সন্ত্রাস প্রতিরোধে মহানবী সা.-এর শিক্ষাদর্শন -মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

সন্ত্রাস প্রতিরোধে তরুণ বয়সে মুহাম্মদ সা: যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তার বাস্তবায়ন তার সমগ্র জীবনে পরিলক্ষিত হয়। তিনি নবুওয়ত পাওয়ার পরও এই প্রতিজ্ঞার কথা ভুলেননি। তিনি নবুওয়ত প্রাপ্তির পর কোন একদিন বলেন : “আজও যদি কোন উৎপীড়িত ব্যক্তি ‘হে ফুজুল প্রতিজ্ঞার ব্যক্তিবর্গ’ বলে ডাক দেয়, আমি অবশ্যই তার ডাকে সাড়া দেবো। কারণ, ইসলাম এসেছে ন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং উৎপীড়িত, অত্যাচারিতকে সাহায্য করতে। এভাবে মহানবী সা: মক্কানগরী থেকে অন্যায়, অত্যাচার ও সন্ত্রাস দূর করে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং পরবর্তী সময়ের জন্য সন্ত্রাস প্রতিরোধের আদর্শ রেখে গেছেন।
রাসূল সা: নবুওয়ত লাভের পর আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত অহিভিত্তিক ফর্মুলা অনুযায়ী বিশ্বকে গড়ে তোলার জন্য সার্বিক কার্যক্রম পরিচালিত করেন। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস কোনো সাফল্যজনক পদ্ধতি হতে পারে না। বিশেষ করে সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসবাদ যদি সমাজে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়ে পড়ে- যেমনটি মহানবী সা:-এর আবির্ভাবের আগে আরবে হয়েছিল, তাহলে সন্ত্রাস নির্মূলে সন্ত্রাসী নির্মূলের নির্বুদ্ধিতাগত নীতির ফলে পুরো সমাজটাকেই প্রায় নির্মূল করে ফেলতে হবে। আবার সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করার কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বসে থাকলে সন্ত্রাস ক্রমশ বৃদ্ধি পাবে। উভয় অবস্থায়ই সমাজের সর্বনাশ অনিবার্য। তাই মহানবী সা: সন্ত্রাস প্রতিরোধে মধ্যপন্থা গ্রহণ করেছিলেন। বিশ্ব থেকে সন্ত্রাস নির্মূল করে তথায় শান্তি স্থাপনের চেষ্টায় মহানবী সা: তাঁর সমগ্র নবুওয়তি জীবন ব্যয় করেছিলেন। সন্ত্রাস প্রতিরোধ বা নির্মূলে তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পদক্ষেপ অগণিত। নিম্নে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো-

বাইআতে আকাবা
নবুওয়তের দ্বাদশ বছর হজ উপলক্ষে মক্কায় আগত লোকদের মধ্যে ১২ জন রাসূল সা:-এর সাথে আকাবা নামক স্থানে সাক্ষাৎ করলে তারা তাঁর নিকট ইসলাম গ্রহণপূর্বক অনৈসলামিক কার্যকলাপ পরিত্যাগ করার অঙ্গীকার করলেন। এই অঙ্গীকার গ্রহণ অনুষ্ঠানকে আকাবার প্রথম বাইয়াত বলা হয়। এই বাইআতে সাহাবাগণ যে বিষয়গুলোর ওপর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন তার বিবরণ দিয়ে বাইআতের অন্যতম সদস্য উবাদা ইবনুস সামিত রা: বলেন : “আমরা রাসূল সা:-এর সাথে অঙ্গীকার করেছিলাম যে, আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদার (শরিক) করবো না, চুরি-ডাকাতি করবো না, ব্যভিচার করবো না, সন্তান হত্যা করবো না, কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটাবো না এবং ন্যায়সঙ্গত ব্যাপারে রাসূল সা: এর অবাধ্যতা করবো না। অতঃপর রাসূল সা: বললেন : “এসব অঙ্গীকার পূরণ করলে তোমাদের জন্য জান্নাত রয়েছে। আর এর কোন একটি ভঙ্গ করলে তোমাদের পরিণতি আল্লাহর হাতে ন্যস্ত থাকবে। ইচ্ছে করলে মাফ করে দেবেন, ইচ্ছা করলে তিনি শাস্তি দেবেন। এই প্রতিজ্ঞার বিষয়াবলির সবগুলোই প্রত্যক্ষভাবে সন্ত্রাসের সাথে সম্পৃক্ত। তাই মহানবী সা: সন্ত্রাস প্রতিরোধে সর্বপ্রথম তার সাহাবাদেরকে সকল সন্ত্রাস এবং সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলেন, যার ফলে পরবর্তীকালে মক্কা-মদিনাসহ সমগ্র ইসলামী বিশ্ব থেকে সন্ত্রাস নির্মূল হয়েছিলো।

মদিনার সনদ
কাফির-মুশরিকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মহানবী সা: মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় স্থায়ীভাবে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে মদিনায় বসবাসকারী অন্যান্য ধর্মাবলম্বী বিশেষত ইয়াহুদিদের সাথে তিনি শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেন, যা ইতিহাসে মদিনার সনদ (ঈযধৎঃবৎ ড়ভ গধফরহধ) নামে খ্যাত। নবী করীম সা:-এর পক্ষ থেকে কুরাইশি, মদিনাবাসী, তাদের অধীনস্থ এবং তাদের সাথে সংশ্লিষ্টদের এবং জিহাদে অংশগ্রহণকারী মুমিন ও মুসলিমদের মধ্যে সম্পাদিত এ অঙ্গীকারনামায় সন্ত্রাস প্রতিরোধক যে ধারাগুলো ছিলো তা নিম্নরূপ :
১.    যারা বাড়াবাড়ি করবে, সকল সত্যনিষ্ঠ মুসলিম তাদের বিরোধিতা করবে। ঈমানদারদের মধ্যে যারা জুলুম অত্যাচার, পাপ, দাঙ্গা-হাঙ্গমা বা ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করবে, সকল মুমিন তাদের বিরোধিতা করবে। ২. মু‘মিনরা সম্মিলিতভাবে অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে থাকবে। অন্যায়কারী কোন মু‘মিনের সন্তান হলেও এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হবে না।
৩.    কোন ব্যক্তি যদি কোনো মু‘মিনকে হত্যা করে এবং তার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে এর পরিবর্তে তার কাছ থেকে কিসাস আদায় করা হবে। অর্থাৎ হত্যার অপরাধে অপরাধী হওয়ায় তাকেও হত্যা করা হবে। তবে যদি নিহত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনকে হত্যাকারী ক্ষতিপূরণ দিয়ে সন্তুষ্ট করতে পারে, তবে সে ক্ষেত্রে কিসাস করা হবে না।
৪.    কোন হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী বা বিদ’আতিকে সাহায্য করা মু‘মিনের জন্য বৈধ বিবেচিত হবে না। অশান্তি সৃষ্টিকারী কোনো ব্যক্তিকে কেউ আশ্রয় দিতে পারবে না। যদি কেউ আশ্রয় দেয় বা সাহায্য করে, তাহলে কিয়ামতের দিন তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হবে। ইহলৌকিক জীবনে তার ফরজ ও নফল ইবাদত কোনটাই কবুল হবে না।

সন্ত্রাসীদের শাস্তিদান
সন্ত্রাস প্রতিরোধে মহানবী সা: সন্ত্রাসীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতেও দ্বিধাবোধ করতেন না। কারণ তিনি জানতেন সন্ত্রাসকে অঙ্কুরেই নির্মূল করা না হলে তা ক্রমেই সমাজ-রাষ্ট্র ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছবে। তখন ইচ্ছা হলেই তা আর নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। যেমন অবস্থা বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে দেখা যাচ্ছে। তাই দূরদর্শী বিশ্বনবী মুহাম্মাদ সা: আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে সন্ত্রাসকেই সমূলেই নির্মূল করেছিলেন।
একটি ঘটনা এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত : “উকল বা উরাইনা গোত্রের কিছু লোক (ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে) মদিনায় এলে তারা অসুস্থ হয়ে পড়ল। নবী সা: তাদেরকে (সদকার) উটের নিকট যাওয়ার এবং পেশাব ও দুধ পান করার নির্দেশ দিলেন। তারা সেখানে চলে গেল। অতঃপর তারা যখন (উটের পেশাব ও দুধ পান করে) সুস্থ হলো তখন নবী সা:-এর রাখালকে হত্যা করল এবং উটগুলো তাড়িয়ে নিয়ে গেল। এ সংবাদ দিনের প্রথম ভাগেই (তাঁর নিকট) এসে পৌঁছল। তারপর তিনি তাদের পশ্চাদ্ধাবন করার জন্য লোক পাঠালেন। বেলা বাড়লে তাদেরকে পাকড়াও করে আনা হলো। অতঃপর তাঁর আদেশে তাদের হাত-পা কেটে দেয়া হলো। উত্তপ্ত শলাকা দিয়ে তাদের চোখ ফুটিয়ে দেয়া হলো এবং গরম পাথুরে ভূমিতে তাদের নিক্ষেপ করা হলো। এমতাবস্থায় তারা পানি প্রার্থনা করছিল কিন্তু তাদেরকে পানি দেয়া হয়নি। আবু কিলাবাহ রহ. বলেন, এরা চুরি করেছিল, হত্যাকান্ড ঘটিয়েছিল, ঈমান আনার পর কুফরি করেছিল এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা: বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল।”

সন্ত্রাসীদের উৎখাতকরণ
দেশ থেকে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সন্ত্রাস নির্মূলের প্রয়োজনের ক্ষেত্রে মহানবী সা: কখনও সন্ত্রাসীদেরকে গোষ্ঠীসহ উৎখাত করেছিলেন। ইয়াহুদি গোত্র বানু নাজির মহানবী সা: কে সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিল। ঘটনা প্রমাণিত হওয়ার পর মহানবী সা: তাদেরকে তাদের আবাসস্থল থেকে উৎখাত করে অন্যত্র পাঠিয়ে দেয়ার মাধ্যমে মদিনাকে সন্ত্রাসমুক্ত করেন।

ঘটনাটির বিবরণ হলো
“সাহাবী আমর ইবনে উমায়্যা আদ-দামরি রা: বানু ‘আমিরের দু’জন লোককে ভুলবশত শত্রুপক্ষ মনে করে হত্যা করেন। প্রকৃত ব্যাপার হলো, বানু ‘আমিরের সাথে মহানবী সা:-এর মৈত্রীচুক্তি ছিল। ফলে মহানবী সা: তাদেরকে ‘রক্তপণ’ দিনে মনস্থ করেন। আর এ কাজে সহযোগিতা ও মধ্যস্থতা করার জন্য তিনি ইয়াহুদিদের সবচেয়ে বড় গোত্র বানু নাজিরের নিকট যান। তাদের ব্যবসা ছিল মদিনা থেকে দুই মাইল দূরে উপকণ্ঠে। বানু ‘আমিরের সাথে বানু নাজিরেরও মৈত্রীচুক্তি ছিল। বানু নাজিরের লোকজন মহানবী সা: কে দেখে আনন্দ প্রকাশ করে বরং তাঁর সাথে প্রথম খুবই ভালো ব্যবহার করে। তারা এ ব্যাপারে তাঁকে সহযোগিতার পূর্ণ আশ্বাস দেয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ষড়যন্ত্র পাকাতে থাকে। মহানবী সা: তাদের একটি দেয়াল ঘেঁষে বসে ছিলেন, তাঁর সাথে আবু বকর, ওমর ও আলী রা: প্রমুখ দশজন সাহাবীও ছিলেন। বানু নাজিরের লোকজন নিজেদের মধ্যে সলাপরামর্শ করতে লাগলেন যে, এমন মোক্ষম সুযোগ আমরা আর কখনো পাবো না। আমাদের কেউ যদি ঘরের ছাদে উঠে তাঁর মাথার ওপর একটি ভারী পাথর ছেড়ে দেয় তাবে আমরা চিরতরে তার হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবো। আমার ইবন জাহহাশ ইবন কা’ব নামে তাদের এক লোক বলল, আমি এ কাজের জন্য প্রস্তুত। এই বলে সে ঠিকই মহানবী সা:-এর ওপর পাথর ছেড়ে দেয়ার জন্য সবার অলক্ষ্যে ঘরের ছাদে উঠে গেল। তখনই মহান আল্লাহ মহানবী সা:কে অহি মারফত এ ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে দেন। সাথে সাথে মহানবী সা: সেখান থেকে উঠে পড়েন এবং কাউকে কিছু না বলে সোজা মদিনায় চলে আসেন। তাঁর সঙ্গে থাকা সাহাবীগণও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তাঁর সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। অতঃপর মদিনা থেকে আগত এক ব্যক্তিকে পেয়ে তাকে মহানবী সা: সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। লোকটি বলল, আমি তাঁকে মদিনায় প্রবেশ করতে দেখেছি। অতঃপর তাঁরা মদিনায় এসে মহানবী সা:-এর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। তিনি তাদেরকে ইয়াহুদিদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার কথা জানালেন এবং সকলকে রণপ্রস্তুতি নিয়ে তাদের মোকাবেলা করার জন্য বের হবার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রা: কে মদিনার দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে তিনি সেনা সমভিব্যাহারে বানু নাজিরের বসতিতে পৌঁছেন। সেখানে পৌঁছে তিনি তাদেরকে চর্তুদিকে থেকে অবরোধ করেন। ছয়দিন অবরোধ করার পর তাদের মনোবল ভেঙে দেয়ার জন্য তাদের খেজুর গাছ কেটে ফেলেন এবং বাগান জ্বালিয়ে দেন।” তখন মহানবী সা:-এর সমর্থনে আয়াত নাজিল হয়। “তোমরা যে খেজুর বৃক্ষগুলো কর্তন করেছ এবং যেগুলো কান্ডের ওপর স্থির রেখে দিয়েছ, তা তো আল্লাহরই অনুমতিক্রমে; তা এ জন্য যে, আল্লাহ পাপাচারীদেরকে লাঞ্ছিত করবেন।” (আল-কুরআন, ৫৯ : ০৫)
মূলত সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে যুদ্ধকৌশল  সেবে এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন ছিল। অবশেষে বানু নাজিরের মনে মহান আল্লাহ ভীতির সঞ্চার করে দিলেন। তারা নিজেদেরই প্রস্তাব দিয়ে দেশ ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাবার পথ বেছে নিলো। অন্যত্র গিয়ে যাতে তারা আবার সন্ত্রাস করতে না পারে সে জন্য মহানবী সা: তাদেরকে সাথে করে অস্ত্র নিয়ে যেতে দেননি। শুধুমাত্র নিজেদের উটের পিঠে করে যে পরিমাণ মালপত্র নেয়া যায় সে পরিমাণই নেয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। এ আদেশ এত কঠোর ছিল যে, তিলতিল করে গড়ে তোলা নিজেদের ঘরবাড়ি তাদের নিজেদের হাতেই ভেঙে ফেলতে হলো। আর তার যতটুকু পারা যায় ততটুকু সাথে নিয়ে অবশিষ্ট আসবাবপত্র ছেড়ে যেতে হলো। তাদের কতক খায়বারে গিয়ে বসতি স্থাপন করে, আর কতক চলে যায় সিরিয়ায়। ফলে মদিনা মুনাওয়ারা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল অভিশপ্ত ইয়াহুদিদের এ গোত্রটির কুটিল ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের হাত থেকে রেহাই পায়।

সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান
সন্ত্রাসীদের নির্মূল করে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মহানবী সা: প্রয়োজন হলেই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতেন। এমনই একটি অভিযান তিনি তৃতীয় হিজরির আউয়াল মাসে মদিনার নিকটবর্তী যু’আমর নামক স্থানে মুসলিমদের পরাজিত ও নিঃশেষ করার দৃঢ় সঙ্কল্পে একত্রিত বনি সা’লাবা এবং বনি মুহারিব গোত্রদ্বয়ের এক বিরাট বাহিনীর বিরুদ্ধে পরিচালনা করেছিলেন। কিন্তু সন্ত্রাসীরা মুসলিম সৈন্যবাহিনীর আগমনের সংবাদে ছত্রভঙ্গ হয়ে আশপাশ পাহাড়গুলোতে আত্মগোপন করে। রাসূল সা: তার অভিযান অব্যাহত রাখেন এবং সৈন্যবাহিনীসহ সন্ত্রাসীদের অবস্থানস্থল পর্যন্ত গমন করেন এবং কিছু দিন সেখানে অতিবাহিত করে মদিনায় ফিরে আসেন।
এই অভিযানের পর পরই মুহারিব গোত্র সন্ত্রাসের পথ পরিহার করে ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষে চলে এসেছিল। তবে সা’লাবা গোত্র এর পরও কিছু দিন ধরে ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচরণ অব্যাহত রাখে। এর ফল হিসেবে ৬২৬-৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে আরো পাঁচটি অভিযান প্রেরণ করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল জাতুর রিকার বিরুদ্ধে মহানবী সা:-এর নেতৃত্ব পরিচালিত অভিযান। পঞ্চম হিজরির মুহররম মাসে পরিচালিত এই অভিযান জাতুর রিকাহ গোত্রের অবাধ্যতামূলক সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে এক বিরাট নিবৃত্তকারী প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এরপর থেকে মহানবী সা:-এর বিরুদ্ধে সা’লাবার তীব্র বিরোধিতার অবসান ঘটে। এবং সপ্তম হিজরির শেষ নাগাদ সা’লাবা গোত্রের মধ্যে ইসলামের দৃঢ় ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিলো। এভাবে মহানবী সা: তাঁর সমগ্র মাদানি জীবনে দেশী ও বিদেশী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাত থেকে সমসাময়িক মদিনাকেন্দ্রিক ইসলামী রাষ্ট্রের এবং পরবর্তীকালের সমগ্র আরব উপদ্বীপকে সন্ত্রাসমুক্ত করে সন্ত্রাস নির্মূলে বিশ্ববাসীর সামনে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে যান। সন্ত্রাস নির্মূলে তাঁর কার্যক্রমের ওপর আত্মবিশ্বাস থেকে তিনি ঘোষণা দিয়ে যান যে, এমন একদিন আসবে যেদিন একজন আরোহী একাকী সানা থেকে হাজরামাউত পর্যন্ত ভ্রমণ করবে এবং সে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কাউকে (কোনো সন্ত্রাসীকে) ভয় পাবে না।”
এ প্রবন্ধে সন্ত্রাস প্রতিরোধে কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা ও রাসূল সা:-এর কার্যক্রম বর্ণনা করার চেষ্টা করা হয়েছে। এ ছাড়াও সন্ত্রাস প্রতিরোধে ইসলাম মানবীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, সামাজিক সাম্য ও অর্থনৈতিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, ধর্মীয় সহনশীলতা বৃদ্ধি, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি রোধ, আদর্শ সমাজগঠন, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছে। আর ইসলামী দন্ডবিধি প্রতিষ্ঠা সন্ত্রাসসহ যেকোনো অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো বর্তমান সৌদি আরব। সেখানে ইসলামী দন্ডবিধি কার্যকর থাকায় অপরাধের হার সারা বিশ্বের চেয়ে অনেক নিচে।

উপসংহার
বিশ্ববাসী ইসলামের ব্যাপক আবেদন থাকা সত্ত্বেও হিংসা ও স্বভাবজাত শত্রুতাবশত অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা বিশেষ করে ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা ইসলাম ও মুসলিমদের নামে অন্যান্য নানা কুৎসা রটাচ্ছে। ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় ইসলাম ও এর অনুসারীরা ইসলামবিরোধীর নিকট থেকে যেসব ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে বর্তমান সন্ত্রাসকে ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত করার অপচেষ্টাও সেসবের অন্যতম। একদিকে ইহুদি-খ্রিষ্টান-পৌত্তলিকদের ষড়যন্ত্র অপরদিকে জন্মগতভাবে ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা ও ভ্রান্তি, এ দুয়ে মিলে ইসলাম আজ পৃথিবীতে ভুলবোঝা ধর্মে পরিণত হয়েছে, যেমনটি বলেছেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী চিন্তাবিদ মুহাম্মদ কুতুব রহ:।
তবে আশার কথা, মুসলিমরা এখন ধীরে ধীরে তাদের অজ্ঞতা ও ভ্রান্তির বেড়াজাল ছিন্ন করার চেষ্টা শুরু করেছে। সন্ত্রাসের সাথে যে ইসলামের কোনো রকম সম্পর্ক নেই সে কথা উপযুক্ত আলোচনায় কিছুটা হলেও স্পষ্ট হয়েছে। ইসলামের অবস্থান কুরআন, হাদিস ও রাসূল সা:-এর জীবনাদর্শে চমৎকারভাবে বিধৃত হয়েছে। কুরআন, হাদিস ও রাসূল সা:-এর জীবনাদর্শ দ্বারা এ কথা প্রমাণিত যে ইসলামের সাথে সন্ত্রাসের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ নয়, বরং চরম বিরোধী। শান্তিকে বিঘিœত করে এমন কোন কর্মকান্ডকে ইসলাম সমর্থন করে না, উপরন্তু বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করাই ইসলামের চিরন্তন নীতি।

ইসলাম স্বভাবগত কারণেই কখনো সন্ত্রাসে বা বিশ্বশান্তি নষ্ট করে এমন কর্মে উৎসাহ, সমর্থন, অনুমোদন দেয় না। মুসলিম কখনো সন্ত্রাসী হতে পারে না। তা ছাড়া গুটিকতক তথাকথিত মুসলিমের কর্ম বিচার করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ধর্ম ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধিান ইসলামকে সন্ত্রাসের সাথে সম্পৃক্ত করা কখনোই উচিত নয়।

SHARE

Leave a Reply