সন্তানের কফিনের ভার বহন বড়ই কঠিন

ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম

পৃথিবীতে সব সন্তানই পিতা-মাতার অতি আদরের। মায়ের নাড়িছেঁড়া ধন কলিজার টুকরা সন্তান পিতা-মাতার যোগ্য উত্তরসূরি। সেই সন্তান যদি হয় পিতা-মাতার চক্ষুশীতলকারী, যোগ্যতা ও আমলে উত্তম তাহলে তো কোনো কথাই নেই। এমনই এক শ্রেষ্ঠ সন্তান আমাদের মাঝ থেকে চিরবিদায় নিয়ে পরপারে পাড়ি জমালেন, তিনি হলেন বিশ্ববিখ্যাত মোফাচ্ছের-ই কুরআন হযরত মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সুযোগ্য সন্তান দেশবরেণ্য আলেম মাওলানা রাফীক বিন সাঈদী। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। পৃথিবীতে প্রতিটি মৃত্যুই আমাদের কাছে বেদনার। কিন্তু কিছু কিছু বিয়োগ আমাদের কাঁদায় যুগ যুগ ধরে। পিতা-মাতার ঔরসে জন্ম নেয়া অনেক সন্তান-ই তাদের যোগ্যতা দক্ষতায় বনে যান জাতীয় সম্পদে। তেমনই একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ রাফীক বিন সাঈদী। পিতৃ পরিচয়ের পাশাপাশি দেশব্যাপী খুব অল্প সময়ে জনপ্রিয় বক্তা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। রাফীক বিন সাঈদীর আকস্মিক ইন্তিকালে জাতি একজন খ্যাতিমান আলেমে দ্বীনকে হারালো। তিনি ছিলেন আল্লাহর দ্বীনের জন্য নিবেদিতপ্রাণ একজন আলেম। তিনি ইসলাম প্রচার ও আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য সারা জীবন সংগ্রাম করে গেছেন। তার পিতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের কারাগার থেকে মুক্ত করার কঠিন সংগ্রামে তিনি নিয়োজিত ছিলেন। আর এ অবস্থায়ই তিনি দুনিয়া থেকে চলে গেছেন।
তাছাড়া দিগন্ত টিভিতে সরলপথ পরিচালনা করতে গিয়ে ফুটে ওঠে তার মেধার প্রস্ফুটন। পিতার মতোই পরম বিনয়ী যেন তার মর্যাদার আরেক ভূষণ। রাফীক বিন সাঈদীর সাথে অনেকবার সাক্ষাৎ হয়েছে, আলাপ হয়েছে কিন্তু সবই যেন আজ নিকট অতীত স্মৃতির ফ্রেমে আবদ্ধ। একটি স্মৃতিকথা আজও মনে হয় কানে ভাসছে। আমি কারাগার থেকে বের হওয়ার পর মাসুদ বিন সাঈদী আমাকে ফোন করে আলাপ শেষ করে বললেন, রেজাউল ভাই এই নিন বড় ভাইয়ের সাথে কথা বলুন। রাফীক ভাই সালাম দিয়ে বললেন, ‘আপনার শরীর কেমন আছে? আমরা আপনার জন্য অনেক দোয়া করেছি, অনেক কান্নাকাটি করেছি।’ আজ এখন আমরা সবাই তার জন্য অনেক অনেক দোয়া করি। তাকে হারিয়ে আজ কাঁদছে দেশবাসী।
যা আমার মতো অনেককেই কাঁদায় প্রতিটি মুহূর্তে পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে। রাফীক ভাইকে হারানোর এই বেদনা আমাদের নিকট কিছু সময় কিছু কাল আর দিবসে আবদ্ধ হবে এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু কে সান্ত্বনা দেবে জনম দুঃখিনী মাকে আর প্রিয় পিতাকে যারা আমৃত্যু বয়ে বেড়াবেন সন্তান হারানোর বেদনা? যারা শত সহস্র বিনিদ্র রজনী কাটিয়ে দেবেন জায়নামাজে বসে আল্লাহর দরবারে! চোখের পানি ফেলতে থাকবেন একান্ত নির্বিঘেœ। কে সান্ত্বনা দেবে তাদেরকে? রাতের পর পর রাত তাহাজ্জুতের নামাজ পড়ে সিজদায় পড়ে দোয়া করবেন, হে আল্লাহ, তুমি আমার কলিজার টুকরা সন্তানকে জান্নাত দিও! পৃথিবীতে এমন পিতা-মাতা সার্থক সন্তান আছে কয়জনের!
জন্মের পর মানুষের মৃত্যুই একমাত্র অবধারিত বস্তু। মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাবার নেই উপায়। কিন্তু রাফীক বিন সাঈদীর জীবনের সীমানা যদিও এটাই ছিল শেষ, তারপরও অনেক বেদনার পাহাড় তাকে বয়ে বেড়াতে হয়েছে মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত। তার জন্মের পর যে পিতার জনপ্রিয়তা দেখলেন বিশ্বখ্যাতি, মৃত্যুর সময় দেখলেন শুধুমাত্র ইসলামী আন্দোলন করার অপরাধে সেই বৃদ্ধ পিতাকে টেনেহিঁচড়ে অসুস্থ অবস্থায় তথাকথিত বিচারের নামের ওই ট্রাইব্যুনালে দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে প্রায় দুটি বছর। পৃথিবীর সবচেয়ে নোংরা ভাষা প্রয়োগ করা হচ্ছে তার বিরুদ্ধে। একজন সন্তানের পক্ষে তা কতটুকু সহ্য করা সম্ভব? এই কষ্টই কি তাকে ব্রেইনস্ট্রোকের দিকে ধাবিত করেছে? এর কোন জবাব মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট আছে কি?
প্রায় দুই বছর থেকেই রাফীক বিন সাঈদীর নিয়মিত ট্রাইব্যুনালে যাওয়া এটা তার রুটিনওয়ার্ক। ট্রাইব্যুনালে এসে পিতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার কার্যক্রম দেখাশুনার কাজ তিনিই করতেন। তবে তার বিদায়ের দিনটি ছিল ব্যতিক্রম। ঘড়িতে তখন বেলা ১টা। বিচারপতিরা এজলাস ত্যাগ করেছেন। কাঠগড়া থেকে নিচে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। ঠিক তখনই হঠাৎ করে বুকে ব্যথা অনুভব করলেন তার বড় ছেলে মাওলানা রাফীক বিন সাঈদী। দ্রুত নিচে নেমে এলেন। তাকে ছোটভাই মাসুদ গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেলেন ইব্রাহীম কার্ডিয়াক হাসপাতালে। কিন্তু কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা সেখানে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এভাবেই হার্ট অ্যাটাকে ইন্তিকাল করেছেন মাওলানা রাফীক বিন সাঈদী। পুত্রের জানাজায় অংশ নিতে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী প্যারোলে মুক্তি নিয়ে এলেন। ছেলের জানাজায় ইমামতি করেন পিতা নিজেই। মাত্র কিছুদিন আগেও প্যারোলে মুক্তি পেয়ে মায়ের জানাজায়ও ইমামতি করেছিলেন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। ভাগ্যের কী নির্মম বাস্তবতা!
একজন পিতার জন্য সন্তানের জানাজার ইমামতি সত্যিই কঠিন। সন্তানের কফিন কাঁধে নেয়া একজন পিতার জন্য অনেক কষ্টের অনেক বেদনার। সেই কঠিন কাজটিই করতে হয়েছে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেবকে। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত মতিঝিল বালক উচ্চবিদ্যালয়ে মাওলানা রাফীক বিন সাঈদীর জানাজায় অংশ নিতে সারা দেশ থেকে অনেক ভক্ত অনুরক্তরা এসে মাঠ কানায় কানায় পরিপূর্ণ। লাখ জনতা অপেক্ষা করছে তাদের প্রিয় নেতা আর ভালোবাসার মানুষটি কখন আসবে। গোটা মাঠে গগনবিদারি আহাজারি। কালেমায়ে শাহাদাতে মুখরিত। অনেক অপেক্ষার পালা শেষে মাঠে উপস্থিত হলেন বিশ্ববরেণ্য মোফাচ্ছেরে কুরআন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সম্মানিত নায়েবে আমীর মজলুম জননেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। চতুর্দিক থেকে শুধু কান্নার আওয়াজ গোটা আকাশ বাতাসকে ভারী করে তুলেছে। পুলিশ র‌্যাব বেষ্টিত গাড়ি থেকে নেমেই মর্দে মুজাহিদ ঠিক আগের মতই প্রাণখুলে লাখো জনতাকে সালাম জানালেন। লাখো জনতা কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে তাদের প্রিয় নেতার সালামের জবাব দিলেন। এরপর তিনি বললেন, ‘হায় আল্লাহ আমার কলিজার টুকরা সন্তান গতকাল ইন্তেকাল করলো আর আমাকে আজ আসরের সময় জানানো হলো। হায় আল্লাহ! মাত্র কয়েকদিন আগে এখানে আমার মায়ের জানাজা পড়িয়ে গেলাম। এখন আবার আমার কলিজার টুকরা সন্তানের জানাজা পড়তে আসতে হলো। হায়, তুমি আমাকে ধৈর্য ধারণের তৌফিক দাও। হায় আল্লাহতায়ালা তুমিতো জানো একজন পিতার পক্ষে সন্তানের কফিন বহন করা কত কঠিন! আমি মনে করেছিলাম আমার এই সন্তান আমার জানাজার ইমামতি করবে। কিন্তু এখন আমাকেই সন্তানের জানাজার ইমামতি করতে হচ্ছে। হায় আল্লাহতায়ালা তুমি আমার সন্তানকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করো।’ এভাবেই তিনি সন্তানের জন্য সবাইকে নিয়ে মুনাজাত করলেন।
মজলুম জননেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী অত্যন্ত দৃঢ়কণ্ঠে বললেন-     ‘হায় আল্লাহ, তুমি সাক্ষী, তোমার কসম খেয়ে বলছি, ১৯৭১ সাল নিয়ে আমার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগই মিথ্যা বানোয়াট। নাস্তিকরা কুরআনের কথা সহ্য করতে পারে না বলে আমাকে তথাকথিত যুদ্ধাপরাধ বিচারের নামে কারাগারে আটক করে রাখা হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন- ‘হায় আল্লাহ তোমার দরবারে আমি শাহাদাতের মউত কামনা করি। কিন্তু বর্তমান সরকার আমাকে যেভাবে খুনি, ধর্ষণকারী বানিয়ে শাস্তি দিতে চায় তার জন্য একদিনের শাস্তিও তুমি আমাকে দিও না। তুমিই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিচারক। হায় আল্লাহতায়ালা, এই জালেম সরকারের হাত থেকে তুমি আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে রক্ষা করো।
লাখো জনতার চোখের পানি আর আমীন আমীন আওয়াজ আল্লাহর আরশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এরপর প্রিয় নেতার ইমামতিতে সালাতুল মাগরিবের নামাজ আদায় আর সংক্ষিপ্ত মুনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এই বিশাল স্মরণকালের ঐতিহাসিক জানাজার আয়োজন। এরপর ভিড় শুরু হয় চিরনিদ্রায় শায়িত সবার প্রিয় মানুষ রাফীক বিন সাঈদীকে শেষবারের মত একবার দেখবার প্রতিযোগিতায়। কিন্তু মজলুম জননেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেবের শেষদৃশ্যটি সবাইকে কাঁদিয়েছে বেশি। যখন সাঈদী সাহেব তার কলিজার টুকরা সন্তানের কফিনের পাশে বসে সন্তানের কফিনের মাথায় হাত ভুলিয়ে দিয়ে দোয়া করছেন। এটাই সন্তানের সাথে পিতার শেষ দেখা। তিনি ইচ্ছে করলেই কালকে আবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া করতে পারবেন না। পিতা চোখের পানি মুছতে মুছতে পুলিশের বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে গাড়িতে করে আবার কারাগারের দিকে পাড়ি দিচ্ছেন আর কফিনের পাশে বসে রাফীক বিন সাঈদীর এতিম সন্তানেরা বাবার জন্য পরিবারের সদস্যদের সাথে চোখের পানি ফেলছে। তাদের সান্ত্বনা দেবার সাধ্য কার!!

লেখক : সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ও
সহকারী সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা
mrkarim_80@yahoo.com

SHARE

Leave a Reply