শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় ও নৈতিক বাস্তবতাকে মেনে নিতেই হচ্ছে -মো: কামরুজ্জামান (বাবলু)

কিছু কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও নাস্তিক চিন্তা-ভাবনার লোক নিজের জ্ঞান জাহির করার জন্য প্রায়শই একটি সস্তা পথ বাতলে নেন। আর সেটি হলো ধর্মকে কটাক্ষ করা। বিশেষ করে ইসলাম ধর্মকে হেয় করে মন্তব্য করা কিংবা লেখালেখি করাকে তারা জনপ্রিয়তা অর্জনের সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন। এ ছাড়া বর্তমান বিশ^ পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টিপাত করলেও দেখা যায় ইসলামের প্রতি বৈরী মনোভাবাপন্ন মহলের ক্রমাগত ইসলামবিদ্বেষী প্রচার-প্রচারণা তথা ইসলামোফোবিক তথ্য-সন্ত্রাসের ফলে গোটা দুনিয়াব্যাপী মানুষের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে একটি বিরূপ ধারণার উদ্রেক হয়েছে।

কিন্তু ইতোমধ্যেই নানা ঘটনাচক্রের মধ্য দিয়ে আল্লাহ বারবার ইসলামের নৈতিকতা ও বিধি-বিধানই যে মানুষের জন্য সর্বোত্তম তা তুলে ধরেছেন। একটু বিবেকবান যে কেউ সামান্য চিন্তা-ভাবনা করলেই বিষয়টি উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন। বাংলাদেশের একজন তরুণ শিক্ষার্থীর তারই সহকর্মী কর্তৃক ধর্ষিত হওয়া ও পরবর্তীতে নিহত হওয়ার ঘটনাকে বিশ্লেষণপূর্বক আমি বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবো।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী মোটা দাগে ঘটনাটি এরকম- গত ৭ জানুয়ারি (২০২১) রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডির ইংরেজি মাধ্যমের মাস্টারমাইন্ড স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী আনুশকা নূর আমিনকে (১৭) অচেতন অবস্থায় ধানমন্ডির আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে নিয়ে যান তারই ছেলে বন্ধু ইফতেখার ফারদিন দিহান (১৮) এবং দিহানই ফোন দিয়ে মেয়েটির মাকে তার অসুস্থতার কথা জানান। তবে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই মেয়েটির মৃত্যু হয়।

পরের দিন ময়নাতদন্ত শেষে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা: সোহেল মাহমুদ গণমাধ্যমকে জানান, মেয়েটির শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন না পাওয়া গেলেও সে বিকৃত যৌনাচারের শিকার হয়েছে এবং তার শরীরে সেই ধরনের আলামত পাওয়া গেছে। আর এর ফলেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মেয়েটির মৃত্যু হয়েছে। মেয়েটির পরিবারের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলায় এরই মধ্যে দিহানকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং সে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে দিহানের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, দুইজনের সম্মতিতেই তাদের মধ্যে অনৈতিক সম্পর্ক হয়। তবে, মেয়েটির বাবার অভিযোগ তার মেয়েকে কলাবাগানের ডলফিন গলির বাসায় পড়াশুনার কথা বলে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে। প্রচুর রক্তক্ষরণের ফলে অচেতন হয়ে পড়লে বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আসামি নিজেই তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

হয়তোবা ফেব্রুয়ারির শুরুতে যখন এই লেখা প্রকাশিত হবে তখন ঘটনাটি অনেকের স্মৃতি থেকেই হারিয়ে যাবে। এরই মধ্যে দেশে হয়তো ঘটে যাবে আরো বহু হত্যা, ধর্ষণ, খুন, গুম ও নানাবিধ অপরাধ। গণমাধ্যমের শিরোনামে সেই হাজারো ঘটনার মাঝে হারিয়ে যাবে আনুশকার এই ঘটনা। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (Human Rights Support Society-HRSS) এর বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায় ২০২০ সালে বাংলাদেশে মোট ১,৬৩৭ জন নারী ধর্ষণের শিকার হন। এর মধ্যে ৮৫০ জনই শিশু যাদের বয়স ১৬ বছরের নিচে। এ ছাড়া, একই বছর ২১৩ জন নারী গণধর্ষণের শিকার হন এবং পাশবিকতার চরমে উঠে ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয় ৩৪ নারীকে।

যাই হোক এবার আনুশকার প্রসঙ্গে আসি। আনুশকার সাথে দিহানের অনৈতিক সম্পর্ক সম্মতিতে হয়েছিল নাকি আনুশকাকে জোর করে নির্যাতন করা হয়েছিল তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও যে বিষয়টি পরিষ্কার তা হলো তারা দু’জনই পূর্ব পরিচিত এবং বন্ধু ছিল। আর আনুশকা নিজের ইচ্ছাতেই দিহানের বাসায় গিয়েছিল। আর তখন সেই বাসায় কেউ ছিল না। দিহানের মা গণমাধ্যমকে বলেছেন, বন্ধুত্বের সম্পর্ক থাকায় তারা একান্ত নিরিবিলি কিছু সময় কাটাতেই হয়তোবা সেখানে গিয়েছিল। ধর্ষণের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। হয়তোবা আবেগের বশে এটা হয়েছে এবং দু’জনের পরিপক্বতার অভাবে এমনটি ঘটেছে।

খুবই যৌক্তিক কথাই বলেছেন দিহানের মা। আমার কাছেও এমনটাই মনে হচ্ছে। কারণ দু’জনের মধ্যকার সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে তাদের ফেসবুক প্রোফাইল ঘাঁটাঘাঁটি করেও কিছু গণমাধ্যমে খবর এসেছে। সুতরাং যে বিষয়টি এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান হয়েছে তা হলো দু’জনেই পারস্পরিক সম্পর্ক ও আস্থার ভিত্তিতেই একটি বাসায় গিয়েছিল। হয়তোবা পড়াশুনার বিষয়টিও থাকতে পারে। কিন্তু নির্জন বাসায় এক পর্যায়ে তাদের সম্পর্কটা আর স্বাভাবিক থাকেনি। ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।
আর এটাই হলো এক নিরেট বাস্তবতা। ইসলাম এই বাস্তবতাকেই খুব সাবলীলভাবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করেছে। পবিত্র কুরআনের সূরা নূরের ৩০ ও ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন: “(হে নবী! আপনি) মুমিন (পুরুষদের) বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নিচু করে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে, এটা তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। তারা যা কিছু করে আল্লাহ সে বিষয়ে অবগত। এবং (হে নবী! আপনি) ঈমানদার নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নিচু রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে।”

আসলে যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন সেই আল্লাহই আমাদের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানেন এটাই স্বাভাবিক। তাই তিনি আমাদের সতর্ক করেছেন। পবিত্র কুরআনের সূরা আল ইসরার ৩২ নাম্বার আয়াতে মহান আল্লাহ আরো বলেন: “তোমরা ব্যভিচারের ধারে কাছেও যেয়ো না, কারণ এটি একটি লজ্জাজনক ও নিকৃষ্ট কর্ম, যা অন্যান্য নিকৃষ্ট কর্মের পথ খুলে দেয়।” অর্থাৎ অনৈতিক স¤পর্ক ঘটে যেতে পারে এমন কোনো কিছুর ধারে কাছেও যাওয়ার জন্য আল্লাহ নিষেধ করেছেন। মহানবী সা. বিষয়টি আরো খোলাসা করে দিয়েছেন সবার বোঝার জন্য। তিনি বলেছেন: “কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সাথে একান্তে গোপনে অবস্থান না করে। কারণ, শয়তান উভয়ের কুটনী হয়।” (তিরমিযি, মিশকাতুল মসাবিহ-৩,১৮৮)।

মেডিক্যাল সায়েন্স সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে তারাও জানেন যে নির্জন কক্ষে দু’জন প্রাপ্ত বয়স্ক ও সক্ষম ছেলেমেয়ে কিংবা নারী-পুরুষ একান্তে মিলিত হলে তাদের মধ্যে অনৈতিক চিন্তার উদ্রেক হওয়াটাই স্বাভাবিক। মানবিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন যে কোনো নারী-পুরুষের বেলায়ই এটা প্রযোজ্য। গায়ের জোরে যারা এটাকে অস্বীকার করেন তারা প্রকৃত প্রস্তাবে বাস্তবতাকেই অস্বীকার করেন। আজকে যারা বড় বড় আইডল, ছোট পর্দা-বড় পর্দার বড় বড় সব স্টার তারাও কি এই বাস্তবতা থেকে রেহাই পেয়েছেন? আজকের গোটা বিশ^জুড়ে বড় বড় সব স্টারদের পরিবার ভেঙে যাচ্ছে। একেকজনের সাথে একাধিক জনের অনৈতিক সম্পর্ক। কে এটা অস্বীকার করতে পারবেন?

