সঙ্কট সমরে বাংলাদেশ

মাসুম রহমান

Storyনানামুখী সঙ্কটে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এ লড়াই সার্বভৌম জাতি হিসেবে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারার সক্ষমতার লড়াই। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বজায় রাখা আর বৈদেশিক বাণিজ্যে সুদৃঢ় ভিত্তি অর্জনের লড়াই। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লড়াই। গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার বিঘœগুলো কাটিয়ে সামনে এগোনোর লড়াই। এই চতুর্মুখী লড়াইয়ে বাংলাদেশ নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে যেতে পারছে না। এমন একটা সঙ্কট সময় বাংলাদেশ এখন অতিক্রম করছে যাতে এর সমাধান কোন পথে আসবে তা নিয়ে অনুমান করা হয়ে পড়েছে দুরূহ। এই সঙ্কটের বিশেষ দিক হলো এর আগে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে এতটা নৈরাজ্যের অবস্থায় যায়নি। এখনকার মতো কারণে-অকারণে দেখামাত্র গুলির পরিস্থিতি দেখা যায়নি। আন্তর্জাতিক পরিবেশও ছিল না এতটা ঘোলাটে। বাংলাদেশ গণতন্ত্রের পথে চলার যে রাজনৈতিক শক্তি গত দুই যুগে অর্জন করেছিল তা এখন আবার সূচনা বিন্দুতে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। বহুদলীয় গণতন্ত্র, ভোটের কার্যকর অধিকার যা বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক বিশ্বে সম্মানের একটি আসন দিয়েছিল তাও এখন আর থাকছে না। বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক কোটারিতে বন্দী হয়ে পড়েছে দেশ।

অগণতন্ত্রের শঙ্কা
১৯৯০ সালের আগের দশককাল সময়েও বাংলাদেশে ভোট হতো। নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হতো। কিন্তু এতে জনমতের প্রতিফলন তেমন থাকত না। হোন্ডা-গুণ্ডা আর প্রশাসনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করত নির্বাচনের ফলাফল। জেনারেল এরশাদের পতনের মাধ্যমে ’৯০-এর পর সে ধারা আর থাকেনি। নির্বাচনকে সরকার যাতে প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রভাবিত করতে না পারে সে জন্য নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাংবিধানিক ব্যবস্থা করা হয়। ২০০৮ সালের পর বর্তমান সরকার সংবিধান থেকে সে ব্যবস্থা তুলে দিয়ে নির্বাচনব্যবস্থাকে আবার ১৯৯০-পূর্ববর্তী সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। নতুন ব্যবস্থায় কী ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে তার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন এবং পরে ৫ দফায় অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। সংসদ নির্বাচনে ৫ শতাংশ ভোটার অংশ না নিলেও ৪০ শতাংশ ভোট প্রদত্ত হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে। সংবিধানে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে যেখানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে দেশ শাসনের বিধান রয়েছে সেখানে অর্ধেকের বেশি আসনে এমপি নির্বাচিত দেখানো হয়েছে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া কিভাবে জোর করে ক্ষমতায় থাকা যায় তার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। এরপর প্রতিদ্বন্দ্বী থাকার পরও কিভাবে নির্বাচনের ফলাফল নিজের পক্ষে নিয়ে আসতে হয় তার মহড়া হয়েছে উপজেলা নির্বাচনের তৃতীয় থেকে পঞ্চম পর্বে।
এই দুই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা মূলত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। গণতন্ত্র অর্থ হলো জনগণের ইচ্ছায় দেশ শাসন হওয়া। আর জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন হতে পারে নির্বাচনের মাধ্যমে। নির্বাচনীব্যবস্থা অকার্যকর হওয়া মানে হলো গণতন্ত্র অকার্যকর হয়ে পড়া। এটিই বাংলাদেশের জন্য এখন অনেক বড় সঙ্কট। এ সঙ্কট থেকে উত্তরণ কিভাবে হবে তার পদ্ধতিগত কোনো পথ সামনে দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না।

জানমালের নিরাপত্তা
রাষ্ট্র সৃষ্টির মূল কারণ হিসেবে এ পর্যন্ত সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত হলো সামাজিক চুক্তি মতবাদ। এ মতবাদ অনুসারে জনগণ তার জীবন এবং সম্পদের নিরাপত্তা বিধান তথা নিজের মৌলিক অধিকারগুলো বলবৎ করার জন্য বিশেষ চুক্তির মাধ্যমে কিছু অধিকার রাষ্ট্রের কাছে সমর্পণ করেছে। সরকার গঠনের মাধ্যমে রাষ্ট্র সে ক্ষমতা প্রয়োগ করে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ অন্তর অন্তর জনগণ কারা দেশ পরিচালনার এই দায়িত্ব পালন করবে সে ব্যাপারে সম্মতি জ্ঞাপন করে। রাষ্ট্র যখন বিধিবদ্ধ আইনের শাসনের পরিবর্তে পক্ষপাতমূলক ব্যবস্থা চালু করে তখন আর জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের সে মৌলিক শর্ত পূরণ হয় না। যে শর্ত পরিপালনের জন্য রাষ্ট্রের হাতে ক্ষমতা সমর্পণ করা হয়েছিল তার বৈধতাও আর থাকে না। রাষ্ট্রের ক্ষমতাচর্চা সরকারের জন্য হয়ে দাঁড়ায় অবৈধ। বস্তুত বাংলাদেশে গণতন্ত্র সঙ্কটের সাথে সাথে ক্ষমতার যে বৈধতার সঙ্কট দেখা দিয়েছে তার পথ ধরে চলে এসেছে খুন, গুম, অপহরণ ও জোর করে সম্পদ দখলের সংস্কৃতি।
রাষ্ট্র পরিচালনায় বড় রকমের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সঙ্কট দেখা দিলে জরুরি অবস্থা জারির সাংবিধানিক একটি ব্যবস্থা ১৯৭২-এর মূল সংবিধানে সংশোধনী এনে প্রবর্তন করা হয়। সংবিধানের এই বিধান অনুসারে জরুরি অবস্থা জারি করা হলে নাগরিকের মৌলিক কোনো অধিকার বলবৎযোগ্য থাকে না। নির্বিচারে খুন, অপহরণ, সম্পদ দখলের মতো অপরাধ প্রতিরোধে সাংবিধানিক প্রতিকার লাভের সুযোগ হয় রহিত।
বিগত বিএনপি সরকার আইনশৃঙ্খলার অবনতি রোধ করার অজুহাতে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) নামে একটি এলিট ফোর্স গঠন করে। এই বাহিনীকে ব্যবহার করা হয় জঙ্গিতৎপরতা দমন এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি রোধ করার কাজে। এ কাজে তাদের দায়মুক্তি দিয়ে বিনা বিচারের এনকাউন্টারের ব্যবস্থা করা হয়। এ ধরনের এনকাউন্টার আইনের চোখে গ্রহণযোগ্য নয় বলে একটি কাহিনী সাজানো হয় বন্দুকযুদ্ধের। তখন অবশ্য এনকাউন্টারের জন্য অপরাধী চিহ্নিত করতে বিশেষ তদন্তের বিভাগীয় ব্যবস্থা রাখা হয়, যা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হতো না। আগের রাজনৈতিক সরকার এলিট ফোর্স এবং এনকাউন্টারকে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার থেকে কঠোরভাবে নিবৃত ছিল। ২০০৭ সালের পর ক্ষমতায় আসা জরুরি সরকার রাজনৈতিক দলের নেতাদের ওপর দমন-পীড়ন চালালেও এনকাউন্টার ব্যবহার করেনি রাজনৈতিক কারণে।
বর্তমান সরকারের আমলে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলকে কেন্দ্র করে এবং ট্রাইব্যুনালের বিতর্কিত বিচারিক কার্যক্রমের ব্যাপারে রাজনৈতিক আন্দোলন তৈরি হলে এই এনকাউন্টারের রাজনৈতিক ব্যবহার শুরু হয়। আন্দোলন যত জোরদার আর সহিংস হয়ে ওঠে এনকাউন্টার তত বাড়তে থাকে। এক সপ্তাহে এনকাউন্টারে কয়েক শ’ মানুষের মৃত্যুর রেকর্ড হয়। এর ব্যবহার করতে দেখা যায় প্রচলিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি এলিট ফোর্স র‌্যাব ও আধা সামরিক বাহিনীকেও।
যেকোনো বিচারবহির্র্ভূত হত্যাকাণ্ড সমাজের স্থিতি ও আইনের শাসনকে বিঘিœত করে। আর বিচার ছাড়া হত্যার সংস্কৃতিতে যখন রাজনৈতিক কারণ যুক্ত হয় তখন তা হয়ে ওঠে ভয়াবহ।
সরকার রাজনৈতিক কারণে হত্যায় ঘোষিত-অঘোষিত দায়মুক্তি দিলে এ কাজে যাদের ব্যবহার করা হয় তারা এ সুযোগকে শুধু রাজনৈতিক ব্যবহারের মধ্যে নিজেদের সীমিত রাখে না। ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক স্বার্থ আদায় পর্যন্ত নানা কারণে বিচারবহির্র্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িত হয়ে পড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ধরনের সঙ্কট দেশ ও জাতির জন্য এক আইনি কাঠামোয় অরাজকতা সৃষ্টি করে, যেটি একটি দেশের যুদ্ধ পরিস্থিতিতেই সাধারণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা যায়।
এ ধরনের পরিস্থিতি দেশে এক আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করে যেখানে সরকারের রাজনৈতিক ভিন্নমতের লোকরাই কেবল নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকে না, রাজনীতি নির্বিশেষে সব লোকের জীবনই বিপন্ন হয়ে পড়ে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় সেটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
অস্ব^াভাবিক পরিবর্তনের শঙ্কা
অপহরণ, খুন, গুম যত বাড়ছে, দেশের নানা স্থানে যতটা অরাজক পরিস্থিতি দেখা দিচ্ছে ততই অস্ব^াভাবিক পরিবর্তনের আশঙ্কার কথা উচ্চারিত হচ্ছে। সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতাদের মুখ থেকে যেমন এটি উচ্চারিত হচ্ছে তেমনিভাবে বিরোধী দলের নেতারাও একই কথা বলছেন। তবে এ ধরনের সংবিধানবহির্ভূত পরিবর্তনের কথা এর আগে এত বেশি বলা হয়েছে যে, তাতে এখন আর তা নিয়ে ভয় উদ্বেগ কেটে গেছে। তবে স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন এবং কেন্দ্র দখলের উপজেলা নির্বাচনের পর কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। যদিও এই নির্বাচনের পর বিরোধী পক্ষ থেকে প্রতিবাদ কর্মসূচি বা কোনো সহিংসতা বা উত্তাপ উত্তেজনার লক্ষণ দেখা যায়নি।
বিরোধীদলীয় নেতারা আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনের কথা মাঝে মধ্যে উচ্চারণ করলেও কার্যক্ষেত্রে তার কোনো প্রস্তুতি বা আলামত দেখা যায়নি। ফলে রাজনৈতিক দলের আন্দোলনের মুখে সরকারের পতনের কোনো সম্ভাবনা এখন অনেকেই দেখছেন না। এটিই বাস্তব হয়ে থাকলে ২০২১ সাল এমনকি ২০৪১ সাল পর্যন্ত (যদি তত দিন রাষ্ট্রের বর্তমান অবয়ব থাকে) বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকবে বলে যেটি বলা হচ্ছে সেটি দেখা যাবে। এ লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে উদীয়মান বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের গুম ও এনকাউন্টার চলমান রয়েছে। গ্রেফতারের পর বিরোধী নেতাকর্মীদের পায়ে বা অন্য স্থানে গুলি করে স্থায়ী পঙ্গু করে দেয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে সরকারি দলের সমর্থক ক্যাডারদের নিয়োগের কাজ দ্রুত এগোচ্ছে। সব ধরনের বাহিনীতে নিয়োগ পদোন্নতি পদায়ন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে মূলত জনসমর্থন যা-ই থাক না কেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমর্থনে ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে। সাবেক ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিব শ্রীনিবাসন ৫ জানুুয়ারির নির্বাচনের পর এই পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন শেখ হাসিনার সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করার ক্ষেত্রে বাধাই থাকবে না যদি আইনশৃঙ্খলার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সমর্থন সরকার নিশ্চিত করতে পারে।
ভারতীয় কূটনীতিক ও আমলাদের এই পরামর্শ সরকার গুরুত্বের সাথে যে গ্রহণ করেছে তার প্রতিফলন এখন নানা ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সামরিক বাহিনীর অংশীদারিত্বে ব্যবস্থা কায়েমের একটি কৌশল সরকারের উপদেষ্টাদের সামনে রয়েছে। এ মডেল মিসর আলজিরিয়াসহ বেশ ক’টি মুসলিম দেশে বাস্তবায়ন হয়েছে। একই কৌশল কার্যকর করা সম্ভব হলে অস্বাভাবিক পরিবর্তনের শঙ্কা সরকারের সামনে না-ও থাকতে পারে বলে শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের অনেকে মনে করেন।
কূটনৈতিক চাপ
৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনকে সামনে রেখে বর্তমান সরকার কূটনৈতিকভাবে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনের কথা বলেছিলেন চীন ও রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতরাও। কেবল প্রতিবেশী ভারতই সরকারের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন সমর্থন করে এসেছে। নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর পরিস্থিতি সেপর্যায়ে থাকেনি। সরকারের পক্ষে সমর্থন ব্যক্ত করেছে রাশিয়া। চীন মাঝামাঝি অবস্থান নিয়ে এখন ঝুঁকে পড়েছে সরকারের সাথে নানা ধরনের সংশ্লিষ্টতায়। চীনের উচ্চপদস্থ এক প্রতিনিধিদল আসছেন বাংলাদেশে। শেখ হাসিনা নিজেও যাচ্ছেন চীন সফরে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো আরেকটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে রয়েছেন এখনো। কিন্তু প্রতিবেশী ভারতের নির্বাচনে কোন দল ক্ষমতায় আসে সে দিকে তাকিয়ে আছেন অনেকে। সব ধরনের এক্সিটপোল জরিপে বলা হচ্ছে ভারতের আগামী নির্বাচনে ক্ষমতায় আসছে বিরোধী বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএ। কেউ কেউ তৃতীয় ফ্রন্টের ক্ষমতায় আসার কথা বললেও সে সম্ভাবনা অনেকটাই কমে গেছে কংগ্রেস সহসভাপতি রাহুল গান্ধী তৃতীয় ফ্রন্টকে ক্ষমতায় যেতে সমর্থন না করার ঘোষণার কারণে। পরে অবশ্য তিনি এর ব্যাখ্যাও দিয়েছেন এই বলে যে কংগ্রেস বাইরে থেকে সমর্থন না দিলেও কোয়ালিশন সরকার গঠনে যেতে পারে। এমনকি সে সরকারের প্রধানমন্ত্রী অন্য কোনো দলের হলেও। ভারতের নির্বাচনে কোন সরকার ক্ষমতায় আসছে তা পরিষ্কার হবে আগামী ১৬ মে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী কংগ্রেসের হোক বা না হোক সরকারের কোয়ালিশনে দলটি থাকলে বাংলাদেশের একতরফা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনার সরকারকে সমর্থন জোগানোতে নয়াদিল্লির ব্যতিক্রম না-ও ঘটতে পারে। অন্য দিকে বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদি অথবা দলের অন্য কেউ প্রধানমন্ত্রী হলে পুরনো নীতির ধারাবাহিকতা না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ নীতিতে পরিবর্তন না আসার ঘোষণা যাতে নরেন্দ্র মোদি তার বক্তব্যে দেন সেই চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তিনি ১৬ মের পর বাংলাদেশীদের পুশব্যাক করার ঘোষণা ছাড়া আর কিছুই বলেননি।
ভারতের বাংলাদেশ নীতির ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে বলে সে দেশের সাবেক আমলা ও কূটনীতিবিদেরা যেভাবে আশ্বস্ত করছেন তাতে নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না সরকারের নীতিনির্ধারকরা। তারা জানেন ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে পাশ্চাত্যের বিরোধিতা সত্ত্বেও সর্বাত্মক সমর্থন দেয়া এবং রাষ্ট্রের পরিবর্তে ব্যক্তি ও দলকেন্দ্রিক বাংলাদেশ নীতি ভারতের জন্য কতটুকু কল্যাণকর হবে এ ব্যাপারে ভিন্নমত রয়েছে। মতের এই দ্বিধাবিভক্তি সে দেশের বিদেশ দফতর, গোয়েন্দা সংস্থা এমনকি কংগ্রেসের নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও ছিল। প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির বিশেষ প্রভাব এবং র-এর শীর্ষ ব্যক্তিদের প্রভাবে সে ভিন্নমত গুরুত্ব পায়নি। নয়াদিল্লিতে সরকার পরিবর্তনের পর এখনকার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আর সেসব পদে থাকার সম্ভাবনা কম। পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের দৈনন্দিন কাজে প্রেসিডেন্ট ভূমিকা আর রাখতে পারবেন বলেও মনে করা যাচ্ছে না। ফলে অকংগ্রেসী সরকার নয়াদিল্লির ক্ষমতায় গেলে ভারতের বাংলাদেশ নীতি পাল্টাতে পারে।
ভারতের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না এমন একটি সুশীল-রাজনীতিকের মিশ্র সরকার বাংলাদেশের ক্ষমতায় আনার ব্যাপারে একটি পক্ষ প্রতিবেশী দেশটিতে কাজ করছে বলে ঢাকার বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্র থেকে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রতিবেশী দেশের সাথে পাশ্চাত্যের এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশগুলোর সমন্বয় বা যোগসূত্রও থাকতে পারে। এ ধরনের কোনো মেরুকরণ যদি শেষ পর্যন্ত হয় তাহলে তা বাস্তবায়নে ২০১৪ সাল পার হবে বলে মনে হয় না।

অর্থনীতির চাপ
বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোর দিকে গভীরভাবে দৃষ্টি দিলে কিছু শঙ্কার বিষয় স্পষ্ট হয়। অর্থনীতিতে চাহিদা না থাকায় আমদানি সেভাবে বাড়ছে না। আমদানি পণ্য না এনে অথবা অধিক মূল্য দেখানোর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। রফতানি ১০ শতাংশের মতো বাড়লেও রফতানিকারকদের মধ্যে জিএসপি বাতিলের শঙ্কা যাচ্ছে না। ইউরোপ জিএসপি বাতিল করলে চীনা বাজারের সুবিধা নিয়ে তা পোষানো যায় কি না চিন্তা করা হচ্ছে। এই চিন্তার সাথে বাস্তব পরিস্থিতির কোনো মিল আছে বলে মনে করছেন না পোশাক রফতানিকারকেরা। বিদেশী সাহায্যের প্রতিশ্রুতি এখন একেবারেই নিম্নপর্যায়ে। পুরনো প্রতিশ্রুত সহায়তাও অবমুক্ত হচ্ছে না। এ অবস্থায় নতুন বছরের বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বিনিয়োগ পরিস্থিতি। বিদেশী বিনিয়োগ বলতে কিছু ভাড়াটে বিদ্যুতের পুরনো যন্ত্রপাতি ছাড়া উল্লেখযোগ্য কিছু নেই। নতুন কোনো কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী প্রকল্পে বিনিয়োগ হচ্ছে না। ব্যাংকগুলো ছোট-বড় যেসব প্রকল্পে ঋণ দিচ্ছে তাই যেন খেলাপি হয়ে পড়ছে। অনেক ব্যাংককে নতুন প্রকল্পে বেশি ঋণ দিয়ে পুরনো টাকা আদায় করতে হচ্ছে অথবা করতে হচ্ছে ঋণ পুনঃতফসিল। বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণসূচি পুনর্নির্ধারণের ব্যাপারে উদার হওয়ার পরও খেলাপি ঋণের হার ক্রমেই বাড়ছে। অর্থনীতির অবস্থা এখন যে পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে তাতে মুখ থুবড়ে পড়ার অবস্থা স্বল্প মেয়াদে হয়তো হবে না তবে মধ্য মেয়াদে মন্দা সৃষ্টির আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে। বিশেষত রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে কোনো পদক্ষেপ নেয়া না হলে দাতা দেশ ও সংস্থাগুলো সরকারের প্রতি অর্থনৈতিক সহায়তার হাত না বাড়ানোর বার্তাই দিচ্ছে।

শেষ কথা
বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে যে একটি ক্রান্তিকালে উপনীত তা সর্বমহলেই এখন অনুভূত হচ্ছে। কিন্তু জনমতের বাইরে গায়ের জোরের শাসন প্রবর্তনের রাস্তা থেকে গণতন্ত্র চর্চার পথে কিভাবে দেশকে ফেরানো যাবে এ বিষয়টি স্পষ্ট নয়। যেকোনো অগণতান্ত্রিক পরিবর্তন দেশকে আবার পেছনে ঠেলে নেবে নিঃসন্দেহে। কিন্তু রাষ্ট্র যখন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায় তখন ডকট্রিন অব নেসেসিটির গুরুত্ব অনেক সময় বেড়ে যায়। বাংলাদেশ আজ তেমন একটা সময়ের মুখোমুখি।

SHARE

Leave a Reply