সঙ্কটে সাধারণ মানুষ প্রয়োজন সংলাপ

মেহেদী হাসান সিকদার

csদেশে স্থিতিশীল পরিস্থিত ফিরিয়ে আনতে সরকারি দল, বিরোধী দল ও বিএনপি-জামায়াত জোটসহ সকল রাজনৈতিক দলকে আলোচনায় বসা এখন সময়ের দাবি। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারি দলকে এগিয়ে আসতে হবে। গ্রহণযোগ্য একটি সমাধানের আশ্বাস পেলেই হয়তো বিএনপি জোট হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহার করতে পারে। পাশাপাশি বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টির ভূমিকাও কম নয়। তারা সরকার ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংলাপের উদ্যোগ নিতে পারে। শুধু গৃহপালিত বিরোধী দল হয়ে থাকলে ভবিষ্যতে তারা রাজনীতি থেকে হারিয়ে যেতে পারে বলে মনে করেন অনেকেই। এ ছাড়া দেশের এই অবস্থার মধ্যে যারা দিন আনে দিন খায় তাদের অবস্থা করুণ। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের। তাই দেশের চলমান এই সঙ্কটের সমাধান চায় দেশের সাধারণ মানুষ। সরজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, রিকশাচালক, ড্রাইভার, ফল বিক্রেতাসহ সাধারণ মানুষের সাথে আলাপ করলেই এই অবস্থার প্রকৃত রূপ দেখা যাবে। তাই এই সঙ্কট সমাধানে সব রাজনৈতিক দলকে ছাড় দেয়ার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

সাধারণ মানুষের মতামত ও ভাবনা
নাজমুল কবীর নামে রাজধানীর এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, এভাবে দেশ চলতে পারে না। দেশের জনগণ নিয়ে রাজনীতি করে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু এই সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাখেন তারা। তাই সন্ত্রাস, সহিংসতা, দমন, পীড়ন পরিহার করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে সমঝোতার আহবান জানান তিনি। এই হরতাল-অবরোধের কারণে মানুষ চরম সঙ্কটে আছে। একদিকে অর্থনীতির সঙ্কট অপরদিকে পরিবহন সঙ্কটের কারণে মানুষ আজ দিশেহারা। তাই সঙ্কটের সমাধান চাই আমরা। একজনের একগুঁয়েমির কারণে দেশ আজ রসাতলে যেতে বসেছে। আব্দুল কাদের নামে এক স্টিল ব্যবসায়ী বলেন, বর্তমানে আমাদের অবস্থা বেঁচে থেকেও মরে যাওয়ার মতো। কারণ হরতাল ও অবরোধের কারণে আমাদের বেচা বিক্রি কম। আগে যেখানে প্রতিদিন বিক্রি হতো ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা, এখন সেখানে ১ থেকে দুই হাজার টাকাও বিক্রি হয় না। তাই আমাদের সাধারণ মানুষের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। যদি এভাবে চলতে থাকে তাহলে আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর বেঁচে থাকা-ই কষ্টকর হবে। তবে এই সঙ্কট সমাধানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। কারণ একটি দেশের প্রধান হলেন তিনি। দেশ ও মানুষের রক্ষার দায়িত্ব তার। এ ক্ষেত্রে বিএনপিকেও হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহার করে সরকারের সাথে সমঝোতায় আসার আহবান জানান তিনি।
কামাল হোসেন নামে এক রিকশাচালক বলেন, হরতাল-অবরোধের কারণে দৈনিক আয় অনেক কমে গেছে। আগে যেখানে সকাল ৮টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত রিকশা চালালে ১ থেকে ২ হাজার টাকা আয় হতো, এখন সেখানে ৫০০ টাকাও আয় করতে কষ্ট হয়। এর মধ্যে রিকশার জমা দিতে হয় ৩০০ টাকা। তাই ২০০ টাকা নিয়ে কোনমতে দিন চলছে। তবে এই সঙ্কটের জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলকে দায়ী করেন তিনি। তাই এই দুই দলের নেত্রী বসে একটি সমঝোতার আহবান জানান তিনি।
স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে আইনাল হোসেনের সংসার। রাজধানীর জুরাইন এলাকায় ১৫০০ টাকায় বাসা ভাড়া দিয়ে পরিবার নিয়ে থাকেন তিনি। ২ সন্তানের মধ্যে ১ মেয়ে ও ১ ছেলে। ভ্রাম্যমাণ বাদাম বিক্রি করে চলে তার সংসার। গত ৫ জানুয়ারির পর তার সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়ছে। সারাদিন বাদাম বিক্রি করে আগে যেখানে ৬০০-৭০০ টাকা আয় হতো, এখন সেখানে ২০০ থেকে ২৫০ টাকাও আয় হয় না। কোনমতে বেঁচে আছেন। গত মাসের বাসা ভাড়াও এখনো দিতে পারেননি। হরতাল-অবরোধের কারণে রাস্তা-ঘাট ও দোকানে লোকজন কম থাকে, তাই তার বাদাম তেমন বিক্রি হয় না। সকাল ৮টায় বাসা থেকে বের হয়ে সারাদিনে আয় হয় মাত্র ২৩০ টাকা। তা দিয়ে পরিবারের জন্য সামান্য চাল, ডাল ও ১ কেজি আলু কিনে বাড়িতে যান। রাজনীতি সম্পর্কে তার ধারণা তেমন নেই। তবুও এই পরিস্থিতি সমাধানের জন্য হাসিনা-খালেদা দুই নেত্রীর আলোচনার আহবান জানান তিনি।
একই অবস্থা রাজধানীর মতিঝিল এলাকার ফুটপাথের ব্যবসায়ী মোসলেম উদ্দীনের। ফুটপাথে বিভিন্ন রকমের গেঞ্জি ও প্যান্ট বিক্রি করেন তিনি। হরতাল-অবরোধের কারণে দুই মাসে বেচা-বিক্রয় নেই বলেই চলে। আগে যেখানে প্রতিদিন ২ থেকে ৫ হাজার টাকা বিক্রি হতো, এখন সেখানে ৫০০ টাকা বিক্রি হয় না। এভাবে চলতে থাকলে রাস্তায় মেনে পড়বেন বলে জানান তিনি। তাই দেশের মানুষের কথা চিন্তা করে হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহার করে হাসিনা-খালেদাকে সংলাপে বসার আহবান জানান তিনি।
এই অবরোধ-হরতালের কারণে অনেক কষ্টে আছেন পরিবহন চালকরা। গত ৫ জানুয়ারি থেকে অবরোধ চলার কারণে প্রায় ২২ হাজার টাকা ঋণ করেছেন আসলাম হোসেন নামে শিকড় পরিবহনের এক চালক। তিনি বলেন, দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলছে এই অবরোধ ও হরতাল। এর ফলে রাস্তায় নামতে ভয় হয়। কখন গাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। তবুও জীবনের মায়া ত্যাগ করে রাস্তায় নামতে হচ্ছে। কিন্তু যাত্রী না পাওয়ার কারণে তেমন আয় হচ্ছে না। আগে যেখানে প্রতিদিন ১৫ শ’ থেকে ২ হাজার টাকা পাওয়া যেত এখন সেখানে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পাওয়া যায়। এর ফলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে চলাচল করতে কষ্ট হচ্ছে। তবে দেশের এই অবস্থা সমাধানে সরকারের প্রতি আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশ ও জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় একটি দেশের সরকার। তাই সরকারের উচিত দেশ ও মানুষের কথা বিবেচনা করে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো। এর মধ্যে হতে পারে নতুন করে নির্বাচন দেয়া অথবা সকল রাজনৈতিক দলের সাথে সংলাপ করা। এ ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজের চিঠির বিষয়টি সরকারের বিবেচনা করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
বর্তমান সঙ্কট সমাধানে সরকারি দল, বিরোধী দল ও বিএনপিসহ সকল রাজনৈতিক দলের ভূমিকা-ই প্রধান বলে মনে করেন নাসির উদ্দীন নামে এক ফলবিক্রেতা। তিনি বলেন, এক দিকে বিএনপি-জামায়াত জোট একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে গত ৬ জানুয়ারি থেকে লাগাতার অবরোধ ও হরতাল দিয়ে আসছে। অপর দিকে সরকার জঙ্গি-সন্ত্রাসী দমনের নামে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের গণ-গ্রেফতার ও ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করছে। এই পরিস্থিতির মধ্যে গৃহপালিত বিরোধী দল জাতীয় পার্টির কোনো ভূমিকায় নেই। তারা বসে বসে দেশ কোন দিকে যাচ্ছে তা পর্যবেক্ষণ করছে। কিন্তু দেশের এই অবস্থার জন্য এই রাজনৈতিক দলগুলোই দায়ী। তাই সমাধানের জন্য সর্বপ্রথম সরকারি দলকে এগিয়ে আসতে হবে। এ জন্য আওয়ামী লীগকে সংলাপের উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিএনপি জোটকেও হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহার করে এগিয়ে আসতে হবে। তবে এখানে বর্তমান সরকারের বিরোধী দলের ভূমিকাও অনেক। তারা ইচ্ছে করলে এই সঙ্কট সমাধানে উদ্যোগ নিতে পারে। তাদের উদ্যোগে সরকার সাড়া না দিলে, তারা জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিতে পারে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সমাধান না করে এই তিন দলের তিন মহিলা দেশের সঙ্কট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছেন। তাই দেশের স্বার্থে, জাতীয় স্বার্থে সবাই একটু নমনীয় হয়ে সমঝোতায় আসার আহবান জানান তিনি।
এ দিকে লাগাতার অবরোধ ও হরতালের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে দেশে তৈরী পোশাক শিল্প। তাই এই সমস্যা সমাধানে সরকার ও বিএনপি জোটকে উদ্যোগ নিতে বলেছেন তারা। এ ব্যাপারে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে অবস্থিত চুংঅন এআরএস সোয়েটার ফ্যাক্টরি অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বন্ধ আছে। এই ফ্যাক্টরিতে প্রায় ৬০০-এর মতো শ্রমিক কর্মরত আছেন। কিন্তু পণ্যের অর্ডার ও ডেলিভারি না থাকার কারণে এ মাসের প্রথম দিক থেকেই কারখানাটি বন্ধ রয়েছে বলে জানান ফ্যাক্টরির ম্যানেজার আবুল কালাম। তিনি বলেন, হরতাল-অবরোধের মধ্যে ফ্যাক্টরির অর্ডার ও ডেলিভারি যে হারে হওয়ার কথা সে পরিমাণে হয় না। চলতি মাসে মাত্র ৩০-৪০ শতাংশ কাজের অর্ডার পাওয়া গেছে, যা দুই-এক মাস কাজ করলেই শেষ হয়ে যাবে। বছরের শুরুতে এই সময়টায় প্রচুর বিদেশী অর্ডার পাওয়া যায়। কিন্তু রাজনৈতিক এই অস্থিরতার কারণে বিদেশী বায়াররা এ সময় অর্ডার দেয়ার জন্য আসছে না। তাই এখন আমাদের ৬০ শতাংশ অর্ডার পিছিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি জনান।
জুরাইন এলাকার বাসিন্দা একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের মালিক মো: সাইদুর রহমান বলেন, এভাবে লাগাতার অবরোধ-হরতাল চলতে থাকলে দেশের সমগ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর এর প্রভাব পড়বে। কারণ আগে একটি ট্রাকে রাজশাহীতে মাল পাঠাতাম ৯ হাজার টাকায়। এখন সেখানে লাগচ্ছে ২০ হাজার টাকা। তবুও ঠিক সময় ট্রাক পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকে আবার আগুন ও ভাঙচুরের ভয়ে যেতে চাচ্ছে না। তাই সামগ্রিকভাবে এর প্রভাব পড়ছে আয়-ব্যয়ের ওপর। যেমন গত ডিসেম্বর মাসে তার ওয়ার্কশপ থেকে আয় হয়েছিলো ৫০ লাখ। কিন্তু চলতি মাসে এখন পর্যন্ত ২০ লাখ টাকাও আয় হয়নি বলে তিনি জানান। তাই এই সঙ্কটের সমাধান চান তিনি।
এ ছাড়া অবরোধ-হরতালের মধ্যে গার্মেন্টস কারখানাগুলোয় কাজ হলেও যোগাযোগব্যবস্থার কারণে আমদানি-রফতানি কম হচ্ছে। তাই এর প্রভাব উৎপাদনের ওপর পড়ছে বলে জানান কামাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার মো: ইকবাল হোসেন। তিনি বলেন, অবরোধ-হরতালের কারণে ফ্যাক্টরির কাজ অনেক কমে গেছে। গত ডিসেম্বরে এই ফ্যাক্টরিতে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার পিস প্যান্ট। কিন্তু চলতি মাসে এখন পর্যন্ত ১৫ হাজারও উৎপাদন হচ্ছে না। এর প্রধান কারণ যোগাযোগব্যবস্থার কারণে ঠিক সময় কাঁচামাল সরবরাহ না হওয়া। এ ছাড়া কাজ হলেও ট্রান্সপোর্টের কারণে ঠিকমতো ডেলিভারি হচ্ছে না। তাই এভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলতে থাকলে ফ্যাক্টরির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে তিনি জানান।

রাজধানীর আগারগাঁও এলাকায় অবস্থিত একটি পেপার মিলস লিমিটেডের শ্রমিক মো: আলম হোসেন বলেন, হরতাল-অবরোধের কারণে ফ্যাক্টরির কাজ বন্ধ না থাকলেও আমাদের আসা-যাওয়া করতে হয় আতঙ্কের মধ্যে। কখন কে কোথা থেকে গাড়িতে পেট্রলবোমা মেরে দেয় এই ভয়ে থাকতে হয়। সেই সকাল ৮টায় ফ্যাক্টরিতে আসি। বের হতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। আর তখনই বিভিন্ন স্থানে গাড়ি ভাঙচুর, ককটেল ও পেট্রলবোমা মারা শুরু হয়। তাই ভয় ও আতঙ্কের মধ্য দিয়ে ফ্যাক্টরিতে আসা-যাওয়া করতে হয়। তাই দেশের মানুষের জানমালের নিরাপত্তার জন্য নিরীহ মানুষ হত্যা না করে একটি রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য দুই নেত্রীর সংলাপে বসার আহবান জানান তিনি।
সাধারণ মানুষের মতামত এবং ভাবনায় যেটা পরিষ্কার অবশ্যই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য একটি কার্যকরী সংলাপ প্রয়োজন। প্রয়োজন আলোচনা করে এর সুষ্ঠু সমাধান।
লেখক : সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply