ষোড়শ সংশোধনীর কথা

মাসুমুর রহমান খলিলী

বর্তমান সরকারের সাংবিধানিক মেয়াদ একেবারে শেষপর্যায়ে। আগামী ২৫ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। কিন্তু এ নির্বাচন আদৌ হবে কি না, হলে কিভাবে হবে; তা নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। একপক্ষ বলছে, সংবিধানের বিধান অনুসারে বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আবার আরেক পক্ষ বলছে, দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে তারা অংশ নেবে না। আর এ ধরনের নির্বাচন করতেও দেয়া হবে না। এ ধরনের পরস্পরবিরোধী অবস্থানে দেশ এক চরম সঙ্কট ও হানাহানির দিকে যে যাচ্ছে, তাতে কোনো সংশয় আর থাকছে না। এর মধ্যেও কিছু কিছু উদ্যোগ ও আলোচনা ভেতরে ভেতরে হচ্ছে। আবার সব কিছু একটি বিন্দুতে এসে থেমে যাচ্ছে। তবে এ ধরনের আলোচনায় সমঝোতা হোক বা না হোক, সংবিধানের আরেক দফা সংশোধনী যেন অনিবার্য হয়ে উঠেছে। এমনও মনে করা হচ্ছে, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সৃষ্ট সঙ্কটের অবসান ঘটানো না হলে পুরো সংবিধানের কার্যকারিতা নিয়েই সঙ্কট দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশের শাসনতন্ত্র ১৯৭২ সালে প্রণীত হওয়ার পর এ যাবৎ ১৫ দফা সংশোধন করা হয়েছে। এসব সংশোধনীর কিছু ছিল রাষ্ট্রের প্রয়োজনে বাকি কিছু ছিল ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক প্রয়োজনে। আবার কিছু কিছু সংশোধনী সংবিধানের অনাহূত ছেদ ব্যবচ্ছেদকে সঠিক লাইনে আনতেও করতে হয়েছে। সংবিধান সংশোধনের জন্য যে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন, তা বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন সব সরকারের সময় ছিল না। ফলে অনেক সরকার ইচ্ছা বা প্রয়োজন মনে করলেও সংবিধানের সংশোধনী আনতে পারেনি।
এ সংসদে বর্তমান সরকারের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সংবিধান সংশোধন তেমন কোনো বিষয় নয়। সরকারপ্রধান ইচ্ছা করলেই যেকোনো সংশোধন ইচ্ছার বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল, হয়তো এখনো আছে। শাসনতন্ত্রে সর্বশেষ সংশোধনীতেও প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার প্রতিফলনই বেশি ঘটতে দেখা গেছে। বহুলালোচিত এই পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানের আগের চেহারার আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতে রাষ্ট্রের পূর্ববর্তী চার মূল নীতির পরিবর্তন আনা হয়েছে। সরকারের মেয়াদ শেষের নির্বাচনের জন্য যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ছিল, সেটি তুলে দেয়া হয়েছে। সংবিধানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশকে পরিবর্তন অযোগ্য করা হয়েছে। রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সম্পর্কের অগ্রাধিকারেও আনা হয়েছে পরিবর্তন। শাসনতন্ত্রের মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিকতা বাড়ানো হয়েছে। এ সংশোধনীতে সংবিধানের আমূল পরিবর্তন আনতে গিয়ে এমন অনেক অসঙ্গতিও এসে গেছে, যেগুলো সংশোধনের প্রয়োজন অনিবার্য হয়ে দেখা দিয়েছিল। কিন্তু তা এত দিন পর্যন্ত সরকারের অগ্রাধিকারে স্থান পায়নি অথবা আরো কিছু পরিবর্তন মাথায় থাকায় হয়তো সেটি করা হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের রায় ও সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী সমন্বয় করলে এমন এক অবস্থা দেখা যায়, যাতে এখন যে সংসদীয়পদ্ধতির সরকার চলছে সেটিও ভিত্তিশূন্য হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি থেকে সংসদীয়পদ্ধতির সরকারে রূপান্তরের ব্যবস্থাটি আদালতের রায়ে এখন আর সংবিধানের অংশ নয়। এ ঘাটতি দূর করতে সুপ্রিম কোর্ট সরকারকে কয়েকবার সময়ও বেঁধে দিয়েছে। কিন্তু এ সময় কেবলই অতিক্রান্ত হয়েছে। এসব কিছু মেরামতের জন্য শাসনতন্ত্রের সংশোধন এ মেয়াদে করা না হলে এর ফাঁক দিয়ে আরো অনেক কিছু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও সরকারের অনেকের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু সরকারের শীর্ষপর্যায়ে তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্যের গন্তব্য কোথায়, কিভাবে যাবেন সে গন্তব্যে তা নিয়ে কিছুটা সিদ্ধান্তহীনতার জন্য সংবিধানের অসঙ্গতি দূর করার সংশোধনটুকু এখন পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি।
সরকারের মেয়াদ ফুরিয়ে আসার এ-পর্যায়ে অতি গোপনে এ নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার বৈঠক করা হয়েছে। এসব বৈঠকে সংবিধান সংশোধনের বেশ কয়েকটি এজেন্ডাও সামনে রাখা হয়েছে।
সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানসংবলিত ৫৮খ নম্বর অনুচ্ছেদ বাদ দেয়ার মাধ্যমে দলীয় সরকারের অধীনে যে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়েছে, তাতে সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। এ ব্যবস্থার ফলে এক দিকে সংসদ সদস্যরা তাদের পদে বহাল থাকাবস্থায় নির্বাচনে অবতীর্ণ হওয়ার নজিরবিহীন সুযোগ পাচ্ছেন। অন্য দিকে আবার সরকারের স্বাভাবিক পাঁচ বছরের মেয়াদ তিন মাস কমে গেছে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় সরকার আবার ক্ষমতায় আসবে এমন বিষয়টি ধরে নেয়া হয়েছিল। ফলে তিন মাস সময়কে খুব বড় বিষয় মনে করা হয়নি। এমনকি একটি পর্যায়ে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নির্বাচনের চিন্তাভাবনাও করা হয়েছিল। এখন আবার ক্ষমতায় যাওয়ার বিষয়টি নানা কারণেই সরকারের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন যে তিন মাস মেয়াদ সরকারের কমানো হয়েছিল, সেটি আবার বাড়ানোর বিষয়টি সংবিধান সংশোধনের ভাবনার মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংসদ ভেঙে না দিয়ে নির্বাচন করার সমালোচনা আর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর সংসদ ভেঙে দেয়ার অনুরোধ করার বৈধতা নিয়ে যে সাংবিধানিক প্রশ্ন উঠেছে, সেটিকে যুক্তি হিসেবে রাখা হবে। নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় সংসদের মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিন করা হলে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সরকারের মেয়াদ বেড়ে যাবে। আর এর পরের ৯০ দিন হবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার না হলে দলীয় সরকারই হবে নির্বাচন সময়ের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার। সরকারের শেষপর্যায়ে এ তিন মাস সময়কে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। প্রথমত, এ সময়ে সরকারের অনেক উন্নয়ন বা সরবরাহ কন্ট্রাক্টে স্বাক্ষর করা যাবে। অতিরিক্ত তিন মাসে অনেক প্রকল্পের অর্থ ছাড় হবে। এতে সরকার সমর্থক রাজনীতিবিদদের আর্থিক সুবিধাপ্রাপ্তির সুযোগ আসবে। দ্বিতীয়ত, বিরোধী দল তাদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে শেষ মুহূর্তের আন্দোলনে কতটুকু কী করতে পারে, তা আরো কিছু সময় অবলোকন করা যাবে। তৃতীয়ত, যুদ্ধাপরাধ মামলার রায়গুলোকে আরো পরিণতির দিকে নিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই হোক অথবা প্রতিহিংসা কার্যকর করা হোক তার সুযোগ পাওয়া যাবে। চতুর্থত, সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনকে পরবর্তী পরিস্থিতির জন্য বিন্যাস করার ক্ষেত্রে আরো কিছু সময় পাওয়া যাবে। এসব বিবেচনায় বিদায় সময়ের সংবিধান সংশোধন প্যাকেজে ৯০ দিনের এ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান উঠিয়ে দেয়ার বিষয়টি সরকারের সাড়ে চার বছরের কর্মকাণ্ডের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়। বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কটের জন্য এটিকেই বেশি দায়ী করা হয়। কিন্তু এ ধরনের ব্যবস্থায় নির্বাচনে হেরে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় আসুক সেটিও ক্ষমতাসীনেরা মেনে নিতে পারছেন না। ফলে সংবিধান সংশোধনের যতই সুযোগ থাকুক না কেন, আগের বিধান ফেরানোর কোনো চিন্তা সরকার করতে পারছে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপে সমঝোতামূলক কোনো পদক্ষেপ যদি নিতে হয় তা হলে জরুরি পরিস্থিতির জন্য এক ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখা ভালো। এ ভাবনা থেকে নির্বাচিতদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ধরনের কিছু একটি বিধান করার ব্যাপারেও কাজ করার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এ চিন্তা অনুযায়ী ৬ থেকে ১০ সদস্যের অন্তর্বর্তী ধরনের এক সরকারের ব্যবস্থা থাকবে। এ সরকারের প্রধান হবেন স্পিকার। সংসদে নির্বাচিতদের মধ্য থেকে সরকার বা বিরোধীপক্ষের দুই বা তিনজন করে উপদেষ্টা বা মন্ত্রী নেয়া হবে। আর এর বাইরে দু-তিনজন টেকনোক্র্যাট আমলা থেকে উপদেষ্টা করা হবে। স্পর্শকাতর মন্ত্রণালয়গুলো থাকবে তাদের দায়িত্বে। এ সরকার নির্বাচন পরিচালনা ও প্রশাসনের নৈমিত্তিক কাজ সম্পাদন করবে। এ সময়ে প্রতিরক্ষাসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ রাষ্ট্রপতির হাতে থাকবে। এতে আগের সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে নন ফাংশনিং অবস্থায় দায়িত্বে রাখার প্রস্তাবও থাকতে পারে। এটি যদি একান্তই অন্য পক্ষ না মানতে চায়, তখন ভিন্ন কিছু বিবেচিত হতে পারে। এ সংশোধনের বিষয়টি তৈরি করে রাখা হলেও এ কাজ নিয়ে এগোনো হবে কেবল প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পেলে।
তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক বিষয়-আশয় নিয়ে যখন নানা অলোচনা হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের এক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মিশনের সদস্য সরকারের প্রভাবশালী এক ব্যক্তির রেফারেন্স উল্লেখ করে বলেন, বর্তমান সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য বঙ্গবন্ধু যেভাবে সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্রপতিব্যবস্থার দিকে গিয়েছিলেন, তেমন একটি ভাবনাও সরকারের রয়েছে।
সংবিধানের একাদশ সংশোধন আইনের মাধ্যমে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে সাহাবুদ্দীন আহমদের উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ ও পরে প্রধান বিচারপতি পদে ফেরত যাওয়ার বৈধতা দেয়া হয়েছিল। দ্বাদশ সংবিধান সংশোধন আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিপদ্ধতি থেকে সংসদীয় পদ্ধতিতে প্রত্যাবর্তন এবং পঞ্চম সংসদের নির্বাচন ও গঠনের বৈধতা দেয়া হয়। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ক্রান্তিকালীন বিধান হিসেবে সংবিধানের এ সংযোজনকে অবৈধ ঘোষণা করে। তবে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে চতুর্থ সংশোধনী (বাকশাল) বাতিল, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনসহ সামরিক ফরমানের মাধ্যমে জনস্বার্থে সংঘটিত কার্যক্রমকে মার্জনা দেন আদালত। পরে সরকারপক্ষ আপিল বিভাগের ওই রায়ের বিরুদ্ধে পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। আদালত কিছু পর্যবেক্ষণসহ পুনর্বিবেচনার আবেদনটির নিষ্পত্তি করে। আগে আপিল বিভাগ জনস্বার্থে যেসব বিষয় মার্জনা করেছিল, পুনর্বিবেচনার আবেদনে বর্তমান আপিল বিভাগ সেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষমতা সংসদের ওপর ন্যস্ত করে এ জন্য ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়। পরে সরকারের আবেদনক্রমে আপিল বিভাগ এ সময় আরো কয়েকবার বৃদ্ধি করে। এ সময়ের মধ্যে কোনগুলো মার্জনা করা হবে, সংসদকে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছে। কিন্তু মার্জনার বিষয়টি সংসদের ওপর ছেড়ে দিলেও সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আদালত ক্রান্তিকাল নির্দিষ্ট করে দেয়। রায়ে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে সংবিধান প্রণয়নের আগ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর পর্যন্ত সময়কে ক্রান্তিকাল হিসেবে গণ্য করা হবে। এর বাইরে ক্রান্তিকাল হিসেবে সংবিধানে যা কিছু অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তা সঠিক হয়নি। আপিল বিভাগের এ রায়ের পর ২০১১ সালের অক্টোবরে পঞ্চদশ সংশোধনী উত্তর সর্বশেষ মুদ্রিত সংবিধান থেকে এগুলো বাদ দেয়া হয়েছে। ফলে একাদশ ও দ্বাদশ সংশোধনী এখন আর সংবিধানের অংশ নয়, যার ফলে রাষ্ট্রপতিপদ্ধতি থেকে সংসদীয়পদ্ধতিতে প্রত্যাবর্তন ‘অবৈধ’ হয়ে গেছে। কিন্তু এ অবৈধ শাসনপদ্ধতি এখনো কার্যকরভাবে চলে আসছে। আর এতে সরকারের সামনে সেটিকে বৈধ করে নেয়ার সুযোগও এসেছে।
সংবিধানের সাম্প্রতিক সংস্করণে চতুর্থ তফসিলে সংযুক্ত একাদশ ও দ্বাদশ সংশোধনীসহ পাঁচটি প্যারা (১৮ থেকে ২২) ফেলে দেয়া হয়েছে। এতেও একধরনের অস্বচ্ছতা ও গোঁজামিলের অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে শাসনতন্ত্রে।
অনেকে বলছেন, সরকারপদ্ধতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্তহীন ছিলেন বলে পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় ইচ্ছা করেই সরকারপদ্ধতির বিষয়টি অনিষ্পন্ন রাখা হয়। নতুন আরেক সংশোধনীর মাধ্যমে আবার রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া হতে পারে; যাতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রপতি হওয়ার সুযোগ পাবেন। বাস্তবে এ বিষয়টি হচ্ছে কি হচ্ছে না, তা সরকারের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক লোকই জানেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বাবা শেখ মুজিব বাকশাল গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রপতি হন। তখন নির্বাচনের ব্যবস্থা না করে সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে তা সম্পন্ন করা হয়েছিল। এক্ষেত্রেও তেমন কিছু করার বিষয় বিবেচিত হতে পারে।
সংবিধানের ক্রান্তিকালীন সময় নির্ধারণ নিয়ে জটিলতার বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনা না হলেও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা এটিকে আলোচনায় নিয়ে এসেছেন। এ প্রসঙ্গে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি উল্লেখ করেন, ‘রাজনৈতিক বিষয় নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা আমরা দুই বছরে সুপ্রিম কোর্টের কাজে প্রত্যক্ষ করেছি। এর ফলে এমন কিছু সঙ্কট ভবিষ্যতে সৃষ্টি হবে, যা সামাল দেয়া রাজনীতিবিদদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। গত দুই বছরে উচ্চ আদালত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় অনেক কিছুই অবৈধ ঘোষণা করে ফেলেছে। জিয়া ও এরশাদের শাসন অবৈধ হয়েছে। একাদশ, দ্বাদশ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার অবৈধ ঘোষিত হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে তিনটি নির্বাচন কি বৈধ হয়েছে? যদি অবৈধ হয়, তাহলে মার্জনা কে করবে? আপিল বিভাগ তো এ বিষয়ে কোনো মার্জনা করেনি। সংসদকেও মার্জনার ক্ষমতা দেয়নি।’ (ইত্তেফাক, ২৩ জানুয়ারি ২০১৩)
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ একাদশ ও দ্বাদশ সংশোধনীর বিষয়াবলি চতুর্থ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করাকে সঠিক হয়নি বলে অভিহিত করেছেন। ক্রান্তিকাল নির্দিষ্ট করার পর চতুর্থ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করাকে অবৈধ বলেছেন। তবে তারা ১৯৭৯ সালের সংসদকে অবৈধ ঘোষণা করেননি। পঞ্চম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। ওই সংসদ ও তার পরবর্তী সংসদ চতুর্থ তফসিলে যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেছিল, ওই সব বিষয় বর্তমান সংসদকে বিবেচনা করতে বলেছেন আদালত। এখন বর্তমান সংসদ যদি আদালতের দৃষ্টিতে যা অবৈধ তা রেখে দেয়, তা হলে অবৈধ বিষয় চতুর্থ তফসিলে থেকে যাবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়েও আদালত সংসদকে পরামর্শ দিয়েছেন। তারা যেটিকে অবৈধ মনে করেন, সংসদ সেই অবৈধ জিনিস কেন আরো দুই মেয়াদের জন্য রাখবে? সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদিন মালিকের এ প্রশ্নে কোনো জবাব সরকারের পক্ষ থেকে পাওয়া যায়নি।
তবে এখন সরকারের মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে কূটনৈতিক মিশনের এই কর্মকর্তার কথায় যেন অনেক জট খোলার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। দেশে আগামী দিনগুলোতে আসলেই কী হতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে নিশ্চিত করে বলার মতো কেউ হয়তো দেশে নেই। তবে সরকারের ভাবনার প্রভাব আগামী পরিস্থিতিকে যে অনেকখানি প্রভাবিত করবে তাতে সন্দেহ নেই। এ ক্ষেত্রে মজার একটি তথ্য হলো ১৯৯১ সালে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কিন্তু চাননি সংসদীয়পদ্ধতির দিকে চলে যেতে। মূলত তখনকার বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনার চাপেই তিনি এতে সম্মত হয়েছিলেন। এখন সেই শেখ হাসিনা বাবার দৃষ্টান্তের ব্যাপারে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোন্ দিকে গড়ায় তার জন্য আরো কিছু দিন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে সেই অপেক্ষার দিন দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply