সংবাদপত্রের সততা ও নিরপেক্ষতা

শাহ আব্দুল হান্নান#

Mediaসংবাদপত্রের একজন নিয়মিত পাঠক হওয়া সত্ত্বেও আমি কেন জানি কখনও সংবাদপত্রের সততা ও নিরপেক্ষতার ওপর পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারিনি। যখনই সংবাদপত্রের সততা ও নিরপেক্ষতার প্রশ্ন আসে তখন কেউ কেউ বলেন, নিরপেক্ষতা বলে কিছু নেই এবং এ কথা বলে নিরপেক্ষতার গুরুত্বকে খাটো করার চেষ্টা করেন। কেউ এটিও বলতে চান যে নিরপেক্ষতা মানে মুনাফিকি। আসলে এটি হচ্ছে বিষয়টির অতি সরলীকরণ। প্রকৃতপক্ষে এটি ভুল ব্যাখ্যা বা অপব্যাখ্যা; নিরপেক্ষতার যে প্রয়োজনীয়তা তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া। সংবাদপত্র এবং অন্যান্য মিডিয়ার দায়িত্ব জনগণকে সত্য তথ্য অবহিত করা এবং তাদের যে এডিটোরিয়াল পলিসি তা যথাসম্ভব সততার ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া। কোনোভাবেই মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে এডিটোরিয়াল কমেন্ট করা ঠিক নয়। এডিটোরিয়াল অবশ্যই সত্যের ওপর ভিত্তিশীল হতে হবে।
সংবাদপত্রগুলো যে দৃষ্টিভঙ্গি ফলো করে তাতে পাঠক হিসেবে আমি সন্তুষ্ট হতে পারিনি। আমরা বিশ^ব্যাপী গত এক শ’ বছর ধরে একটি নৈতিক সঙ্কটের অভাব বোধ করছি। বিশেষ করে এটি শুরু হয়েছে যখন থেকে শিক্ষাকে সেকুলারাইজ করা হয়। অর্থাৎ শিক্ষা থেকে নৈতিকতাকে যে সময় থেকে বাদ দেয়া হয়, খাটো করে দেখা হয় তখন থেকেই প্রকৃতপক্ষে বিশ্বব্যাপী নৈতিক সঙ্কট শুরু হয়েছে। এ নৈতিক সঙ্কটের ফল হচ্ছে বিশ্বব্যাপী দুর্নীতি, সামাজিক ক্ষেত্রে দুর্নীতি, রাজনৈতিক দুর্নীতি, আর আন্তর্জাতিক নীতিতে দুর্নীতি বা মুনাফিকি। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যে দুর্নীতি, ডিপ্লোম্যাসির নামে যে নীতিহীনতা এটি আজ ব্যাপক হয়েছে এবং ক্রমেই বিস্তার লাভ করছে। এ নৈতিক সঙ্কটের প্রতিফলন হচ্ছে সংবাদপত্রে। এর প্রভাব পড়ছে সার্বিকভাবে মিডিয়ায়। একটি আলাদা কিছু নয়; তারই একটি অংশ মাত্র। বিষয়টি আমাদেরকে এভাবেই বিবেচনা করতে হবে।
বিবিসি, সিএনএন-এর অন্যান্য অনুষ্ঠান (যা অনেক ক্ষেত্রে অশ্লীল) বাদ দিয়ে যদি শুধু প্রতি ঘন্টায় পরিবেশিত সংবাদের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো তারা সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে খুবই পক্ষপাতিত্ব করে। বিশেষ করে ইস্যুটি যদি মুসলিম বিশে^র বা তৃতীয় বিশ্বের হয় তাহলে তাদের নিরপেক্ষতা ও সততা এ ক্ষেত্রে থাকে না বললেই চলে। যদি উত্তর কোরিয়ার ব্যাপার হয় তাহলে তারা তিলকে তাল করে। আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তি নের ব্যাপারে তারা নিরপেক্ষ থাকে না। এসব মিডিয়া তাদের জন্মলগ্ন থেকে এ ইস্যুগুলোতে একপেশে নীতি অনুসরণ করে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই তারা তাদের ইচ্ছা ও সুবিধামতো পক্ষপাতিত্ব করে থাকে। কোনো ব্যক্তি যদি এক ক্ষেত্রে দুর্নীতিপরায়ণ হয় তাহলে তার কাছ থেকে অন্য ক্ষেত্রে আমরা নীতিবোধের আশা করতে পারি না। এটি গেল ইলেকট্রনিক মিডিয়ার একটি দিক।
আবার বিদেশী সংবাদপত্রগুলোর দিকে তাকালেও এরকমই চিত্র আমরা দেখবো। সব বিদেশী পত্রিকা আমার পড়া সম্ভব হয় না; কিন্তু আমি বিশ্ববিখ্যাত তিনটি পত্রিকার মাধ্যমে বিষয়টি বিচার করতে পারি। পত্রিকা তিনটি হলোÑ ‘দি ইকোনমিস্ট’, ‘টাইমস’ এবং ‘নিউজউইক’। এ তিনটি পত্রিকাই মানের দিক থেকে ভালো ও তথ্যসমৃদ্ধ পত্রিকা। সাধারণ লোক বুঝতেই পারবে না, এর ভেতরে কী ধরনের তথ্য বিভ্রান্তি ঢুকে আছে। একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তিই বুঝতে পারবেন কিভাবে এগুলোতে তথ্য বিকৃতি করা হচ্ছে। অবাক হতে হয় এর মধ্যে আবার সবচেয়ে খ্যাত ইকোনমিস্ট পত্রিকাটি যখনই তৃতীয় বিশ্ব বা মুসলিম ইস্যু আসে তখন আর জাস্টিস করতে পারে না বা সততা দেখাতে ব্যর্থ হয়। একই ব্যাপারÑ তাদের কাছেও উত্তর কোরিয়া শয়তান; ইসরাইল আণবিক অস্ত্র বানালেও শয়তান নয়। যদি উত্তর কোরিয়ার পাশে চীনের মতো একটি দেশ না থাকতো তাহলে আমেরিকা যে এতদিনে উত্তর কোরিয়া আক্রমণ করতো না, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। এ কথা সত্য যে, উত্তর কোরিয়ার ওপর আক্রমণ চীন অনেক আটকে রেখেছে।
ইকোনমিস্টকে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে ইরাক যুদ্ধ সমর্থ করতে দেখা গেছে। দুর্বল শক্তি ইরাক একটি সবল শক্তির প্রেসারের সম্মুখীন। ইরাক সবসময় তার ওপর হামলার আতঙ্কের সম্মুখীন। সে অবস্থায় ইকোনমিস্টের মতো একটি পত্রিকা তার এডিটোরিয়ালে একবার নয়, দশবারেরও বেশি আমেরিকাকে উসকিয়েছে। তারা বলেছে, যুদ্ধ করতে হবে, যুদ্ধ করাই সমাধান, যুদ্ধ ছাড়া এ ইস্যুর সমাধান নেই। আমি এ কথা বলি না যে, ইকোনমিস্টের কারণেই যুদ্ধ হয়েছে। ইকোনমিস্টকে রেসপনসিবল পত্রিকা বলা হয়। কিন্তু আমি এতো বড় উসকানিতে এই পত্রিকাকে কোনোভাবেই রেসপনসিবল বলতে পারি না। এর কাজ বরাবরই ইরেসপনসিবল ছিল। আফগানিস্তানের ব্যাপারেও পত্রিকাটি উসকানি দিয়েছে। উত্তর কোরিয়ার ব্যাপারে একই ধরনের উসকানি তারা সম্ভবমতো দিচ্ছে। এ দিক থেকে সংবাদপত্রের খুব ভালো একটি ভূমিকা আমি পাই না।
আবার দেশের সংবাদপত্র সম্পর্কে বলতে গেলে খুব সাবধানেই কথা বলতে হয় যাতে দেশীয় রাজনীতির উত্তাল তরঙ্গে আমি যেন জড়িয়ে না পড়ি।
আগেই বলেছি, এখানকার এডিটোরিয়াল পলিসি আমি খুব একটি ফেয়ার পাই না। সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে এখানে ঘটনাকে খুব বেশি ফলাও করে বা কম করে দেখানোর অভিযোগে কম বেশি প্রায় সব পত্রিকা জড়িত। আমি বুঝি না এটি কী করে ফেয়ার রিপোর্টিং হয়? তারা কী করে দাবি করবে যে তাদের পত্রিকা সৎ ও নিরপেক্ষ?
আবার অন্য দিকে সংবাদপত্রগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ইসলামিস্টদের তারা বলবে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী। সাম্প্রদায়িক টাইটেল দিয়ে এটিকে তারা বিশেষভাবে প্রচার করতে থাকবে। কিন্তু আমরা জানি, এ দেশের বৃহত্তম ইসলামি দলটি কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িকতার সাথে জড়িত নয়; কিন্তু সংবাদপত্রগুলো এটিই সব সময় বলে যাবে। এ প্রধান দলটি সাম্প্রদায়িক তো নয়ই এবং সন্ত্রাসী তৎপরতায় জড়িত থাকারও কোনো প্রমাণ নেই। তারা সবসময় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। তা সত্ত্বেও তাদেরকেই সবসময় সাম্প্রদায়িক এবং সন্ত্রাসী বলা হয়। এ সমস্ত রিপোর্টিং রাজনৈতিকভাবে রঞ্জিত এবং আইডিওলজিক্যালি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাদের ভাষায় কোনো হিন্দু বা বৌদ্ধ সাম্প্রদায়িকতায় নেই। তাদের কাছে সাম্প্রদায়িকতা মানে ইসলাম। এটি হয়ে গেছে। একে আমরা কোনোভাবেই পত্রিকাগুলোর জন্য সততা বা নিরপেক্ষতা বলতে পারি না।
তেমনিভাবে কোনো ইসলামিস্টের ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ’ বা ‘রামবাবুদের কারসাজি’ প্রমুখ শব্দ ব্যবহারকে ভালো বলা যায় না। আর এগুলো ইসলামিস্টদের মানায় না। তাই এগুলো বলা উচিত নয়। এমন নাম দেয়া ভালো নয় যা লোকে পছন্দ করে না। সার্বিক বিবেচনায় বলা যায়, কোনো একদিনের পত্রিকা হাতে নিলে দেখা যাবে কিভাবে এখানে রিপোর্টটি খুব পক্ষপাতমূলক ও একপেশে হচ্ছে। আর প্রায় কোনো পত্রিকাই এ দোষ থেকে মুক্ত নয়। এটিই বেদনার কথা, দুঃখের কথা।
কিন্তু এর কি কোনো সমাধান নেই? আমার মন বলে, বিশ্বে এবং সারাদেশে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তাতে আপাত দৃষ্টিতে আমি কোনো সমাধান দেখছি না। তবে এ রকম একটি হতাশাব্যঞ্জক কথা দিয়ে শেষ করা কোনোভাবেই ঠিক নয়; কল্যাণকরও নয়। সেদিক থেকে আমি বলবো, মানবজাতির মধ্যে নৈতিকতাকে ফিরিয়ে আরো উদ্যোগ নিতে হবে। এ কাজ বিশ্বব্যাপীই হতে হবে। নৈতিকতা যদি বিশ্বব্যাপী কিংবা স্থানীয়ভাবে ফিরিয়ে আনা না যায় তাহলে এর কোনো সমাধান নেই, এ অবস্থার উত্তরণও সম্ভব নয়। বিশ্বব্যাপী নৈতিকতাকে ফিরিয়ে আনা বা নৈতিকতার বিজয় অর্জন এটি তো অনেক বড় কথা। ছোট করে বললেও বলতে হয়, বাংলাদেশের একদল সিনিয়র সাংবাদিক যারা নৈতিকতায় বিশ্বাস করেন, তাদেরকে একটি শক্ত আন্দোলন করতে হবে। যেমন আমরা দেখছি ফিল্মস্টারদের মধ্যেই একদল অশ্লীলতার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। তেমনিভাবে আমি মনে করি, সংবাদপত্রের ভেতরও একদল সিনিয়র সাংবাদিককে খুব দৃঢ় মনোবল নিয়ে সততা ও নিরপেক্ষতার পক্ষে আন্দোলন করতে হবে। সেই সাথে আমাদের প্রেস ইনস্টিটিউট, যেখানে সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, সেখানে অন্যান্য নিয়মিত বিষয়ের সাথে সবচেয় বড় প্রশিক্ষণ দিতে হবে সততা ও নিরপেক্ষতার ওপর। আমার মনে হয়, সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণের সবচেয়ে বড় দিক হতে হবে নিজের মত ও পথের ঊর্ধ্বে ওঠে সততা দেখানো। যেমন আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন, তুমি সত্যের পথে সাক্ষী হও তা যদি তোমার নিজের বিরুদ্ধেও হয়, তোমার আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে হয়, তোমার বাবা-মায়ের বিরুদ্ধেও হয়। (সূরা নিসা : ১৩৫)
এই যে নীতিমালার কথা আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, তাই সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে ভিত্তি হওয়া উচিত।
(সঙ্কলিত)

SHARE

Leave a Reply