সন্ত্রাস প্রতিরোধে গণশপথ । আদিলুর রহমান

সন্ত্রাস প্রতিরোধে গণশপথ । আদিলুর রহমানশিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস ও সহিংসতার বিষয়টি জাতীয় উৎকণ্ঠায় পরিণত হয়েছে। পাকিস্তান আমলে শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ ছিল। ব্রিটিশ আমলে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থনপুষ্ট ছাত্রসংগঠনের অস্তিত্ব এবং চরম সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সত্ত্বেও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া শিক্ষাঙ্গনে কোনো সহিংসতা ছিল না। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক তৎপরতায় ছাত্রসমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল শুধু রাজনৈতিক প্রশ্নে।
সম্ভবত আইয়ুব খানের শাসনামল থেকেই শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসের সূচনা হয়। ওই সময়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ফেডারেশন (এনএসএফ) নামে একটি ছাত্রসংগঠন গঠিত হয়। এনএসএফ-এর ক্যাডাররা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে দেশের প্রধান শিক্ষাঙ্গন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে।
১৯৭৩ সালের পর দৃশ্যপট সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। পাকিস্তানি শাসনের অবসান এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ছাত্রকর্মীদের প্রত্যাবর্তনের পর নতুন করে ছাত্রদের মধ্যে রাজনৈতিক ও আদর্শগত মেরুকরণের ফলে শিক্ষাঙ্গন দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও সহিংসতার ক্ষেত্রে পরিণত হয়। জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা এমনি ভয়াবহ রূপ নেয় যে, তা বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৯৯৩ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘বিশ্বের সর্বাধিক সংঘাতপূর্ণ শিক্ষাঙ্গন’ বলে চিহ্নিত করে। ‘তিন দশকব্যাপী শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা’ শিরোনামে দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত (৪ মে ২০০১) একটি জরিপে দেখা গেছে যে, ১৯৭৪ সাল থেকে তিন দশকে শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতায় খুন হয়েছে ১২৮ জন, মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে ৪২৯০ জন। নিহতদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭২, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১১, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫ জন। উল্লেখযোগ্য সবগুলো ছাত্রসংগঠন ভয়াবহ এই সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিক্ষাঙ্গনে ভয়াবহ সহিংসতার কারণ হচ্ছে উপদলীয় কোন্দল, বিরোধী ছাত্রসংগঠন ও উপদলকে হঠানোর উদ্যোগ, আধিপত্য বিস্তারের জন্য আবাসিক হল দখল, টেন্ডার ব্যবসা ও ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি।
সব বড় রাজনৈতিক দল এবং ব্যক্তিগতভাবে অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতাই সশস্ত্র ক্যাডার পোষে এবং এদের যোগান দেওয়া হয় ছাত্রসংগঠন ও উপদল থেকে। এ ধরনের সশস্ত্র ক্যাডারদের অভিভাবক বা ‘গডফাদার’ রয়েছে। প্রশাসনে গডফাদারদের ক্ষমতা ও প্রভাব থাকায় ক্যাডারদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয় না। কাজেই এদের শাস্তি দেওয়ার জন্য বিভিন্ন সময়ে সরকার অনেক আইন পাস করলেও কোন সরকারই শিক্ষাঙ্গনে শান্তি পুনরুদ্ধারে সক্ষম হয়নি।
১৯৭৪ সাল থেকে শিক্ষাঙ্গনে খুন, জখম ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে সহিংসতা চরম রূপ ধারণ করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর হামলা শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ধর্ষণ, সম্ভ্রমহানি, অপহরণ, উত্ত্যক্ত করা এবং জোরপূর্বক বিয়ে করা এখন শিক্ষাঙ্গন সহিংসতার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ ছাড়াও রয়েছে বলপূর্বক আবাসিক হল দখল, আবাসিক হলে বসবাসকারী বিরোধী ছাত্রদের হল থেকে বিতাড়িত করা, সাধারণ আবাসিক ছাত্রদের তাদের কক্ষে ছাত্রসংগঠনের কর্মীদের নিয়ে সহাবস্থানে বাধ্য করা এবং দলীয় মিছিল ও আন্দোলনে অংশগ্রহণে তাদের বাধ্য করার মতো সহিংস তৎপরতা।
আমাদের দেশে পরমতসহিষ্ণুতা নেই। গণতন্ত্রে অন্যের মতকে শ্রদ্ধা করা স্বাভাবিক প্রবণতা। কিন্তু বেপরোয়া তরুণ রাজনীতিক থেকে শুরু করে প্রাপ্ত বয়স্ক পর্যন্ত আমিত্ব আর আমার দল শ্রেষ্ঠ এই মন্ত্রে উজ্জীবিত। দৈনিক সমকাল পত্রিকায় ৯ অক্টোবর প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে একদল সন্ত্রাসী বেধড়ক পেটাতে পেটাতে প্রশ্ন করে ‘তুই শিবির কর্মী। স্বীকার কর। নইলে তোর রক্ষা নেই। হলে কে কে শিবিরের সঙ্গে জড়িত তোকে বলতে হবে। শিবিরের সঙ্গে জড়িত নেই। এই স্বীকারোক্তির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে নির্যাতন। রোববার রাত ৮টা থেকে ১টা পর্যন্ত কিল-ঘুষি ও লাঠি দিয়ে আবরারকে পেটানো হয়। একটি সংগঠনের ছাত্রনেতা ও কর্মীরা আবরার ফাহাদকে বেধড়ক পিটিয়ে হত্যা করে।
এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় সারা দেশের মানুষ। আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। বুয়েটের শিক্ষার্থীরা তাদের সহপাঠী হত্যার প্রতিবাদে আন্দোলনে নামে। অবশেষে গণশপথের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
১৬ অক্টোবর বুধবার দুপুরে এই গণশপথ পরিচালনা করে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী রাফিয়া রিজওয়ানা। উপস্থিত সকলে বুকে হাত রেখে দাঁড়িয়ে শপথ বাক্য পাঠ করেন। শপথ অনুষ্ঠানের আগে প্রথমে আবরারের প্রতি সম্মান জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
শপথবাক্য লেখা ছিল- ‘আমি প্রতিজ্ঞা করছি যে, আজ এই মুহূর্ত থেকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার কল্যাণ ও নিরাপত্তার নিমিত্তে আমার ওপর অর্পিত ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক, নৈতিক ও মানবিক সকল প্রকার দায়িত্ব সর্বোচ্চ সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করব। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় আমার জ্ঞাতসারে হওয়া প্রত্যেক অন্যায়, অবিচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমি সর্বদা সোচ্চার থাকব। আমি আরও প্রতিজ্ঞা করছি যে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল প্রকার সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির উত্থানকে আমরা সম্মিলিতভাবে রুখে দেবো। নৈতিকতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সব ধরনের বৈষম্যমূলক অপসংস্কৃতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার আমরা সমূলে উৎপাটিত করব। এই আঙিনায় আর যেন কোনও নিষ্পাপ প্রাণ ঝড়ে না যায়। আর কোনও নিরপরাধ শিক্ষার্থী যেন অত্যাচারের শিকার না হয়। তা আমরা সবাই মিলে নিশ্চিত করব।’
শপথ মানুষের জীবনকে সুন্দর, জ্ঞানগত পরিপূর্ণতা, মানুষের কল্যাণকামী ও উন্নত আমলের ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা পালন করে।
শপথের অর্থ : শপথ এটি বাংলা শব্দ। যার অর্থ চুক্তি, অঙ্গীকার, সঙ্কল্প, ক্রয়-বিক্রয় করা, আদান-প্রদান, প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা ও ঐকান্তিক সাধনা।
ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় বাইয়াত (শপথ) হলো আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি ও রেজামন্দি অর্জনের লক্ষ্যে নিজের জান ও মালকে ইসলামী জীবনযাত্রার দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা সত্তার নিকট আনুগত্যের শপথের মাধ্যমে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করার ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতির নাম।

কুরআনে শপথ : আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, যখন তারা বৃক্ষের নিচে আপনার কাছে শপথ করল। আল্লাহ অবগত যা তাদের অন্তরে বিদ্যমান। অতঃপর তিনি তাদের প্রতি প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে আসন্ন বিজয় পুরস্কার দিলেন।” (সূরা ফাত্হ : ১৮)
আল্লাহ তা‘আলা আরোও বলেন, “হে নবী, ঈমানদার নারীরা যখন আপনার কাছে এসে আনুগত্যের শপথ করে যে, তারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, তাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না, জারজ সন্তানকে স্বামীর ঔরস থেকে আপন গর্ভজাত সন্তান বলে মিথ্যা দাবি করবে না এবং ভালো কাজে আপনার অবাধ্যতা করবে না, তখন তাদের আনুগত্য গ্রহণ করুন এবং তাদের জন্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল অত্যন্ত দয়ালু।” (সূরা মুমতাহিনা: ১২)

হাদীসে শপথ : হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমরা যখন রাসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট নসিহত শ্রবণ ও আনুগত্যের ওপর বাইয়াত (শপথ) গ্রহণ করতাম, তখন তিনি আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী তা পালন করার অনুমতি প্রদান করেছেন।” (সহীহ বুখারী: ৯/৭২০২)

রাসূলের নিকট সাহাবাদের শপথ : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে সাহাবীগণ বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে বাইয়াত (শপথ) নিয়েছেন। ১. বাইয়াতে রিদওয়ান ২. আকাবার শপথ ৩. হুদায়বিয়ার শপথ ও ৪. মক্কা বিজয় উল্লেখযোগ্য।

সাহাবা ও দায়িত্বশীলদের নিকট শপথ : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কেরাম হযরত আবু বকর রাদিআল্লাহু তা‘আলা আনহু এর নিকট বাইয়াত হয়েছেন। মুসলিম সমাজ পরিচালনার দায়িত্ব যার উপর ন্যস্ত হয়েছিল তাঁর নিকট বাইয়াত হওয়া ইসলামের ইতিহাসে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।

বাংলাদেশে সাংবিধানিক পদধারীদের শপথ : বাংলাদেশে সাংবিধানিক পদধারীদের মধ্যে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথগ্রহণ করাকালীন পাঠ করতে হয়: তারা বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করবেন; তারা সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করবেন এবং তারা ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হয়ে সবার প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করবেন। রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার ছাড়া উপরোক্ত অপর সব পদধারীকে শপথ পাঠের পর গোপনতার শপথ পাঠ করতে হয়। প্রধান বিচারপতি বা বিচারককে শপথগ্রহণ করাকালীন উপরোক্ত পদধারীরা যা পাঠ করেন তার অতিরিক্ত পাঠ করে বলতে হয়- তারা বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করবেন।

সবার জন্যে শপথ : শুধুমাত্র নিচের ক্লাসের অবুঝ শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের পাঠের জন্য ও বুয়েট শিক্ষার্থীদের শপথ নয়, স্কুল-কলেজ-মাদরাসা-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সকল শ্রেণি-পেশা-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্যই বাধ্যতামূলক থাকা চাই একটি সহজবুদ্ধ অর্থবহ নিরপেক্ষ শপথ। যা হবে আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের মতই জাতীয় শপথ। যা হতে পারে এমন- ‘আমি শপথ করছি যে, সদা সত্য কথা বলবো ও সৎ পথে চলবো। ছোটদের স্নেহ ও বড়দের মান্য করবো। সুশিক্ষা অর্জনে আমরণ আন্তরিক থাকবো। প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র ও স্বধর্মের সকল বিধি-বিধান মেনে চলবো। ভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, জাতি ও সম্প্রদায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবো। সন্ত্রাস-দুর্নীতি, চুরি-ডাকাতি, যেনা-ব্যভিচার, অন্যায় ও অবিচার করবো না। আমাদের জাতীয় চেতনা, একতা ও স্বাধীনতা সুরক্ষায় সর্বদা সক্রিয় থাকবো। হে আল্লাহ, আমাকে শক্তি দিন, আমি যেন সুনাগরিক হয়ে- প্রতিষ্ঠান, মাতৃভূমি ও মানুষের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করতে পারি, আমিন।’

লেখক : প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply