শ্রম বিশ্বায়ন ও ইসলাম বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

শ্রম বিশ্বায়ন ও ইসলাম
বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

মানবজীবনের উন্নতি, অবনতি, সভ্যতা-সংস্কৃতি এমনকি অস্তিত্ব রক্ষাও নির্ভর করে পরিশ্রমের ওপর। তাই বলা হয়ে থাকে ‘পরিশ্রম সফলতার প্রসূতি’। শ্রম বিনিয়োগ ছাড়া কোন প্রাণীই প্রয়োজন মোতাবেক রিজিক পায় না। ছোট্ট একটি পিপীলিকাও খাবারের সন্ধানে ব্যস্ত থাকে। ক্ষুধার তাড়নায় কেঁদে কেঁদে বাড়ি মাতিয়ে তোলে অবুঝ কচি দু-একদিনের শিশুটিও; তাকে খেতে হলেও কমপক্ষে কাঁদতে হয়। সুতরাং শ্রম বিনিয়োগ ছাড়া সুন্দর জীবিকার আশা করা বাতুলতা মাত্র। সৃষ্টির ক্ষেত্রে যেমন রয়েছে বৈচিত্র্যময়তা তেমনি পেশা ও জীবিকার ক্ষেত্রেও আল্লাহতায়ালা ভিন্নতা সৃষ্টি করেছেন। কেউ কায়িক পরিশ্রম করে আর কেউবা মানসিক পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে জীবিকা অর্জনের পাশাপাশি দেশ, জাতি ও মানবতার কল্যাণ সাধন করে যাচ্ছেন। কাজ যে ধরনেরই হোক না কেন, তা কাজ বা শ্রম। অতএব, যে লোক যে স্তরেই শ্রম বিনিয়োগ করুন না কেন তিনিই শ্রমিক। যার শ্রম বিনিয়োগ যে ক্ষেত্রেই হোক না কেন, কিংবা যিনি যে ধরনের শ্রমিকই হোন না কেন তার শ্রমের যেমন গুরুত্ব আছে তেমনি সেই শ্রমিকেরও মর্যাদা স্রষ্টা ও সৃষ্টির কাছে অপরিসীম। শান্তি ও মানবতাবাদী শাশ্বত বিধান ইসলামে শ্রমজীবী মানুষকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আমাদের আদিপিতা হযরত আদম (আ) ও মা হাওয়া (আ) কঠোর পরিশ্রম করেই পৃথিবীতে মানুষের বসতি শুরু করেন। তাদের প্রচেষ্টার ফলেই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ জিন জাতির বাস করা পৃথিবীকে মানববসতির সুন্দর নিবাস রূপে গড়ে তোলেন। পৃথিবীর প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী হযরত আদমই (আ) শুধু নন; সকল নবী-রাসূল এমনকি আমাদের প্রিয় নবী, শ্রমিকের অধিকার ও শ্রম আইনের পথপ্রদর্শক হযরত মুহাম্মদ (সা) নিজ হাতে কাজ করে জীবিকা উপার্জন করতেন। সুতরাং শ্রমিকের হাত আল্লাহর কাছে অত্যন্ত পছন্দনীয়। অথচ বিশ্বে সবচেয়ে নির্যাতিত নিষ্পেষিত ও বঞ্চিত শ্রেণীই হচ্ছে শ্রমিক। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় –

দেখিনু সেদিন রেলে
কুলি বলে এক বাবু’সাব তারে
ঠেলে দিল নিচে ফেলে।
চোখ ফেটে এল জল
এমনি করে জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?

শ্রেণীসংগ্রাম নয়, সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্বই পৃথিবীর চিরন্তন ইতিহাস। যেখানে সত্য বিধান ইসলাম নেই সেখানে শ্রেণীসংগ্রামই ইতিহাস হয়ে দাঁড়ায়। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সভ্যতার চরম উৎকর্ষের এ আধুনিক যুগে সবচেয়ে অবহেলিত, লাঞ্ছিত ও অধিকারবঞ্চিত জনগোষ্ঠীই হচ্ছে শ্রমিক। সব ধরনের মানবিক আইন তাদের ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত। অথচ তাদের শ্রম, গায়ের ঘাম ও মেধার বলেই সমাজ সুন্দর ও সচ্ছলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, অর্থনীতি হচ্ছে উন্নত থেকে উন্নততর। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে যেমন পেছানোর সুযোগ থাকে না, হয় সামনে এগিয়ে যেতে হবে নতুবা কুকুর শিয়ালের মত গুলি খেয়ে মরতে হবে। তেমনি সচেতন শ্রমিকসমাজ বসে বসে না খেয়ে মরার চেয়ে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আত্মাহুতি দেয়ার মাধ্যমে অধিকার আদায়ে বিশ্বাসী। তারই বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল সভ্যতার ধ্বজাধারী ইউরোপ-আমেরিকা থেকেই। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে শ্রমিকদেরকে ১০-১২ ঘণ্টা থেকে শুরু করে ১৬-১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত খাটানো হতো।
কাজের যেমন সুনির্দিষ্ট সময় ছিল না, তেমনি ছিল না সাপ্তাহিক ও অন্যান্য ছুটি এবং চাকরির স্থায়িত্ব ও মজুরিসহ সকল বিষয় ছিল মালিকের ইচ্ছাধীন বিষয়। তখন নির্ধারিত কোন ছুটি ছিল না, বেতন বা মজুরির কোন স্কেল বা পরিমাণ ছিল না, চরম বিপদের দিনেও শ্রমিকরা ছুটি পেতনা। দায়িত্বপালন কালে দুর্ঘটনায় কারো মৃত্যু ঘটলে তার পরিবারকে কোন ক্ষতিপূরণ দেয়া হতো না। সরকারও ছিল মালিকের স্বার্থের পুতুল।
নির্যাতনমুখী ও অমানবিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নির্যাতিত শ্রমিক শ্রেণী ১৮২০ সাল থেকে বিচ্ছিন্নভাবে মিটিং মিছিল শুরু করে। ১৮৬২-৬৩ সালে গড়ে ওঠে ট্রেড ইউনিয়ন। বহু আন্দোলনের বিনিময়ে কাজের সময়সূচি ১০ ঘণ্টা স্বীকৃত হলেও তা মানা হতো না। এমনকি আমেরিকার আইনসভা ১৮৬৮ সালে ‘আট ঘণ্টার কাজ’ বলে একটি আইনও পাস করে। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। ১৮৮১ সালে ‘আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার’ প্রতিষ্ঠিত হয়। সেখানে ১৮৮৪ সালের ৭ অক্টোবর এর চতুর্থ সম্মেলনে সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো যে, ১৮৮৬ সালের ১ মে থেকে ৮ ঘণ্টাকেই কাজের দিন হিসেবে গণ্য করা হবে। শ্রমিকরা ইস্পাতের ন্যায় সংঘবদ্ধ হলেন যে, তারা ১৮৮৬ সালের ১ মে থেকে কেউ আট ঘণ্টার বেশি কাজ করবেন না। এ দাবি আদায়ে ১৮৮৬ সালের ১ মে পাঁচ লাখ শ্রমিক প্রত্যক্ষ ধর্মঘটে যোগ দেন। ৩ মে ম্যাককর্মিক হার্ভেস্টার কারখানায় পুলিশি নির্যাতন হলো এবং ২ জন নিরস্ত্র শ্রমিক নিহত হলেন। ৪ মে হেমাকেট  স্কোয়ারে সংঘবদ্ধ শ্রমিকদের বিশাল সমাবেশে পুলিশ নির্বিচারে গুলি করে ৫ জন শ্রমিককে হত্যা করলো এবং গ্রেফতার করলো আগস্ট স্পাইজ, পার্সনস, ফিসার ও অ্যাঞ্জেলস নামক ৪ জন শ্রমিক নেতাকে। ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। সেখানে ১৮৯০ সাল থেকে ১ মে প্রতিবছর শ্রমিক শ্রেণীর আন্তর্জাতিক সংহতি, সৌভ্রাতৃত্ব ও সংগ্রামের দিন বলে ঘোষিত হল। সেই থেকে মে দিবস বিশ্বে আজও ধারাবাহিকভাবে পালিত হচ্ছে।
মে দিবস প্রতি বছর শ্রমজীবী মানুষের কাছে অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং আরও উন্নততর জীবন যাপনের প্রত্যয় নিয়ে এলেও বর্তমানে বিশ্বায়নের কষাঘাতে পৃথিবীকে এককেন্দ্রিক বিশ্বে পরিণত করার পাঁয়তারা চলছে। ইরাকের ওপর ইঙ্গ-মার্কিনিদের নগ্ন হামলা এবং একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র দখল করা বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের এ নীল নকশারই বহিঃপ্রকাশ। জাতিসংঘকে উপেক্ষা করে জেনেভা কনভেনশনসহ মানবসভ্যতার সমস্ত রীতিনীতি ভঙ্গ করে সাম্রাজ্যবাদের মোড়ল আমেরিকা ও ব্রিটেন যেভাবে ইরাককে ধ্বংস করেছে তাতে এটাই প্রমাণিত হয় যে, ‘জোর যার মুল্লুক তার’। তেলের নেশায় তারা একবিংশ শতাব্দীর মানবসভ্যতাকে ম্লান করে দিয়েছে। উদারীকরণ এবং বিশ্বায়নের মাধ্যমে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ আমেরিকা সারা বিশ্বের অর্থনীতিকে গ্রাস করে নিজের পেটে ঢুকাতে চায়। বিশ্ব পুঁজিবাদ, বহুজাতিক করপোরেশন এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুঁজিবাদের বিপর্যয়কে ঠেকানোর জন্যই উদারীকরণ ও বিশ্বায়নের নামে সাম্রাজ্যবাদকে মজবুত করতে ব্যস্ত। বিশ্বায়ন দারিদ্র্য বিমোচন করতে তো পারেইনি বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বনির্ভর অর্থনীতি বিকাশের ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতি ধ্বংসের ভীতি বিশ্বের উন্নয়নশীল সকল দেশকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
সাম্রাজ্যবাদের দোসর বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং ডব্লিউটিও’র খরবদারির কারণে আমাদের দেশের অর্থনীতি ও শিল্প প্রতিষ্ঠান চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন। বিদেশী পর্বতপ্রমাণ ঋণের বোঝা চাপানোর ফলে উন্নয়নমূলক সম্পদ নিঃশেষিত হচ্ছে। এ বিশ্বায়নপ্রক্রিয়ায় সবচেয়ে লাভবান হচ্ছে বৃহৎ আকারের একচেটিয়া ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। আমাদের রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান অপরিকল্পিতভাবে ব্যক্তি মালিকানায় ছেড়ে দেবার ফলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আমাদের অর্থনীতির উপর খবরদারি করছে। তাদের নির্দেশ অনুযায়ী বিশ্বের বৃহত্তম পাটকল আদমজী বন্ধ করে দেয়ায় দেশের ৩৫ হাজার শ্রমিক ও পাটচাষিসহ ১ লাখ লোক কর্মহীন হয়ে পড়েছে। সরকারি ব্যাংকসহ সেবামূলক প্রতিষ্ঠান যেমন রেল, টিএন্ডটি, বিদ্যুৎ, পানি, তেল, ও বিএডিসিসহ অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রাইভেটাইজেশন করার পরামর্শ দিচ্ছে এবং তেলের দাম বৃদ্ধির জন্য সরকারকে সব সময় চাপ প্রয়োগ করে আসছে। অন্য দিকে বিশ্বায়নের পথ ধরে পশ্চিমা উন্নত দেশের তৈরি পণ্য ও যন্ত্রপাতি বিনা বাধায় এদেশে প্রবেশ করছে। উন্নত ও আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে প্রস্তুত তাদের পণ্যাদি কেন্দ্রীয় বাজার থেকে দেশজ পণ্যাদি বিতাড়িত করে চলছে। পুঁজিবাদের নগ্ন আগ্রাসী হামলায় দেশীয় শিল্প কারখানা ও ব্যবসায় বাণিজ্য প্রচণ্ডভাবে ধ্বংসের মুখোমুখি হচ্ছে। অপর্যাপ্ত পুঁজি, সীমিত জাতীয় সঞ্চয়, পুরনো প্রযুক্তি, অদক্ষ মানবসম্পদ, আমদানিনির্ভর অর্থনীতি, রফতানির ক্ষেত্রে জটিলতা অনুন্নত ভৌত অবকাঠামো, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর কঠিন শর্তাবলি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্বল্পতা, রাজস্ব আদায়ের অদক্ষতা, ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সরকারের অতিমাত্রায় ঋণ গ্রহণ, সর্বোপরি সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিসহ দলীয় ও সুবিধাবাদী শ্রেণীর লাগামহীন লুটপাট, দুর্নীতি ও অনাদায়ী ব্যাংকঋণ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ক্রমশ পঙ্গু বানিয়ে ফেলেছে। অন্য দিকে ভারতসহ বিভিন্ন প্রতিবেশী দেশের চোরাই ব্যবসা দেশীয় ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কৃষিশিল্পকে ধ্বংসের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে। বিশ্বায়নের ফলে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতির তেমন কোন উন্নয়ন হচ্ছে না; বরং মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কিছুটা বাড়লেও শ্রমিকদের প্রকৃত ও ন্যায্য মজুরি আজও পাচ্ছে না। ফলে মানুষের কষ্ট-দুঃখ দুর্দশা আশানুরূপভাবে কমছে না বরং দিন দিন ব্যাপকহারে বেড়েই চলছে।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহে শ্রমিক কর্তৃক কাজ ফাঁকি দেবার খবর যেমন সত্য তেমনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও এনজিওসমূহে ৮ ঘণ্টা সময়ের কোন বালাই নাই, ৮ ঘণ্টার পরিবর্তে কোন ওভার টাইম ছাড়াই শ্রমিকদেরকে ১২-১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। ট্যানারিসহ বেশির ভাগ শিল্পাঞ্চলে স্থায়ী শ্রমিক নিয়োগের পরিবর্তে প্রচলিত শ্রম আইন ভঙ্গ করে সম্পূর্ণ অস্থায়ী ভিত্তিতে শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে কাজ করানো হয়। অসংগঠিত সেক্টরের বেশির ভাগ শিল্পে শ্রমিকদের কোন নিয়োগপত্র নেই, নেই কোন প্রচলিত ছুটি, নির্দিষ্ট বেতন ভাতা, এমনকি চাকরির নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তাও নেই। দেশে সবচেয়ে নির্মম ও বিধিবহির্ভূত অমানবিকভাবে শ্রম নির্যাতন চালানো হয় নারী ও শিশু শ্রমিকদের ওপর। গার্মেন্টস, বিড়ি, লেদমেশিন ও বিভিন্ন ফ্যাক্টরি থেকে শুরু করে ইট-পাথর ভাঙার মত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নারী ও শিশু শ্রমিক নিয়োজিত করা হয়ে থাকে। কিন্তু তারা শ্রমের যথাযথ মজুরি পায় না। বিশ্ব শ্রমসংস্থা শিশু শ্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও তার কোন বাস্তবায়ন নেই। বরং শিশুশ্রম বেড়েই চলছে। রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে বিড়ি কারখানায় কাজ করে শিশু শ্রমিকরা। শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য এ কাজ অত্যন্ত মারাত্মক হলেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা এ কাজ করে থাকে। ঢাকার লালবাগসহ দেশের অন্যান্য স্থানে কাঁচ শিল্পের পাশাপাশি অন্যান্য শিল্প ফ্যাক্টরিগুলোতে নিয়োজিত রয়েছে শিশু শ্রমিক। ইট-পাথর ভাঙার কাজ, ময়লা কুড়ানো, শহর ও শহরতলির পান-বিড়ির দোকানে, সিগন্যাল মোড়ে ফুল বিক্রি, লেদ মেশিন, ঝালাই দোকান আর গাড়ি মেরামতির গ্যারেজগুলোতে ব্যাপকভাবে শিশু শ্রমিক নিয়োগ করা হচ্ছে। ঐ শিশুরা গরিব বলে মালিকরা তাদের কাজের উপযুক্ত মূল্যও দেয় না বরং শিশু শ্রমিক অত্যন্ত সস্তা, অল্প মজুরিতে অনেক বেশি কাজ আদায় করা যায়, হাজারো নির্যাতন করলেও তারা প্রতিবাদের সাহস পায় না বলেই মালিকরা শিশু শ্রমিকদের নিয়োগ দান করে। বিড়ি ফ্যাক্টরিসহ বিভিন্ন কারখানায় শিশু শ্রমিক নিয়োগের ফলে অতি অল্প বয়সেই তারা বিভিন্ন মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়।
শ্রমিক স্বার্থ সংরক্ষণ ও অন্যায়ের প্রতিবাদের একমাত্র মাধ্যম ট্রেড ইউনিয়নগুলো আজ সুবিধাবাদী, সন্ত্রাসী ও শ্রমিক স্বার্থবিরোধীরাই দখল করে নিয়েছে। জাতীয় স্বার্থবিরোধী দেশী বিদেশী বিভিন্ন মহলের উসকানি ও মদদে তারা দাবি আদায়ের আন্দোলনের নামে শিল্প কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহে সুচিন্তিতভাবে ক্ষতিকর ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের বিপুল লোকসানের জন্য এ ধরনের কর্মকাণ্ডই দায়ী। ফলে চিন্তাশীল দেশদরদি ও সহজ সরল শ্রমিকরা প্রতিবাদ ও অধিকার আদায়ের কোন প্লাটফর্ম বা মাধ্যম খুঁজে পাচ্ছে না।
শ্রমজীবী মানুষের জন্য একমাত্র ইসলামই দিয়েছে শাশ্বত সুন্দর বিধান। মহান আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন- “প্রত্যেকের জন্য তাদের কাজের আনুপাতিক মর্যাদা আছে এবং তোমাদের প্রতিপালক তাদের কর্ম সম্পর্কে বেখবর নন।” (সূরা আনয়াম-১৩২)। শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে মহানবী (সা) এরশাদ করেন – যারা তোমাদের কাজ করে জীবিকা উপার্জন করে সে শ্রমিক তোমাদের ভাই, আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। কাজেই যাদের কাছে এমন লোক রয়েছে তাদেরকে যেন সে তাই খেতে দেয় যা সে নিজে খায়। তাদের ক্ষমতার বাইরে কোন কাজ করতে যেন তাকে বাধ্য না করা হয়। মহানবী (সা) আরও বলেছেন- শ্রমিককে কাজে নিয়োগ করার সময় তার মজুরি ঠিক করে নাও। অন্য হাদিসে বলা হয়েছে – শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও। সুতরাং কাজের সময় নির্ধারণ ও অতিরিক্ত কাজ না চাপানো, মজুরি বা বেতন স্কেল নির্ধারণ ও যথাসময়ে তার পারিশ্রমিক প্রদান ইসলামী শ্রমনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। এ নীতি অমান্য করার মাধ্যমে যেমন শ্রমিককে অবমাননা করা হয় তেমনি ইসলামের বিধান অমান্যকারী হিসেবে আল্লাহ ও তার রাসূলের বিরাগভাজন হতে হয়। তাই বিশ্বায়ন মোকাবেলায় যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ, ইসলামী শ্রমনীতি চালু, জাতীয় মজুরি ও বেতন কমিশন ঘোষণা, ঢালাওভাবে বিরাষ্ট্রীয়করণ বন্ধ করে লাভজনক শিল্প কারখানা চালু, শ্রমিক স্বার্থ বিরোধী সকল কালাকানুন বাতিল, গার্মেন্টসসহ সকল কারখানার শ্রমিকদের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কাজের সময় ৮ ঘণ্টা নির্ধারণসহ পাটকল, সুতাকল, কাগজকল, চিনিকল, সার কারখানা, গার্মেন্টস, বিদ্যুৎ, টিএন্ডটি, রেল, বন্দর, পরিবহনসহ সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরো আন্তরিক হতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদেরকেও দেশ ও জাতির স্বার্থে কাজে ফাঁকি দেবার মানসিকতা পরিত্যাগ করতে হবে; এটাই হোক ২০১১ সালের ১২৫তম মে দিবসের বিপ্লবী আহবান।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক,

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply