সঙ্ঘাতের রাজনীতি

আলফাজ আনাম

মহাজোট সরকারের এক বছর মেয়াদ থাকতে দেশের রাজনীতি অস্থির হয়ে উঠছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন বড় প্রশ্ন আগামী নির্বাচন হবে কি না বা হলেও সে নির্বাচন কিভাবে হবে। নাকি আবারো তৃতীয় কোনো শক্তি ক্ষমতায় আসবে? এসব নানা প্রশ্নের মধ্যেই বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিধান ফিরিয়ে আনার দাবিতে কঠোর আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। নতুন বছরে এই আন্দোলন আরো জোরদার হবে।
ডিসেম্বর ও জানুয়ারির হরতাল ইতোমধ্যে সেই বার্তা দিয়েছে। অপর দিকে বিরোধী দলের আন্দোলন দমনে সরকার আরো কঠোর হওয়ার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর নতুন মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। বিরোধী জোটের প্রধান শরিক জামায়াতের বিরুদ্ধে স্পষ্টত দমন নীতি চালানো হচ্ছে। প্রথম ও দ্বিতীয় সারির নেতাদের গ্রেফতারের পর এখন দলটির নারী কর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে যা আগে কখনোই বাংলাদেশে হয়নি। দমন-পীড়ন পরিস্থিতির মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে সংবিধান অনুযায়ী দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করা হবে। ফলে আগামী দিনে দেশের রাজনীতি শুধু অনিশ্চিত নয়, বড় আকারের সঙ্ঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
কোন পথে সরকার
মহাজোট সরকারের চার বছর পূর্ণ হয়েছে জানুয়ারির ৬ তারিখে। সরকারের চার বছরের শাসনামলে সীমাহীন দুর্নীতি, ব্যাংক থেকে অর্থ লোপাট, শেয়ারবাজার বিপর্যয়, গুম-খুনের রেকর্ড অতিক্রম সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থায় ধস নেমেছে। সরকার সমর্থক গণমাধ্যম বলতে বাধ্য হচ্ছে ব্যর্থতায় সাফল্য ম্লান হয়ে গেছে। কিন্তু সরকারের চার বছরে সাফল্য যে কী তা বর্ণনা করা এখন দুরূহ হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতির দায় শোধ করতে অব্যাহতভাবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে সাধারণ মানুষের খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। অর্থমন্ত্রী এ পরিস্থিতিতে আবারো জ্বালানির দাম বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন।
সরকারের বড় একটি নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল পদ্মা সেতু নির্মাণ। কিন্তু দুর্নীতির কারণে বিশ্বব্যাংক এই প্রকল্পে ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ফলে পদ্মা সেতুর কাজ আদৌ এই সরকারের আমলে হবে এর কোনো সম্ভাবনা নেই। পদ্মা সেতুর দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের সাথে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের লোক জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে আরো যেসব বড় বড় প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল সেগুলোর কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি যেমন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর ও মেট্রোরেল প্রকল্পের মতো বড় উন্নয়ন কর্মকা- এখন সরকারের ঘোষণার মধ্যেই সীমিত হয়ে পড়েছে। দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন কর্মকা- সরকার দেখাতে পারছে না।
দুর্নীতির সাথে সরকারি ও সাধারণ মানুষের অর্থলোপাটের যেসব ঘটনা ঘটেছে তাতে ক্ষোভ ও হতাশা আরো বেড়েছে। শেয়ারবাজার থেকে শুরু করে ডেসটিনির অর্থ পাচারের ঘটনা সরকারের অর্থনৈতিক অবব্যস্থাপনার চিত্রই শুধু নয়, একের পর এক এসব ঘটনায় প্রমাণ হয় অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারিতে সরকার নিমজ্জিত হয়ে পড়ছে।
তবে সরকার শুরু থেকেই সতর্ক যেকোনো ইস্যুতে বিরোধী দল যাতে বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারে। সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে প্রকৃত অর্থেই বিরোধী দল গত চার বছরে বড় ধরনের কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। বলতেই হবে একের পর এক ইস্যু পাওয়ার পরও বিরোধী দল বড় আকারের আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।
দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন
বিরোধী দল গত চার বছরে বড় আকারের আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হলেও সরকার জনপ্রিয়তার পারদ এখন নিম্নমুখী। বিরোধী দলের জনসংযোগমুখী আন্দোলনের কর্মসূচির কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন ছাড়া যে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় তা সাধারণ মানুষের কাছে সহজেই বোধগম্য। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা জানেন দ্বিতীয়বারের মতো বিজয়ী হয়ে আসা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। এ কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই রায়ের একটি অংশকে আমলে নিয়ে সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করে দেয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সংসদ সদস্যপদ বহাল রেখে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আইন করা হয়। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের ৩ (ক) বলা হয়েছে, মেয়াদ অবসানের ক্ষেত্রে সংসদ ভাঙিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে। অর্থাৎ সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় নির্বাচন হবে। এ ধরনের নির্বাচনের ফলাফল কী হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। সাজানো নির্বাচনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা একেবারেই নেই। জনসমর্থন হারানোর পর ক্ষমতায় থেকে সাজানো নির্বাচনের এই আয়োজন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকার করেছে। কিন্তু কোনো সরকারই তাদের ক্ষমতার মেয়াদ পূরণ করতে পারেনি। তার পরও স্বৈরশাসকেরা এমন আয়োজন করেছে বাংলাদেশেও হয়তো এমন আরেকটি নির্বাচনের আয়োজনের পরিকল্পনা ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে রয়েছে।
সাজানো নির্বাচনের কৌশল
সরকারের মেয়াদ শেষ হবে চলতি বছরের ডিসেম্বরে। সংশোধিত সংবিধান অনুযায়ী সংসদ ভেঙে দেয়ার তিন মাস আগে নির্বাচন হবে। অর্থাৎ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে সরকার একটি নির্বাচন আয়োজন করতে চাইবে। সেই নির্বাচনে অনিবার্যভাবে মহাজোট সরকারের শরিকেরা অংশ নেবে। এরশাদ হবেন প্রধান বিরোধী দল। ইতোমধ্যে তিনি বিরোধী দলের সুরে কথা বলতে শুরু করেছেন। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে বিরোধী দলের ডাকা হরতাল যৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন। এর আগে ভারত সফর করে এসে হঠাৎ ভারতবিরোধী বক্তব্য দেয়া শুরু করেছিলেন। বাংলাদেশে সাজানো নির্বাচনের প্রথম আয়োজক এরশাদ। তার শাসনামলে ’৮৬-এর পার্লামেন্টে আওয়ামী লীগ অংশ নিয়ে বিরোধী দলের আসনে বসেছিল। এবার তিনি আবার বসবেন। সরকার সমর্থক সুশীলরাও এই আয়োজনের সাথে যোগ দিতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে সুশীল গণমাধ্যমে এরশাদের জনপ্রিয়তা ৩ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে বলে জরিপ প্রকাশ করেছে। আওয়াজ উঠেছে দুই নেত্রীর শাসন থেকে এরশাদের শাসনামল ভালো ছিল। এরশাদের মহানুভবতার খবরগুলো সামনে আরো বড় হয়ে আসতে পারে। নিশ্চয়ই এসব খবর এরশাদের জন্য আনন্দের। এর সাথে বাম দলগুলোকে প্রস্তুত করা হচ্ছে। সরকারের সমর্থন নিয়ে ইসলামপন্থী রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে তারা একটা হরতাল করে ফেলেছে। সেই হরতালে পুলিশ পুরোপুরি সমর্থন দিয়েছিল। এরশাদ ও বাম দলগুলোকে নিয়ে একটি গৃহপালিত সংসদের আয়োজন পরিকল্পনা নিয়ে সরকার এগোচ্ছে। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী এর আগে দুই দল থেকে সংসদ সদস্যদের নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কথাও বলেছিলেন। কিন্তু তিনি তার রূপরেখা স্পষ্ট করেননি। ’৯৩ থেকে ’৯৬ পর্যন্ত সময়কালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সময় বিএনপির পক্ষ থেকেও এমন প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তখন আওয়ামী লীগ সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল। এ ছাড়া এ সরকারে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা ও ক্ষমতা কতটা থাকবে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলো কার হাতে থাকবে সেসব বিষয়ে জটিলতা রয়েছে। ফলে নির্বাচনকালীন এ ধরনের অন্তর্বর্তী সরকারের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
বিরোধী দলের আন্দোলন
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনার দাবিতে বিরোধী দলের আন্দোলনের ওপর নির্ভর করবে সরকারের নির্বাচন কৌশল বাস্তবায়ন। আর এ কারণে বিরোধী দল আগামী মার্চের মধ্যে নির্বাচনের ফর্মুলার বিষয়টি চূড়ান্ত করতে চায়। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সিদ্ধান্ত নীতিগতভাবে মেনে নিলে বিরোধী দল সংসদে যাবে এবং আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেবে। বিরোধী দলের এ আহ্বানে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া দেয়া হয়নি। এখন সরকার যদি অনড় অবস্থান গ্রহণ করে বিরোধী দল এই সময়ের মধ্যে কঠোর অন্দোলনের দিকে যাবে। তা না হলে বিরোধী দলের সামনে নির্বাচন ঠেকানোর মতো আন্দোলনে যেতে হতে পারে। যা হবে অনেক বেশি সঙ্ঘাতময়। তবে বিরোধী দলের এই আন্দোলন দমনে সরকার আরো কঠোর অবস্থান নেবে। বিরোধীদলীয় নেতা ও তার ছেলেদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর রায়ও আসতে পারে। বিরোধীদলীয় নেতাকে গৃহবন্দী বা কারারুদ্ধ করলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এমনকি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জারি করা হতে পারে জরুরি অবস্থা। এর মধ্যে চাপ প্রয়োগ করে প্রধান বিরোধী দলের একটি অংশকে নির্বাচনে আনার চেষ্টাও করা হতে পারে। সব মিলিয়ে বিরোধী দলের সামনে রাজনৈতিক সাফল্য আসতে হলে আগামী তিন মাসের মধ্যে দাবি আদায়ে চূড়ান্ত আন্দোলনের দিকে যেতে হবে।
টার্গেট জামায়াত
বিরোধী দলকে মোকাবেলার জন্য সরকার শুরু থেকেই কৌশলী অবস্থান গ্রহণ করেছে। বিরোধী জোটের সবচেয়ে সুসঙ্ঘবদ্ধ রাজনৈতিক দল জামায়াতকে দুর্বল করার নানা প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধে শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতারের পর দলটির শত শত নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একজন গ্রেফতার করার পর যিনি দলটির দায়িত্ব পেয়েছেন তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জনসমক্ষে ডা-াবেড়ি ও হাতকড়া পরিয়ে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। এর মাধ্যমে জামায়াতকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কর্মীনির্ভর দলটির শক্তি খর্ব করা সম্ভব হয়নি। বরং ডিসেম্বরে জামায়াত এককভাবে হরতাল পালন করে রাজনৈতিক শক্তি দেখিয়েছে। এর আগে জামায়াতের সাথে সরকার নির্বাচনকালীন সমঝোতায় আসার চেষ্টা করে। বিরোধীদলীয় নেতাও এই অভিযোগ করেন। কিন্তু এ ধরনের সমঝোতা-উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর জামায়াতের ওপর নিপীড়নের মাত্রা আরো বাড়তে থাকে। সরকারের কৌশল হচ্ছে জামায়াতকে দুর্বল করে। আর এ কারণে সরকার জামায়াতের নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙার কৌশল নিয়েছে। এখন দলটির নারী কর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। কিন্তু সরকারের হিসেবে একটি বড় ভুল হচ্ছে আদর্শবাদী রাজনৈতিক দল নিপীড়নের মাধ্যমে দমন করা যায় না। বরং নেতাকর্মীরা আরো বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। জামায়াতের ওপর নিপীড়ন কার্যত বিএনপির আন্দোলনকে গতিশীল করে তুলছে।
তৃতীয় শক্তির গুঞ্জন
দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা যতই বাড়ছে ততৃীয় শক্তির ক্ষমতা গ্রহণের গুঞ্জন তত বাড়ছে। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, এক-এগারোর মতো পরিস্থিতি ঘনীভূত হচ্ছে। অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে। আবার অনেকে মনে করেন শেখ হাসিনা তার চিরবৈরী খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসুক তা কখনোই চাইবেন না এ জন্য ততৃীয় কোনো পক্ষের ক্ষমতা গ্রহণ তার কাছে অধিক কাম্য হতে পারে। এর উদাহরণ হিসেবে বলা হয় এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি তাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। আবার মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীন সরকারের সাথেও তিনি সমঝোতা করেছিলেন। তাদের সব কাজের বৈধতা দিয়েছিলেন। এবারো এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। বিরোধী দলকে এমনভাবে কোণঠাসা করা হচ্ছে যাতে সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতি ছাড়া সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকবে না। তবে এই বিশ্লেষণের সাথে অনেকে একমত নন। তারা বলছেন রাষ্ট্র পরিচালনায় অনির্বাচিত সরকারের ব্যর্থতা প্রমাণিত হয়েছে। পরোক্ষভাবে ক্ষমতাসীন হয়ে দেশ চালানো যায় না। কোনো-না-কোনোভাবে রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন দরকার। ফলে এ অতীত অভিজ্ঞতায় আর কোনো অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসবে না। কিন্তু তার পরও রাজনৈতিক প্রচেষ্টা যদি পুরোপুরি ব্যর্থ হয় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে অনির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের ঝুঁকি থেকেই যায়।
আন্তর্জাতিক চাপ
সরকারের ওপর নানাভাবে আন্তর্জাতিক মহলের চাপ বাড়ছে। পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতা সীমাহীনভাবে ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক দুনিয়া থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এর মধ্যে মানবাধিকার পরিস্থিতি ও সুশাসন নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই চাপ ভবিষ্যতে আরো বাড়তে থাকবে। এ ছাড়া যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে সরকারের ওপর নানামুখী চাপ রয়েছে।
স্কাইপ কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার পর এই বিচারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও গ্রহণযোগ্য নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ইতোমধ্যে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে আটক জামায়াত নেতাদের শাস্তি না দিতে চিঠি দেয়া হয়েছে। সৌদি আরবসহ কয়েকটি আরব দেশ থেকে একই ধরনের অনুরোধ আসছে। এ ধরনের চাপের মধ্যে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও একদলীয় নির্বাচনের আয়োজন সরকারের জন্য আরো ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
সঙ্ঘাতই কী সমাধান?
বাংলাদেশের বড় ধরনের রাজনৈতিক সঙ্কটের অবসান ঘটেছে রক্তাক্ত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে। ’৭৫ সালে একদলীয় শাসন কায়েমের পর তার অবসান ঘটেছে অমানবিক একটি হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে। জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণের আগে ৭ নভেম্বরে অনেক রক্তপাতের ঘটনা ঘটেছে। এরপর এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণের প্রেক্ষাপটও স্বাভাবিক ছিল না। এরশাদের পতন ঘটেছে রক্তাক্ত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ’৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিতেও সহিংস আন্দোলন করেছিল আওয়ামী লীগসহ তৎকালীন বিরোধী দল। ২০০৭ সালে নির্বাচনের আগে একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে একটি অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল। এরপর দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হলে নানা আপসরফার মধ্য দিয়ে একটি নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতা থেকে সরে যায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। আবারো দেশে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থার মধ্যে নির্বাচনকালীন সরকার এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে কার্যত সরকার ও বিরোধী দল এখন মুখোমুখি অবস্থানে। এক দিকে জনপ্রিয়তা কমতে থাকা সরকারের ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা অপর দিকে বিরোধী দলের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। শেষ পর্যন্ত এই লড়াইয়ের অবসান সমঝোতার মাধ্যমে হবে এখন পর্যন্ত তার কোনো সম্ভাবনা নেই। একটি সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচনের আগে আরেকটি রক্তাক্ত সঙ্ঘাতই যেন অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply