সংখ্যালঘুদের নিয়ে রাজনীতির খেলা অপ্রকাশিত রয়ে যায় নেপথ্যের রহস্য – জিবলু রহমান

১৯৫২ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত জুলুম ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এক হয়েছিলেন। এর এক নাম জাতীয়তাবাদ, আরেক নাম কিন্তু অসাম্প্রদায়িকতা। অসাম্প্রদায়িকতার চেয়েও স্পষ্ট কথা হলো সর্বসম্প্রদায়মান্যতা; অর্থাৎ সব সম্প্রদায়ের সমান মর্যাদা ও অধিকার।
আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রের ‘লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, মূলনীতি ও উন্নয়ন দর্শন’ অংশে বলা হয়েছেÑ ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে অর্জিত সংবিধানে বিধৃত চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সকল ধর্মের সমান অধিকার নিশ্চিতকরণ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অভীষ্ট লক্ষ্য।’
মুক্তিযুদ্ধের পর মাত্র ১০ মাসের মাথায় ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণীত হয়ে। ১৬ ডিসেম্বর থেকে সংবিধান কার্যকর হয়। এই সংবিধান মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদের রক্তে রাঙা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন, যা প্রজাতন্ত্রের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করে।
দুঃখের বিষয় ৪ নভেম্বরের সংবিধান প্রণয়নের দিবসেই ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে চার দিনের ব্যবধানে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের গ্রাম। আরও কয়েকটি জেলায় হিন্দু প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে একই দিন। এসব হামলায় কার্যত আক্রান্ত হয়েছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পবিত্র সংবিধান। কারণ এই সংবিধান ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের অধিকার নিশ্চিত করেছে।
নাসিরনগরে প্রথম আক্রমণ ঘটে ৩০ অক্টোবর। দ্বিতীয়টি ৪ নভেম্বর ভোরবেলায়। কেন ঘটল এ তাণ্ডব? ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার একটি ছবি পোস্ট করাকে কেন্দ্র করে ২৯ অক্টোবর উপজেলার হরিণবেড় গ্রামের রসরাজ দাস নামের একজন তরুণকে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে নিয়ে আসে কিছু উত্তেজিত মানুষ। যদিও রসরাজ দাস বলছে, সে অশিক্ষিত, ফেসবুক চালাতে পারে না। খবর পেয়ে পুলিশ রসরাজকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে মামলা দায়ের করা হয়। রসরাজ যদি অপরাধ করে থাকে, তাহলে দেশের বিদ্যমান আইনে তার শাস্তি নির্ধারিত আছে। কিন্তু ঘটনা সেখানেই থেমে থাকেনি। এ ঘটনাকে পুঁজি করে সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করা হয়েছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করা হয়েছে। তারপর কয়েক শ’ মানুষ ৩০ অক্টোবর শতাধিক হিন্দু ঘরবাড়ি এবং কয়েকটি মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটতরাজ চালিয়েছে। পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাব সদস্যরা এসে তারপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। বিস্ময়ের বিষয়, এই নিরাপত্তার পরও ঘটেছে দ্বিতীয় দফা আক্রমণ!
৩০ অক্টোবরের হামলার আগে দুটি ধর্মীয় সংগঠন সমাবেশ করেছে। তাতে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতাও বক্তৃতা দিয়েছেন। হামলার ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এর একটিতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মিছিলসহ যোগদান করে এবং সুরুজ আলী নামে এক নেতা উত্তেজনাকর বক্তব্য দেন বলে স্থানীয়রা দাবি করেছে। চাপরতলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো: সুরুজ আলী মিছিল নিয়ে সমাবেশে যোগ দেয়ার কথা স্বীকার করলেও হামলায় ইন্ধনের অভিযোগ নাকচ করেছেন। তিনি সংবাদপত্রকে বলেছেন, ‘আমি শুধু ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে রসরাজের ফাঁসি দাবি করেছি। বক্তব্যে কোনো ধরনের উসকানিমূলক কথা ছিল না।’
খাঁটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের উপজেলা কমিটির প্রচার সম্পাদক মুফতি ইসহাক আল হোসাইন জানান, আওয়ামী লীগ নেতা সুরুজ আলী তাদের সমাবেশে বক্তব্য দেন। তিনি কী বলেছেন তা বক্তব্যের রেকর্ড শুনলে বোঝা যাবে। তবে এ সমাবেশ থেকে কেউ হামলায় অংশ নেয়নি বলে দাবি করেন আহলে সুন্নাত নেতা।
নাসিরনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এ টি এম মনিরুজ্জামান সরকার বলেন, ‘সুরুজ আলী কোনো সমাবেশে বক্তব্য রেখেছেন কি না, মিছিল নিয়ে গিয়েছেন কি না, তা জানা নেই। তবে একটি সমাবেশ থেকে লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালানোর জন্য লোকজনকে ছুটে যেতে দেখেছি।’
স্থানীয় সংসদ সদস্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী অ্যাডভোকেট ছায়েদুল হক ঘটনার কয়েকদিন পর নাসিরনগর গিয়েছেন। তবে ২ নভেম্বর ২০১৬ প্রথম দিকেই কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধিদল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছে। আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম ছাড়াও এ প্রতিনিধিদলে ছিলেন কেন্দ্রীয় নেতা সুজিৎ রায় নন্দী, গোলাম রাব্বানী চিনু, মারুফা আক্তার পপি, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকার প্রমুখ।
সরকারি-বেসরকারি অনুসন্ধানে নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলার ঘটনায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। স্থানীয় এমপি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হক ও পার্শ্ববর্তী এলাকার এমপি উবায়দুল মুক্তাদীর চৌধুরীর মধ্যে বিরোধের জেরই ওই হামলার মূল কারণ বলে জানা যায়। নাসিরনগর-তাণ্ডব নিয়ে কোনো আন্দোলন না করার জন্য হুমকি দেয়া হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বী নেতাদের। নাসিরনগরে ১৫টি মন্দির ও শতাধিক বাড়িতে তান্ডব চালানো ও আগুন দেয়ায় ঘটনায় উসকানি দেয়ার অভিযোগে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হকের ঘনিষ্ঠ তিন আওয়ামী লীগ নেতাকে বহিষ্কার করেছে জেলা আওয়ামী লীগ। এরপরও তাদের এখনো আটক না করে পুলিশ এলাকা ব্লক রেইড দিয়ে গণগ্রেফতার চালিয়েছে।
৩০ অক্টোবর নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলার ঘটনায় গঠিত পুলিশ সদর দফতর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশের গঠিত দুটি তদন্ত কমিটিই তদন্তে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছে। ১২ নভেম্বর ২০১৬ দুটি কমিটির প্রধানই ডেইলি স্টার পত্রিকাকে জানিয়েছেন, প্রশাসন এবং পুলিশ দক্ষতার সঙ্গে এবং সঠিকভাবে সক্রিয় হলে এই হামলার ঘটনা ঘটতো না। পুলিশের অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক (চট্টগ্রাম অঞ্চল) সাখাওয়াত হোসেনকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে পুলিশ সদর দফতর। অন্য দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেনকে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটির প্রধান করে জেলা পুলিশ দফতর থেকে আরো একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ ছাড়া হামলার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসকের অফিস থেকেও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সামসুল হককে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রথম দুটি তদন্ত কমিটিকে ৭ কার্যদিবসে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। অন্য কমিটিকে ১০ কার্যদিবস সময় দেয়া হয়। সবগুলো কমিটিকে নির্দেশ দেয়া হয় স্থানীয় প্রশাসন এবং পুলিশের কোনো গাফিলতি আছে কিনা, অথবা তারা পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে। ঘটনার কারণ এবং এর পেছনে কোনো পরিকল্পনাকারী আছে কিনা সেটাও খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘তদন্তে আমরা প্রমাণ পেয়েছি যে ওই ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন এবং পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।’ তিনি বলেন, স্থানীয় প্রশাসনের উচিত ছিল এই ঘটনা যাতে না ঘটে তার ব্যবস্থা নেয়া, কিন্তু তারা সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যেই প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। ঘটনার সময় নাসিরনগর থানার ওসি আব্দুল কাদিরের ভূমিকার ব্যাপারে তিনি বলেন, তার বিষয়টিতে অধিক গুরুত্ব দেয়া উচিত ছিল। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মোয়াজ্জেম হোসেন দুটি ইসলামিস্ট গোষ্ঠীকে সমাবেশ করার অনুমতি দেয়ার ব্যাপারে মতামত চেয়ে স্থানীয় থানাকে অবগত করা উচিত ছিল। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোয়াজ্জেমকে পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়।
স্থানীয় অনেকে ডেইলি স্টার পত্রিকাকে জানিয়েছেন, তৌহিদী জনতা ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের ডাকা পরের দিনের সমাবেশ নিয়ে ২৯ অক্টোবর থেকেই উত্তেজনা বিরাজ করছিল। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অথবা প্রশাসন বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি। তারা অভিযোগ করে বলেন, ফেসবুক পোস্টের প্রতিবাদে স্থানীয় জনতাকে উত্তেজিত করে তুলতে সকাল থেকেই কয়েক ঘণ্টা যাবৎ বিভিন্ন মসজিদ থেকে ডাকা হচ্ছিল। কিন্তু এসব জানার পরেও প্রশাসন বা পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশের গঠিত কমিটির প্রধান ইকবাল হোসেনও বলেন, তার কমিটিও ঘটনায় পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসনের গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছে। তিনি বলেন, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা না বলে মৌখিক অনুমতি দিয়ে ইউএনও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। যদি তিনি অনুমতি দেয়ার আগে বিষয়টি নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করতেন তাহলে এই ঘটনা এতদূর যেত না।
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল কাদিরের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার বিষয়ে তিনি বলেন, তার উচিত ছিল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক বিষয়টি জানানো। ওসি অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলেও তিনি জানান। এই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে পরে প্রত্যাহার করা হয়।
ইকবাল আরো বলেন, ঘটনার সময় তিনি কেবল এক প্লাটুন পুলিশ মোতায়েন করেন এবং পরে আরো ৬০ জন পুলিশ মোতায়েন করা হয় যা মোটেও যথেষ্ট ছিল না। ওইদিকে জেলা প্রশাসক রেজাউর রহমান জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি অচিরেই প্রতিবেদন করবে। (সূত্র : ডেইলি স্টার ১৩ নভেম্বর ২০১৬)
এর আগে বৌদ্ধমন্দিরে হামলার ঘটনায় আওয়ামী লীগের ইন্ধন থাকলেও রাখা হয়েছে স¤পূর্ণ আড়ালে। এর আগে ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুর ঘটনায় আলোচনায় আসা আটক আলিফের মা সাজেদা বেগম শ্রীকুল ইউনিয়ন মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী। দশকের পর দশক ধরে পরিবারটি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে ঐতিহ্যগতভাবেই জড়িত। সে পরিবারের ছেলে আলিফকে হঠাৎ করে ছাত্রশিবির হিসেবে পরিচয় করার চেষ্টা করছিল সরকার। স্থানীয় এমপি কমলও তাদের আত্মীয়। স্থানীয়রা বলেন, রামুর চৌমুহনীতে বৌদ্ধ যুবক উত্তম বড়–য়ার প্রতিবাদে যে মিছিল-উত্তর সমাবেশ হয়েছে তাতে বক্তব্য রাখেন সরকারি দলের নেতারা। ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম হোসেন, আমজাদ হোসেন, জিন বাবু ও রুস্তম আলীর নেতৃত্বে ওই মিছিলটি বৌদ্ধমন্দির এলাকা ঘুরে আসে। সেখান থেকে রামু চৌমুহনী বাজারের চৌরাস্তায় মিলিত হয়। সেখানে যোগ দেন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা নুরুল ইসলাম, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সোহেল সারোযার কাজল, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মুশরাত জাহান, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নুরুল ইসলাম। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবী চন্দ ও স্থানীয় থানার ওসি নজিবুল ইসলাম এ সময় উপস্থিত হন। (সূত্র : দৈনিক দিনকাল ১৩ নভেম্বর ২০১৬)
বর্তমান সরকার ২০০১ সালের নির্বাচনের পর হিন্দুদের ওপর হামলার বিচারের জন্য কমিশন গঠন করে বিচারের আয়োজন করছে। অন্য দিকে সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের হাতে জমিজমা, বাড়িঘর হারিয়ে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে সংখ্যালঘুরাÑ বিষয়টি দুঃখজনক। ২০১৫ সালের জুলাই থেকে সংখ্যালঘুদের জমি দখল, ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ, মন্দির দখল, মন্দিরে যেতে বাধা ও খুনের ঘটনা লক্ষ্য করছি। অনেক জায়গায় সংখ্যালঘু নারী অপহরণ ও ধর্ষণ করা হচ্ছে। আমরা দেখেছি এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িতরা বর্তমান সরকারি দলের লোকজন। পিরোজপুর, নাটোর এবং গফরগাঁওয়ে সরকারি দলের সংসদ সদস্যরাও প্রত্যক্ষভাবে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচারে জড়িত ছিল।
৯ জানুয়ারি ২০১৪ বিবিসি বাংলায় প্রচারিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিলÑ ‘…বাংলাদেশে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় হিন্দু সম্প্রদায়ের শতাধিক বাড়িঘর এবং মন্দিরে হামলা হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলার জন্য সরকারের দিক থেকে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে এসব ঘটনার সাথে সরকার দলীয় সমর্থকরাই জড়িত।
বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর বিভিন্ন সময় আক্রমণের ঘটনা এরকম পাল্টা বক্তব্য দেখা গেলেও হামলাকারীদের শাস্তির নজির খুব একটা নেই। হিন্দুদের বাড়িঘর এবং মন্দিরে হামলা, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো বিভিন্ন সময় দেশি-বিদেশী গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার হয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরকে দায়ী করেছে। কিন্তু বিচার নেই। মানবাধিকার আইনজীবী জেড আই খান পান্না মনে করেন, বিভিন্ন সময় হিন্দুদের ওপর আক্রমণের ঘটনাগুলো রাজনীতির আবর্তে হারিয়ে গেছে।
মি. পান্না বলেন, হিন্দুদের ওপর যে হামলা হয় তার প্রতিটির পেছনে রাজনৈতিক অভিসন্ধি কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ মি. পান্না বলেন, ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর এবং ২০০১ সালের নির্বাচনের পর হিন্দুদের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া ২০১৩ সাল এবং সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর বিভিন্ন জায়গায় হিন্দুদের ওপর আক্রমণের ঘটনা।
মি. পান্না বলেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে এসব হামলা হয় বলে এর কোনো বিচার নেই। নিন্দা জানানো এক বিষয় আর বিচার করা ভিন্ন বিষয়।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় হিন্দুদের বাড়িঘর এবং মন্দিরে হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটে। মূলত ২০১৩ সালের ফেব্র“য়ারিতে জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা হয়।
এজন্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দোষারোপ করেছে জামায়াতে ইসলামীকে। সাথে বিএনপিকেও। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপি পাল্টা বলেছে, সরকার দলের নেতাকর্মীরা হিন্দুদের বাড়িতে আক্রমণ করে বিরোধীদের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।
বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের একজন নেতা সুব্রত চৌধুরী বলেন, সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটলে সেটা এখন রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের ওপর দোষ চাপানোর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হামলাকারীদের বিচারের আওতায় না আনার একটি সংস্কৃতি চালু হয়ে গেছে।
সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘এখন যেমন বলা হচ্ছে জামায়াত-শিবির এটা করেছে। এটা একটা শ্লোগান হয়ে গেছে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সব জায়গায় জামায়াত-শিবির করেছে বিষয়টি এ রকম না। অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগের লোকজনও জড়িত হয়েছে সেটা আমরা দেখতে পেয়েছি।’
তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি জামায়াত-শিবিরই হামলা করে থাকে বা আর যেই করুক না কেন, সরকার কেন তাদের বিচার করছে না? মি. চৌধুরী বলেন, হামলার ঘটনা বন্ধ করতে প্রশাসনের যেসব কর্মকর্তা ব্যর্থ হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।
বিভিন্ন সময় হিন্দুদের ওপর হামলার বিচার না হলেও এবারে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর হামলাগুলোর বিচার হবে কিনা সেদিকে অনেকে নজর রাখছে। ঢাকায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, হিন্দুদের ওপর হামলার ঘটনায় সরকার জিরো টলারেন্স বা কোনো ছাড় না দেয়ার নীতি অনুসরণ করবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কামালউদ্দিন আহমেদ জানান, হিন্দুদের ওপর হামলাগুলোর বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠানোর জন্য বিভিন্ন জেলার পুলিশকে এরই মধ্যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। মি. আহমেদ জানান, প্রয়োজনে আইন অনুযায়ী দ্রুত বিচারের উদ্যোগ নেয়া হবে। কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিচ্ছেন প্রত্যেকটি হামলার ঘটনার আলাদা আলাদা মামলা হবে। পাশাপাশি ২০০১ সালের নির্বাচনের পর এবং বিভিন্ন সময় হিন্দুদের ওপর আক্রমণের ঘটনাগুলোর বিচারের জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যায় কিনা সেটিও সরকার খতিয়ে দেখছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন …।’
গত ৬ বছরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৭৩টি। এর মধ্যে বিচার হয়েছে মাত্র একটির। আর ৯৩টি ঘটনায় দায়ের করা মামলায় পুলিশ কোনো প্রমাণই খুঁজে পায়নি। ২০১১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের ৪ নভেম্বর পর্যন্ত এসব মামলা দায়ের করা হয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনায় বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান নেতৃবৃন্দ। ৬ নভেম্বর ২০১৬ পুলিশ সদর দফতরে মহাপুলিশ পরির্দশক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হকের সঙ্গে এক বৈঠকে নেতৃবৃন্দ এ ক্ষোভের কথা জানান। তারা বলেন, বিচার হলে এ ধরনের ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি হতো না। নেতৃবৃন্দ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা সংক্রান্ত মামলাগুলো মনিটরিং করার জন্য পুলিশ সদর দফতরে একটি মনিটরিং সেল গঠনেরও দাবি জানান।
মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি ডি এন চ্যাটার্জী বলেন, ২৭৩টি মামলার মধ্যে একটির মাত্র বিচার হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৫ সালের এপ্রিলে সিলেটে চালিবন্দরের ভৈরব মন্দিরে। এতে প্রধান হামলাকারীর ৫ বছর জেল হয়েছে।
হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজল দেবনাথ বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতির সঙ্গে আমরা এমনভাবে জড়িয়ে গেছি যে, আমরা প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রে সরব। কিন্তু মাইনোরিটির ক্ষেত্রে নির্লিপ্ত। তিনি আরো বলেন, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, মাইনোরিটির ওপর অত্যাচার একটি গা সওয়া ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, দেশের দুটি মেট্রোপলিটন ও ৮টি রেঞ্জে মোট ২৭৩টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে প্রথম অবস্থানে ঢাকা রেঞ্জ, মামলার সংখ্যা ৬২টি। দ্বিতীয় অবস্থানে চট্টগ্রাম রেঞ্জে মামলার সংখ্যা ৫৪টি। তৃতীয় অবস্থানে রাজশাহী রেঞ্জ, মামলার সংখ্যা ৪১টি, চতুর্থ খুলনা রেঞ্জে ৪০টি, পঞ্চম স্থানে রংপুর রেঞ্জ, মামলার সংখ্যা ৩৯টি। ময়মনসিংহ রেঞ্জে মামলার সংখ্যা ২১টি, বরিশাল রেঞ্জে মামলা ৬টি, বিএমপিতে ৪টি, সিলেটে ৩টি ও এসএমপিতে ৩টি মামলা।
২৭৩ মামলার মধ্যে অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে ১৪১টির। তদন্তাধীন রয়েছে ৩৯টি মামলা। আর ৯৩টি মামলায় পুলিশ কোনো প্রমাণ পায়নি। ফলে এসব মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। তথ্যে জানা যায়, সর্বাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে ২০১৪ সালে। মামলার সংখ্যা ৭৬টি। এর মধ্যে ঢাকা রেঞ্জে ১৪টি, খুলনা রেঞ্জে ১৪টি, রংপুর রেঞ্জে ১৩টি, চট্টগ্রাম রেঞ্জে ১২টি, রাজশাহী রেঞ্জে ১০টি, ময়মনসিংহ রেঞ্জে ৮টি, বরিশাল রেঞ্জে ২টি, বিএমপিতে ২টি ও এসএমপিতে ১টি মামলা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ২০১৬ সাল। এ বছরের দশ মাসে মামলা হয়েছে ৫৫টি। এর মধ্যে ঢাকা রেঞ্জে ১৫টি, রংপুর রেঞ্জে ৯টি, রাজশাহী রেঞ্জে ৭টি, চট্টগ্রাম রেঞ্জে ৬টি, ময়মনসিংহ রেঞ্জে ৬টি, এসএমপিতে ২টি, সিলেটে ৩টি, বরিশাল রেঞ্জে ২টি ও বিএমপিতে ১টি মামলা হয়। ২০১৩ সালে হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে ৪৬টি। সর্বাধিক রাজশাহীতে মামলার সংখ্যা ১১টি। দ্বিতীয় অবস্থানে ঢাকা রেঞ্জে মামলার সংখ্যা ৯টি এবং চট্টগ্রাম রেঞ্জে ৭টি। এ ছাড়া খুলনা রেঞ্জে মামলার সংখ্যা ৬টি, রংপুর রেঞ্জে ৭টি, ময়মনসিংহ রেঞ্জে ৫টি এবং বিএমপিতে ১টি। ২০১৫ সালে মামলা হয় ৪৪টি। এর মধ্যে ঢাকা রেঞ্জে ১১টি, রাজশাহী রেঞ্জে ১০টি, খুলনা রেঞ্জে ৮টি, রংপুর রেঞ্জে ৭টি, চট্টগ্রাম রেঞ্জে ৪টি, বরিশাল রেঞ্জে ২টি এবং ময়মনসিংহ রেঞ্জে মামলার সংখ্যা ২টি। ২০১২ সালে মামলা হয় ৩৬টি। সর্বাধিক চট্টগ্রামে মামলার সংখ্যা ২৪টি। ঢাকা রেঞ্জে ৬টি, রাজশাহী রেঞ্জে ৩টি, খুলনা রেঞ্জে ২টি ও রংপুর রেঞ্জে ১টি মামলা হয়। ২০১১ সালে মামলার সংখ্যা ১৬টি। এর মধ্যে ঢাকা রেঞ্জে ৭টি, খুলনা রেঞ্জে ৬টি, রংপুর রেঞ্জে ২টি ও চট্টগ্রাম রেঞ্জে ১টি মামলা হয়। আদালতে অভিযোগপত্র দায়ের করা হয়েছে ১৪১টি মামলার। এর মধ্যে চট্টগ্রাম রেঞ্জে ৪৩টি, ঢাকা রেঞ্জে ২৪টি, রাজশাহী রেঞ্জে ১৯টি, রংপুর রেঞ্জে ১৯টি, খুলনা রেঞ্জে ১৮টি, ময়মনসিংহ রেঞ্জে ১১টি, বরিশাল রেঞ্জে ৪টি, এসএমপিতে ২টি ও বিএমপিতে রয়েছে ১টি মামলা। প্রমাণ না পাওয়ায় ৯৩টি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পুলিশ। এর মধ্যে সর্বাধিক ঢাকা রেঞ্জে ২৮টি, খুলনা রেঞ্জ ১৯টি, রাজশাহী রেঞ্জে ১৭টি, রংপুর রেঞ্জে ১৩টি, চট্টগ্রামে ৭টি, ময়মনসিংহে ৬টি ও বিএমপিতে ৩টি। তদন্তাধীন মামলার সংখ্যা ৩৯টি। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা রেঞ্জে ১০টি, রংপুর রেঞ্জে ৭টি, রাজশাহী রেঞ্জে ৫টি, চট্টগ্রাম রেঞ্জে ৪টি, ময়মনসিংহ রেঞ্জে ৪টি, খুলনা রেঞ্জে ৩টি, সিলেট রেঞ্জে ৩টি, বরিশাল রেঞ্জে ২টি ও এসএমপিতে ১টি মামলা।
হিন্দুদের মন্দির ও বাড়িঘরে হামলা ঘটনার বিশ্ব মিডিয়ায় গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার পেয়েছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ার প্রায় প্রতিটিতেই এই খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফক্স নিউজের শিরোনামে বলা হয়, ফেসবুকে ইসলামের পবিত্র স্থান নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশে। খবরের ভূমিকায় বলা হয় ফেসবুকের ওই পোস্টের কারণে শতাধিক মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। তাদের ঘরবাড়ি লুটপাট ও ভাঙচুরের শিকার হয়। যার কারণে এই ঘটনার সূত্রপাত তাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ কিন্তু পুলিশ নিশ্চিত নয় ঘটনার মূল হোতা সেই কিনা। মূর্তি ভাঙার ছবি দেয়া হয় তাদের প্রতিবেদনে।
এএফপির শিরোনাম ছিল ফেসবুকের পোস্টের কারণে বাংলাদেশে হিন্দুদের মন্দির ভাঙচুর করা হয়েছে। ভূমিকায় বলা হয়, ফেসবুকে পোস্টের কারণে অন্তত ৫টি মন্দিরে হামলা করে এক দল ক্ষুব্ধ দুর্বৃত্ত। পুলিশের সূত্র দিয়ে এ খবর প্রকাশ করেন তারা। খবরের ভেতরে লেখা হয়, এক হিন্দু ছেলের ফেসবুক পোস্টের কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দুদের ওপর সহিংসতা চালায় এক দল দুর্বৃত্ত। ৩০ অক্টোবর রবিবার এসব হামলার ঘটনা ঘটে। কাবা শরিফের ওপর হিন্দু দেবতা ছবি দিলে উত্তেজিত হয় সেখানকার লোকজন। ঘণ্টাব্যাপী হিন্দুদের বাড়িঘরে ও তাদের মন্দিরে ভাঙচুর চালায় দুর্বৃত্তরা। আক্রান্ত হিন্দু বাড়িঘরের সংখ্যা ২০০-এর মত জানিয়েছে তারা। এতে ১৫০ লোক আহত হয়েছে। স্থানীয় এলাকার এক বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি সোমেশ রায় এ তথ্য দিয়েছেন।
আরব টাইমস খবরের শিরোনাম করেছে, ফেসবুক পোস্টে কাবা শরিফের বিকৃত ছবি প্রকাশ করার কারণে বাংলাদেশে হিন্দুদের মন্দির আক্রান্ত। খবরে ২০০ ঘরবাড়ি ও ৮ দোকানে আগুন লাগানোর কথা বলা হয়। ১৫টি মন্দির দুর্বৃত্তদের আক্রমণের শিকার হয়েছে বলে তাদের খবরে লেখা হয়। ফেসবুকের পোস্টের কারণে ১৫টি হিন্দু মন্দিরে হামলা হয়েছে বাংলাদেশে। কাবা শরিফের বিকৃত ছবি প্রচারে এই ঘটনা ঘটে। একদল দুর্বৃত্ত সেখানকার ১০০ বাড়িঘরে লুটপাট চালায়।
বিবিসি ইংরেজি এ নিয়ে কোনো সংবাদ প্রকাশ করেনি। কিন্তু এর বাংলা বিভাগ এ নিয়ে সংবাদ দেয়। যেখানে ৫টি মন্দির ও ২০ ঘর লুটপাটের কথা বলা হয়। স্থানীয় মুসলমানরা নাকি হিন্দুদের সহায়তা করেছে এমন খবর বিবিসি বাংলা খবরে দাবি করা হয়। এছাড়া প্রতিবেশী ভারতের মূলধারার সব গণমাধ্যমই এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
ক্ষমতাসীন দলের এমপি, মন্ত্রী ও নেতাকর্মীদের সশস্ত্র হামলা, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ করে দখলবাজিতে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এখন অসহায় অবস্থায় বসবাস করছে। একের পর এক হামলা ও উচ্ছেদ ঘটনায় সারাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকেরা অনেকটাই আতঙ্কিত। গত ৮ বছরে সারাদেশে কয়েক শ’ হামলা, নির্যাতন ও দখলবাজির ঘটনা ঘটলেও এখনো বিচার হয়নি একটিরও। এ ছাড়াও হামলার ঘটনায় শত শত লোকের বিরুদ্ধে মামলা ও আটক করা হলেও হামলা এবং ইন্ধনে সরাসরি জড়িত সরকারি দলের চিহ্নিত কাউকেই গ্রেফতার করা হয়নি।
৫ নভেম্বর ২০১৬ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের পক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা বিএনপি-জামায়াতের গভীর চক্রান্তের ফসল।
হানিফ বলেন, বিগত আট বছরে সরকার দেশকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে এসেছে। বিএনপি-জামায়াতের মাথাব্যথার কারণ এই উন্নয়ন। তারা সর্বশেষ পন্থা হিসেবে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, এই ঘটনাকে রাজনৈতিক ইস্যু করার জন্য একাত্তরের প্রেত্মাতা বিএনপি মাঠে নেমেছে। বিএনপি সেখানে টিম পাঠিয়ে কর্মসূচি দিয়েছে। বিএনপি নেতা হাফিজ উদ্দিন সংবাদ সম্মেলনে মিথ্যাচার করেছেন দাবি করে তিনি বিএনপি শাসনামলে সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই সেই হাফিজ উদ্দিন যার এলাকা ভোলায় বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে ২৮ দিন হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর অত্যাচার করা হয়েছিল।
৬ নভেম্বর ২০১৬ নাসিরনগরে ক্ষতিগ্রস্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির ও ঘরবাড়ি পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম বলেছেন, নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনায় সরকার ও প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা রয়েছে। আমরা চাই সব ধর্মের মানুষ নিরাপদে বাংলাদেশে থাকুক।
তিনি বলেন, নাসিরনগরে হামলার ঘটনায় আমার কাছে সবচেয়ে বেশি মনে হয়েছে প্রশাসনিক দুর্বলতা। দেশে রাজনীতি না থাকলে, মানুষের সম্মান না থাকলে, প্রতিবাদের ক্ষমতা না থাকলে প্রশাসন অথর্ব হয়ে যায়। আমরা এর প্রতিকার চাই।
তিনি আরো বলেন, ভারতের সঙ্গে এতো বন্ধুত্ব থাকলে একটি সম্প্রদায় এতো নির্যাতিত হবে কেন? হাজার বছর আগেও আমাদের এমন সম্প্রদায়িক রেষারেষি ছিল না। নাসিরনগরের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের পাশাপাশি বেসরকারি তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়ে তিনি আরো বলেন, হামলার সম্পৃক্ততার অভিযোগে তিন আওয়ামী লীগ নেতা বহিষ্কার হওয়ায় বিএনপি নেতা মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন বলেছেন, তাই ঘটনায় আওয়ামী লীগ জড়িত।
দলগতভাবে আওয়ামী লীগকে ব্লেইম দেয়ার কোনো অর্থ হয় না, নিশ্চয়ই আওয়ামী লীগের নেতারা জড়িত থাকতে পারে, হয়তো বিএনপির নেতারাও জড়িত থাকতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ক্ষত না শুকাতেই ৬ নভেম্বর ২০১৬ গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার রংপুর চিনিকলের অধিগ্রহণকৃত পতিত জমিতে বসবাস করা সাঁওতাল সম্প্রদায়কে উচ্ছেদ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে তিন সাঁওতাল নিহত ও অর্ধশত আহত হয়েছে। স্থানীয় সরকারদলীয় এমপির নির্দেশে ওই অভিযানে স্থানীয় চেয়ারম্যান ও দলীয় ক্যাডাররা অংশ নেয়। ওই ঘটনার পর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার সংলগ্ন সাঁওতাল পল্লী মাদারপুর ও জয়পুর পাড়ার বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। তাদের জীবনে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। শতাধিক সাঁওতাল শিশু-কিশোর ভয়ে স্কুল-কলেজে যাচ্ছে না। নিয়মিত কাজে ফিরতে পারছেন না সাঁওতালরা। হাট-বাজারেও যেতে পারছেন না। ফলে খাদ্যসঙ্কট দেখা দিয়েছে। এখনও একটি পক্ষ থেকে তাদেরকে কারো কাছে মুখ না খোলার জন্য হুমকি দেয়া হচ্ছে। হ
লেখক : কলামিস্ট ও সমাজকর্মী

SHARE