সত্যপন্থীদের পথচলা কখনো থামবে না -মু. আতাউর রহমান সরকার

“যে সমাজের সার্বিক কর্তৃত্ব ইসলামের হাতে এবং মানুষের আকিদা-বিশ্বাস, ইবাদত, আইন-কানুন, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা,  নৈতিক চরিত্র, পারস্পরিক লেনদেন ইত্যাদি সকল বিষয় ইসলামের প্রাধান্য বিদ্যমান সে সমাজই ইসলামী সমাজ।”
যুগে যুগে সে সমাজ কায়েমের কর্মীরা কায়েমি স্বার্থবাদীদের কর্তৃক হয়েছে নিগৃহীত। হয়েছে নির্মম নির্যাতনের শিকার। ইসলাম মানুষের জন্য প্রদত্ত আল্লাহর বিধান। কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী,  শ্রেণী বা গোত্র এ বিধান রচনা করেনি। ইসলামকে একটি আল্লাহপ্রদত্ত জীবনবিধান হিসেবে গ্রহণ করে যারা মানুষকে তার জীবনের সংস্কার ও সংশোধনের দাওয়াত দিয়েছে তাদেরকে যুগে যুগে অনিচ্ছা সত্ত্বেও জাহেলিয়াতের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছিল। কারণ তার আত্মপ্রকাশই জাহেলিয়াতকে ইসলামের প্রতি আক্রমণ চালাতে বাধ্য করে। যুগে যুগে ইসলাম প্রচার-প্রসারে ভূমিকা গ্রহণকারী কিছু মহান ব্যক্তির ত্যাগ-কোরবানির বদৌলতে ইসলাম আজ অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে। মানবতার মুক্তির জন্য ইসলামের বিজয় অনিবার্য সে কথাই প্রমাণিত হচ্ছে বারবার। প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য সর্বত্র ইসলামের জয়গান শুরু হয়েছে। ইসলামকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন, ব্যক্তিজীবনে ইসলামের পূর্ণ অনুশীলনের মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে কোটি মানুষ শামিল হচ্ছে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে। ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী মানুষের ইন্তিফাদা, কাশ্মিরের স্বাধীনতা আন্দোলন, তুরস্ক, মিসর, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, চেচনিয়ায় ইসলামী জাগরণ শুরু হয়েছে। যেখানেই ইসলামী আন্দোলনের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে সেখানেই ইসলামী আন্দোলনের নেতাদেরকে, সেই দলটিকে চরম নির্যাতন, নিষ্পেষণ সহ্য করতে হয়েছে। কেননা এই দ্বীনি  আন্দোলন এমনই একটি বিপ্লবী আন্দোলনের নাম যার মাধ্যমে ইসলামবহির্ভূত সব কিছু নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। যাবতীয় পাপ, পঙ্কিলতা, মানুষের প্রভুত্ব, জুলুম-নির্যাতন উৎখাত করে মানবতার শান্তি ও মুক্তির বিধান  কায়েম করে ইসলাম। আর তাই যখন থেকে এই দ্বীন পৃথিবীতে কায়েম হয়েছে তখন থেকেই এ দ্বীনের কান্ডারিদের ওপর এই নির্যাতন, চরম পরীক্ষা পতিত হয়েছে। মক্কায় ইসলাম প্রচারের শুরুতেই সাহাবীদের ওপর এই নির্যাতনের স্টিম রোলার চালানো হয়েছে। হযরত বেলাল রা. ছিলেন একজন ক্রীতদাস। ইসলাম গ্রহণের পর থেকে তার মালিক তাকে প্রতিদিন মরুর উত্তপ্ত বালু, পাথরকুচি ও জ্বলন্ত অঙ্গারের ওপর তাকে শুইয়ে রাখতো। টানা অনেক দিন না খাইয়ে রাখতো। পানাহারের সুযোগও দেয়া হতো না। এত উত্তপ্ত বালুতে প্রখর সূর্যলোকে  তাকে শুইয়ে রাখা হতো যে কাঁচা  গোশত রাখলেও তা সিদ্ধ হয়ে যেত। কখনও কখনও গরুর কাঁচা চামড়া বা লোহার বর্ম পরিয়ে উত্তপ্ত রোদে বসিয়ে রাখতো। হযরত খাব্বাব রা: যিনি তলোয়ার বানাতেন তাকে তো ইসলাম গ্রহণের পর বিনিময়ে কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হতো না, ফলে আর্থিকভাবে তিনি একদম নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলেন। এরপর তার ওপর শারীরিক নির্যাতন শুরু হয়। উত্তপ্ত লোহা দিয়ে তার শরীরে ছেঁক দেয়া হতো। উত্তপ্ত কয়লার ওপর তাকে শুইয়ে রাখা হতো। এতে তার শরীরের চর্বি গলে কয়লার আগুন নিভে যেতো। তার ওপর এহেন নির্যাতনে তার শরীরে গর্ত তৈরি হয়েছিল। যা দেখে  পরবর্তী সময়ে হযরত  উমর রা. কেঁদে দিয়েছিলেন। হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. এর চোখের সামনে তার মা, বাবা, ভাই সবাইকে নির্মম নির্যাতন করে শাহাদতের পথে নিয়ে গেছে। তার ওপর চরম জুলুম নির্যাতন করে তাকে বাধ্য করতে চেয়েছিল ঈমান পরিত্যাগ করতে। জান্নাতে যিনি হবেন শহীদের নেতা তিনি ছিলেন হযরত হামযাহ। বদরযুদ্ধে তিনি সবচেয় বেশি কাফের হত্যা করায় কাফেরদের মহা আক্রোশ ছিল তার ওপর। তাই তারা তাকে হত্যা করে হিং¯্রতার চরম নিদর্শন পেশ করে। আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে উতবা হামযার নাক, কান কেটে অলঙ্কার বানিয়েছিল, বুক, পেট চিরে কলিজা বের করে চিবিয়ে  থুথু নিক্ষেপ করেছিল। ভাতিজার এহেন বিকৃত লাশ দেখে আল্লাহর রাসূল সা. কেঁদেই দিয়েছিলেন। হযরত উবাইদা ইবনুল জাররাহ রা: শুধু দ্বীনের খাতিরে বদরের ময়দানে তার পিতার শিরñেদ করেন। এমনই আরও হাজার হাজার সাহাবীর রক্ত, দেহ, ভালোবাসা আর সবচেয়ে প্রিয় জিনিসের কোরবানিকে কবুল করে ইসলামকে আল্লাহর দুনিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। জুলুম নির্যাতন যত বেড়েছে সাহাবাদের ত্যাগ, কোরবানি, দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা ততোই বেড়ে গেছে। জাহেলি আরবদের  সেই সময় পার হলেও দ্বীনের দ্বীনি  আন্দোলেন শত্রুদের বিরোধিতা এক মুহূর্তের জন্যও থামেনি। কায়েমি স্বার্থবাদীরা তাদের লক্ষ্য হাসিলের জন্য সব সময় দ্বীনের কান্ডারিদের হত্যা, নির্যাতন করে দমানোর চেষ্টা করেছে। ১৯৪৫ সালে সাইয়েদ কুতুবের যোগদানে ইখওয়ানুল মুসলিমিন নামে মিসরের ইসলামী সংগঠনের কাজ  জোরদার হয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পর এ দলের জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। মাত্র ২ বছরে সক্রিয় কর্মী সংখ্যা পঁচিশ লক্ষে পৌঁছে। এ ছাড়াও সদস্য, সমর্থক ও শুভাকাক্সক্ষী ছিল কয়েক গুণ বেশি। ফলে ইসলামী আন্দোলনের অনিবার্য পরীক্ষা এসে আপতিত হয় নেতাকর্মীদের ওপর। সাইয়েদ কুতুবসহ নেতারা আটক হন, তাদের জেলে রাখা হয়। প্রচন্ড জ্বরাক্রান্ত অবস্থায়ও তাকে হেঁটে হাতে-পায়ে শিকল পরিয়ে জেল পর্যন্ত হেঁটে যেতে বাধ্য করা হয়। পথে কয়েকবার তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়েন। জেলে ঢোকার সাথে সাথেই জেল কর্মচারীরা তাকে মারপিট করতে শুরু করে এবং দুই ঘন্টা ধরে এ নির্যাতন চলতে থাকে। তারপর একটি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরকে তার ওপর লেলিয়ে দেয়া হয়। কুকুর তার পা কামড়ে জেলের আঙিনায় টেনে নিয়ে বেড়ায়। এ প্রাথমিক অভ্যর্থনার পর সাতঘন্টাব্যাপী তাকে জেরা করা হয়। এত নির্যাতন সহ্য করতে করতে তিনি শুধু বলতে থাকেন আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।
