শেকল পরা স্বাধীনতা -সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা। ১৭৫৭ সালের পলাশীর আম্রকাননে ভাগীরথি নদীর তীরে মীরজাফর, জগৎশেঠ, উমিচর্ঁাদ আর রায়দুর্লভদের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। লর্ড ক্লাইভের মতো সাম্রাজ্যবাদীদের নীলনকশা আর ক্ষমতাসীন শাসকবর্গের অদূরদর্শী দুর্বল নেতৃত্ব এ উপমহাদেশের জনগণের পায়ে যে গোলামির জিঞ্জির পরিয়ে দিয়েছিল তা থেকে মুক্তি লাভের জন্য ’৪৭, ’৫২, ’৬৯ আর ’৭১ সাল পর্যন্ত অবিরাম প্রচেষ্টা আর ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে আজকের এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। কিন্তু আজ স্বাধীনতার ৪৬তম বছরে নতুন করে এ জাতির মাঝে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে স্বাধীনতার শান্তির যে শ্বেত-কপোত মুক্ত বিহঙ্গের মত মুক্ত বাতাসে স্বাধীন ভূমিতে নির্ভরতার আকাশ পানে উড়তে পারছে কি তার ডানা মেলে? এ দেশের অবালবৃদ্ধ, যুবক, কৃষক, দিনমজুর ও ছাত্ররা যে স্বপ্ন বুকে নিয়ে মুক্তির স্লোগানকে ধারণ করে নির্যাতিত ও মাজলুমদের পক্ষে শোষণবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম করেছিল; একটি শোষণমুক্ত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধশালী এবং সামাজিক ন্যায়বিচার সম্পন্ন একটি কাক্সিক্ষত ভূখণ্ডের জন্য তা কি অর্জন  হয়েছে?
হ্যাঁ। আজ সবার একই প্রশ্ন- তাহলে কেন ছিল এই লড়াই? কিসের বিরুদ্ধে, কার বিরুদ্ধে করেছিলাম এ সংগ্রাম? আজ দেশপ্রেমিক সকল মানুষের চোখে-মুখে একই হতাশার চিহ্ন! কেন আজও মেলেনি মানবতার মুক্তি? কেন আজও এ স্বাধীন দেশে পরাধীনতার মতো বেঁচে থাকতে হচ্ছে? মতপ্রকাশের অপরাধে গুম, খুন হতে হচ্ছে। আজ লর্ড ক্লাইভ ব্রিটিশ বেনিয়াদের মতো এ দেশের সম্পদ ও সম্মান লুটপাট করে নিয়ে যাচ্ছে । রাজনৈতিক বিরোধী মতাদর্শদের পালিয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে; হত্যা, সন্ত্রাস, খুন, লুটপাট, চাঁদাবাজি, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় এবং বিরোধী মতাদর্শকে দমন-নিপীড়ন যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। প্রতিবাদের ভাষা যেন নীরবতা ও নিশ্চুপভাবে সবকিছু মেনে নেওয়া। আজ এ জাতির এ অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে যেন-বাঘের মুখ থেকে বাঁচার জন্য কুমিরের মুখে পতিত হওয়ার মতো।
হ্যাঁ, এমনটি আশঙ্কা ছিল অনেকেরই সেই সময়। সব কিছু ভুলে গিয়ে নতুন স্বপ্ন বুনে সমস্ত শক্তি নিয়ে সুদৃঢ় ঐক্যের আহবানে দেশ গড়ার প্রত্যয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সবাই কিন্তু শুরুতেই হোঁচট খেতে হয় এ জাতিকে। স্বাধীনতার স্থপতির সপরিবারের অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু ঘটে। তার পরের ইতিহাস আরও করুণ! স্বৈরাচার আর গণন্ত্রের লেবাস পরিহিত নব্য হিটলারি কায়দায় এ দেশশাসন যেন চেঙ্গিস খানের শাসনকে হার মানায়।
যে দেশের মানুষ নিশ্চিন্তে রাত্রি যাপনের জন্য নির্ঘুম কত রাত লড়াই করেছিল আজ তাদের উত্তরসূরিদের রাত্রির অন্ধকারে হতে হয় গুম, খুন ও ক্রসফায়ারের মতো বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মুখোমুখি। যে দেশের মানুষ ধর্মীয় অধিকার ও মতপ্রকাশের জন্য সেই উর্দি ওয়ালাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিল- সেই কালো পোশাকধারীদের কুকীর্তি ফাঁসের ভয়ে মতপ্রকাশকারী আলেম, দাড়ি-টুপিওয়ালা ও সাংবাদিকদের হত্যা নির্যাতন ও মামলা দিয়ে বছরের পর বছর কারান্তরীণ করে রাখছে। যে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের অধিকারের দাবিতে সংগ্রাম করেছিল এ দেশের খেটে খাওয়া দিনমজুর কৃষক শ্রমিক জনতা-তারাই আজ সবচাইতে বেশি শোষণ নির্যাতনের শিকার। রাজপথে প্রতিবাদে নামলে হতে হয় লাঠিপেটা আর জেল-জুলুমের শিকার। মহান মুক্তিযুদ্ধে যে সকল  শিক্ষক ও ছাত্ররা যুদ্ধক্ষেত্রে সম্মুখ সারিতে দাঁড়িয়ে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিল আজ তারা চরমভাবে অপমানিত, অবহেলিত। শুধুমাত্র রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে হত্যা, ফাঁসি, জেল-জুলুম আর গৃহছাড়া হচ্ছে অন্যমতের মানুষ ।
কিন্তু কেন এই বৈষম্য, কেন এই জুলুম আর নির্যাতন আর কেনইবা সেই সাম্রাজ্যবাদী ও ব্রাহ্মণ্যবাদীদের মতো একই কায়দায় দমননিপীড়ন ও রাজনৈতিক আচরণ। সবার মনের মাঝে প্রশ্ন জাগে  এরই জন্যই কি মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিলো? কেনইবা বিলিয়ে দেওয়া হলো লক্ষ প্রাণের তাজা খুন, কেন আজ লিখতে হচ্ছে ‘‘অধিক দামে কেনা স্বাধীনতা অল্প দামে বেচা।” কেন আজ স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের শক্তির নামে বিভক্ত করা হচ্ছে জাতিকে? কেন আজ ক্ষমতার প্রভুদেরকে খুশি করার জন্য ও তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য দেশের স্বার্থ ও স্বাধীনতা বিকিয়ে দেওয়া হচ্ছে? দেশপ্রেম, সততা, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নৈতিকতা যেন আজ কিছু উদ্দীপনামূলক পাঠ্যপুস্তকের শব্দে পরিণত হয়েছে। বাস্তবে যা বিরল ও অদৃশ্যমান নেতৃত্ববানদের চরিত্রে।
পলাশীর প্রান্তরের সেই মীরজাফর নেই কিন্তু তার প্রেতাত্মা রয়েছে সর্বত্র, লর্ড ক্লাইভ ও ব্রিটিশ বেনিয়া নেই কিন্তু রয়ে গেছে তাদের তৈরি করা কিছু মগজওয়ালা। জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ ও উমিরচাদরা নেই কিন্তু তাদের ব্রাহ্মণ্যবাদী অপশক্তি রয়েছে। অব্যাহত রয়েছে তাদের সাংস্কৃতিক ও সীমান্ত আগ্রাসনের কালো থাবা। অধিকার ও নিরাপত্তা যেন আজ সোনার হরিণ।
না। এটা মেনে নেওয়া যায় না, মেনে নিতে পারে না সিরাজউদ্দৌলা, তিতুমীর, শরিয়তউল্লাহ ও শাহজালালের উত্তরসূরিরা। এ জমিনে ঘুমিয়ে আছেন ৩৬০ আউলিয়া- রয়েছে মুহাম্মদ বিন বখতিয়ারের ১৭ সওয়ারির ঘোড়ার পদচিহ্ন, আছে ঈসা খাঁর চারণভূমি ও শতপুণ্যবান মুজাহিদের কবর। রয়েছে  এতে হাজার বছরের ধর্মীয় প্রীতি-বন্ধনের এক অনুপম দৃষ্টান্ত যা আমাদের স্বপ্ন দেখায়; সাহস জোগায়; দৃঢ় পদভারে সামনে এগিয়ে চলার এক সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার জন্য যার নেতৃত্ব দেবে সৎ দক্ষ দেশপ্রেমিক ও নৈতিকতাসম্পন্ন একদল তরুণ। প্রয়োজনে আরেকটি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে- যে যুদ্ধ হবে শোষণ ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে, অনৈতিকতা ও অশ্লীলতার বিরুদ্ধে, যুদ্ধ করতে হবে মানবতা ও সুখী সমৃদ্ধ আগামীর ভবিষ্যৎ-এর জন্য। আঘাত হানতে হবে সেই শেকলের গোড়ায় যা পরিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে তেজোদীপ্ত সাহসী এ জাতিকে।
তাইতো রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ বলেছেন-
“আজ সংগ্রাম নিজেকে চিনার-মানবতা নিয়ে বেচা ও কেনার হাটের ভিড়ে
সময় এসেছে সকল দেনার- সকল হিসাব মিটাতে ধীরে ঋণ শুধবার দিন
আজ সংগ্রাম নিজের সঙ্গে- নিজেকে চেনার দিন।”

SHARE