সমাজ বিনির্মাণে যুবদের দায়িত্ব ও কর্তব্য ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম

(২য় পর্ব)

যুবক মনে যেমনি উদ্দীপনা থাকে, তেমনি সত্য গ্রহণে তারা দ্বিধাহীনচিত্তে এগিয়ে যায়। কোন ধরনের জটিলতা কুটিলতা তাদেরকে আটকাতে পারে না সত্যের পথ থেকে। যুবক সব সময় পাওয়ার আশায় ব্যাকুল থাকে, প্রতিবাদে থাকে অটুট। আদর যত্ন, ভালোবাসা তাদের আন্দোলিত করে। আল্লাহ তায়ালা নিজেও তাদের মর্যাদা দিয়েছেন। রাসূল সা. বলেন- যৌবনের ইবাদত আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়। যুবক, তরুণদের পরিচ্ছন্ন বিবেকের মাঝে যদি সত্যটিকে বসিয়ে দেয়া যায়, তাহলে তারা দ্বিধাহীনচিত্তে সেটি গ্রহণ করে এগিয়ে যায় জীবনবাজি রেখে। আর যদি মিথ্যা, কলুষতা তাদেরকে পেয়ে বসে তাহলে অন্ধকার তাদের আচ্ছাদিত করে ফেলে। তখনই ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র অন্ধকারের অতল গহবরে হারিয়ে যায়।
এতে শুধুমাত্র একজন যুবক-তরুণই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি সমাজ রাষ্ট্র। একজন যুবক যদি আলোর সন্ধান পেয়ে যায় তাহলে সত্যকে দুর্বার গতিতে নিয়ে যায় সামনের দিকে। ছুটে চলে লক্ষ্যপানে। তখন আলোকিত হয় ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র। কারণ যুবক মানেই সামর্থ্যবান। যুবক মানেই এগিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ শক্তিমান। সুতরাং তার কাছে যদি সত্য এসে যায় তাহলে সেই টেনে নিয়ে যায় গোটা সমাজকে। হযরত মুসা আ. আসহাবে কাহাফ, ইউসুফ আ.-সহ এরকম অসংখ্য ঘটনা তারই সাক্ষ্য গ্রহণ করে।

ঈমান গ্রহণে অগ্রগামী যুবসমাজ
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মুসা আ.-এর সাথীদের সম্পর্কে আমাদেরকে বলেছেন যে, “আর কেউ ঈমান আনলো না মুসার প্রতি তাঁর কওমের কতিপয় বালক ছাড়া-তাদের নিজেদেরই কওমের নেতৃস্থানীয় লোকদের ভয়ে (তাদের আশঙ্কা ছিল) ফেরাউন তাদের ওপর নির্যাতন চালাবে। আর প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে এই যে, ফেরাউন দুনিয়ায় পরাক্রমশালী ছিল এবং সে এমন লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল যারা কোনো সীমানা মানে না।” (সূরা ইউনুস : ৮৩)
তাফহিমুল কুরআনে সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী (রহ) লিখেছেন, ‘কুরআনের মূল বাক্যে (যুররিয়াতুন) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এর মানে সন্তান-সন্ততি। আমি এর অনুবাদ করেছি নওজোয়ান। কিন্তু এ বিশেষ শব্দটির মাধ্যমে কুরআন মজিদে যে কথা বর্ণনা করতে চায় তা হচ্ছে এই যে, বিভীষিকাময় দিনগুলোতে গুটিকয় ছেলেমেয়েই তো সত্যের সাথে সহযোগিতা করার এবং সত্যের পতাকাবাহীকে নিজেদের নেতা হিসেবে মেনে নেয়ার দুঃসাহস করেছিল। কিন্তু মা-বাপ ও জাতির বয়স্ক লোকেরা এ সৌভাগ্য লাভ করতে পারেনি। তারা তখন বৈষয়িক স্বার্থ পূজা, সুবিধাবাদিতা ও নিরাপদ জীবন যাপনের চিন্তায় এত বেশি বিভোর ছিল যে, এমন কোনো সত্যের সাথে সহযোগিতা করতে তারা উদ্যোগী হয়নি যার পথ তারা দেখছিল বিপদসঙ্কুল। বরং তারা উল্টো নওজোয়ানদের পথ রোধ করে দাঁড়াচ্ছিল। তাদেরকে বলছিল, তোমরা মূসার ধারে কাছেও যেয়ো না, অন্যথায় তোমরা নিজেরা ফেরাউনের রোষাগ্নিতে পড়বে এবং আমাদের জন্যও বিপদ ডেকে আনবে।
কুরআনের এ কথা বিশেষভাবে সুস্পষ্ট করে পেশ করার কারণ হচ্ছে এই যে, মক্কার জনবসতিতেও মুহাম্মাদ সা.-এর সাথে সহযোগিতা করার জন্য যারা এগিয়ে এসেছিলেন তারাও জাতির বয়স্ক ও বয়োবৃদ্ধ লোক ছিলেন না। বরং তারাও সবাই ছিলেন বয়সে নবীন। আলী ইবনে আবী তালেব রা., জাফর ইবনে তাইয়ার রা., যুবাইর রা., তালহা রা., সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রা., মুসআব ইবনে উমাইর রা., আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের রা. মতো লোকদের বয়স ইসলাম গ্রহণের সময় ২০ বছরের কম ছিল। আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা., বিলাল রা. ও সোহাইবের রা. বয়স ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে ছিল। আবু উবাদাহ ইবনুল জাররাহ রা., যায়েদ ইবনে হারেসাহ রা., উসমান ইবনে আফ্ফান রা. ও উমর ফারুকের রা. বয়স ছিল ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। এদের সবার থেকে বেশি বয়সের ছিলেন হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা.। তার বয়স ঈমান আনার সময় ৩৮ বছরের বেশি ছিল না। প্রাথমিক মুসলমানদের মধ্যে শুধুমাত্র একজন সাহাবীর নাম আমরা পাই যার বসয় ছিল নবী সা. এর চেয়ে বেশি। তিনি ছিলেন হযরত উবাদাহ ইবনে হারেস মুত্তালাবি রা.। আর সম্ভবত সাহাবীগণের সমগ্র দলের মধ্যে একমাত্র হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. ছিলেন নবী সা.-এর সমবয়সী।
অর্থাৎ গুটিকয় নওজোয়ানকে বাদ দিয়ে বাকি সমস্ত বনি ইসরাইল জাতির কেউই হযরত মূসাকে নিজের নেতা ও পথপ্রদর্শক হিসেবে মেনে নিয়ে তার আনুগত্য করতে এবং ইসলামী দাওয়াতের কাজে তাকে সাহায্য করতে প্রস্তুত হয়নি। তারপর পরবর্তী বাক্যাংশ এ কথা সুস্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তাদের এ কার্যধারার আসল কারণ এই ছিল না যে, হযরত মূসার সত্যবাদী ও তার দাওয়াত সত্য হওয়ার ব্যাপারে তাদের মধ্যে কোনো সন্দেহ ছিল বরং এর কারণ শুধুমাত্র এই ছিল যে, তারা এবং বিশেষ করে তাদের প্রধান ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ হযরত মূসার সহযোগী হয়ে ফেরাউনের নির্যাতনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হওয়ার ঝুঁকি নিতে রাজি ছিল না। যদিও তারা বংশধারা ও ধর্মীয় উভয় দিক দিয়ে হযরত ইবরাহিম, ইসহাক, ইয়াকুব ও ইউসুফ আ.-এর উম্মত ছিল এবং এ দিক দিয়ে তারা সবাই মুসলমান ছিল। কিন্তু দীর্ঘকালীন নৈতিক অবক্ষয় এবং পরাধীনতার ফলে সৃষ্ট কাপুরুষতা তাদের মধ্যে কুফরি ও গোমরাহির শাসনের বিরুদ্ধে ঈমান ও হেদায়াতের ঝাণ্ডা হাতে নিয়ে নিজেরা এগিয়ে আসার অথবা যে এগিয়ে এসেছে তাকে সাহায্য করার মতো মনোবল অবশিষ্ট রাখেনি।
আসহাবে কাহাফ সম্পর্কে কুরআন আমাদেরকে বলেছে, “আমি তাদের সত্যিকার ঘটনা তোমাকে শুনাচ্ছি। তারা কয়েকজন যুবক ছিলো, তাদের রবের ওপর ঈমান এনেছিলো এবং আমি তাদের সঠিক পথে চলার ক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।” (সূরা কাহাফ : ১৩)
অর্থাৎ আমি তাদের সত্যিকার ঘটনা তোমাকে শুনাচ্ছি। তারা কয়েকজন যুবক ছিলো, তাদের রবের ওপর ঈমান এনেছিলো এবং আমি তাদের সঠিক পথে চলার ক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। এ কাহিনীর প্রাচীনতম বিবরণ পাওয়া গেছে জেমস সারোজি নামক সিরিয়ার একজন খ্রিষ্টান পাদরির বক্তৃতামালায়। তার এ বক্তৃতা ও উপদেশবাণী সুরিয়ানি ভাষায় লিখিত। আসহাবে কাহাফের মৃত্যুর কয়েক বছর পর ৪৫২ খ্রিষ্টাব্দে তার জন্ম হয়। ৪৭৪ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে তিনি নিজের এ বক্তৃতামালা সঙ্কলন করেন। এ বক্তৃতামালায় তিনি আসহাবে কাহাফের ঘটনাবলি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন।
আমাদের প্রথম যুগের মুফাসসিরগণ এ সুরিয়ানি বর্ণনার সন্ধান পান। ইবনে জারির তাবারি তাঁর তাফসিরগ্রন্থের বিভিন্ন সূত্র মাধ্যমে এ কাহিনী উদ্ধৃত করেছেন। অন্যদিকে এগুলো ইউরোপেও পৌঁছে যায়। সেখানে গ্রিক ও ল্যাটিন ভাষায় তার অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত সার প্রকাশিত হয়। গিবন তার ‘রোম সাম্রাজ্যের পতনের ইতিহাস’ গ্রন্থের ৩৩ অধ্যায়ে ঘুমন্ত সাতজন শিরোনামে ঐসব উৎস থেকে এ কাহিনীর যে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়েছেন তা আমাদের মুফাসসিরগণের বর্ণনার সাথে এত বেশি মিলে যায় যে, উভয় বর্ণনা একই উৎস থেকে গৃহীত বলে মনে হয়। যেমন যে বাদশাহর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আসহাবে কাহাফ গুহাভ্যন্তরে আশ্রয় নেন আমাদের মুফাসসিরগণ তাঁর নাম লিখেছেন ‘দাকায়ানুস’ বা ‘দাকিয়ানুস’ এবং গিবন বলেন, সে ছিল কাইজার ‘ডিসিয়াস’ (উবপরড়ঁং) এ বাদশাহ ২৪৯ থেকে ২৫১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রোম সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করেন এবং ঈসা আলাইহিস সালামের অনুসারীদের ওপর নিপীড়ন নির্যাতন চালাবার ব্যাপারে তার আমলই সবচেয়ে বেশি দুর্নাম কুড়িয়েছে।
যে নগরীতে এ ঘটনাটি ঘটে আমাদের মুফাসসিরগণ তার নাম লিখেছেন ‘আফসুস’ বা ‘আসসোস’। অন্য দিকে গিবন তার নাম লিখেছেন ‘এফিসুস’ (ঊঢ়যবংঁং)। এ নগরীটি এশিয়া মাইনরের পশ্চিম তীরে রোমীয়দের সবচেয়ে বড় শহর ও বন্দর নগরী ছিল। এর ধ্বংসাবশেষ বর্তমান তুরস্কের ‘ইজমির’ (স্মার্না) নগরী থেকে ২০-২৫ মাইল দক্ষিণে পাওয়া যায়। (দেখুন ২২২ পৃষ্ঠায়)
তারপর যে বাদশাহর শাসনামলে আসহাবে কাহাফ জেগে ওঠেন আমাদের মুফাসসিরগণ তার নাম লিখেছেন ‘তেযোসিস’ এবং গিবন বলেন, তাদের নিদ্রাভঙ্গের ঘটনাটি কাইজার দ্বিতীয় থিয়োডোসিস (ঃযবড়ফড়ংরঁং) এর আমলে ঘটে। রোম সাম্রাজ্য খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে নেয়ার পর ৪০৮ থেকে ৪৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি রোমের কাইজার ছিলেন।
উভয় বর্ণনার সাদৃশ্য এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে আসহাবে কাহাফ ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর তাদের যে সাথীকে খাবার আনার জন্য শহরে পাঠান তার নাম আমাদের মুফাসসিরগণ লিখেছেন ‘ইয়ামলিখা’ এবং গিবন লিখেছেন ‘ইয়াসলিখুস’ (ষধসনষপযঁং) ঘটনার বিস্তারিত বিবরণের ক্ষেত্রে উভয় বর্ণনা একই রকমের। এর সংক্ষিপ্তসার হচ্ছে, কাইজার ডিসিয়াসের আমলে যখন ঈসা আলাইহিস সালামের অনুসারীদের ওপর চরম নিপীড়ন নির্যাতে চালানো হচ্ছিল তখন এ সাতজন যুবক একটি গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারপর কাইজার থিয়োডোসিসের রাজত্বের ৩৮তম বছরে অর্থাৎ প্রায় ৪৪৫ বা ৪৪৬ খ্রিষ্টাব্দে তারা জেগে উঠেছিলেন। এ সময় সমগ্র রোম সাম্রাজ্য ছিল ঈসা আলাইহিস সালামের দীনের অনুসারী। ঐ হিসেবে গুহায় তাদের ঘুমানোর সময় ধরা যায় প্রায় ১৯৬ বছর।
কোন কোন প্রাচ্যবিদ এ কাহিনীটিকে আসহাবে কাহাফের কাহিনী বলে মেনে নিতে এ জন্য অস্বীকার করেছেন যে, সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে কুরআন তাদের গুহায় অবস্থানের সময় ৩০৯ বছর বলে বর্ণনা করছে। কিন্তু ২৫ টীকায় আমি এ জবাব দিয়েছি।
এ সুরিয়ানি বর্ণনা ও কুরআনের বিবৃতির মধ্যে সামান্য বিরোধও রয়েছে। এরই ভিত্তিতে গিবন নবী সা.-এর বিরুদ্ধে ‘অজ্ঞতার’ অভিযোগ এনেছেন। অথচ যে বর্ণনার ভিত্তিতে তিনি এতবড় দুঃসাহস করেছেন তার সম্পর্কে তিনি নিজেই স্বীকার করেন যে, সেটি এ ঘটনার তিরিশ চল্লিশ বছর পর সিরিয়ার এক ব্যক্তি লেখেন। আর এত বছর পর নিছক জনশ্রুতির মাধ্যমে একটি ঘটনার বর্ণনা এক দেশ থেকে অন্য দেশে পৌঁছুতে পৌঁছুতে কিছু না কিছু বদলে যায়। এ ধরনের একটি ঘটনার বর্ণনাকে অক্ষরে অক্ষরে সত্য মনে করা এবং তার কোন অংশের সাথে বিরোধ হওয়াকে নিশ্চিতভাবে কুরআনের ভ্রান্তি বলে মনে করা কেবলমাত্র এমনসব হঠকারী লোকের পক্ষেই শোভা পায় যারা ধর্মীয়বিদ্বেষবশে বুদ্ধিমত্তার সামান্যতম দাবিও উপেক্ষা করে যায়।
আসহাবে কাহাফের ঘটনাটি ঘটে আফসোস (ঊঢ়যবংঁং) নগরীতে। খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় এগারো শতকে এ নগরীটির পত্তন হয়। পরবর্তীকালে এটি মূর্তিপূজার বিরাট কেন্দ্রে পরিণত হয়। এখানকার লোকেরা চাঁদ বিবির পূজা করতো। তাকে বলা হতো ডায়না (ফরধহধ)। এর সুবিশাল মন্দিরটি প্রাচীন যুগের দুনিয়ার অত্যাশ্চর্য বিষয় বলে গণ্য হতো। এশিয়া মাইনরের লোকেরা তার পূজা করতো। রোমান সাম্রাজ্যেও তাকে উপাস্যদের মধ্যে শামিল করে নেয়া হয়।
হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের পর যখন তাঁর দাওয়াত রোম সাম্রাজ্যে পৌঁছুতে শুরু করে তখন এ শহরের কয়েকজন যুবকও শিরক থেকে তাওবা করে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে। খ্রিষ্টীয় বর্ণনাবলি একত্র করে তাদের ঘটনার যে বিস্তারিত বিবরণ গ্রেগরি অব ট্যুরস (এৎবমড়ৎু ড়ভ ঃড়ঁৎং) তার গ্রন্থে (গবৎধপঁষড়ৎঁস ষরনবৎ) বর্ণনা করেছেন তার সংক্ষিপ্তসার নিম্নরূপ : তারা ছিলেন সাতজন যুবক। তাদের ধর্মান্তরের কথা শুনে কাইজার ডিসিয়াস তাদের নিজের কাছে ডেকে পাঠান। তাদের জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের ধর্ম কী? তারা জানতেন, কাইজার ঈসার অনুসারীদের রক্তের পিপাসু। কিন্তু তারা কোন প্রকার শঙ্কা না করে পরিষ্কার বলে দেন, আমাদের রব তিনিই যিনি পৃথিবী ও আকাশের রব। তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদকে আমরা ডাকি না। যদি আমরা এমনটি করি তাহলে অনেক বড় গুনাহ করবো। কাইজার প্রথমে ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে বলেন, তোমাদের মুখ বন্ধ করো, নয়তো আমি এখানেই তোমাদের হত্যা করার ব্যবস্থা করবো। তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, তোমরা এখনো শিশু। তাই তোমাদের তিন দিন সময় দিলাম। ইতোমধ্যে যদি তোমরা নিজেদের মত বদলে ফেলো এবং জাতির ধর্মের দিকে ফিরে এসো তাহলে তো ভালো, নয়তো তোমাদের শিরñেদ করা হবে।
‘এ তিন দিনের অবকাশের সুযোগে এ সাতজন যুবক শহর ত্যাগ করেন। তারা কোন গুহায় লুকাবার জন্য পাহাড়ের পথ ধরেন। পথে একটি কুকুর তাদের সাথে চলতে থাকে। তারা কুকুরটাকে তাদের পিছু নেয়া থেকে বিরত রাখার জন্য বহু চেষ্টা করেন। কিন্তু সে কিছুতেই তাদের সঙ্গ ত্যাগ করতে রাজি হয়নি। শেষে একটি বড় গভীর বিস্তৃত গুহাকে ভালো আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নিয়ে তারা তার মধ্যে লুকিয়ে পড়েন। কুকুরটি গুহার মুখে বসে পড়ে। দারুণ ক্লান্ত পরিশ্রান্ত থাকার কারণে তারা সবাই সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়েন। এটি ২৫০ খ্রিষ্টাব্দের ঘটনা। ১৯৭ বছর পর ৪৪৭ খ্রিষ্টাব্দে তারা হঠাৎ জেগে ওঠেন। তখন ছিল কাইজার দ্বিতীয় থিয়োডোসিসের শাসনামল। রোম সাম্রাজ্য তখন খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিল এবং আফসোস শহরের লোকেরাও মূর্তিপূজা ত্যাগ করেছিল।’
এটা ছিল এমন এক সময় যখন রোমান সাম্রাজ্যের অধিবাসীদের মধ্যে মৃত্যুর পরের জীবন এবং কিয়ামতের দিন হাশরের মাঠে জমায়েত ও হিসাব নিকাশ হওয়া সম্পর্কে প্রচণ্ড মতবিরোধ চলছিল। আখেরাত অস্বীকারের ধারণা লোকদের মন থেকে কিভাবে নির্মূল করা যায় এ ব্যাপারটা নিয়ে কাইজার নিজে বেশ চিন্তিত ছিলেন। একদিন তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন যেন তিনি এমন কোন নিদর্শন দেখিয়ে দেন যার মাধ্যমে লোকেরা আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে। ঘটনাক্রমে ঠিক এ সময়েই এ যুবকরা ঘুম থেকে জেগে ওঠেন।
জেগে ওঠেই তারা পরস্পরকে জিজ্ঞস করেন, আমরা কতক্ষণ ঘুমিয়েছি? কেউ বলেন একদিন, কেউ বলেন দিনের কিছু অংশ। তারপর আবার এ কথা বলে সবাই নীরব হয়ে যান যে এ ব্যাপারে আল্লাহই ভালো জানেন। এরপর তারা জিন (ঔবধহ) নামে নিজেদের একজন সহযোগীকে রূপার কয়েকটি মুদ্রা দিয়ে খাবার আনার জন্য শহরে পাঠান। লোকেরা যাতে চিনতে না পারে এ জন্য তাকে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেন। তারা ভয় করছিলেন, লোকেরা আমাদের ঠিকানা জানতে পারলে আমাদের ধরে নিয়ে যাবে এবং ডায়নার পূজা করার জন্য আমাদের বাধ্য করবে। কিন্তু জিন শহরে পৌঁছে সবকিছু বদলে গেছে দেখে অবাক হয়ে যান। তিনি দেখেন সবাই ঈসায়ী হয়ে গেছে এবং ডায়না দেবীর পূজা কেউ করছে না। একটি দোকানে গিয়ে তিনি কিছু রুটি কিনেন এবং দোকনদারকে একটি রূপার মুদ্রা দেন। এ মুদ্রার গায়ে কাইজার ডিসিয়াসের ছবি ছাপানো ছিল। দোকানদার এ মুদ্রা দেখে অবাক হয়ে যায়। সে জিজ্ঞেস করে, এ মুদ্রা কোথায় পেলে? জিন বলে এ আমার নিজের টাকা, অন্য কোথাও থেকে নিয়ে আসিনি। এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে বেশ কথা কাটাকাটি হয়। লোকদের ভিড় জমে ওঠে। এমনকি শেষ পর্যন্ত বিষয়টি নগর কোতায়ালের কাছে পৌঁছে যায়। কোতোয়াল বলেন, এ গুপ্তধন যেখান থেকে এনেছো সেই জায়গাটা কোথায় আমাকে বলো। জিন বলেন, কিসের গুপ্তধন? এ আমার নিজের টাকা। কোন গুপ্তধনের কথা আমার জানা নেই। কোতোয়াল বলেন, তোমার এ কথা মেনে নেয়া যায় না। কারণ তুমি যে মুদ্রা এনেছো, এতো কয়েক শ’ বছরের পুরনো। তুমি তো সবেমাত্র যুবক, আমাদের বুড়োরাও এ মুদ্রা দেখেনি।
নিশ্চয়ই এর মধ্যে কোন রহস্য আছে। জিন যখন শোনেন কাইজার ডিসিয়াস মারা গেছে বহুযুগ আগে তখন তিনি বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ পর্যন্ত তিনি কোনো কথাই বলতে পারেন না। তারপর আস্তে আস্তে বলেন, এ তো মাত্র কালই আমি এবং আমার ছয়জন সাথী এ শহর থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম এবং ডিসিয়াসের জুলুম থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য একটি গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলাম। জিনের এ কথা শুনে কোতোয়ালও অবাক হয়ে যান। তিনি তাকে নিয়ে যেখানে তার কথা মতো তারা লুকিয়ে আছেন সেই গুহার দিকে চলেন। বিপুল সংখ্যক জনতাও তাদের সাথী হয়ে যায়। তারা যে যথার্থই কাইজার ডিসিয়াসের আমলের লোক সেখানে পৌঁছে এ ব্যাপারটি পুরোপুরি প্রমাণিত হয়ে যায়। এ ঘটনার খবর কাইজার ডিসিয়াসের কাছেও পাঠানো হয়। তিনি নিজে এসে তাদের সাথে দেখা করেন এবং তাদের থেকে বরকত গ্রহণ করেন। তারপর হঠাৎ তারা সাতজন গুহার মধ্যে গিয়ে সটান শুয়ে পড়েন এবং তাদের মৃত্যু ঘটে। এ সুস্পষ্ট নিদর্শন দেখে লোকেরা যথার্থই মৃত্যুর পরে জীবন আছে বলে বিশ্বাস করে। এ ঘটনার পর কাইজারের নির্দেশে গুহায় একটি ইবাদতখানা নির্মাণ করা হয়।
খ্রিষ্টীয় বর্ণনাসমূহে গুহাবাসীদের সম্পর্কে এই যে কাহিনী বিবৃত হয়েছে কুরআন বর্ণিত কাহিনীর সাথে এর সাদৃশ্য এত বেশি যে, এদেরকেই আসহাবে কাহাফ বলা অধিকতর যুক্তিযুক্ত মনে হয়। এ ব্যাপারে কেউ কেউ আপত্তি তোলেন যে, এ ঘটনাটি হচ্ছে এশিয়া মাইনরের আর আরব ভূখণ্ডের বাইরের কোন ঘটনা নিয়ে কুরআন আলোচনা করে না, কাজেই খ্রিষ্টীয় কাহিনীকে আসহাবে কাহাফের ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়া কুরআনের পথ থেকে বিচ্যুতি হবে। কারণ কুরআন মজিদে আসলে আরববাসীদেরকে শিক্ষা দেয়ার জন্য এমন সব জাতির এ শক্তির অবস্থা আলোচনার ব্যবস্থা করা হয়েছে যাদের সম্পর্কে তারা জানতো। তারা আরবের সীমানার মধ্যে থাকুক বা বাইরে- তাতে কিছু আসে যায় না। এ কারণে মিসরের প্রাচীন ইতিহাস কুরআনে আলোচিত হয়েছে। অথচ (প্রাচীন) মিসর আরবের বাইরে অবস্থিত ছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, মিসরের ঘটনাবলি কেন হতে পারে না? আরববাসীরা যেভাবে মিসর সম্পর্কে জানতো ঠিক তেমনি রোম সম্পর্কেও তো জানতো। রোমান সাম্রাজ্যের সীমানা হিজাজের একেবারে উত্তর সীমান্তের সাথে লাগোয়া ছিল। আরবদের বাণিজ্য কাফেলা দিনরাত রোমীয় এলাকায় যাওয়া আসা করতো। বহু আরব গোত্র রোমানদের প্রভাবাধীন ছিল। রোম আরবদের জন্য মোটেই অজ্ঞাত দেশ ছিল না। সূরা রূম এর প্রমাণ। এ ছাড়া এ কথাও চিন্তা করার মতো যে, এ কাহিনীটি আল্লাহ নিজেই স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে কুরআন মজিদে বর্ণনা করেননি। বরং মক্কার কাফেরদের জিজ্ঞাসার জবাবে বর্ণনা করেছেন। আর আহলি কিতাবরা রাসূলুল্লাহ সা.-কে পরীক্ষা করার জন্য মক্কার কাফেরদেরকে তাঁর কাছ থেকে এমন ঘটনার কথা জিজ্ঞেস করার পরামর্শ দিয়েছিল যে সম্পর্কে আরববাসীরা মোটেই কিছু জানতো না। অর্থাৎ যখন তারা সাচ্চা দিলে ঈমান আনলো তখন আল্লাহ তাদের সঠিক পথে চলার ক্ষমতা বাড়িয়ে দিলেন এবং তাদের ন্যায় ও সত্যের ওপর অবিচল থাকার সুযোগ দিলেন। যুবরা নিজেদেরকে বিপদের মুখে ঠেলে দেবে কিন্তু বাতিলের কাছে মাথা নত করবে না। (চলবে)
লেখক : সহকারী সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা

SHARE

Leave a Reply