জেলে অন্ধকার তালাবদ্ধ কুঠুরিতে আরও  অন্যান্য রোগে আক্রান্ত থাকা অবস্থায় তার গায়ে আগুনের ছেঁকা দেওয়া হয়। কুকুর লেলিয়ে  নখ ও দাঁতের আঁচড় কাটানো, মাথায় খুব গরম এবং বেশি ঠান্ডা পানি ঢালা হতে থাকে। লাথি, কিল, ঘুষি, অশ্লীল ভাষায় গালাগাল ইত্যাদি ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এক বছর কারাভোগের  পর তাকে নাসের সরকার ক্ষমার আবেদন জানাতে বললে তিনি বলিষ্ঠ ঈমান নিয়ে খুবই চমৎকার ভাষায় প্রত্যাখ্যানমূলক জবাব দেন। এরপর ইরাকের  প্রেসিডেন্টের সুপারিশে তাকে  ছেড়ে বাসস্থানে অন্তরীণ করা হয়। পরবর্তীতে তার ভাই, বোন, প্রায় সাত শ’ মহিলাসহ ২০ হাজারেরও বেশি নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের ওপর নির্যাতনের বিবরণ প্রকাশ করায় টেলিভিশন পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়। সবশেষে ১৯৬৬ সালে আর ও দু’জন সাথীসহ তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। উপমহাদেশে সাইয়েদ আবূল আলা মাওদূদীসহ বর্তমান ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্ব ও কর্মীবাহিনীকে একইভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে।
প্রিয় জন্মভূমি এ বাংলাদেশেও ইসলামের অনুসারীদের কারাবরণ নির্যাতনের নজির ভূরি ভূরি। ইতিহাসও কম দীর্ঘ নয়। অস্বাভাবিক ও বিস্ময়কর ফলাফলের মাধ্যমে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা ইসলামে প্রাথমিক পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণকারী মুসলিমদের ওপর কাফেরদের নির্মম নির্যাতনকে হার মানিয়েছে। ২০১০ সালে রাবি শিবির সেক্রেটারি শরীফুজ্জামান নোমানীকে মাথা দ্বিখন্ডিত করে ও জামালপুরে উপজেলা শিবির সভাপতি হাফেজ রমজান আলীকে চলন্ত  ট্রেনের নিচে ফেলে দিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগ। ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সাংস্কৃতিক সম্পাদক গোলাম মুর্তজা, শিবির নেতা সাবিত, রিপনকে গ্রেফতার  করে ডিবি অফিসে নিয়ে লটকিয়ে নির্র্মম নির্যাতন করে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। বিগত ৫টি বছর প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে ইসলামী আন্দোলনের পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মীকে। রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের মাত্রা খুবই ভয়াবহ। সত্তরোর্ধ্ব এমনকি নব্বই বছরের বৃদ্ধ নেতাকেও কারাভোগ করানো হচ্ছে। বিনা দোষে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছিল শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা এবং মু. কামারুজ্জামানের মতো নির্দোষ ব্যক্তিকে। অমানবিক হয়রানির ফলে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে মৃত্যু বরণ করেছেন এ. কে. এম নাজির আহমেদ, মাওলানা এ কে এম ইউসুফের মত আলেম ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তি। ৮-১০ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৮০-৯০ বছর এর মহিলা, পুরুষ কেউই বাদ পড়েনি কারাগারে যাওয়া থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যালে পড়–য়া ছাত্র, অধ্যাপক তাসনীম আলম ও এ টি এম  আজহারের মতো সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ্যে ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে জেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রখ্যাত আলেম ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন  সাঈদীর ফাঁসির  রায় হলে বিক্ষুব্ধ জনতার ঢলে নির্মমভাবে গুলি করে সারাদেশে ২ দিনে ১৭০ জনকে শহীদ করা হয়। এদের মধ্যে কিছু মহিলাও ছিলেন। হাজার হাজার মেধাবী ছাত্রের ছাত্রজীবন ধ্বংস হয় কারাগারে বিনা দোষে, বিনা বিচারে বছরের পর বছর তারা দিনাতিপাত করছেন।  নির্যাতনে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন অনেকে। সাতক্ষীরার মতো ইসলামপ্রিয় এলাকায় সমগ্র জনপদ ধ্বংসে বুলডোজার দিয়ে মিছমার করে দেয়া হয়েছে নিরীহ জনসাধারণের ঘরবাড়ি,  আসবাবপত্র। এ সকল নির্যাতিত ভাইদের নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন ও শঙ্কিত হলেও নির্যাতনের শিকার ভাইদের বক্তব্য হযরত খাব্বাব রা., হযরত ইউসুফ আ.  এর মতো। মাওলানা মওদুদী রহ. এর ফাঁসির হুকুম হবার পর তাকে ক্ষমা চেয়ে  দয়া ভিক্ষা করার মাধ্যমে মুক্তির জন্য বলা হয়েছিল। তখন তিনি সরাসরি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন “যে জীবন-মৃত্যুর মালিক আল্লাহ,  সে মৃত্যুর ফয়সালা আকাশে হয় জমিনে নয়”। এ  সময়, এভাবে যদি আল্লাহ মৃত্যু নির্ধারণ করে থাকেন, তাহলে কারো সাধ্যে নেই  মৃত্যু ঠেকাবার। আর তা যদি না হয়ে থাকে তাহলে এমন কোন শক্তি নেই মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার। আর শাহাদাতের মৃত্যুই শুধু পারে জান্নাতের নিশ্চয়তা দিতে। আমি ক্ষমা চেয়ে প্রার্থনা করবো যে আমাকে জান্নাত থেকে বাঁচাও? “এভাবে এই যুগের  ইসলামী আন্দোলনের প্রাণপুরুষ সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী সারা বিশ্বের ইসলামী আন্দোলনের জন্য নজির স্থাপন করেছিলেন। তার নজির উপস্থাপনের লোক আজও তৈরি করছে জামায়াত ও ছাত্রশিবির। এই সংগঠনের কর্মীদের শাহাদত বরণ, নির্মম নির্যাতনকে হাসি মুখে বরণ আজ বাংলাদেশের ঘরে ঘরে মুসলমানদের মধ্যে নবতর চেতনার জন্ম দিয়েছে। কুরআনের মর্যাদা রক্ষা, ইসলাম, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত সত্যপন্থীরা। “সত্য সমাগত, মিথ্যা বিতাড়িত। সত্যের বিজয় অবশ্যম্ভাবী।” (সূরা বনি ইসরাইল আয়াত-৮১) সত্য-মিথ্যার এই দ্বন্দ্ব পৃথিবীর শুরু থেকেই। মিথ্যাকে কখনো কখনো সত্যর ওপর বলিষ্ঠ দেখা গেলেও পরিণামে মিথ্যারই পরাজয় ঘটে থাকে। আর বাতিলের অনুসারীরা তো আলো দেখে ভয় পাবেই। তাদের প্রধান বিরোধিতা মূলত সত্যের দ্যুতির কাছে। পার্থিব ক্ষমতাকে তারা তাদের দম্ভ-অহঙ্কারের বাহন হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। তাই আলোর মিছিলকে তারা একেবারেই সহ্য করতে পারে না। এ কারণেই কল্যাণের কাফেলার সেনানীকে তারা নানাভাবে অপদস্থ-পর্যুদস্থ করতে কসুর করে না। জুলুম নির্যাতন নিষ্পেষণ, মানবাধিকার হরণ, ব্যক্তি ইমেজ বিনষ্টসহ যাবতীয় ঘৃণ্য পন্থা তখন ব্যবহারিত হয় সত্যপথের পথিকদের বিরুদ্ধে। কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে অবরুদ্ধ, রিমান্ডের নামে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। যুগে যুগে সত্যের বাণী বাহকরা শিকার হয়েছেন বতিলের এই নির্মমতার।
বাংলাদেশের এমন কোন অঞ্চল নেই যে অঞ্চল আন্দোলনে নিয়োজিত শহীদের রক্তে রক্তাক্ত হয়নি। রাজশাহী, খুলনা, সিলেট কুষ্টিয়া, কুমিল্লার মতো সব এলাকার মাটি উর্বর হয়েছে শহীদের রক্তে। আর সেই সব উর্বর মাঠিতে দ্বিগুণ জজবা নিয়ে ইসলাম প্রচারের কাজ করে যাচ্ছে ইসলামপ্রিয় জনতা। তাই নিবন্ধন বাতিল, যুদ্ধাপরাধে দুষ্ট, এমন হাজার অপবাদ দিয়ে ইসলামী সংগঠনের কাজ নিষিদ্ধ করার অব্যাহত প্রচেষ্টার পরও আল্লাহমুখী সাধারণ মানুষ দৌড়ে ছুটে আসছে এই আদর্শের পথে। তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে উপজেলা নির্বাচনে  সাধারণ মানুষের ব্যাপক জনসমর্থন। চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান (পুরুষ ও মহিলা) পদেপ্রার্থীদের বিজয় জানিয়ে দিচ্ছে ইসলামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ এই জনগণ তাদের সৎ নেতৃত্ব খুঁজে পেয়েছে। ঠিক যেভাবে যুগে যুগে ইসলামী আন্দোলনের ত্যাগের রাস্তা ধরে বিজয় এসেছে তেমনি একইভাবে বাংলাদেশেও ইসলামপন্থীদের বিজয় অতি সন্নিকটে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে বলেছেন “আল্লাহ এই নূরকে অবশ্যই প্রজ্বলিত করবেন, মুশরিকদের নিকট তা যতই অসহনীয় হোক না কেন।” এই অলি-আউলিয়াদের পুণ্যভূমি শহীদ গাজির এই মাটিতে এই অপ্রতিরোধ্য দুর্বার আন্দোলন এগিয়ে যাবেই। নবী-রাসূল  থেকে শুরু করে সবাই মানুষকে মানুষের গোলামি থেকে মুক্ত করার ব্রত নিয়ে এগিয়ে গেছেন। মহান রবের প্রদর্শিত পথে আহবান করেছেন। তাদেরকেই ক্ষমতাসীনদের এই জুলুমকে বরণ করে নিতে হয়েছে। তথাপি তাঁরা এতটুকু থমকে দাঁড়াননি, এখনও। বরং দ্বিগুণ-ত্রিগুণ বেগে সম্মুখে পাড়ি জমিয়েছে। অবশেষে বাতিলের  সব দম্ভ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। বাতিলরা প্রত্যাশা করে এভাবে হয়তো এই আলোর কাফেলাকে স্তব্ধ করে দেয়া যাবে। কিন্তু তাদের সেই আশাকে দুরাশায় পরিণত করে কাফেলার মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে চলছে। সত্যের সেনানীরা খুবই উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে দ্বীনি দায়িত্ব পালনে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। সময়ের ব্যবধানে প্রমাণিত হবে সত্যপন্থীদের পথচলা কখনো থামবে না।
লেখক : সাবেক কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply