সকালের সূর্যোদয় অনিবার্য । ইয়াসিন মাহমুদ

আজ ওমরপন্থী পথীর দিকে দিকে প্রয়োজন
পিঠে বোঝা নিয়ে পাড়ি দেবে যারা প্রান্তর প্রাণপণ।
(ফররুখ আহমদ)

আজ ওমরপন্থী পথীর দিকে দিকে প্রয়োজন পিঠে বোঝা নিয়ে পাড়ি দেবে যারা প্রান্তর প্রাণপণ।আকাশে মেঘ জমে বৃষ্টি হয়। কখনো কখনো খাঁ খাঁ রোদ্দুর হাঁফিয়ে তোলে আমাদেরকে। কনকনে শীতে জড়সড় হয়ে যাই সময়ের ফ্রেমে। প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করতে হয় এই জীবনে। উপেক্ষা করার উপায় নেই। ধৈর্যহারা হয়েও খুব বেশি লাভ হয় না। প্রতিটি সময়ে জীবনকে জানবার ইচ্ছে করলেই সামনে চলার নতুন এক দিগন্ত উন্মোচিত হয়ে যায়। আমরা জীবনের নানা বাঁকে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠি; দিশেহারা হয়ে যাই। নতুন পথের সন্ধান খুঁজি অনবরত। একটু ফুরসত চাই জীবনের প্রয়োজনে। তবে একটি অনিবার্য বিপ্লবের জন্য তো বহু পথ পাড়ি দিতে হয়। অপেক্ষা করতে হয় কাল মহাকাল। একদিন কাঙ্ক্ষিত দিন আসবেই। সুবাসিত জোছনার পথ উপভোগের মহাসড়কে উন্মুক্ত হয়ে যাবে সকল প্রাণে প্রাণে। সময়ের মুখোমুখি ও পরিস্থিতির ভয়ানক এক আয়োজনে আমরা হতাশ হয়ে পড়ি মাঝে মাঝে। হা হুতাশ করি, কী হবে আমাদের! ভবিষ্যৎ অন্ধকার। আলোহীন নগরীর নাগরিক জীবনে প্রতিদিন আলোঘরের হাহাকার জাগে; অনিবার্য হয়ে ওঠে একটি নতুন সকালের সূর্যোদয়।

২.
নদীতে জোয়ার ভাটা হয়। জোয়ারে কানায় কানায় উছলে পড়ে ঢেউ। ভাটায় শুকনো মরুভূমি। সময়ের অদ্ভুত এক খেলা। এ যেন ভাঙার-গড়ার একেকটি উৎসব। আমাদের জীবনেও এমন আলো-ছায়ার খেলা হয়ে থাকে। প্রতিটি ঘটনার অন্তরালে রয়েছে একজন নিয়ন্ত্রক। তিনিই আমাদের অধিকর্তা। সময়ের মাধ্যমে তিনি কারো কারো প্রতিশোধ নেন। সাময়িক দাপট দেখিয়ে যারা আধিপত্য বিস্তারের সমাবেশে যোগ দেন; আল্লাহ তাদেরকে কিছুই বলবেন না। বরং সাময়িক দাম্ভিকতা প্রকাশের সুযোগ দেবেন। তবে তাঁর পাকড়াও অনেক কঠিন, যে দিন যাকে ধরবেন তাকে আর ক্ষমা করবে না। ইতিহাসের পাঠ উন্মোচন পর্যালোচনায় ওঠে আসে স্বৈরশাসক কিংবা ক্ষমতালোভীদের জীবনশেষের পরিণতির ঘটনাপ্রবাহ। সময় নির্ধারণ করে দেয় ইতিহাস। প্রিয়-অপ্রিয় সব কিছুই ছেঁকে তুলে নিয়ে আসে পৃথিবীর পাঠশালায় নতুন কারিকুলামে।

৩.
দুনিয়ার মানচিত্রে আজ অসহায় মুসলিম উম্মাহ। চারিদিকে কান্নার শব্দ। ধ্বনিত কান্নার কলরোল বেজে ওঠে মনে প্রাণে। এই মজলুমানের আর্তনাদ দেখে আপনি কি পালিয়ে যাবেন? হতাশার পর্দাচাদর তুলে নিবেন জীবনের পাড়ে। আঁধার আর রাত্রির কাছে পরাজিত হবে আলোর ফুলকি; দুঃখ আর হতাশায় গ্রাস করে ফেলবে আমাদের স্বপ্ন ও সোনালি রাঙা প্রভাত? লাভ কী তাতে? সূর্যকে ছিনিয়ে এনে তাড়িয়ে দেই অমানিশা; দুঃখগুলো দূর করে দেই স্বপ্নপূরণে।

৪.
যারা আমার মাতৃভূমিকে ব্যর্থ ও অকার্যকর করার জন্য বিছিয়েছে মাকড়সার জাল
পিটিয়ে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করেছে,
যারা ক্ষতবিক্ষত লাশের ওপর হিংস্র উল্লাসে বর্বর নৃত্য করেছে,
যারা ড্রাকুলার মতো পান করেছে মানুষের রক্ত,
বিশ্বময় পাঠিয়েছে ভুল এবং বীভৎস বার্তা
তাদের কথায় আমি বদলাতে পারি না।
(কসম/আবদুল হাই শিকদার)


বুলেট, বেয়নেট, গুম, খুন, হত্যা, কারাগার, নির্যাতনের ভয়ে কখনো শপথে বলীয়ান সঙ্ঘবদ্ধ একটি জনসমষ্টিকে দমিয়ে রাখতে পারে না কেউ। যেখানে বান্দার প্রচেষ্টা শেষ সেখানেই আল্লাহর রহমত শুরু। একজন মুমিন হয় না হতাশ ভেঙে পড়ে না। বরং একজন মুমিন সীসাঢালা প্রাচীরের মতো দ্বীন প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে।


দেশপ্রেম। বক্তৃতায় মঞ্চ কাঁপানো কিংবা উদ্বেলিত কণ্ঠে শ্লোগান নয়। হঠাৎ উড়ে এসে বিলজুড়ে নিয়ে দাপটের প্রকাশ নয়। তিলে তিলে অসহ জ্বালা সয়ে সয়ে দেশবিরোধী প্রতিটি পদক্ষেপ ও কর্মসূচিতে অংশগ্রহণই প্রমাণ করে দেশপ্রেম। দেশপ্রেমিক হিসেবে শুধু ঘোষণা ও প্রেস রিলিজই যথেষ্ট নয়। কথা নয়, কাজেই যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে হয় সবখানে সবসময়। রঙিন কালারের ইলাস্ট্রেশন ডিজাইনে এক অন্য সাজে অভিনব আয়োজনে যতই নিজেকে উপস্থাপন করেন না কেন নিখাদ প্রমাণের আগ পর্যন্ত কেউই আপনার পক্ষে আহলান সাহলান বলবে না; শ্লোগান তুলবে না। সময় ও অসময়ের বন্ধুকে নির্ধারণ করে এই সমাজেরই সচেতন মানুষ; নাগরিক সমাজ। বরাবরই ত্যাগীদের কদর কমে না। স্বার্থান্বেষী ও ধূর্তবাজরা পরাজিত হয়; বয়কট করে দেশপ্রেমিক মানুষেরা। দেশপ্রেমিকরাই জয়ী হয় অবশেষে। কবি কাজী নজরুল ইসলামও সেই ইঙ্গিত দিয়েছেন। কবি বলেছেন-
অন্তরে আর বাহিরে সমান নিত্য প্রবল হও!
যত দুর্দিন ঘিরে আসে, তত অটল হইয়া রও!
যত পরাজয়-ভয় আসে, তত দুর্জয় হয়ে ওঠো।
মৃত্যুর ভয়ে শিথিল যেন হয় তলোয়ার-মুঠো ।
সত্যের তরে দৈত্যের সাথে করে যাও সংগ্রাম,
রণক্ষেত্রে মরিলে অমর হইয়া রহিবে নাম।
এই আল্লার হুকুম- ধরায় নিত্য প্রবল রবে,
প্রবলেই যুগে যুগে সম্ভব করেছে অসম্ভবে।

৫.
আমাদের এই মিছিল নিকট অতীত থেকে অনন্ত কালের দিকে।
আমরা বদর থেকে ওহুদ হয়ে এখানে,
শত সঙ্ঘাতের মধ্যে এ শিবিরে এসে দাঁড়িয়েছি।
কে জিজ্ঞেস করে আমরা কোথায় যাবো?
আমরা তো বলেছি আমাদের যাত্রা অনন্তকালের।
(আমাদের মিছিল / আল মাহমুদ)

বুলেট, বেয়নেট, গুম, খুন, হত্যা, কারাগার, নির্যাতনের ভয়ে কখনো শপথে বলীয়ান সঙ্ঘবদ্ধ একটি জনসমষ্টিকে দমিয়ে রাখতে পারে না কেউ। যেখানে বান্দার প্রচেষ্টা শেষ সেখানেই আল্লাহর রহমত শুরু। একজন মুমিন হয় না হতাশ ভেঙে পড়ে না। বরং একজন মুমিন সীসাঢালা প্রাচীরের মতো দ্বীন প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। দুনিয়ার সাময়িক চাকচিক্য যাদের লক্ষ্য নয়, তারা তো জীবনের মুক্তি কামনায় সম্পৃক্ত রাখে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার আহবান। ভয়, ক্ষুধা, দরিদ্রতা, জানমালের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা থাকা সত্ত্বে¡ও যারা দ্বীনের প্রয়োজনে সবকিছু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সোপর্দ করে আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জায়গায় কামিয়াব করবেন। তাহলে কি আমরা আমাদের পথচলাকে স্তব্ধ করে দিবো নাকি শত সঙ্ঘাতের মুখে এগিয়ে যাবো? আমাদের যাত্রা তো অনন্তকালের; আমরা সেই পথেই গড়ে তুলি নতুন ইমারত।

আজ ওমরপন্থী পথীর দিকে দিকে প্রয়োজন পিঠে বোঝা নিয়ে পাড়ি দেবে যারা প্রান্তর প্রাণপণ। ৬.
বেরিয়েছে যে কাফেলা ফিরবে না সে কভু আর। বিজয় অথবা শাহাদাত তাদেরই লক্ষ্য। বিজয় একটি দ্বীনের জন্য অনিবার্য। আর তা না হলে, শাহাদাত সে তো পরম পাওয়া। সময় খারাপ হলে চেনা যায় পথের সাথী; প্রিয়তম। তবে যারা নিছক আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে তারা কখনো পিছু হটতে জানে না। বীরদর্পে এগিয়ে যায় সামনের দিকে। আর ভিতু, কাপুরুষ মোনাফেকরা পালিয়ে যায় মিছিল থেকে। গুলিবিদ্ধ ক্ষত-বিক্ষত দেহ নিয়ে কেবল তারাই দাঁড়িয়ে থাকে বুক টানটান করে; যারা আল্লাহকে ভালোবেসে সঁপেছে জীবন। প্লিজ অপেক্ষা করুন। সূচনা হবে নতুন বিপ্লবের; দলে দলে লোক সমবেত হবে সেই সমাবেশে।

লেখক : কবি ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply