সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় টক অব দ্য কান্ট্রি -হারুন ইবনে শাহাদাত

গত ১ আগস্ট সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। এই রায় এই এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ সাত বিচারপতির স্বাক্ষরের পর ৭৯৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচারপতিদের অপসারণে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বিধান বহাল রাখা হয়েছে। রায়ে পর্যবেক্ষণে মাননীয় বিচারপতিদের মন্তব্য নিয়ে সারাদেশে তোলপাড় চলছে। বিশেষ করে সরকারি দল খুব নাখোশ হয়েছে। রায়ের পর একটি জাতীয় দৈনিকে সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ ক্ষুব্ধ, আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত। দলটি মনে করে, দেশের বিরোধী দলও তাদের প্রতি এতটা ‘নিষ্ঠুর’ মন্তব্য করেনি।’ অবশ্য দেশের অধিকাংশ সিনিয়র আইনজীবী এই রায়কে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেছেন। এই সিনিয়র আইনজীবীদের মধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এক সময়ে প্রভাবশালী নেতা এবং সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেনও আছেন। সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেয়া বিচার বিভাগের রায়ের বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে দেশে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপের চেষ্টা চলছে। এই প্রবণতা সত্যিই দুঃখজনক।’ সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিজের অবস্থানের কারণে আওয়ামী লীগের সমালোচনার জবাবে তিনি বলেছেন, ‘শুধু আমার একার যুক্তি ছিল না, আরও সাতজন সিনিয়র লইয়ার আমার সঙ্গে একমত হয়েছেন, সাতজন জাজ পুরো একমত হয়ে রায়টি দিয়েছেন। আমরা তো সবাই পাগল হয়ে যাইনি।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে কামাল হোসেন বলেন, ‘বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকা উচিত নয়। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীকে সংসদ অভিশংসন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ‘সংবিধানের ব্যালান্সে’ আঘাত আসে না। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বুঝতে হবে। বিচার বিভাগ হলো সংবিধানের অভিভাবক। বিচার বিভাগকে রেফারির ভূমিকা দেয়া হয়। অন্য অঙ্গগুলো ক্ষমতা লঙ্ঘন করলে একজনকে সিটি বাজাতে হবে। লাল কার্ড দেখাতে হবে।’
সিনিয়র আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেন, ‘আপিল বিভাগের এ রায় প্রত্যাশিত ছিল। কেননা, ১০ জন অ্যামিকাস কিউরি, অর্থাৎ দেশের ১০ জন বরেণ্য আইনজীবীর মধ্যে ৯ জনই মতামত দিয়েছিলেন যে হাইকোর্টের রায় সঠিক ছিল। সেই কারণে আমার প্রত্যাশা ছিল হাইকোর্টের রায় বহাল থাকবে। আর আপিল বিভাগের সাতজন মাননীয় বিচারপতি সর্বসম্মতিক্রমে হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছেন। ক্ষমতার পৃথক্করণের যে নীতি সংবিধান ধারণ করে, অর্থাৎ রাষ্ট্রের তিন অঙ্গ নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগের কেউ কারও ওপর সরাসরি কর্তৃত্ব করবে না। ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে সেই নীতি লঙ্ঘিত হচ্ছিল। অতএব বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও পৃথককরণের স্বার্থে এই সংশোধনী বাতিল করা জরুরি ছিল।’
ষোড়শ সংশোধনী বাতিল চেয়ে উচ্চ আদালতে রিটকারী এ আইনজীবী বলেন, ‘এটা চাইলেও বদলানো যাবে না। গত ৪৬ বছরের ইতিহাসে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের এমন কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি। এটা মেনে নেয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। সংবিধান মানলে রায় মানতে হবে।’
ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, এই রায় শুধু ঐতিহাসিক নয়, এই রায় দেশের ১৬ কোটি মানুষের মনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। এমন কোনো বিষয় নেই যার প্রতিফলন হয়নি, জনগণের মধ্যে যে ক্ষোভ-দুঃখ-অভিযোগ আছে সেগুলোর প্রতিফলন ঘটেনি। এই রায়কে জাতীয় দলিল বলে আমরা আখ্যায়িত করতে পারি। সুপ্রিম কোর্টের ৭ জন বিচারপতির সর্বসম্মতিক্রমে এই রায় দিয়েছেন, আমিসহ দেশের সকলে তাদেরকে সালাম জানাই। সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে সাবেক আইনমন্ত্রী বলেন, এই রায়কে সমুন্নত রাখতে হবে। যারা এই রায় অবমূল্যায়ন করবেন, সরকার যদি সেই পথে আরেকবার সংশোধন করতে চান তাহলে তারা ভুল করবেন। তাতে এই সরকারের পতন আরও দ্রুত গতিতে হবে বলে আমি মনে করি।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের চার বারের নির্বাচিত সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, ষোড়শ সংশোধনীর রায় বাস্তবসম্মত রায়। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে কোনো আপত্তিকর বলে কিছু থাকে না, থাকতে পারে না। আদালতের পর্যবেক্ষণে দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। এখন সংক্ষুব্ধপক্ষ রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করতে পারে। সাধারণত রিভিউতে রায় পরিবর্তনের নজির বিরল ঘটনা। আমি মনে করি রিভিউ করে কোনো লাভ হবে না।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও সুপ্রিম কোর্টের সাবেক রেজিস্ট্রার ইকতেদার আহমেদ বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে হাইকোর্টের দেয়া রায় বহাল রেখেছেন। রায়ে অনেকগুলো পর্যবেক্ষণ রয়েছে। এই পর্যবেক্ষণ অনুসরণযোগ্য। এই অবস্থায় কেউ সংক্ষুব্ধ হলে রায়ের রিভিউ চাইতে পারেন। এ জন্য রিভিউ আবেদন করতে হবে। রিভিউ না করে আবেদন করা যায় না।
ষোড়শ সংশোধনীর আপিলের রায়ের কিছু পর্যবেক্ষণ “বক্তব্য আপত্তিকর” বলে মন্তব্য করেছে আওয়ামী লীগ সরকারের সরকারের মন্ত্রিসভা। মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘আপত্তিকর’ বক্তব্য প্রত্যাহারে প্রধান বিচারপতি বরাবর এক্সপাঞ্জ আপিলের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের রায় বাস্তবসম্মত। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে আপত্তিকর বলে কিছু থাকতে পারে না। সংবিধান অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় চূড়ান্ত এবং শেষ কথা। আপিলের রায় মানতে সকলে বাধ্য। রায়ের ব্যাপারে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) করতে পারেন। রিভিউয়ের বাইরে প্রধান বিচারপতি বরাবরে এক্সপাঞ্জ পিটিশন করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে আপিল খারিজ হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ষোড়শ সংশোধানী বিল জাতীয় সংসদে উত্থাপনের পর পরই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ডা: শফিকুর রহমান প্রতিবাদ জানিয়ে গণমাধ্যমে পাঠিয়েছিলেন। তাঁর প্রেরিত সেই বিবৃতিতে তিনি তীব্র ভাষায় এর প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তার বিবৃতিতে এখানে তুলে ধরা হলো, “বর্তমান সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের স্থলে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদটি পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারপতিগণকে অভিশংসন বা অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে ফিরিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে আজ ৭ সেপ্টেম্বর (২০১৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বিল উত্থাপনের আমি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এ আইন পাসের মাধ্যমে সরকার আর একটি জঘন্য কালো আইন পাস করে দেশে একদলীয় বাকশালী শাসন কায়েমের ষড়যন্ত্র করছে। ২০ দলীয় জোটসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, দেশের আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও সুশীলসমাজ ইতোমধ্যেই সরকারের এ কালো আইন পাসের উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে এবং বিচারক বিভাগকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদ জানিয়েছে। কিন্তু সরকার সেদিকে কর্ণপাত না করে ৭ সেপ্টেম্বর (২০১৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর) সংসদে বিল উত্থাপন করেছে। বিচারপতিগণকে অভিশংসন বা অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে দেয়া হলে বিচার বিভাগ প্রধানমন্ত্রীর হাতের পুতুলে পরিণত হবে। জাতি এ ধরনের অন্যায় ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত কিছুতেই মেনে নেবে না। সরকার এ বিল পাস করার মাধ্যমে বিচার বিভাগকে ধ্বংস করতে চায়। বর্তমান সংসদ দেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না। দেশের জনগণ বর্তমান সংসদের সদস্যগণকে নির্বাচিত করেনি। যে সংসদে ১৫৪ জন সংসদ সদস্যকে বিনা ভোটে অন্যায়ভাবে সংসদে নিয়ে আসা হয়েছে, সেই সংসদের কোন এখতিয়ার নেই দেশের সংবিধান সংশোধন করার। বর্তমান সংসদ ও সংসদ সদস্যগণ অবৈধ। দেশের জনগণকে ন্যায়বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার হীন উদ্দেশ্যেই সরকার এ কালো আইন পাস করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিচার বিভাগকে কুক্ষিগত করার হীন উদ্দেশ্যে সরকার এ অন্যায় ও অশুভ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দেশের জনগণ সরকারের এ অন্যায় সিদ্ধান্ত কখনো মেনে নেবে না। আমরা এ জঘন্য কালো আইন পাস করা থেকে বিরত থাকার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানাচ্ছি। এই জঘন্য কালো আইন পাস করা থেকে সরকার বিরত না থাকলে দেশের জনগণ আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে এ আইন পাস করা থেকে বিরত রাখতে বাধ্য হবে। আমরা আশা করি সরকার শুভ বুদ্ধির পরিচয় দিবেন।”
সরকারি ও বিরোধী দলের সমর্থনে এ বিলটি পাস হয়েছিল: বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে দিতে ‘সংবিধান (ষোড়শ সংশোধন) বিল-২০১৪’ জাতীয় সংসদে পাস হয় ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বুধবার। সরকারি ও বিরোধী দলের সমর্থনে এ বিলটি পাস হয় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক স্থায়ী কমিটির সুপারিশকৃত আকারে বিলটি অবিলম্বে বিবেচনার জন্য গ্রহণ করার প্রস্তাব করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। পরে ব্যালটের মাধ্যমেও এ বিলটি পাস করানো হয়। জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব ও সংশোধনী প্রস্তাবগুলো কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়। উল্লেখ্য, এ বিলটি সংসদে ওঠার আগেই দেশের আইনজীবীসহ বিভিন্ন মহলের পক্ষ থেকে বিরোধিতা করা হয়। এ বিলটি পাস করানোর জন্য আলোচনা শুরু হলে বিকট শব্দে মাইক বন্ধ হয়ে যায়। পরে অধিবেশন কক্ষের জরুরি মাইক দিয়ে অধিবেশন চলে। হ্যাঁর পক্ষে ৩২৭ ভোট এবং নার পক্ষে শূন্য ভোট পড়ে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ২০১৪ জানুয়ারি সালের ৫ জানুয়ারির বিনা ভোটে নির্বাচিত সংসদে সর্বসম্মতি ক্রমে পাস হলেই বা কি মূল্য আছে সেই সংশোধনীর।
রায়ের আগে পরের ঘটনা প্রবাহ: গত ৩ জুলাই বিচাপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে এনে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। ওই দিন সকালে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। এর আগে গত ১ জুন সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি শেষে মামলাটি রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। গত ৮ মে ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি শুরু হয়। টানা ১১ দিন শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। আপিল শুনানিতে আদালতে মতামত উপস্থাপনকারী ১০ অ্যামিক্যাস কিউরির (আদালতের বন্ধু) মধ্যে শুধু ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর পক্ষে মত দেন।
অপর ৯ অ্যামিক্যাস কিউরি ড. কামাল হোসেন, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম আই ফারুকী, আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, প্রাক্তন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ এম হাসান আরিফ, ব্যারিস্টার এম. আমিরুল ইসলাম, বিচারপতি টিএইচ খান, ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, ফিদা এম কামাল, এ জে মোহাম্মদ আলী সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর বিপক্ষে তাদের মতামত তুলে ধরেন। গত ৮ ফেব্রুয়ারি ষোড়শ সংশোধনীর আপিল শুনানিতে অ্যামিক্যাস কিউরি নিয়োগ দেন আপিল বিভাগ। গত বছরের ১১ আগস্ট সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে দেয়া রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। পরে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ।
গত বছরের ৫ মে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি আশরাফুল কামালের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ বলে রায় ঘোষণা করেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আইনসভার কাছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা রয়েছে। দেশের সংবিধানেও শুরুতে এই বিধান ছিল। তবে সেটি ইতিহাসের দুর্ঘটনা মাত্র। রায়ে আরো বলা হয়, কমনওয়েলথভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর ৬৩ শতাংশের অ্যাডহক ট্রাইব্যুনাল বা ডিসিপ্লিনারি কাউন্সিলরের মাধ্যমে বিচারপতি অপসারণের বিধান রয়েছে। আদালত রায়ে আরো বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদের ফলে দলের বিরুদ্ধে সাংসদেরা ভোট দিতে পারেন না। তারা দলের হাইকমান্ডের কাছে জিম্মি। নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষমতা নেই। ৭০ অনুচ্ছেদ রাখার ফলে সাংসদদের সব সময় দলের অনুগত থাকতে হয়। বিচারপতি অপসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তারা দলের বাইরে যেতে পারেন না। যদিও বিভিন্ন উন্নত দেশে সাংসদদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষমতা আছে। রায়ে বলা হয়, মানুষের ধারণা হলো, বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণœ হবে। সে ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে যাবে। মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধানটি তুলে দিয়ে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী পাস হয়। ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ৯৬ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন এনে বিচারকের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। যেটি ১৯৭২ সালের সংবিধানেও ছিল।
সংবিধানে এই সংশোধনী হওয়ায় মৌল কাঠামোতে পরিবর্তন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণœ করবে; এমন যুক্তিতে ওই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একই বছরের ৫ নভেম্বর হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়। ওই রিটের ওপর প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর রুল জারি করেন। গত বছরের ১০ মার্চ মামলাটির চূড়ান্ত শুনানি শেষে ৫ মে রায় দেন আদালত।

আদালতের পর্যবেক্ষণ
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ভারসাম্যপূর্ণ নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং কার্যকরী তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে সরকার অহঙ্কারী এবং অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠেছে। ফলে মানবাধিকার পড়েছে হুমকিতে, বাড়ছে দুর্নীতির প্রাদুর্ভাব, সংসদ হয়েছে অকার্যকর, কোটি কোটি মানুষ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত হচ্ছে। প্রশাসনের অব্যবস্থাপনায় বঞ্চিতের হার তীব্র থেকে হচ্ছে তীব্রতর। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে।
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা রায়ের পর্যবেক্ষণে যা বলেছেন একটি জাতীয় দৈনিকের আলোকে তা তুলে ধরা হলো, ‘প্রধান বিচারপতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘আমি ও আমিত্ব’-এর সংস্কৃতির সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের সংবিধানের ভিত্তি হচ্ছে, “আমরা জনগণ” সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। জাতীয় সংসদ সংবিধানের পরিপন্থী কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারে না এবং কোনো আইন সংবিধানসম্মত কি না, তা বিচার করার অধিকার সংবিধান সুপ্রিম কোর্টকেই দিয়েছে।’ ষোড়শ সংশোধনীকে সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ যে রায় ঘোষণা করেছেন, তার পূর্ণাঙ্গ রায়ে প্রধান বিচারপতি এসব কথা লিখেছেন।
গত ১ আগস্ট এই রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ সূত্রে জানা যায় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা লিখেছেন, ‘১৯৭১ সালে আমরা যে অলঙ্ঘনীয় ঐক্য গড়েছিলাম, তা শত্রুরা নস্যাৎ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। আজ আমরা একটি মুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশে বাস করি। অথচ আজ ঔদ্ধত্য এবং অজ্ঞতাকে আমরা প্রশ্রয় দিয়ে চলছি। কোনো একজন ব্যক্তি দ্বারা কোনো একটি দেশ বা জাতি তৈরি হয়নি। আমরা যদি সত্যিই জাতির পিতার স্বপ্নে সোনার বাংলায় বাঁচতে চাই, তাহলে এই আমিত্বের আসক্তি এবং আত্মঘাতী উচ্চাভিলাষ থেকে আমাদের মুক্ত থাকতে হবে। এই আমিত্ব হলো কেবল এক ব্যক্তি বা একজন মানুষ সবকিছুই করতে পারেন এমন ভাবনা।’
আপিল বিভাগের সাতজন বিচারপতির মধ্যে পাঁচজন বিচারপতি প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত পোষণ করার পরও আলাদা করে নিজেরা পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন বলে প্রতীয়মান হয়। তবে বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা প্রধান বিচারপতির রায়ের সঙ্গে সহমত পোষণ করে তার বাইরে আর কিছু লেখেননি। তিনি লিখেছেন, ‘আমরা যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নগর-পরিকল্পনার দিকে তাকাই, তাহলে দেখি যেই ব্যক্তি তাদের নগরের পরিকল্পনা করেছেন, তাঁকেই তারা স্বীকৃতি দিয়েছে। দাসপ্রথা বিলুপ্তির জন্য আব্রাহাম লিংকনের স্ত্রী মেরি টড স্বীকৃতি পেয়েছেন। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আরও অনেকে স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে চারজন জেনারেলও রয়েছেন। কিন্তু আমাদের দেশে একটি রোগ আমাদের মধ্যে সংক্রমিত হয়েছে। আর সেই রোগের নাম “অদূরদর্শী রাজনৈতিকীকরণ”। এটা একটা ভাইরাস এবং দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সংস্কৃতিকে তা এমন বিস্তৃতভাবে সংক্রমিত করেছে যে আমাদের নীতিনির্ধারকেরা এমন একটি ভবিষ্যৎ দেখতে বা কল্পনা করতেও পারছেন না যে ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পুরো জাতি, কোনো একজন ব্যক্তি নন।’
প্রধান বিচারপতি লিখেছেন, ‘এই বাজে রোগের কারণে নীতিনির্ধারকেরা সবকিছু ব্যক্তিকরণ করে ফেলেছেন। তাঁরা তাঁদের ক্ষুদ্র এবং সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থে একটি ভুয়া ও “মেকি গণতন্ত্র” প্রতিষ্ঠা করেছেন। আর এটা তাঁরা লজ্জাজনকভাবে আমাদের সংবিধানের অন্যায্য সুবিধা নিয়ে করেছেন। অথচ ১৯৭১ সালে আমাদের শহীদেরা রক্ত দিয়ে এ সংবিধান লিখেছিলেন। আমাদের অবশ্যই এই নোংরা “আমাদের লোক” মতবাদ পরিহার করতে হবে। পরিত্যাগ করতে হবে এই আত্মঘাতী “আমি একাই সব” দৃষ্টিভঙ্গি। দলীয় আনুগত্য বা অর্থবিত্ত নয়, জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠান তৈরিতে শুধু মেধার বিবেচনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।’
প্রধান বিচারপতি এক-এগারো সম্পর্কে লিখেছেন, ‘দুই বছরের জরুরি অবস্থার নামে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। আর সেটা ঘটেছিল সেই সময়ের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের দূরদর্শিতার অভাব এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে তাদের অনীহার কারণে।’ ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিষয়ে প্রধান বিচারপতি লিখেছেন, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের রায়ে আপিল বিভাগ মত দিয়েছিলেন যে দু’টি সংসদীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে। তবে শর্ত হলো, বিলুপ্ত হওয়া ৫৮(ক) অনুচ্ছেদের ৩ ও ৪ দফা অনুযায়ী সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কিংবা আপিল বিভাগের সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টা পদে নিয়োগ করা যাবে না। এই আদালত উল্লিখিত নির্দেশনা এ কথা মনে রেখে দিয়েছিলেন যে প্রধান বিচারপতির নিয়োগপ্রক্রিয়ায় তাহলে রাজনৈতিকী-করণের সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।’ নির্বাচন যাতে সর্বদাই অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে পারে, সে জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে আরও বেশি ক্ষমতা এবং তার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করতে হবে উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি লিখেছেন, ‘এই আদালত লক্ষ করেছেন যে প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দল যারাই নির্বাচনে হেরে যায়, তারা নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং বিরোধী দল সংসদে সহযোগিতা করে না। শেষ পর্যন্ত দশম সংসদ নির্বাচনে একটি বড় রাজনৈতিক দল অংশ নেয়নি। এই আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে সব ক্ষমতা দিয়ে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা। সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই নির্বাচন কমিশনের শূন্য পদগুলো স্বয়ংক্রিয়ভবে পূরণ হবে। কিন্তু পরবর্তী সরকারগুলোর কেউ এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এমনকি বিরোধী রাজনৈতিক দলও সংসদে কিংবা কোনো ফোরামে এই প্রশ্ন তোলেনি এবং তার ফল দাঁড়িয়েছে, নির্বাচন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ঘটেনি।’
রায়ে প্রধান বিচারপতি লিখেছেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন যদি নিরপেক্ষভাবে এবং কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বাধীনভাবে না হতে পারে, তাহলে গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অনুপস্থিতিতে একটি গ্রহণযোগ্য সংসদও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। সে কারণে আমাদের নির্বাচনপ্রক্রিয়া এবং সংসদ শিশু অবস্থায় রয়ে গেছে। জনগণ এ দু’টি প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা অর্পণ করতে পারছে না। এ দু’টি প্রতিষ্ঠান যদি জনগণের আস্থা এবং শ্রদ্ধা অর্জনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ থেকে বিরত থাকে, তাহলে কোনো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে পারে না। একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অভাবে বিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের দিয়ে সংসদ গঠিত হতে পারে না, বরং তা সংসদের নিজের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণকে ব্যাহত করতে পারে।’
রায়ে বলা হয়েছে, ‘সংসদ যদি যথেষ্ট পরিপক্বতা অর্জন না করে, তাহলে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণ করার ক্ষমতা সংসদের কাছে ন্যস্ত করা হবে একটি আত্মঘাতী উদ্যোগ। সংসদের কাছে বিচার বিভাগের জবাবদিহি করা উচিত নয়; বরং রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবে জাতীয় নির্বাচনে তাদের প্রার্থী বাছাইয়ে সতর্ক হওয়া। যেসব দেশে বিচারপতিদের সংসদীয় অভিশংসনের ব্যবস্থা রয়েছে, সেসব দেশের গণতন্ত্র আমাদের তুলনায় বয়ঃপ্রাপ্ত হলেও সেখানে ওই ব্যবস্থা কার্যকরভাবে প্রয়োগ সম্ভব হয়নি।’
রায়ে উচ্চ আদালতের বিচারক, নির্বাচন কমিশনার, মহাহিসাব নিরীক্ষক, পিএসসির সদস্যসহ সব সাংবিধানিক পদধারীকে অপসারণ-সংক্রান্ত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনরুজ্জীবনের জন্য এখন সংসদের আর কোনো পদক্ষেপ প্রয়োজন হবে না। অষ্টম সংশোধনীর বৈধতার মামলার রায়ের আলোকে এটি আপনাআপনি কার্যকর হয়ে গেছে। সুপ্রিম কোর্ট একই সঙ্গে বিচারকদের অসদাচরণের কোনো প্রাথমিক অভিযোগ এলে তা প্রথমে প্রধান বিচারপতি এবং তাঁর পরের দুই জ্যেষ্ঠ বিচারককে নিয়ে তদন্ত করে সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য সম্মতি চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রেরণের বিধান করে নতুন আচরণবিধি করেছেন।’
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা অ্যাটর্নি জেনারেলের যুক্তি খন্ডন করে বলেন, ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ইতঃপূর্বে আপিল বিভাগ স্থায়ীভাবে মার্জনা করেনি, এ যুক্তি সঠিক নয়।’ তিনি আরও বলেন, এটিই একমাত্র সামরিক আইন দ্বারা তৈরি বিধান নয়, যা এই আদালত অনুমোদন করেছেন। দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন, পঞ্চম সংশোধনীতে আনা জাতীয়তার পরিচয় বাংলাদেশি করা, সংবিধানের শুরুতে বিসমিল্লাহ যুক্ত করার কথা উল্লেখ করেছেন।
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘১৯৮৮ সালের রাবার স্ট্যাম্প সংসদে আনা, ২(ক) অনুচ্ছেদে বর্ণিত রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ১৯৭২ সালের সংবিধানে ছিল না। ’৭২-এর সংবিধানের অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের প্রত্যক্ষ সংঘাত রয়েছে, তারপরও তাকে সংবিধানে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। এভাবে ধর্মীয় একটি অভিমন্ত্রে ধর্মীয় ভাবাবেগকে প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে, যা আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের আকাক্সক্ষা ও চেতনার সরাসরি বিরুদ্ধে। ১৯৭৯ সালে একটি সামরিক সরকার সংবিধানে এটি প্রতিস্থাপন করলেও পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংসদ তাকে বৈধতা দিয়েছে। সে কারণে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত হয়েছে। আর এভাবে ’৭২-এ সংবিধানে বর্ণিত স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং মূল সংবিধানের চেতনা সমাহিত করা হয়েছে। অথচ অ্যাটর্নি জেনারেল যুক্তি দিয়েছেন, সামরিক আইনের কণামাত্রও সংবিধানে থাকতে পারবে না।’
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, যার সুরক্ষায় শেখ মুজিবুর রহমান সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন। তাই অ্যাটর্নি জেনারেলের আবেগপূর্ণ যুক্তি গ্রহণ করতে আমরা অক্ষম। এটাও স্বীকৃত যে উভয় পক্ষ স্বীকার করেছে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মৌলিক কাঠামো, আর মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করা যায় না। আর এই আদালত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার স্বার্থে সুরক্ষা দিয়েছেন।’
প্রধান বিচারপতি উল্লেখ করেন, ‘ষোড়শ সংশোধনী মামলায় হাইকোর্ট বিভাগের রায় প্রদানের পরে সুপ্রিম কোর্ট লক্ষ করেছেন যে সংসদ সদস্যরা রায়ের সমালোচনা করে সংসদে বক্তব্য দিয়েছেন। রায় এবং বিচারকদের শুদ্ধতা নিয়ে অসংসদীয় ভাষায় প্রশ্ন তুলেছেন। এটা প্রমাণ করে যে আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্র অপরিপক্ব।’
রায়ে বলা হয়েছে, অ্যাটর্নি জেনারেল শুনানিকালে যুক্তি দিয়েছেন যে যদি কতিপয় বিচারক হতে আগ্রহী ব্যক্তি নিজেদের ‘খুব উঁচু, খুব বড়’ এবং ‘জনপ্রতিনিধিদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ’ বলে গণ্য করেন, তাঁদের বিচার বিভাগে স্বাগত জানাই না। তাঁরা এমনকি চলে যেতে পারেন। আজমালুল হোসেনও তাঁর সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন। এম আমীর-উল ইসলাম ইতিহাসবিদ লর্ড অ্যাক্টনের বরাতে বলেছেন, সকল ক্ষমতা দুর্নীতিগ্রস্ত। কিন্তু নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিরঙ্কুশভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত। তাই প্রশ্ন জাগে, ক্ষমতার অনুশীলন কার নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত? ইংল্যান্ডের বিচারপতি লর্ড ড্যানিং বলেছেন, ‘কাউকে অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে। আর আসুন বিচারকদেরই বিশ্বাস করি।’ এরপর প্রধান বিচারপতি লিখেছেন, ‘বিচারকদের প্রতি অ্যাটর্নি জেনারেল অত্যন্ত নির্দয় মন্তব্য করেছেন। তিনি এবং সরকার যদি বিচারকদের ওপর ভরসা না রাখতে পারেন, তাহলে আমি বলব, তিনি ভ্রান্ত এবং তাঁর উচিত হবে তাঁর মক্কেলকে (সরকার) এই পরামর্শ দেয়া যে এটাই যদি সরকারের ধারণা হয় যে বিচারকেরা স্বাধীন এবং পক্ষপাতহীন নন, তাহলে দেশে আস্থার আর কোনো জায়গাই থাকবে না।’ তিনি লিখেছেন, আজমালুল হোসেনও উচ্চ আদালতের বিচারকদের সম্পর্কে নির্দয় এবং অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন।
৭০ অনুচ্ছেদ প্রসঙ্গে : ৭০ অনুচ্ছেদ সম্পর্কে প্রধান বিচারপতি মনে করেন, ‘এই অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্যদের বেদনাহত এবং অসঙ্গতভাবে তাঁদের অধিকারকে শৃঙ্খলিত করেছে। তাই সংসদের কোনো ইস্যুতেই তাঁরা দলীয় অবস্থানের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নিতে পারেন না। সংবিধানের ৯৫(২)গ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো আইন না করা সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে নির্বাহী বিভাগকে একটি বিশেষ সুবিধা দিয়েছে। আর ১১৫ ও ১১৬ অনুচ্ছেদ ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় নির্বাহী বিভাগের প্রভাব পড়বে।’ তিনি লিখেছেন, ‘কোনো সন্দেহ নেই, ৭০ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য হলো সরকারের স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। দলের সদস্যদের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখা।’
প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন রেখেছেন, ‘সংসদ সদস্যদের যদি সন্দেহের চোখেই দেখা হয়, তাহলে তাঁদের কী করে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের মতো দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেয়ার কাজে ন্যস্ত করা যায়। তাই এই অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্যের চেতনা হলো সংসদের নির্বাচিত সদস্যরা তাঁদের মনোনীত করা দলের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখবেন। আসলে তাঁরা তাঁদের দলের উচ্চপর্যায়ের হাতে জিম্মি। তাই ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগ যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েছেন, তার মধ্যে আমরা কোনো বৈকল্য দেখি না। সংসদের হাতে বিচারক অপসারণের ক্ষমতা দেয়া হলে বিচারকেরা দলের হাইকমান্ডের অনুকম্পানির্ভর হয়ে পড়বেন।’

হাইকোর্টকে ভর্ৎসনা
প্রধান বিচারপতি হাইকোর্টের রায়ের একটি অংশ তুলে ধরেন, যেখানে বলা হয়েছিল, ‘আমাদের অভিজ্ঞতা এটা দেখাচ্ছে যে সংসদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের ফৌজদারি অপরাধের রেকর্ড রয়েছে। তাঁরা দেওয়ানি মামলাসমূহের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিন্তু ষোড়শ সংশোধনীর কারণে সাংসদেরা বিচারকদের কার্যত বসে (কর্তৃত্ব অর্থে) পরিণত হয়েছেন, যা উচ্চ আদালতের বিচারকদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনে হুমকি সৃষ্টি করেছে। সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী সংসদের ৭০ শতাংশ সদস্য ব্যবসায়ী। মাহবুবে আলম এবং মুরাদ রেজা (অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল) এই তথ্যের বিষয়ে আপত্তি করেননি। আমরা আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখতে পাই, আইন প্রণয়নসংক্রান্ত সংসদীয় বিতর্কে তাঁরা কম আগ্রহী। এর পরিণাম হলো আজকের দিনে সংসদে পাস করা বেশির ভাগ আইন ‘ত্রুটিযুক্ত’। অসম্পূর্ণ এবং ‘নিচু মানের’ আইন প্রণয়নে তাঁদের দায়িত্ব উত্তমরূপে পালনের চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণের প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হতে তাঁরা বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েছেন। বিচারকদের অসদাচরণ বা অসামর্থ্যরে বিচার করা আইনপ্রণেতাদের কাজ নয়।’
প্রধান বিচারপতি এরপর মন্তব্য করেছেন, ‘সংসদ সদস্যদের বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগের উল্লিখিত পর্যবেক্ষণ সম্পূর্ণরূপে অবাঞ্ছিত এবং আমরা কোনোভাবেই এ দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করি না। সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো আদালত বা বিচারকদের এ রকম অবমাননাকর মন্তব্য করা উচিত নয়। আদালত এবং সংসদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতি থাকা দরকার। একইভাবে সংসদেরও উচিত নয় সুপ্রিম কোর্টের কোনো পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য বা কটাক্ষ করা।’
বাকশাল প্রতিষ্ঠা ছিল সংবিধানের ভিত্তিমূলে আঘাত: সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ একযোগে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন যে ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনী ছিল সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদে গৃহীত চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে একদলীয় (বাকশাল) শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। এতে আরো বলা হয়েছে, জিয়াউর রহমানের সামরিক ফরমান নয়, বরং চতুর্থ সংশোধনীর দ্বারাই সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে সংসদের ক্ষমতা খর্ব করে বিচারক অপসারণের কর্তৃত্ব রাষ্ট্রপতির কাছে ন্যস্ত করা হয়েছিল। আর সেই ব্যবস্থা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য হুমকি বিবেচনা করে এবং তার তুলনায় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে ‘অধিকতর স্বচ্ছ’ পদ্ধতি বিবেচনায় আপিল বিভাগ পঞ্চম সংশোধনীর মামলার রিভিউতে তা মার্জনা করেছিলেন।
সাবেক আইন ও বিচারমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সংসদ তার স্বীয় বিচক্ষণতায় একটি সংশোধনী এনেছে। কিন্তু অন্যান্য মৌলিক বিষয়ে পরিবর্তনের যে এখতিয়ার সংসদের নেই, তা তারা করেনি। কোনো আইন যদি সংবিধানের পরিপন্থী হয়, তাহলে তা তারা বাতিল করতে পারে। কিন্তু এখানে দেখার বিষয় হলো, এটা একটা সাধারণ বিষয় ছিল না। মূল সংবিধানে থাকা একটি বিষয় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। সুতরাং সেই বিধান সংবিধান পরিপন্থী বিবেচিত হবে কোন মানদন্ডে? কিন্তু আমাদের এখন উদ্বেগ হলো প্রধান বিচারপতির রাজনৈতিক মন্তব্য, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক হয়েছে।’ তবে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে তার মধ্যে দিয়ে একটি শুভ সূচনা হলেই ভালো। যেমন- ঝড়ের পরে বিধ্বস্ত প্রকৃতি সুবিন্যস্ত করার মাধ্যমে আবার সৌন্দর্য ফিরে আসে। ঠিক তেমনিভাবে ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের পর যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে তার সুষ্ঠু সমাধান হবে হারিয়ে যাওয়া গণতন্ত্র এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা পুন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

SHARE

Leave a Reply