখনও আইনে পরিণত করে কার্যকর করা হয়নি। গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী এবং হালকা কাজের জন্য ১২ বছর বয়সী শিশুদের (শিক্ষাগ্রহণকে বিঘ্নিত না করে) চুক্তিসাপেক্ষে গৃহকর্মে নিয়োগ দেয়ার প্রস্তাবনা আছে। কিন্তু এই নীতিমালা কেবল কাগজে-কলমেই আছে, বাস্তবে তার যথাযথ প্রয়োগ নেই। অথচ ২০১১ সালে হাইকোর্ট গৃহকর্মী নিয়োগে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের জন্য নির্দেশ দেয়। সম্প্রতি উন্নয়ন অন্বেষণের ‘ডমেস্টিক ওয়ার্কার্স : ডিভ্যালুয়েশন অ্যান্ড ডিসক্রিমিনেশন’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা যায়, ৫৭ দশমিক ৫ শতাংশ শিশু গৃহকর্মী দৈনিক নয় ঘণ্টার বেশি সময় কাজ করে। ১২ শতাংশ শিশু গৃহকর্মীর কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নাই। অথচ একজন শিশু গৃহকর্মী মাসে গড়ে এক হাজার ১৮৫ টাকা মজুরি পায়। কেউ কেউ তাও পায় না। পায় না ঠিকমতো খাবার-দাবার ও পোশাক-আশাক। প্রাপ্তবয়স্ক গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রেও একই দৈন্যদশা বিদ্যমান।

গৃহকর্মী নির্যাতন ও তাদের অধিকারকে অবজ্ঞা করা আমাদের দীর্ঘদিনের একটি সামাজিক ব্যাধি। শিশু গৃহকর্মীর ওপর নির্মমতা ক্ষমাহীন বর্বরতারই নামান্তর। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হওয়ার পরও ইসলাম শিশুশ্রমিকদের ব্যাপারে যা নির্দেশনা দেয় তা আমরা মেনে চলি না। সোস্যাল মিডিয়ার কল্যাণে প্রায়ই দেখা যায় শিশু গৃহকর্মীকে নিয়ে খাবার হোটেলে গিয়ে তার জন্য খাবারের ব্যবস্থা না করে তাকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। সম্প্রতি দাঁড়িয়ে ট্রেন জার্নি করা এক শিশু গৃহকর্মীর ছবি সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। ছবিতে দেখা যায় গৃহকর্তা ট্রেনের সিটে বসে আরামে ঘুমাচ্ছেন আর তার গৃহকর্মী দাঁড়িয়েই ট্রেনে আরোহণ করছেন, তার জন্য টিকিট কেটে সিটের কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। অধীনস্থদের ব্যাপারে মানবতার মহান শিক্ষক রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজের ভাষণে সতর্ক করে বক্তব্য দিয়েছেন। আবু যার (রা) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (এরা) তোমাদের ভাই, আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীনস্থ করেছেন। অতএব তোমরা যা খাও, তাদেরকে তা খাওয়াও, তোমরা যা পরিধান করো, তাদেরকেও তা পরিধান করাও এবং তাদের ওপর তাদের সাধ্যাতীত কাজ চাপিয়ে দিও না। (বোখারি, মুসলিম, তিরমিজি ও আবু দাউদ)। আবু বকর সিদ্দিক (রা) থেকে অপর এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে; তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অধীনস্থদের সাথে দুর্ব্যবহারকারী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। সাহাবীগণ বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি আমাদের অবহিত করেননি যে, এ উম্মতের অধিকাংশ হবে গোলাম ও ইয়াতিম? তিনি বলেন, হ্যাঁ, অতএব তোমরা তোমাদের সন্তানের মতো তাদের সাথে ব্যবহার করো এবং তোমরা যা আহার করো তা তাদেরকে আহার করাও। সাহাবীগণ বলেন, দুনিয়াতে কোন জিনিস আমাদের উপকারে আসবে? তিনি বলেন, আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম করার উদ্দেশ্যে তুমি যে ঘোড়া প্রতিপালন করো এবং যে গোলাম তোমার দায়িত্ব পালন করে। সে যদি নামাজ পড়ে, তবে সে তোমার ভাই। (তিরমিজি, আহমাদ)।

লেখক : এমফিল গবেষক

SHARE

Leave a Reply