কিছু কিছু তথাকথিত প্রগতির ধারক-বাহকরা বলে থাকেন, নারীর পোশাক নয়, পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন চাই। অথচ দেখেন ইসলামে এমন কোনো একপেশে বক্তব্য নেই। ইসলাম পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির কথা একেবারেই অস্বীকার করেনি। ইসলাম তাইতো প্রথমে পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি সংযত করতে বলেছে এবং নারীদেরও শালীন পোশাক পরিধান করতে বলেছে। পাশাপাশি স্বাভাবিক নৈতিক আচার আচরণের বিষয়ে ইসলামের ভূরি ভূরি নির্দেশনা রয়েছে।
গত কয়েকদিন আগে ভারতের পাখি খ্যাত একটি ধারাবাহিক নাটকের নায়িকার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। সেখানে ওই নায়িকা তার কোনো একটি সিনেমার দৃশ্যে অত্যন্ত অশ্লীলভাবে অভিনয় করার সমালোচনার জবাব দেন। সেই জবাবে তিনি বলেন, একটি কক্ষে একটি প্রাপ্ত বয়স্ক নারী-পুরুষ অবস্থান করবে আর সেখানে কোনো অ্যাডাল্ট সিন থাকবে না এটাতো হতেই পারে না। তার মানে বাস্তবতাকে কেউই অস্বীকার করতে পারছেন না। কিন্তু যখনই আরো সুন্দরভাবে ও সাবলীলভাবে বিষয়টি নিয়ে ইসলাম কিছু বলে তখনই একে ভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেন কেউ কেউ। এটা শুধুই ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকেই করে থাকেন বলে আমার বিশ^াস।

২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে আমেরিকার “দি ইউএসএ টুডে” (The USA Today) পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, “Incidents of sexual assault at U.S. military academies spiked nearly 50 percent in the past school year despite years of focus on the problem and declarations of zero tolerance, according to results of a survey by the Pentagon. The number of students reporting unwanted sexual contact totaled 747 in the 2017-18 academic year, compared with 507 in 2015-16..”
অর্থাৎ “বিগত স্কুল বছরে আমেরিকার মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে যৌন হয়রানির ঘটনা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। অথচ গত কয়েক বছর ধরেই এই সমস্যার ওপর আলোকপাত করা হচ্ছে এবং এর বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সদর দফতর পেন্টাগনের এক জরিপে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। অপ্রত্যাশিত যৌনতার শিকার শিক্ষার্থীদের দেয়া অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে ৭৪৭টি এমন ঘটনা ঘটে যা ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে ছিল ৫০৭।” শুধু আমেরিকাই নয়, ভারতসহ বিশ্বের তাবৎ সব প্রগতিশীল রাষ্ট্রের চিত্রই অনেকটা অভিন্ন। যারাই আকাশ সংস্কৃতি ও খোলামেলা নীতি তথা তথাকথিত ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে অশ্লীলতার পথ বেছে নিয়েছেন তাদের সমাজই অধঃপতিত হয়েছে।

বাংলাদেশের আনুশকার ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনা আমাদের আবারো স্মরণ করিয়ে দিলো- চলুন আমরা স্বাভাবিক বাস্তবতাকে মেনে নেই। ধর্মীয় নীতি-নৈতিকতার বিধানকে বাস্তবতার নিরিখে মেনে নেই। কুসংস্কারের খোলস পরিয়ে ধর্মকে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে নিজেকে বুদ্ধিজীবী হিসেবে জাহির করার সস্তা রাস্তা থেকে সরে আসি। পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদও বিষয়টি স্বীকার করতে বাধ্য হলেন। গত ১১ জানুয়ারি (২০২১) এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন: “পরিবারকে জানতে হবে ছেলে বা মেয়ে কোথায় কার সাথে মিশে, কী করে, কখন কোথায় যায়। এটা প্যারেন্টাল কন্ট্রোল। সন্তান জন্ম দিলে দায়-দায়িত্ব পিতা-মাতাকে নিতে হবে।”
লেখক : সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply