সত্যকে সঞ্জীবিত রাখতে মিথ্যার সাথে যুদ্ধ । মো: রাশেদুল ইসলাম

সত্যকে সঞ্জীবিত রাখতে মিথ্যার সাথে যুদ্ধ । মো: রাশেদুল ইসলামশরতের শেষ মানেই বাংলাদেশের পরিবেশে বিরাট একটা পরিবর্তন আসে। সে পরিবর্তন জলবায়ুর, আবহাওয়ার। মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা বর্ষা-অসহনশীল প্রাণিকুল যেমন বের হতে শুরু করে শরতের শেষে। তেমনি আবহমানকাল ধরে বাংলার মানুষ গা ঝাড়া দিয়ে থাকে এই সময়ে। দীর্ঘ প্রায় ৪-৫ মাসের জবুথবু জীবনপ্রবাহ থেকে বের হওয়া তখন কর্তব্যই হয়ে পড়ে। দায়িত্ববান ব্যক্তিরা যেমনিভাবে এই সময়ে জীর্ণতা কাটিয়ে ওঠা শুরু করে, তেমনিভাবে বিশ্বের সকল মানুষ মানবিক মানুষে পরিণত হয়ে যাক তা আশা করে। এই আশা কেউ করেন মনের অজান্তেই। আবার কেউ কেউ নিশ্ছিদ্র পরিকল্পনা ছাড়া করেন না।
আবহাওয়া পরিবর্তনের সাথে সাথে দায়িত্ববান মানুষের এই পরিবর্তন ব্যক্তিকেন্দ্রিক যতটা দেখতে পাওয়া যায়, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে তার চিত্র বিপরীত। আর এই বৈপরীত্য দেখে আমার মতো আপনিও সহজ সরল মনেই বুঝতে পারবেন যে দায়িত্ববান ব্যক্তির সংখ্যা সমাজে কম। কিন্তু অতোটা সহজে বুঝতে পেরে যাওয়াটা যৌক্তিক না-ও হতে পারে। কারণ, প্রত্যেক ব্যক্তি তার অবস্থানে দায়িত্ববান। এই দায়িত্বের পরিধি কারো ক্ষেত্রে স্বল্প। অনেক ক্ষেত্রে এতো স্বল্প যে, ব্যক্তি নিজেকে ছাড়া অন্য কাউকে নিয়ে চিন্তা করতে পারে না। আবার কিছু ব্যক্তির দায়িত্বের পরিধি বৃহৎ থেকে বৃহত্তর। ব্যক্তি-পরিবারের বাইরেও সমাজ, জাতি, রাষ্ট্র এমনকি বিশ্ব নিয়েও ভাবেন এই ধরনের দায়িত্ববানরা।

দায়িত্বের পরিধি হোক স্বল্প আর বৃহৎ, মৌলিক দায়িত্বের খাতিরে কিছু বিষয় নিয়ে ভাবতেই হয় আমাদের। ব্যক্তি হিসেবে আমাদের নিজেদের জন্য এবং সমাজ-সংগঠন পরিচালনার জন্য সত্যের ওপর টিকে থাকা বাঞ্ছনীয়। আর সত্য তখনই টিকে যায়, যখন মিথ্যেরা পরাজিত হয়। মিথ্যেরা বললাম এ জন্য যে, কোন সত্যকে সঞ্জীবিত রাখতে অনেক মিথ্যার সাথে যুদ্ধ করতে হয়। আমার আজকের আলোচনা ব্যক্তিজীবনে মিথ্যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ সংক্রান্ত।
একজন মুসলিম হিসেবে আমরা প্রায় সবাই জানি যে, ইসলাম ছাড়া অন্য সকল দ্বীন-মত বাতিল। নবুয়তের প্রারম্ভিক অবস্থায় আহলে কিতাবের অনুসরণে মনোনিবেশকারী ব্যক্তিদের মধ্যে কতিপয়ের ব্যাপারে আল্লাহর অনাগ্রহ আছে বলে রাসূল (সা) এর উপর ওহি এলেও, পরে সেই কিতাবে বিশ্বাসের পথ বন্ধ হয় কুরআনিক সমাজব্যবস্থার ধারাবাহিকতার মাধ্যমে। কারণ, অধিকাংশ সহিফার বিকৃতি বা তাতে মিথ্যার সংমিশ্রণ ঘটে। আজ সেই মিথ্যার সংমিশ্রণ সংবলিত কিতাবের চরম প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা সমাজে জাজ্বল্যমান। সারবত্তা হলো ইসলামের বাইরের সকল মত মিথ্যা দ্বারা সংকুচিত হয়ে গেছে।
বস্তুবাদের বর্তমান জয় জয়কারের যুগে এসে আমরা মানবধর্ম নামক এক নব ধর্মের প্রচলন দেখছি। যা আমাদের সেই ভয়ানক মিথ্যার দিকেই ধাবিত করছে নিয়ত। এখানে ধর্মকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে মানুষকে শুধুমাত্র জাগতিক সুখস্বাচ্ছন্দ্যের দিকে প্রতিষ্ঠিত করছে। যার ফলশ্রুতিতে দুনিয়ায় টিকে থাকতে গিয়ে সত্যকে দূরে ঠেলে দিতে কোন দ্বিধা থাকছে না।
এ কথা স্বীকৃত যে, মানব জীবনের শুরুটা সত্যের ওপর হয়ে থাকে। সত্য থেকে বের হওয়া না হওয়া নিজ স্বাধীনতার অধীন। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখো। এটাই আল্লাহর প্রকৃতি, যার উপর তিনি মানব সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটাই সরল ধর্ম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।’ (আল কুরআন-৩০: ৩০)। আবু হুরায়রাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “প্রত্যেক সন্তানই ইসলামী ফিতরাতের/প্রকৃতির উপর জন্মগ্রহণ করে থাকে। অতঃপর তার মাতা-পিতা তাকে ইয়াহুদি, নাসারা অথবা অগ্নিপূজক বানিয়ে ফেলে।” মাতা-পিতা সন্তানকে মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত করে ফেললেও ব্যক্তিকে আল্লাহ জ্ঞানের স্বাধীনতা এবং বিবেক দ্বারা বিচার করে সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতা দান করেছেন (আল কুরআন-৬: ১৩২, ৭: ১৫৫, ১০: ৪১, ১৯: ১২, ৩৪: ৩৭, ৪২: ৩০)। সুতরাং সত্যকে সত্য হিসেবে এবং মিথ্যাকে মিথ্যা হিসেবে চিনে নেয়াটা মানুষের এক বিশাল দায়িত্ব। যার মধ্যে ঈমান নিহিত। আর সত্য কথা বলা মুমিন জীবনের অপরিহার্য গুণ। একজন মুমিনের প্রতি ঈমানের মূল দাবি হলো, সে সর্বাবস্থায় সত্য কথা বলবে, কখনো মিথ্যা কথা বলবে না এবং মিথ্যা সংশ্লিষ্ট সকল বিষয় থেকে দূরে থাকবে। আল্লাহর প্রিয় নবীর (সা) প্রারম্ভিক জীবন ও চরিত্র এই শিক্ষাই দেয় আমাদের। তাঁর সত্যবাদিতার কারণে সবাই তাঁকে আল আমিন বলে ডাকতো। নবুয়তের পর তার বিকাশ ঘটে পূর্ণমাত্রায়। রাসূল (সা) বলেন, “তোমরা সত্যবাদিতাকে আঁকড়ে ধরো। অর্থাৎ সর্বদা সত্য কথা বলবে। কেননা সত্যবাদিতা ন্যায়ের দিকে চালিত করে, আর ন্যায় জান্নাতের দিকে চালিত করে।”

সত্যবাদিতা মানবাত্মার সুন্দরতম ভূষণ এবং মুমিন জীবনের অন্যতম চমৎকার বৈশিষ্ট্য। দ্বীনের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য কেবল বাহ্যিক অলঙ্কার নয় বরং তা অতি সূক্ষ্ম এবং অত্যন্ত ব্যাপক এক বিষয়। মানুষের সকল চিন্তা-পরিকল্পনা, আকিদা-বিশ্বাস, চেষ্টা সাধনা, আচার-আচরণ, কথা ও কাজের সাথে সততার সংশ্লিষ্টতা নিহিত। কোন মানুষের জীবনের সকল বিষয় যদি সূক্ষ্মাতি সূক্ষ্মভাবে এবং নির্ভুলভাবে দ্বীন ও শরিয়তসম্মত পন্থায় বাস্তবায়িত হয়, তাহলেই কেবলমাত্র সেই ব্যক্তিকে ইসলামে সৎলোক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
প্রত্যেক বস্তু মূলের দিকে ধাবিত হয়। মানুষের মনও স্বাভাবিকভাবেই সত্যের (মূল বা ফিতরাত) আলোকেই তার চিন্তাভাবনার পরিস্ফুটন ঘটাতে পছন্দ করে। কিন্তু মিথ্যার সংমিশ্রণ সহকারে কোন কাজ করার অভ্যাস একবার তৈরি হলে, তা থেকে বের হয়ে আসা সহজ থাকে না। আর সত্য এমন একটা বিষয়, যার সাথে মিথ্যা মিশ্রিত হলে সত্যের স্বকীয়তা থাকে না। যেমন, নামাজে সূরা ফাতিহার পাঠে আমরা ‘আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাই’ কথাটির স্বীকৃতি দেওয়ার পরও যখন জাগতিক জীবনে অন্য কোন ব্যক্তি বিশেষের সাহায্য চাই এবং বিষয়টি যখন আত্ম পর্যালোচনায় আসে, তখন হৃদয় ব্যাকুল হয়। এ ব্যাকুলতা মিথ্যা ঢাকবার, সত্যে ফিরে যাবার। কিন্তু ওই সাহায্যের বিষয়টি যখন জীবনের সাথে ট্যাগ হিসেবে লেগে থাকে, তখন স্ব-জ্ঞানে আর নামাজে মন বসে না। এ কথা অনেকেরই মেনে নিতে কষ্ট হয়; কিন্তু এটাই বাস্তবতা।
আমরা আমাদের জীবনের প্রকৃত সমস্যা অনেক সময় বুঝতেই পারি না। আমরা যারা সত্যের সন্ধান বা হিদায়াত পেয়েছি তা যে মূলত আল্লাহ তাঁর রাসূলের মাধ্যমে আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন, যার কল্যাণে আমরা মুসলিম নামে অভিহিত হচ্ছি এবং যার সাথে নিহিত থাকার কারণে স্বেচ্ছায় হোক কি অনিচ্ছায় পৃথিবীতে সমাজ পরিচালনায় এক গুরু দায়িত্বের অধিকারী হয়ে গেছি। তা হলো নিজে সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়া এবং নিজ গণ্ডির মানুষদের সেই সত্যের গুরুত্ব বুঝিয়ে দেওয়া। এই কাজ না করার অর্থ হচ্ছে নিজের প্রকৃতি বা ফিতরাতের সাথে প্রতারণা করা। এর সাথে যোগ হচ্ছে সত্যকে গোপন করার অপরাধ। যার জন্য দুনিয়াতে লাঞ্ছনা-অপমান আর আখিরাতের শাস্তিতো রয়েছেই। পক্ষান্তরে আমরা যদি আমাদের ফিতরাত অনুযায়ী সত্যিকারভাবে দ্বীনের আনুগত্য করি এবং কথা ও কাজের মাধ্যমে তার সত্যতার সাক্ষ্য দিই তাহলে মহান রবের ওয়াদা অনুযায়ী পার্থিব উন্নতি ও সমৃদ্ধিতো পাবোই, পরকালে সাফল্য ও কল্যাণের অধিকারীও হবো। কোন নিমিষে আমাদের উপর ভয়-ভীতি, অপমান-লাঞ্ছনার দ্বারা আচ্ছন্ন মেঘ পরিষ্কার হয়ে যাবে তা হয়তো বুঝতেই পারবো না।
সত্যের সন্ধান পাওয়া আমরা পথ চলতে থাকলে আমাদের প্রকাশ্য শত্রু শয়তান তার চক্রান্ত থামিয়ে দিবে এমন ভাবনার গুড়ে বালি। ডান-বাম, সামনে-পেছনে চতুর্দিক থেকে অতি চাতুরতার সাথে মিথ্যার বীজ আমাদের মনে বপনের বিশাল চেষ্টা সে চালিয়েই যাবে। তার বিপরীতে শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সকল মানুষকে মিথ্যা থেকে বের হবার এক বিপ্লবী যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া ছাড়া উপায় নেই। এই যুদ্ধে আমরা তিনটি কাজ গুরুত্ব দিয়ে করতে পারলে শয়তানের চ্যালেঞ্জ মোটাদাগে মোকাবিলা করতে পারবো বলে ধরে নেওয়া যায়। তা হলো-
এক. সমগ্র জীবনে আকিদা-বিশ্বাস, মূল দৃষ্টিভঙ্গি, নিয়ম-শৃঙ্খলা, কর্মকাণ্ড ইত্যাদি সব কিছুইতেই খুলুসিয়াত আনয়ন এবং কুরআন-হাদিসকে জীবনের মানদণ্ড নির্দিষ্ট করা।
দুই. সমগ্র ফাসেকি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম ঘোষণা করা। যার জন্য প্রথমেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া যে, মিথ্যার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স।
তিন. সংগ্রামের পথ মাড়িয়ে যাওয়ার অংশ হিসেবে আর্থিক অনটন, অপমান, জুলুম-নির্যাতন সহ্য করার প্রস্তুতি ও হিম্মত রাখা।
মহান আল্লাহ আমাদের সমগ্র জীবন থেকে মিথ্যা দূরীভূত করে দিন এবং জীবনকে সত্যের আলোয় আলোকিত করে দিয়ে জান্নাত উপযোগী মানুষে পরিণত করুন। আমিন।

লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply