সংবিধানের আলোকে বাকস্বাধীনতা এবং বর্তমান বাস্তবতা । হারুন ইবনে শাহাদাত

সংবিধানের আলোকে বাকস্বাধীনতা এবং বর্তমান বাস্তবতামানবতার ইতিহাস পর্যলোচনা করলে দেখা যায় বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারগুলো ক্ষমতাবানদের কাছ থেকে আদায় করার সংগ্রাম সৃষ্টির আদিকাল থেকেই চলছে। এই সংগ্রামের ফসল হিসেবে জাতিসংঘ মানবাধিকার সনদ এবং পৃথিবীর অধিকাংশ সুসভ্য গণতান্ত্রিক দেশ সংবিধানে মৌলিক অধিকার সুরক্ষার অঙ্গীকার করেছে। ‘মানুষের কথা বলার এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অধিকার গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকার’ এ কথা সর্বজন স্বীকৃত।বাকস্বাধীনতা একটি দেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নির্ণয়ের মাপকাঠি। তাই পৃথিবীর প্রতিটি গণতান্ত্রিক দেশের সংবিধানই বাকস্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু আইনের মারপ্যাঁচে এই অধিকার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও কম করা হচ্ছে না। আমাদের সংবিধানেও বাকস্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৯-এর (১) এ বলা হয়েছে, ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল। (২) রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের, এবং (খ) সংবাদ ক্ষেত্রের স্বাধীনতার, নিশ্চয়তা দান করা হইল।’ এ ছাড়াও ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টির কথা বলা হয়েছে সংবিধানের ৪১ নম্বর অনুচ্ছেদে। এর ১নং উপধারায় বলা হয়েছে, আইন, জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতাসাপেক্ষে (ক) প্রত্যেক নাগরিকের যে কোনো ধর্ম অবলম্বন, পালন বা প্রচারের অধিকার রয়েছে; (খ) প্রত্যেক ধর্মীয় সম্প্রদায় ও উপ-সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের স্থাপন, রক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অধিকার রয়েছে। উপ-অনুচ্ছেদ নং (২)-এ বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগদানকারী কোনো ব্যক্তির নিজস্ব ধর্মসংক্রান্ত না হলে তাকে কোনো ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ কিংবা কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা উপাসনালয়ে অংশগ্রহণ বা যোগদান করতে হবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক এবং সাবেক তথ্য কমিশনার অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম এ প্রসঙ্গে মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘গবেষকদের মতে, সংবিধানের এই বিধানটির ওপর ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের সংবিধানের অশুভ প্রভাব আছে অর্থাৎ বাধা নিষেধের শর্তটি দীর্ঘায়িত হয়েছে। কিন্তু উদার দৃষ্টিতে পরিলক্ষিত যে কোনো সীমাবদ্ধতা ব্যতিরেকে চিন্তা- চেতনা ও বিবেকবুদ্ধির সম্পূর্ণ স্বাধীনতার মতো অবাধ তথ্য প্রাপ্তির স্বাধীনতাও বাংলাদেশের নাগরিকগণ ‘মৌলিক অধিকার’ হিসেবে অর্জন করেছে (তথ্যের অধিকার, ২০০৭)।
বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভিন্ন মতপ্রকাশে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। নিরাপদ মতপ্রকাশে গণমাধ্যম মুক্ত কিনা, এই আলোচনার জন্য গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ প্রয়োজন। বিশ দশকের পূর্বে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়টি ছিল আন্দোলন বা অধিকার হিসেবে ‘স্বীকৃতি আদায়ের’ বিষয়। কারণ কাঠামোগতভাবে রাষ্ট্র ছিল স্বৈরতান্ত্রিক এবং জনসম্মুখে নিজের মতামত প্রকাশ করাটাই তখন মুখ্য ছিল। ইংরেজ কবি মিল্টন সপ্তদশ শতকে ব্রিটিশ রাজার সঙ্গে লড়াইয়ে লিপ্ত হন বিবেকের স্বাধীনতা, চিন্তার স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠায়। অ্যারিওপ্যাজিটিকায় তার উচ্চারণ ছিল এই রকম; দাও আমায়, জ্ঞানের স্বাধীনতা দাও, কথা কইবার স্বাধীনতা দাও, মুক্তভাবে বিতর্ক করার স্বাধীনতা দাও। সবার ওপরে আমাকে দাও মুক্তি। লক্ষণীয় যে, শর্তহীন বাকস্বাধীনতার অধিকার আজও আমরা অর্জন করতে পারিনি। উল্লেখ্য, মিল্টন স্বাধীনতা চেয়েছিল চার্চ ও রাষ্ট্র থেকে কারণ ক্ষমতার বিলি বণ্টন তখন এ দু’টি প্রতিষ্ঠান করত। আঠারো শতকের শেষ পর্যায়ে ভাব বা মত প্রকাশের স্বাধীনতায় সংবাদপত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সে সময় সংবাদপত্র একটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় বা মতাদর্শগত বিতর্কের জন্য। গণমাধ্যম তাত্ত্বিক জুর্গেন হেবারমাসত মুক্ত আলোচনা বিষয়ে প্রথমে উদাহরণ দিয়েছে আঠারো শতকের public sphere (The English term Ôpublic sphere’ is a translation of the German öffentlichkeit এক কথায় বাংলায় বিষয়টি বুঝানো কঠিন। এর শাব্দিক অর্থ পাবলিক গোলক সাধারণত এমন সামাজিক স্থানকে বুঝায় যেখানে বিভিন্ন মতামত প্রকাশ করা হয়, সাধারণ উদ্বেগ সম্পর্কিত সমস্যাগুলি আলোচনা করা হয় এবং সবাই মিলে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার চেষ্টা করা হয়।) -এ আলোচনাকে যেটা ছিল চার্চ ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। হেবারমাসের প্রতীতি, আঠার শতকে সংবাদপত্র ও সাময়িকী ‘জনপরিসর’-এর অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিল। পরবর্তীতে হেবারমাস সংক্ষুব্ধ হন যে, সংবাদপত্র ও সাময়িকীগুলো বিজ্ঞাপন ও পণ্য বাণিজ্যের কবলে পড়ে যায়; যার পরিণতিতে সৃষ্টি হয় গণভোক্তা ও গণবণ্টন ব্যবস্থা, যার ফলে স্বার্থের বিষয়গুলো আলোচনার শিরোনাম হতে ব্যর্থ হয়। পত্রিকার উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় কাটতির দিকে। ফলে গণমাধ্যম ক্রমশ ঝুঁকে পড়ে ব্যবসায়ী ও বিজ্ঞাপনদাতাদের ওপর (তথ্যের অধিকার, ২০০৭)। হেবারমাস যদিও গণমাধ্যমের বাণিজ্যকরণ প্রক্রিয়ার উল্লেখ করেছেন কিন্তু ইউরোপে তখন সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি তথ্য ও শিক্ষার মতো বিষয়ও ব্যক্তি খাতে চলে যায়। পুঁজিবাদের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশই রাষ্ট্রের চরিত্র, বাণিজ্য সম্পর্ক, পণ্য অর্থব্যবস্থার প্রকৃতি এবং সামাজিক মূল্যবোধ বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয়টি প্রভাবিত হতে শুরু করে। পুঁজিবাদের সঙ্গে এসেছে শিল্পায়ন, নগরায়ণ এবং মুক্তবাজার অর্থনীতি (তথ্যের অধিকার, ২০০৭ : ibid)। এই পুঁজিবাদের নেতিবাচক প্রভাব থেকে বাংলাদেশের গণমাধ্যম কতটুকু মুক্ত? লক্ষণীয় যে, বর্তমানে বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক/প্রিন্ট মাধ্যমের বেশির ভাগ মালিকানা চলে গেছে ব্যবসায়ীদের হাতে এবং সম্পাদকরা মালিক হিসেবে পত্রিকায় কাজ করছেন। যদিও অনেক সম্পাদক/নির্বাহী কর্মকর্তা দাবি করেন যে তারা মালিকের স্বার্থের ঊর্ধ্বে গণমাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে যাচ্ছেন কিন্তু বাস্তবে সবসময় তার প্রতিফলন নেই। গণমাধ্যমও অন্যান্য সেক্টরের মতো রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। উপরন্তু কোনো কোনো সময় সাংবাদিকরা স্বার্থ হাসিলের জন্য বেতনভুক্ত কর্মকর্তা/মালিক হিসেবে অসত্য তথ্য পরিবেশনের মাধ্যমে জাতীয় জীবনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। সমষ্টিগত স্বার্থের বিপরীতে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য গণমাধ্যম ব্যবহৃত হচ্ছে। তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে গণমাধ্যম দু’ভাবে কাজ করতে পারে। Radical Approach যেটা গণমাধ্যমকে status/law দ্বারা নির্ধারিত করে না। গণমাধ্যমে এই ধারার চর্চা অনেক ক্ষেত্রে অপব্যবহার হয়।
অপরদিকে Technocratic Control যুক্তি যেটা গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্ন করে। তাই গণমাধ্যম পরিচালিত হতে হবে নির্ধারিত ধারা এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। যেটা প্রয়োজন তা হলো যৌক্তিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে গণমাধ্যমের নিরাপদ মতপ্রকাশ নিশ্চিতকরণ।’
নিরাপদ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে কেউ যেন ব্যক্তির সুনাম ক্ষুণ্ণ করতে না পারেন তার জন্য মানহানি আইনে অপরাধের মাত্রা অনুসারে শাস্তির বিধান আছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, উসকানি, অশ্লীলতার বিরুদ্ধে শাস্তির বিধানও আছে। উল্লেখিত দিকে বিবেচনা করে সাবেক তথ্য কমিশনার অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বাকস্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের কিছু কারণ তুলে ধরেছেন। তাঁর সাথে দ্বিমত পোষণ না করেই বলা যায়, উল্লেখিত যৌক্তিক কারণগুলো যখন অযৌক্তিকভাবে কোন স্বৈরাচারী শাসক তার শাসনক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতে ব্যবহার করেন সমস্যাটা তখনই হয়। যখন তারা মনে করেন, তাদের চেয়ে বড় দেশপ্রেমিক আর কেউ নেই। তখন মনে পড়ে, জার্মান স্বৈরশাসক হিটলারের কথা। হিটলার তার ক্ষমতা গ্রহণের দিন থেকে নিহত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য অনেক মানুষের ওপর অত্যাচার চালিয়েছেন। তার দল নাৎসি পার্টির ক্যাডার বাহিনী তার ও তার শাসনকালের সমালোচনা করার অভিযোগে লোকজনের বাড়িতে আক্রমণ করতো, ধরে নিয়ে যেত, মারধর করতো, প্রাণে মেরে ফেলত। নাগরিকরা কেউ যদি সাহস করে তাদেরেেক বলতো, আমি জার্মানির নাগরিক, আমি ফুয়েরারের (হিটলার) সমালোচনা করতেই পারি। নাৎসিরা জবাব দিত, ‘তুই কি ফুয়েরারের চেয়ে দেশকে বেশী ভালোবাসিস?’
ঠিক এর বিপরীত চিত্র আমরা পাই অসহিষ্ণুতা, সহিংসতা, ববর্রতার কথা আসলেই যে অযৌক্তিকভাবে যে মধ্যযুগকে টেনে আনি সেই যুগে। ঘটনাটি শ্রী চৈতন্যের বিখ্যাত জীবনালেখ্য বৃন্দাবন দাস ঠাকুরের ‘চৈতন্য ভাগবত’-এ উল্লেখ আছে। বাংলায় মুসলমান সুলতানদের শাসনামলে তাদের উদারতায় মুগ্ধ হয়ে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা দলে দলে মুসলমান হতে থাকে। তখন সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের যুগ। গুটিকয় ব্রাহ্মণ ছাড়া হিন্দু ধর্ম বিলীন হওয়ার উপক্রম। এ সময় বিপন্ন হিন্দু ধর্মকে রক্ষার জন্য এগিয়ে এলেন শ্রী চৈতন্যদেব। তিনি বৈষ্ণব সাধনাকে নতুনভাবে হাজির করলেন। সেটি এমনই মানবিকতায় পরিপূর্ণ ছিল যে, রীতিমতো আন্দোলনে রূপ নিলো। ধর্মান্তর ঠেকিয়ে হিন্দু ধর্মের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হলে শ্রী চৈতন্য। মানুষ দলে দলে তার ডেরায় আসতে শুরু করে। স্বাভাবিকভাবেই মুসলমানরা এটা মেনে নিতে পারেনি। তারা সুলতানকে জানালেন শ্রী চৈতন্য আপনার শাসন মানে না। সে হিন্দুদেরকে আপনার বিরুদ্ধে সংগঠিত করছে। সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ প্রকৃত বিষয় জানতে চৈতন্যের সাথে কথা বলার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। তাঁর এই ইচ্ছা জানার সাথে সাথে চৈতন্যকে ধরে আনার জন্য সবাই এক পায়ে খাড়া, সুলতান বাধা দিয়ে বললেন, আমি নিজেই তার সঙ্গে দেখা করতে যাবো! শ্রী চৈতন্য তখন গৌড়ের নিকট গঙ্গা তীরের রামকেলী গ্রামে। শ্রী চৈতন্যের সাথে সুলতানের মতবিনিময় শেষে সুলতান কোতয়ালকে ডাকলেন। সবাই ভাবলো, এখনই গর্দান নেবার আদেশ হবে। সুলতান কোতয়ালকে আদেশ করলেন, এরপর থেকে কেউ যদি চৈতন্যের ধর্মপ্রচারে বাধা দেয় তাহলে তুমি তার গর্দান নেবে।’ এরই নাম মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। এই হলো গণতন্ত্র! অষ্টাদশ শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী ফরাসি সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক ভলতেয়ারের ভাষায়, ‘তোমার মতামতের সঙ্গে আমি হয়তো একমত নাও হতে পারি কিন্তু তোমার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য আমি আমার জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করে যাবো।’ একজন রাজনীতিবিদকে অনেক উদার হতে হবে। তাকে কে কী বলবে। তার বিরুদ্ধে কে কী স্লোগান দিলো। কী কার্টুন আঁকলো তাতে তাকে শায়েস্তা করতে ক্ষমতার অপব্যবহার করা যাবে না।
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি রাজনীতিবিদদের জীবনকে বলেছেন ‘পাবলিক লাইফ’। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে সবাই কাটাছেঁড়া করবে, এটাইতো স্বাভাবিক। রাজনীতির জগতে থাকা সবাইকে এটা মেনে নিতে হবে। আমিও বরাবরই এটা মেনে নিয়েছি। যারা রাজনীতিতে আছেন তারা তো জেনে বুঝেই এই লাইফটা বেছে নিয়েছেন।’ (১৯৯৮ সাল)।
প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারি বাজপেয়িকে ব্যঙ্গ করে কবিতা লিখলেন ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামার ছাত্র পীযূষ পান্ডে। পীযূষের বন্ধুরা কবিতাটা ক্যাম্পাসের সর্বত্র সেঁটে দিলেন। দিল্লির তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী, মদনলাল খুরানার তরফে মামলা করা হলো। পীযূষকে গ্রেফতার করে পেশ করা হলো খোদ প্রধানমন্ত্রীর দরবারে। অটলবিহারি সন্ধ্যাটা শুধু কবিতা নিয়ে আড্ডা মেরে কাটালেন। হাসতে হাসতে ফিরে এলেন বামপন্থী পীযূষ! (আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৪ এপ্রিল ২০১২)
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায়ই জানিয়েছেন, হোয়াইট হাউজে ওবামার নামে যত চিঠি আসে, তার অর্ধেকের বেশি চিঠিত তাকে বলা হয় গর্ধভ; অন্যান্য গালাগাল তো আছেই। চিঠি পাঠানো কেউ ওবামার শাসনামলে গুম হয়েছেন কিংবা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে কোনো খবর আসেনি। কিন্তু আমরা এদেশে কী দেখছি। একটি রাজনৈতিক দল তাদের পক্ষে জনমত গঠন করতে বক্তৃতা বিবৃতি দিবে, মিছিল, মিটিং করবে, ঘরোয়া বৈঠক করে কর্মসূচি ঠিক করবে, পরিকল্পনা করবে। তাদের এই সব রাজনৈতিক অধিকারের গোপনীয়তা রক্ষা করার দায়িত্ব একটি গণতান্ত্রিক সরকারের। কিন্তু আমরা কী দেখি- ঘরোয়া বৈঠককে ‘নাশকতার পরিকল্পনা’ আখ্যা দিয়ে বিরোধী দলের নেতা- কর্মীদেরকে গ্রেফতার করে অত্যাচার নির্যাতন চালানো হচ্ছে। তাদের টেলিফোন সংলাপ ফাঁস করে ভুলবার্তা দিয়ে উসকানি ছড়ানো হচ্ছে। অথচ সভ্য দুনিয়ায় উল্লেখিত অপকর্মের কারণে সরকারের পতন পর্যন্ত হয়েছে। আমেরিকার ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির কথা আমরা জানি। ১৯৭৪ সালে আমেরিকার ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কনভেনশন চলাকালে রিপাবলিকান দলের কয়েকজন সদস্য আড়িপাতা যন্ত্র স্থাপন করতে গিয়ে ধরা পড়েছিলেন। এ কাজে সহযোগিতা করার অপরাধে নিক্সন প্রশাসনের অনেককে জেলে যেতে হয়েছিল। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী সচেতন নাগরিকদের সমালোচনার মুখে প্রেসিডেন্ট নিক্সন পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কারণ তারা জনমতকে অগ্রাহ্য করে কিংবা জোর করে নিজের পক্ষে নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে লজ্জা পান। তারা বিশ্বাস করেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধীদলের কর্মকৌশল নির্ধারণের জন্য গোপন বৈঠক করা মৌলিক অধিকার। সম্মানের সাথে এ অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। যে সরকার এ দায়িত্ব পালন করেন না, সে সরকার গণতান্ত্রিক নয়, ফ্যাসিবাদী। মুখে যতই গণতন্ত্রের কথা বলুক না কেন? তারা একবার ছলেবলে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে পারলে ষড়যন্ত্র করে চিরদিন মসনদ ধরে রাখার জন্য। নিজেরা জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে জনসমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা না করে, অন্য দলের কর্মসূচি পালনে বাধা সৃষ্টি করে। বিরোধীদলকে গণসংযোগ করতে দিতে ভয় পায় নিজেদের দুর্নীতি অপকীর্তি ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে।
কোন গণতান্ত্রিক সরকার বিরোধী দলকে ভয় পায় না। কারণ তারা জানে ক্ষমতার পালাবদল গণতান্ত্রিক রাজনীতির চিরন্তন নিয়ম। জনগণ যতদিন যে দলকে চাইবে ততদিন সে দল ক্ষমতায় থাকবে। কিন্তু যে দল কোন অশুভ শক্তির সাথে আঁতাত করে জনমতকে ফাঁকি দিয়ে ক্ষমতায় আসে তারা সহজে ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। তাদের ভয় একবার ছাড়লে তারা কোনদিন যদি ক্ষমতায় না আসতে পারে। বিরোধী দলের মধ্যে সেই দলকেই তারা বেশি ভয় পায় যে দল জনগণের মনের কথা বলে, দেশ ও জনগণের স্বার্থকে সবার ওপরে স্থান দেয়।

সংবিধানের আলোকে বাকস্বাধীনতা এবং বর্তমান বাস্তবতা
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসন জনগণ যত বার প্রত্যক্ষ করেছে ততবারই তারা পরিচিত হয়েছে তাদের ফ্যাসিবাদী চরিত্রের সাথে। আওয়ামী লীগের ক্ষমতাগ্রহণ মানে বিরোধী দল নিপীড়ন। তারা চায় বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করে আজীবন ক্ষমতায় থাকতে। সংবিধান নয় সরকারি দলের নেতাদের আজ্ঞা পালন করাকেই প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা কর্মচারীরা পবিত্র দায়িত্ব বলে মনে করেন। বিরোধী দল ছায়া সরকারের ভূমিকা পালন করতে চাইলে আর রক্ষা নেই, ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় ফেলে তাদেরকে পাঠানো হয় জেলে। বন্দী নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবিতে মিছিল মিটিং করতে হলে লেলিয়ে দেয়া হয় জনগণের ট্যাক্সের টাকায় লালিতপালিত নিরাপত্তা বাহিনীকে। দলীয় কার্যালয়ে কিংবা মিলনায়তনে সভা করতে গেলে গোপন বৈঠকের অজুহাতে গ্রেফতার করা হয়। কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে জানতে চাইলে কিংবা গ্রেফতারি পরোয়ানা আছে কিনা এমন প্রশ্ন করলে পুলিশের কাজে বাধাদানের অভিযোগে মামলা দায়ের কর হয়। মামলা খোঁজার বাড়তি ঝামেলা থেকে ক্ষণিক্ষের জন্য রেহাই পায় পুলিশ। রেডিমেড মামলা পেয়ে যায়। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে বিরোধী দল ঠেকাতে নতুন যে ‘পণ্য’ উদ্ভাবন করেছে তার নাম গায়েবি মামলা। বাকস্বাধীনতাকে শৃঙ্খলিত করা হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে। এ প্রসঙ্গে সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ইকতেদার আহমেদের অভিমত হলো, ‘সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন। সংবিধানে বাক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ে যে অধিকার দেয়া হয়েছে, তা প্রমোক্তটির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা, নৈতিকতা, আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে এবং শেষোক্তটির ক্ষেত্রে আইন, জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার সাপেক্ষে। উভয় স্বাধীনতা ভোগের ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি যদি এমন কিছু করেন যা সংবিধানের ৭(ক) এ উল্লিখিত বিধানকে আকৃষ্ট করে অথবা দণ্ডবিধিতে উল্লিখিত ধর্মসংক্রান্ত অপরাধকে আকৃষ্ট করে অথবা তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ বা ৬৬ ধারাকে আকৃষ্ট করে, সে ক্ষেত্রে তা যে সংবিধান প্রদত্ত সীমারেখার ব্যত্যয়ে করা হয়েছে সে বিষয়ে কোনো সংশয় থাকার কথা নয়। দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানসহ দণ্ডবিধি ১৮৬০ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬ যে ধারণা দেয় তাতে আইনের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধা রয়েছে, এমন কোনো ব্যক্তির অনুধাবন করতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, বাক ও ধর্মীয় স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা কতটুকু। সে সীমাবদ্ধতার কারণে উভয় বিষয়ে কথা বলতে হলে একজন ব্যক্তিকে অবশ্যই আইন, নৈতিকত ও জনশৃঙ্খলার জন্য যা হানিকর, তা বিবেচনায় নেয়া অত্যাবশ্যক।’ এখন প্রশ্ন হলো সাংবিধান বাকস্বাধীনতার সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছে। তারপরও কি তথ্যপ্রযুক্তি আইনের প্রয়োজন আছে? এই আইন কি সংবিধান প্রদত্ত অধিকার হরণ করছে? এই সব প্রশ্নের উত্তর এবং বাকস্বাধীনতাকে কিভাবে বর্তমান সরকার শৃঙ্খলিত করছে, তার উত্তর পাওয়া যায় এই আইনের বিরোধিতার ব্যাপারে সম্পাদক পরিষদের দেয়া ব্যাখ্যায়। ‘সংবাদমাধ্যমের প্রয়োজন স্বাধীনতা। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কেন্দ্রীয় বিষয় কেবলই ‘নিয়ন্ত্রণ’, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা এতে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। এটা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অন্যতম মৌলিক ত্রুটি। এর ফলে এ আইন সংবাদমাধ্যমের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একটা ভীতিকর দিক হলো, এতে পুলিশকে এমন অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, যার বলে একজন সাংবাদিক ভবিষ্যতে তথাকথিত কোনো অপরাধ করতে পারেন কেবল এই সন্দেহে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারবে। পুলিশকে পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতার করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এগুলো জামিন অযোগ্য। ফলে সাংবাদিকতা বাস্তবত পুলিশের নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পড়বে। উদ্বেগের আরও একটি বিষয় হলো, এ আইনের অপরাধ ও শাস্তি সংক্রান্ত প্রায় ২০টি ধারার মধ্যে ১৪টি জামিন অযোগ্য।
জাতীয় সংসদে সদ্য পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে নিচের মৌলিক ত্রুটিগুলো রয়েছে: ১. ডিজিটাল যন্ত্রের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটন প্রতিহত করা এবং ডিজিটাল অঙ্গনে নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে একটি আইন প্রণয়নের চেষ্টা করতে গিয়ে এমন একটি আইন করা হয়েছে, যা সংবাদমাধ্যমের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি, বিষয়বস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং আমাদের সংবিধান প্রদত্ত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
২. এই আইন পুলিশকে বাসাবাড়িতে প্রবেশ, অফিসে তল্লাশি, লোকজনের দেহ তল্লাশি এবং কম্পিউটার, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, সার্ভার ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সংক্রান্ত সবকিছু জব্দ করার ক্ষেত্রে সীমাহীন ক্ষমতা দিয়েছে। পুলিশ এ আইনে দেয়া ক্ষমতাবলে পরোয়ানা ছাড়াই সন্দেহবশত যে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের কোনো কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের অনুমোদন নেয়ার প্রয়োজন নেই।
৩. এই আইনে অস্পষ্টতা আছে এবং এতে এমন অনেক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার ভুল ব্যাখ্যা হতে পারে এবং সহজেই সংবাদ মাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যেতে পারে।
৪. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এমন এক আতঙ্ক ও ভীতির পরিবেশ তৈরি করবে, যেখানে সাংবাদিকতা, বিশেষত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।
৫. এই আইন সংবাদমাধ্যমের কর্মী ছাড়াও কম্পিউটার ও কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ইত্যাদি ব্যবহারকারী সব ব্যক্তির মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করবে। ২০০৬ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন (আইসিটি অ্যাক্ট) প্রণীত হওয়ার সময় সরকার বলেছিল, সাংবাদিকদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই; কারণ, আইনটি করা হয়েছে সাইবার অপরাধ ঠেকানো ও সাইবার অপরাধীদের শাস্তি দেয়ার লক্ষ্যে। বাস্তবতা হলো, সাংবাদিকসহ অন্য যারা স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার চর্চা করতে গেছেন, তারা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় কারাভোগ করেছেন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এখন একইভাবে বলা হচ্ছে যে, সাংবাদিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ ঘটেনি; কিন্তু আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে যে, এই আইনেও সাংবাদিকরা আবার একই ধরনের হয়রানির মুখোমুখি হবেন। আইনটির প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এ আইনের উদ্দেশ্য ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এব ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ, দমন, বিচার’ করা। তাই এ আইন নিয়ে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন তার সংজ্ঞায়িত পরিধি অনেক দূর ছাড়িয়ে গিয়ে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকতার পরিধির মধ্যে ঢুকে পড়েছে। এই আইন স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রকৃতির পরিপন্থী এবং তা অনুশীলনের প্রতিকূল, যে সাংবাদিকতা জনগণের জানার অধিকার সুরক্ষা করে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি জনসমক্ষে উন্মোচন করে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কাজ ডিজিটাল প্রযুক্তির জগৎ নিয়ে, যে জগৎ অবিরাম বিকশিত হয়ে চলেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি জীবনের সর্বস্তরে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা থেকে খাদ্য উৎপাদন, স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক লেনদেন পর্যন্ত সর্বত্রই ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রবেশ ঘটেছে। সংবাদমাধ্যমও এর বাইরে নেই।
অন্য ক্ষেত্রগুলোতে প্রয়োজন ‘নিয়ন্ত্রণ’; কিন্তু সংবাদমাধ্যমের প্রয়োজন ‘স্বাধীনতা’। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কেন্দ্রীয় বিষয় কেবলই ‘নিয়ন্ত্রণ’, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা এতে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। এটা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অন্যতম মৌলিক ত্রুটি। এর ফলে এ আইন সংবাদমাধ্যমের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একটা ভীতিকর দিক হলো, এতে পুলিশকে এমন অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, যার বলে একজন সাংবাদিক ভবিষ্যতে তথাকথিত কোনো অপরাধ করতে পারেন কেবল এই সন্দেহে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারবে। পুলিশকে পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতার করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এগুলো জামিন অযোগ্য। ফলে সাংবাদিকতা বাস্তবত পুলিশের নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পড়বে।
উদ্বেগের আরও একটি বিষয় হলো, এ আইনের অপরাধ ও শাস্তি সংক্রান্ত প্রায় ২০টি ধারার মধ্যে ১৪টি জামিন অযোগ্য, ৫টি জামিনযোগ্য এবং একটি সমঝোতাসাপেক্ষ। ন্যূনতম শাস্তির মেয়াদ করা হয়েছে এক বছর কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শাস্তির মেয়াদ ৪ বছর থেকে ৭ বছর কারাদণ্ড। ফলে অনিবার্যভাবে একটা ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি হবে, যেখানে সাংবাদিকতার স্বাভাবিক অনুশীলন অসম্ভব না হলেও হয়ে উঠবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
আইনটি শুধু তার উদ্দেশ্যের সীমানা অনেক দূর পর্যন্ত কেবল লঙ্ঘনই করেনি, এটি অস্পষ্টতায়ও পরিপূর্ণ। অস্পষ্টতার কারণে এ আইন অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যেসব আইনের শব্দচয়ন সুস্পষ্ট, যেখানে অপরাধগুলো সুনির্দিষ্ট এবং অপরাধের সঙ্গে শাস্তির মাত্রা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেসবের মাধ্যমে ‘আইনের শাসন’ ভালোভাবে অর্জিত হয়। আইনের ভাষাগত অস্পষ্টতা থেকে অপরাধ সম্পর্কে ভুল ব্যাখ্যা এবং আইনের অপব্যবহারের সুযোগ ঘটে থাকে। যখন আইনের অপব্যবহার ঘটে, তখন স্বাধীনতা খর্বিত হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আরেক ত্রুটি হলো ‘অপরাধীদের’ শাস্তির মাত্রা নির্ধারণের বিষয়টি। এ প্রসঙ্গে একই সময়ে পাস করা সড়ক নিরাপত্তা আইনের কথা বলা যায়। এ আইনে দুর্ঘটনায় মানুষ মেরে ফেলার সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ বছরের কারাদণ্ড। আর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বিধান করা হয়েছে, ঔপনিবেশিক আমলের অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট (১৯২৩) লঙ্ঘনের জন্য সাংবাদিকদের যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। কোনো সাংবাদিক তার মোবাইল ফোনে অপ্রকাশিত কোনো সরকারি নথির ছবি তুললে অপরাধী বলে গণ্য হবেন, অথচ এটি আজকাল খুবই সাধারণ একটি চর্চা।
বিশদ ব্যাখ্যা : সম্পাদক পরিষদ মনে করে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মুক্ত সংবাদমাধ্যমের পরিপন্থী, বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরোধী এবং গণতন্ত্রের সঙ্গে বিরোধাত্মক। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যেসব ধারাকে আমরা সবচেয়ে বিপজ্জনক বলে মনে করছি, নিচে তা হুবহু তুলে ধরলাম। একই সঙ্গে সেসব নিয়ে আমাদের অবস্থানের বিশদ বিশ্লেষণ তুলে ধরলাম।
ধারা ৮: ৮। কতিপয় তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করিবার ক্ষমতা।
১. মহাপরিচালকের নিজ অধিক্ষেত্রভুক্ত কোনো বিষয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি সৃষ্টি করিলে তিনি উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ক্ষেত্রমত, ব্লক করিবার জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে, অতঃপর বিটিআরসি বলিয়া উল্লিখিত, অনুরোধ করিতে পারিবেন।
২. যদি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিকট প্রতীয়মান হয় যে, ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত দেশের বা উহার কোনো অংশের সংহতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করে বা জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণার সঞ্চার করে, তাহা হইলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করিবার জন্য মহাপরিচালকের মাধ্যমে, বিটিআরসিকে অনুরোধ করিতে পারিবেন।
৩. উপ-ধারা (১) ও (২)-এর অধীন কোনো অনুরোধ প্রাপ্ত হইলে বিটিআরসি, উক্ত বিষয়াদি সরকারকে অবহিতক্রমে, তাৎক্ষণিকভাবে উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ক্ষেত্রমতো ব্লক করিবে।
সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য: এখানে দু’টি উদ্বেগের বিষয় রয়েছে। একটি মহাপরিচালকের (ডিজি) ক্ষমতা, অন্যটি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর ক্ষমতা। প্রকাশের বিষয়বস্তু ব্লক করার ক্ষমতা মুদ্রিত বা অনলাইন যে কোনো প্রকাশনার অন্তরাত্মাকে আঘাত করবে। কোনো সংবাদমাধ্যমের যে কোনো প্রতিবেদন ব্লক করা যাবে, যে কোনো আলোকচিত্র জব্দ করা যাবে। এভাবে সংবাদমাধ্যমটির স্বাভাবিক কাজ বিঘ্নিত হবে।
প্রকাশিত বিষয়বস্তু অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যুক্তি আইনটিতে এত অস্পষ্ট যে, তা নানা ব্যক্তি নানাভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। এতে আইনটির অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, কোনো প্রকল্পে দুর্নীতির খবর প্রকাশ করার ফলে যদি সেটার অর্থায়নকারী বা কোনো বিনিয়োগকারী অর্থায়ন বন্ধ করে দেন, তাহলে এ আইনের অধীনে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক ‘অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিঘ্ন সৃষ্টি করা’র দায়ে অভিযুক্ত হতে পারেন এবং তা ওই খবর ব্লক বা অপসারণ পর্যন্ত গড়াতে পারে।
ধারা ২১: ২১। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সঙ্গীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণার দণ্ড।
১. যদি কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সঙ্গীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণা চালান বা উহাতে মদদ প্রদান করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।
সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য: আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা ও সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণের প্রতি পরিপূর্ণভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ এবং অতীতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা উপলব্ধি করি যে, এ বিষয়ে কিছু করা প্রয়োজন। তবে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ খুবই অস্পষ্ট একটি শব্দবন্ধ। কী কী করলে তা এই ধারার অধীনে ‘অপরাধ’ বলে গণ্য হবে, তা সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট না করায় এবং ‘অপরাধগুলো’কে আরও সংজ্ঞায়িত না করায় এই আইনের গুরুতর অপব্যবহার ও সাংবাদিকদের হয়রানির ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, এর শাস্তি হিসেবে রাখা হয়েছে যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং/অথবা ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান। আমরা আবারও বলতে চাই, আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহান উত্তরাধিকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংক্ষরণ করতে চাই। তবে আইন প্রণয়নের সময় আমাদের তা খুব স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট করতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এখন যে অবস্থায় আছে, তা শুধু সাংবাদিকদের জন্যই ভোগান্তিমূলক হবে না, ইতিহাসবিদ, গবেষক, এমনকি কথাসাহিত্যিকদের মতো সৃজনশীল লেখকদেরও দুর্ভোগের কারণ হতে পারে। এমনকি ভুল ব্যাখ্যা এবং সম্ভাব্য শাস্তির ভয়ে অনেকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বেশি লেখালেখিও করতে চাইবেন না।

সংবিধানের আলোকে বাকস্বাধীনতা এবং বর্তমান বাস্তবতা
ধারা ২৫ :২৫। আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক, তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ ইত্যাদি। (১) যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে।
(ক) ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে, এমন কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ করেন, যাহা আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শক অথবা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্থ বা হেয় প্রতিপন্ন করিবার অভিযোগে কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন, বা (খ) রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ন করিবার, বা বিভ্রান্তি ছড়াইবার, বা তদুদ্দেশ্যে অপপ্রচার বা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও, কোনো তথ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ, বা প্রচার করেন বা করিতে সহায়তা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।
সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য: এই ধারা সংবাদমাধ্যমে সব ধরনের অনুসন্ধানী রিপোর্টিংকে সরাসরি বিরূপভাবে প্রভাবিত করবে। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম সংক্রান্ত ঘটনা নিয়েই এ ধরনের প্রতিবেদন করা হয়ে থাকে। দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা সাংবাদিক ও সংবাদ প্রতিষ্ঠানকে ভয় দেখাতে এই আইন ব্যবহার করতে পারেন। তারা এই অজুহাত দেখিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশে বাধা দেয়ার চেষ্টা করতে পারেন যে ওই প্রতিবেদনে তাদের আক্রমণ করা বা হুমকি দেয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের সব প্রতিবেদনই উল্লিখিত এক বা একাধিক বিধানের আওতায় পড়ে বলে মন্তব্য করা হতে পারে এবং সংবাদমাধ্যমকে হয়রানির কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি উন্মোচন করে, এমন যে কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘বিরক্তিকর’, ‘বিব্রতকর’ বা ‘অপমানজনক’ হতে পারে। এই বিধান কোনো দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি সম্পর্কে নেতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশ অসম্ভব করে তুলবে। এটি সংবাদপত্রকে জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানে পর্যবসিত করবে।
এমনকি সাংবাদিকতার সাধারণ অনুসন্ধানও অসম্ভব হয়ে পড়বে। দ্বিতীয় ধারায় ‘বিভ্রান্তি ছড়ানো’র কথা বলা হয়েছে। ‘বিভ্রান্তি ছড়ানো’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা সুনির্দিষ্ট করা না হলে এই ধারা সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের হয়রানি করার হাতিয়ারে পরিণত হবে। একজনের কাছে যা বিভ্রান্তিমূলক, আরেকজনের কাছে তা নাও হতে পারে। সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখানোর জন্য এটি নিশ্চিতভাবেই নতুন একটি পথ তৈরি করবে।
রাষ্ট্রের ‘ভাবমূর্তি ও সুনাম’ ক্ষুণ্ন করা বলতে কী বোঝায়? সম্প্রতি আমরা ব্যাংক খাতে বিভিন্ন বিবেকহীন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর দুর্নীতির খবর পরিবেশন করেছি। সেসব প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমরা জনগণকে জানিয়েছি যে ব্যাংক খাত গুরুতর সংকটে পড়েছে। এতে কি ‘ভাবমূর্তি’ ক্ষুণ্ন হয়েছে? আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে দুর্নীতি নিয়ে আমরা সংবাদ পরিবেশন করেছি। আমরা ‘হেফাজতে মৃত্যু’, ‘গুম’ ও ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করেছি। কেউ যদি ব্যাখ্যা করেন যে এসব প্রতিবেদন রাষ্ট্রের ‘ভাবমূর্তি’ ক্ষুণ্ন করেছে, তাহলে এই আইন এ ধরনের সংবাদ পরিবেশন করায় সাংবাদিক ও সংবাদপত্রগুলোকে শাস্তি দেয়ার বৈধতা দেয়। কারণ, প্রায় সব সংবাদপত্রেরই নিজস্ব ওয়েবসাইট ও অনলাইন পোর্টাল রয়েছে।
ধারা ২৮: ২৮। ওয়েবসাইট বা কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কোনো তথ্য প্রকাশ, সম্প্রচার, ইত্যাদি।
(১) যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করিবার বা উসকানি প্রদানের অভিপ্রায়ে ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা প্রচার করেন বা করান, যাহা ধর্মীয় অনুভূতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর আঘাত করে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।
সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য: ‘ধর্মীয় মূল্যবোধ’ একটি অস্পষ্ট পরিভাষা। একজন সাংবাদিক কিভাবে জানবেন কখন ও কিভাবে ধর্মীয় মূল্যবোধ আহত হয়েছে? এই পরিভাষা বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যায় এবং কোনো সাংবাদিকই এ ধরনের বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করতে স্বস্তিবোধ করবেন না। এটি সমাজের বড় একটি অংশে সাংবাদিকতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নিরীক্ষণ বাধাগ্রস্ত করবে। বহির্বিশ্বে ক্যাথলিক ধর্মযাজকদের যৌন হয়রানির অভিযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো প্রকাশ করা সম্ভব হতো না, যদি ওই সব দেশে ধর্মীয় অনুভূতিতে ‘আঘাত’ করে, এমন সংবাদ প্রকাশ রুখতে আইন থাকত। বেআইনি ফতোয়া ও সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নিয়ে আলোচনা করাও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি ‘আঘাত’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। এই ধারা সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের হয়রানি করতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে পারে।
ধারা ২৯: ২৯। মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, প্রচার ইত্যাদি। (১) যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে Penal Code (Act XLV of 1860)-Gi section 499-এ বর্ণিত মানহানিকর তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করেন, তজ্জন্য তিনি অনধিক ৩ (তিন) বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।
সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য: মানহানির অভিযোগ বিচার করার জন্য ইতোমধ্যেই একটি আইন থাকায় ডিজিটাল মাধ্যমে মানহানি নিয়ে আলাদা কোনো আইন নিষ্প্রয়োজন। উপরন্তু একই অপরাধে পত্রিকার চেয়ে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমে অতিরিক্ত শাস্তির যুক্তি থাকতে পারে না।
ধারা ৩১: ৩১। আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, ইত্যাদির অপরাধ ও দণ্ড। (১) যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন বা করান, যাহা সংশ্লিষ্ট শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে বা অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অথবা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় বা ঘটিবার উপক্রম হয়, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।
সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য: দলিত বা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ওপর কোনো শোষণ সম্পর্কে পরিবেশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদনের এমন ব্যাখ্যা দেয়া হতে পার যে সেটি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের দুঃখকষ্ট তুলে ধরে লেখা প্রতিবেদন এভাবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে যে তাতে বিভিনড়ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। একইভাবে সম্ভাব্য শ্রমিক অসন্তোষ, আসনড়ব হরতাল বা বিক্ষোভ সমাবেশ নিয়ে পরিবেশিত সংবাদ ‘আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকারী’ প্রতিবেদন হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং এই আইনের আওতায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে। এমন খবর পরিবেশিত হতে পারে যে কোনো বিক্ষোভের সময় এক ব্যক্তি মারা গেছেন, পরে জানা যেতে পারে যে খবরটি সত্য নয়। তাহলে কি সংবাদমাধ্যম ‘গুজব ছড়ানো’র অপরাধ করবে? সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে এ রকম ভুল হয়; কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে ভুলের সংশোধনীও প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, এমনকি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির সংখ্যায় হেরফের হয়। সরকারি পরিসংখ্যানের সঙ্গে সব সময়ই বেসরকারিভাবে সংগৃহীত তথ্যের অমিল থাকে। এ ধরনের ঘটনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী ‘গুজব ছড়ানোর’ অভিযোগে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে। কখনো কখনো আমরা কিছু পূর্বাভাসমূলক খবরও পরিবেশন করতে পারি, যা পরে ঠিক সেভাবেই নাও ঘটতে পারে। এ ধরনের প্রতিবেদনও ‘গুজব ছড়ানো’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এভাবে দেখতে পাচ্ছি, এই ধারা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য গুরুতর ঝুঁকির সৃষ্টি করবে।
ধারা ৩২: ৩২। সরকারি গোপনীয়তা ভঙ্গের অপরাধ ও দণ্ড। (১) যদি কোনো ব্যক্তি Official Secrets Act, 1923(Act No. XIX of 1923)-এর আওতাভুক্ত কোনো অপরাধ কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটন করেন বা করিতে সহায়তা করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ১৪ (চৌদ্দ) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ২৫ (পঁচিশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন। (২) যদি কোনো ব্যক্তি উপধারা (১)-এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয়বার বা পুনঃপুন সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে বা অনধিক ১ (এক) কোটি টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন। সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য: অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ঔপনিবেশিক আমলের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণমূলক আইন, যা ব্রিটিশ প্রশাসনকে সব ধরনের জবাবদিহি থেকে রক্ষা করার জন্য প্রণয়ন করা হয়েছিল। আমরা মর্মাহত হয়ে সেটিকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে টেনে আনতে দেখলাম। সরকার যা প্রকাশ করে না, তা-ই ‘সরকারি গোপন তথ্য’ বলে বিবেচিত হতে পারে। একটি উদাহরণ দিই। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা ব্যাংক খাতের অনিয়ম সম্পর্কে কয়েক ডজন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছি।
বলা হতে পারে, এ ধরনের সব প্রতিবেদনই অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট লঙ্ঘন করেছে। প্রকাশ করা হয়নি, এমন সব সরকারি প্রতিবেদনই অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের আওতায় পড়ে, এমনকি পরিবেশ দূষণ বা শিশুপুষ্টি নিয়ে সরকারি প্রতিবেদন ইত্যাদিও। এ ধরনের কোনো তথ্য ছাড়া কি অর্থপূর্ণ সাংবাদিকতা সম্ভব? আর যেখানে তথ্য অধিকার আইনের বলে জনগণের ‘জানার অধিকার’ রয়েছে; বিশেষত যখন এ ধরনের সব প্রতিবেদন তৈরি করা হয় জনগণের অর্থ ব্যয় করে, সেখানে এসব প্রতিবেদন সাংবাদিকতার কাজে ব্যবহার করা কেন ‘অপরাধ’ বলে গণ্য হবে?
বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকারি দপ্তরের অপ্রকাশিত প্রতিবেদন ছাড়া ফারমার্স বা বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বা ব্যাপক অনিয়ম নিয়ে কি আমরা কোনো প্রতিবেদন তৈরি করতে পারতাম? আমাদের প্রতিবেদকের হরহামেশাই মোবাইল ফোনে এ ধরনের দলিলের ছবি তুলতে হয়। কাজেই তাদের সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া যেতে পারে, তাই তো?
এ আইনের প্রবক্তাদের কাছে আমাদের উদাহরণগুলো ‘হাস্যকর’ ঠেকতে পারে। কিন্তু তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা প্রয়োগের বাস্তব নজির সাংবাদিকদের কোনো স্বস্তির কারণ জোগায়নি।
ধারা ৪৩: ৪৩। পরোয়ানা ব্যতিরেকে তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতার।
(১) যদি কোনো পুলিশ অফিসারের এইরূপ বিশ্বাস করিবার কারণ থাকে যে কোনো স্থানে এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটিত হইয়াছে বা হইতেছে বা হইবার সম্ভাবনা রহিয়াছে বা সাক্ষ্য প্রমাণাদি হারানো, নষ্ট হওয়া, মুছিয়া ফেলা, পরিবর্তন বা অন্য কোনো উপায়ে দুষ্প্রাপ্য হইবার বা করিবার সম্ভাবনা রহিয়াছে, তাহা হইলে তিনি অনুরূপ বিশ্বাসের কারণ লিপিবদ্ধ করিয়া মহাপরিচালকের অনুমোদনক্রমে নিম্নবর্ণিত কার্য সম্পাদন করিতে পারিবেন; (ক) উক্ত স্থানে প্রবেশ করিয়া তল্লাশি এবং প্রবেশ বাধাপ্রাপ্ত হইলে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ; (খ) উক্ত স্থানে তল্লাশিকালে প্রাপ্ত অপরাধ সংঘটনে ব্যবহার্য কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, তথ্য-উপাত্ত বা অন্যান্য সরঞ্জামাদি এবং অপরাধ প্রমাণে সহায়ক কোনো দলিল জব্দকরণ; (গ) উক্ত স্থানে উপস্থাপিত যে কোনো ব্যক্তির দেহ তল্লাশি; (ঘ) উক্ত স্থানে উপস্থিত কোনো ব্যক্তি এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ করিয়াছেন বা করিতেছেন বলিয়া সন্দেহ হইলে উক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার।
সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সবচেয়ে বিপজ্জনক বিধান এটি। এতে পুলিশকে যে কোনো জায়গায় প্রবেশ, যে কোনো কম্পিউটার ব্যবস্থায় তল্লাশি চালানো, যে কোনো কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ও সার্ভার জব্দ করা, যে কোনো ব্যক্তির দেহ তল্লাশি এবং শুধু সন্দেহবশত যে কাউকে গ্রেফতার করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।
প্রথমত, পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতারের হুমকি স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনে বাধার সৃষ্টি করবে। পুলিশ যখন স্রেফ সন্দেহবশত ও পরোয়ানা ছাড়াই সাংবাদিকদের গ্রেফতার করার ক্ষমতা পাবে, তখন এই আইনের ছায়াতলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কবর রচিত হবে। আইনটির ২০টি শাস্তির বিধানের মধ্যে যখন ১৪ টিই জামিন অযোগ্য, তখন গ্রেফতারের ঝুঁকি প্রত্যেক সাংবাদিকের মাথার ওপর ডেমোক্লেসের খড়গের মতো সব সময় ঝুলতে থাকবে, মানসিক চাপ সৃষ্টি করে রাখবে। এতে প্রকৃত সাংবাদিকতার সব পন্থা বাধাগ্রস্ত হবে। আমাদের সংবাদমাধ্যম নিছকই জনসংযোগ কর্মকাণ্ড ও প্রচারণা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। এমনকি সাংবাদিকদের ওপর এ আইনের প্রয়োগ না হলেও (আইন থাকলে প্রয়োগ হবেই না বা কেন?) ভীতির পরিবেশে তারা পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা অনুভব করবেন। গ্রেফতার আতঙ্ক তাদের ‘মানসিক পরিবেশের’ এক প্রাত্যহিক অংশ হয়ে উঠবে। প্রতিবেদন তৈরির কাজে তারা নিয়মিত যেসব সঙ্গত ঝুঁকি নিয়ে থাকেন, এই ভীতির কারণে সেসব ঝুঁকি নিতে তারা আর সাহস পাবেন না। এই বিধানের ফলে সাংবাদিকদের মধ্যে যে মানসিক চাপ সৃষ্টি হবে, তা খাটো করে দেখা ঠিক নয়। খুব সহজেই ধরে নেয়া যায় যে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা এ আইনের অপব্যবহার করবেন। ধনী ও ক্ষমতাসীনরা গোপন রাখতে চান, এমন বিষয়ে যে কোনো সংবাদ প্রতিবেদনের জন্য সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে হুমকি দিতে, এমনকি গ্রেফতার করতে তারা আইন প্রয়োগকারীদের প্ররোচিত বা ‘হাত করতে’ পারেন।
এ আইনের আরও বিপজ্জনক দিক হলো, সব সংবাদপত্র ও টেলিভিশন স্টেশনই এখন ডিজিটাল ব্যবস্থায় কাজ করে বলে কম্পিউটার ও সার্ভারসহ কম্পিউটার নেটওয়ার্ক জব্দ করার ক্ষমতা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে দেয়ার মাধ্যমে কার্যত তাদের যে কোনো সংবাদপত্র, টিভি স্টেশন বা অনলাইন নিউজ পোর্টালের কাজ বন্ধ করে দেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কোনো সংবাদ প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি জব্দ করলে তার কার্যক্রম থেমে যেতে পারে। এভাবে কোনো সংবাদ প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে হাতে সংবাদপত্রের প্রকাশনা বা কোনো টিভি স্টেশনের কার্যক্রম রুদ্ধ করে দেয়ার শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।
ধারা ৫৩: ৫৩। অপরাধের আমলযোগ্যতা ও জামিনযোগ্যতা। এই আইনের (ক) ধারা ১৭, ১৯, ২১, ২২, ২৩, ২৪, ২৬, ২৭, ২৮, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৪-এ উল্লিখিত অপরাধসমূহ আমলযোগ্য ও অজামিনে যাগ্য হইবে; এবং (খ) ধারা-১৮-এর উপধারা (১)-এর দফা (খ) ২০, ২৫, ২৯ ও ৪৮-এর উপধারা (৩)-এ উল্লিখিত অপরাধসমূহ অ-আমলযোগ্য ও জামিনযোগ্য হইবে;
সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য: এই আইনের প্রায় ১৯টি ধারার ১৪টির ক্ষেত্রেই অপরাধ আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য। পুলিশকে নিছক সন্দেহের কারণে এবং পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতার করার ক্ষমতা দেয়ায় এবং এতগুলো অপরাধের অভিযোগকে আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য করায় আইনটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি এক বাস্তব হুমকি।

উপসংহার:
১. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নাগরিকদের বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, যা যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে আমাদের সংবিধানে নিশ্চিত করা হয়েছে, তা সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করে; ২. এ আইন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং যেসব মহান আদর্শ ও মুক্তির জন্য আমাদের শহীদরা জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেসব লঙ্ঘন করে; ৩. গণতন্ত্রের মূলনীতি, গণতান্ত্রিক শাসন এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও ১৯৭১ সালের পরবর্তী সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে যেসব গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য আমাদের জনগণ বারবার লড়াই করেছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সেসবের পরিপন্থী; ৪. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নৈতিক ও স্বাধীন সাংবাদিকতার সব মূল্যবোধের পরিপন্থী; ৫. এ আইন তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কেন আমাদের সংবিধান, মৌলিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক নীতির পরিপন্থী, তা আমরা ওপরে বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করে বিশদভাবে বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা করেছি। এসব কারণে সম্পাদক পরিষদ এই আইন প্রত্যাখ্যান করত বাধ্য হয়েছে।
এই আইন আমাদের সংবিধানের ৩৯(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং ৩৯(২) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ‘যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে’ (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার, এবং (খ) সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা খর্ব করে। পরিশেষে আমরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কিছু কথা উদ্ধৃত করতে চাই। ১৯৫৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদে সংবিধান প্রণয়ন সম্পর্কিত এক বিতর্কে তিনি স্পিকারের উদ্দেশে বলেছিলেন:
‘আপনারা বলে থাকেন যে বাকস্বাধীনতা মানেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা’। ‘আপনি কি জানেন যে পূর্ববঙ্গে সম্পাদকদের ডেকে বলা হয়, আপনারা এটা ছাপাতে পারবেন না, আপনারা ওটা ছাপাতে পারবেন না। স্যার, তারা সত্য কথা পর্যন্ত লিখে ছাপাতে পারেন না এবং আমি সেটা প্রমাণ করে দিতে পারি। নির্দেশটা যায় সচিবালয় থেকে। সরকারের তরফ থেকে একজন ইন্সপেক্টর গিয়ে নির্দেশনা দেন যে, আপনি একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে লিখতে পারবেন না।…’ ‘এটা পরিষ্কারভাবে লিপিবদ্ধ থাকতে হবে যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা থাকবে, তারা তাদের ইচ্ছামতো বক্তব্য লিপিবদ্ধ করতে পারবেন এবং জনমত গড়ে তুলতে পারবেন।’
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, জনগণের সাংবিধানিক অধিকার হরণের উল্লেখিত আয়োজনগুলো দ্রুত বন্ধ করা না হলে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাই দলমত নির্বিশেষে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষের সকল শক্তির দায়িত্ব বাকস্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার সাংবিধানিক দাবি আদায়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়া।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

SHARE

Leave a Reply