সমাজ বিনির্মাণে যুবদের দায়িত্ব ও কর্তব্য -ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম

[৪র্থ কিস্তি]

আমরা আগেই বলেছি এই সমাজ পরিবর্তনের জন্য এমন যুবক মানুষের প্রয়োজন যারা ঈমান রক্ষা করতে গিয়ে সব কষ্ট, জুলুম-নির্যাতন অপমান সহ্য করেছেন কিন্তু মাথানত করেননি। ইসলামে এরকম একজন যুবক হলেন হজরত ইবরাহিম (আ)। যিনি খলিলুল্লাহ বা আল্লাহর বন্ধু হিসেবে পরিচিত। ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মেও হজরত ইবরাহিম (আ)-কে সম্মান করা হয়। বহু আগে জন্মগ্রহণ করায় হজরত ইবরাহিম (আ)-এর সঠিক জন্মকাল নিরূপণ করা কঠিন। তবে একদল গবেষকের মতে, খ্রিস্টপূর্ব ১৮১৩ অব্দে অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৩৮৩৩ বছর আগে তৎকালীন প্রাচীন শহর চালডিনসের উর এলাকায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন, যা বর্তমানে ইরাক নামে পরিচিত। অপর গবেষণায় তাঁর জন্ম বর্তমান তুরস্কের এডেসা অঞ্চলের আসিরিয়ান শহরে বলে দাবি করা হয়। তাঁর বাবার নাম পবিত্র কুরআন অনুসারে আজর, তবে যিনি তেরাহ নামেও কোনো কোনো ইতিহাসগ্রন্থে পরিচিত। হজরত ইবরাহিম (আ) ছিলেন হজরত নূহ (আ)-এর বংশধর। তাঁর পিতা ছিলেন মূর্তি উপাসক। পক্ষান্তরে মহান আল্লাহ নবুয়ত দানের মাধ্যমে হজরত ইবরাহিম (আ)-কে একাত্মবাদের সন্ধান দেন এবং তাঁর গোত্রকে একাত্মবাদে আহবান করেন। এ নিয়ে বাবার সঙ্গে হজরত ইবরাহিম (আ)-এর মতের অমিল হয় এবং তাঁর বাবা তাঁকে পাথর নিক্ষেপ করে মেরে ফেলার হুমকি দেন। কিন্তু হজরত ইবরাহিম (আ) ছিলেন মহান আল্লাহর একাত্মবাদ প্রচার এবং তাঁর বংশকে সঠিক পথে পরিচালনায় দৃঢ় সঙ্কল্পবদ্ধ। পরে তিনি তাঁদের দেব-দেবীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে থাকেন।

এ সংক্রান্ত বর্ণনা রয়েছে পবিত্র কুরআনের ২১ নম্বর সূরা আম্বিয়ার ৫১ থেকে ৭৩ নম্বর আয়াতে। পবিত্র কুরআনের বর্ণনা মতে, হজরত ইবরাহিম (আ)-এর সঙ্গে তাঁর পিতা ও তাঁর সম্প্রদায়ের লোকদের দেব-দেবী বা মূর্তির অসারতা নিয়ে মতপার্থক্য ঘটে। এমনকি নিজেদের জীবন হুমকির সম্মুখীন জেনে-বুঝেও সত্যের পথে ছিলেন অটল-অবিচল। ইবরাহিম (আ) সম্পর্কে বলা হয়েছে, যিনি বড় মূর্তিটিকে রেখে সকল মূর্তিকে ভেঙে ফেলেছিলেন। তিনি বড় মূর্তিটিকে এ জন্য রেখে দিয়েছিলেন যে, হয়তোবা তারা তার দিকে ফিরে আসবে। যারা এ সকল মূর্তির পূজা করতো তারা এ ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বললো,
“আমরা এক যুবককে এদের কথা বলতে শুনেছিলাম, তার নাম ইবরাহিম।” (সূরা আম্বিয়া : ৬০)
তারা বললো, “তাহলে তাকে ধরে নিয়ে এসো সবার সামনে, যাতে লোকেরা দেখে নেয় (কিভাবে তাকে শাস্তি দেয়া হয়)।” (সূরা আম্বিয়া : ৬১)

এ ব্যাপারে তাফহিমুল কুরআনে বলা হয়েছে- অর্থাৎ এভাবে হজরত ইবরাহিমের মনের আশাই যেন পূরণ হলো। কারণ তিনি এটিই চাচ্ছিলেন। ব্যাপারটিকে তিনি শুধু পুরোহিত ও পূজারিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাচ্ছিলেন না। বরং তিনি চাচ্ছিলেন ব্যাপারটি সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়–ক। তারাও আসুক, দেখে নিক এই যে মূর্তিগুলোকে তাদের অভাব পূরণকারী হিসেবে রাখা হয়েছে এরা কতটা অসহায় এবং স্বয়ং পুরোহিতরাই এদের সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করে।
এভাবে এ পুরোহিতরাও ফেরাউনের মতো একই ভুল করলো। ফেরাউন জাদুকরদের সাথে হজরত মূসাকে (আ) প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ করার জন্য সারা দেশের মানুষকে একত্র করেছিলো, এরাও হজরত ইবরাহিমের মামলা শোনার জন্য সারা দেশের মানুষকে একত্র করলো। সেখানে হজরত মূসা (আ) সবার সামনে এ কথা প্রমাণ করার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিলেন যে, তিনি যা কিছু এনেছেন তা যাদু নয় বরং মুজিযা। এখানে হজরত ইবরাহিমকেও তার শত্রুরাই সুযোগ দিয়ে দিল যেন জনগণের সামনে তাদের ধোঁকাবাজির তেলেসমাতি ছিন্নভিন্ন করতে পারেন।

(ইবরাহিমকে নিয়ে আসার পর) তারা জিজ্ঞেস করলো, “ওহে ইবরাহিম! তুমি কি আমাদের ইলাহদের সাথে এ কাণ্ড করেছো?” (৬৩) সে জবাব দিল, “বরং এসব কিছু এদের এ সরদারটি করেছে, এদেরকেই জিজ্ঞেস করো, যদি এরা কথা বলতে পারে।” (সূরা আম্বিয়া : ৬২-৬৩)

এ শেষ বাক্যটি স্বতই এ কথা প্রকাশ করছে যে, প্রথম বাক্যে হজরত ইবরাহিম মূর্তি ভাঙার দায় যে বড় মূর্তিটির ঘাড়ে চাপিয়েছেন, তার দ্বারা মিথ্যা বলা তার উদ্দেশ্য ছিল না। বরং তিনি নিজের বিরোধীদেরকে প্রমাণ দর্শাতে চাচ্ছিলেন। তারা যাতে জবাবে নিজেরাই এ কথা স্বীকার করে নেয় যে, এ উপাস্যরা একেবারেই অসহায় এবং এদের দ্বারা কোনো উপকারের আশাই করা যায় না, তাই তিনি এ কথা বলেছিলেন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কোনো ব্যক্তি প্রমাণ উপস্থাপনের জন্য যে বাস্তব ঘটনা-বিরোধী কথা বলে তাকে মিথ্যা গণ্য করা যেতে পারে না। বক্তা প্রমাণ নির্দেশ করার জন্য এ কথা বলে এবং শ্রোতাও একে সেই অর্থেই গ্রহণ করে।

দুর্ভাগ্যক্রমে হাদীসের এক বর্ণনায় এ কথা এসেছে যে, হজরত ইবরাহিম (আ) তাঁর জীবনে তিনবার মিথ্যা কথা বলেছিলেন। তার মধ্যে এটি একটি ‘মিথ্যা’ দ্বিতীয় ‘মিথ্যা’ হচ্ছে, সূরা সাফ্ফাতে হজরত ইবরাহিমের কথাটি। আর তৃতীয় ‘মিথ্যাটি’ হচ্ছে তাঁর নিজের স্ত্রীকে বোন বলে পরিচিত করানো। এ কথাটি কুরআনে নয় বরং বাইবেলের আদি পুস্তকে বলা হয়েছে- এক শ্রেণীর বিদ্বানদের ‘রেওয়াত’ প্রীতির ব্যাপারে সীমাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে যে, তাদের কাছে বুখারী ও মুসলিমের কতিপয় বর্ণনাকারীর সত্যবাদিতাই বেশি প্রিয় এবং এর ফলে যে একজন নবীর ওপর মিথ্যা বলা অভিযোগ আরোপিত হচ্ছে, তার কোনো পরোয়াই তাদের নেই। অপর একটি শ্রেণী এই একটিমাত্র হাদীসকে ভিত্তি করে সমগ্র হাদীসশাস্ত্রের বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা শুরু করে দেয় এবং বলতে থাকে, সমস্ত হাদীসের স্তূপ উঠিয়ে দূরে ছুড়ে দাও। কারণ এর মধ্যে যত আজেবাজে ধরনের রেওয়ায়াত পাওয়া যায়। অথচ কোনো একটি বা কতিপয় হাদীসের মধ্যে কোনো ত্রুটি পাওয়া যাবার কারণে সমস্ত হাদীস অনির্ভরযোগ্য হয়ে যাবে- এমন কোনো কথা হতে পারে না। আর হাদীসশাস্ত্রের দৃষ্টিতে কোনো হাদীসের বর্ণনা পরম্পরা মজবুত হওয়ার ফলে এটা অপরিহার্য হয়ে ওঠে না যে, তার ‘মতন’ (মূল হাদীস) যতই আপত্তিকর হোক না কেন তাকে চোখ বন্ধ করে ‘সহিহ’ বলে মেনে নিতে হবে। বর্ণনা পরম্পরা সহিহ ও নির্ভরযোগ্য হওয়ার পরও এমন অনেক কারণ থাকতে পারে, যার ফলে এমন ‘মতন’ ত্রুটিপূর্ণ আকারে উদ্ধৃত হয়ে যায় এবং এমন সব বিষয়বস্তু সংবলিত হয় যে, তা থেকে স্পষ্টতই বুঝা যায় যে, একথাগুলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখ নিঃসৃত হতে পারে না। তাই সনদ তথা বর্ণনা পরম্পরার সাথে সাথে মতনও দেখা অপরিহার্য। যদি মতনের মধ্যে সত্যিই কোনো দোষ থেকে থাকে তাহলে এরপরও অযথা তার নির্ভুলতার ওপর জোর দেয়া মোটেই ঠিক নয়।

যে হাদীসটিতে হজরত ইবরাহিমের তিনটি ‘মিথ্যা কথা’ বর্ণনা করা হয়েছে সেটি কেবলমাত্র এ কারণে আপত্তিকর নয় যে, এটি একজন নবীকে মিথ্যাবাদী গণ্য করেছে বরং এ কারণেও এটি ত্রুটিপূর্ণ যে, এখানে যে তিনটি ঘটনার কথা বলা হয়েছে সেগুলো সবই বিতর্কিত। এর মধ্যে মিথ্যার অবস্থা তো পাঠক এইমাত্র দেখলেন। সামান্য বুদ্ধি জ্ঞানও যার আছে তিনি কখনো এই প্রেক্ষাপটে হজরত ইবরাহিমের এই বক্তব্যকে ‘মিথ্যা’ বলে আখ্যায়িত করতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে নাউযুবিল্লাহ আমরা এমন ধারণা তো করতেই পারি না যে, তিনি এই বক্তব্যের তাৎপর্য বুঝাবেন না। এবং খামোখাই একে মিথ্যা ভাষণ বলে আখ্যায়িত করবেন। আর ঘটনাটির ব্যাপারে বলা যায়, এটিকে মিথ্যা প্রমাণ করা যেতে পারে না যতক্ষণ না একথা প্রমাণিত হয় যে, হজরত ইবরাহিম সে সময় সম্পূর্ণ সুস্থ, সবল, রোগমুক্ত ছিলেন এবং তিনি সামান্যতম অসুস্থতায়ও ভুগছিলেন না। এ কথা কুরআনে কোথাও বলা হয়নি এবং আলোচ্য হাদীসটি ছাড়া আর কোনো নির্ভরযোগ্য হাদীসও এ আলোচনা আসেনি।

এখন বাকি থাকে স্ত্রীকে বোন বলার ঘটনাটি। এ ব্যাপারটি এত বেশি উদ্ভট যে, কাহিনীটি শোনার পর কোন ব্যক্তি প্রথমেই বলে বসবে এটা কোন ঘটনাই হতে পারে না। এটি বলা হচ্ছে তখনকার কাহিনী যখন হজরত ইবরাহিম নিজের স্ত্রী সারাকে নিয়ে মিসরে যান। বাইবেলের বর্ণনামতে তখন হজরত ইবরাহিমের বয়স ৭৫ বছর ও হজরত সারার বয়স ৬৫ বছরের কিছু বেশি ছিল। এ বয়সে হজরত ইবরাহিম ভীত হলেন মিসরের বাদশাহ এ সুন্দরীকে লাভ করার জন্য তাকে হত্যা করবেন। কাজেই তিনি স্ত্রীকে বললেন, যখন মিসরীয়রা তোমাকে ধরে বাদশাহর কাছে নিয়ে যেতে থাকবে তখন তুমি আমাকে নিজের ভাই বলবে এবং আমিও তোমাকে বোন বলবো, এর ফলে আমি প্রাণে বেঁচে যাবো। (আদি পুস্তক : ১২ অধ্যায়) হাদীসে বর্ণিত তৃতীয় মিথ্যাটির ভিত্তি এই সুস্পষ্ট বাজে ও উদ্ভট ইসরাইলি বর্ণনার ওপর প্রতিষ্ঠিত। যে হাদীসের ‘মতন’ এ ধরনের উদ্ভট বক্তব্য সংবলিত তাকেও আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উক্তি বলে মেনে নেবো কেমন করে-তা তার ‘সনদ’ যতই ত্রুটিমুক্ত হোক না কেন? এ ধরনের একপেশে চিন্তা বিষয়টিকে বিকৃত করে অন্য এক বিভ্রান্তির উদ্ভব ঘটায় যার প্রকাশ ঘটাচ্ছে হাদীস অস্বীকারকারী গোষ্ঠী।

একথা শুনে তারা নিজেদের বিবেকের দিকে ফিরলো এবং (মনে মনে) বলতে লাগলো, “সত্যিই তোমরা নিজেরাই জালেম।” (৬৫) কিন্তু আবার তাদের মত পাল্টে গেলো এবং বলতে থাকলো, “তুমি জানো, এরা কথা বলে না।” (সূরা আম্বিয়া : ৬৪-৬৫)
৬১. মূলে (মাথা নিচের দিকে উল্টিয়ে দেয়া হলো) বলা হয়েছে। কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন, তারা লজ্জায় মাথা নত করলো। কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতি ও বর্ণনাভঙ্গি এ অর্থ গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। বক্তব্য পরম্পরা ও বক্তব্যের ধরনের প্রতি নজর দিলে যে সঠিক অর্থটি পরিষ্কার বুঝা যায় সেটি হচ্ছে এই যে, হজরত ইবরাহিমের জবাব শুনে প্রথমেই তারা মনে মনে ভাবলো, প্রকৃতপক্ষে তোমরা নিজেরাই তো জালেম। কেমন অসহায় ও অক্ষম দেবতাদেরকে তোমরা ইলাহ বানিয়ে নিয়েছো, যারা নিজমুখে তাদের ওপর কি ঘটে গেছে এবং কে তাদেরকে ভেঙেচুরে রেখে দিয়েছে এ কথা বলতে পারে না। যারা নিজেরা নিজেদেরকে বাঁচাতে পারে না তারা তোমাদেরকে কিভাবে বাঁচাবে। কিন্তু এর পরপরই আবার তাদের ওপর জিদ ও মূর্খতা চড়াও হয়ে গেলো। এবং জিদের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তা চড়াও হবার সাথে সাথেই তাদের বুদ্ধি উল্টোমুখী হয়ে গেলো। মস্তিষ্ক সোজা ও সঠিক চিন্তা করতে করতে হঠাৎ উল্টো চিন্তা করতে আরম্ভ করলো।

ইবরাহিম বললো, “তাহলে তোমরা কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমনসব জিনিসের পূজা করছো যারা তোমাদের না উপকার করতে পারে, না ক্ষতি? (৬৭) ধিক তোমাদেরকে এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে যেসব উপাস্যের তোমরা পূজা করছো তাদেরকে। তোমাদের কি একটুও বুদ্ধি নেই?” (৬৮) তারা বললো, “পুড়িয়ে ফেলো একে এবং সাহায্য করো তোমাদের উপাস্যদেরকে, যদি তোমরা কিছু করতে চাও।” (৬৯) আমি বললাম: “হে আগুন! ঠাণ্ডা হয়ে যাও এবং নিরাপদ হয়ে যাও ইবরাহিমের জন্য।” (সূরা আম্বিয়া : ৬৬-৬৯)
শব্দাবলী পরিষ্কার জানিয়ে দিচ্ছে এবং পূর্বাপর বক্তব্যও এ অর্থ সমর্থন করছে যে, তারা সত্যিই তাদের সিদ্ধান্ত কার্যকর করে। অন্যদিকে আগুনের কুণ্ড তৈরি হয়ে যাবার পর তারা যখন হজরত ইবরাহিমকে তার মধ্য ফেলে দেয় তখন মহান আল্লাহ আগুনকে হুকুম দেন সে যেন ইবরাহিমের জন্য ঠাণ্ডা হয়ে যা এবং তার কোন ক্ষতি না করে। বস্তুত কুরআনের সুস্পষ্টভাবে যেসব মুজিযার বর্ণনা দেয়া হয়েছে এটিও তার অন্তর্ভুক্ত। এখন কোন ব্যক্তি যদি এ মুজিযাগুলোকে সাধারণ ঘটনা প্রমাণ করার জন্য জোড়াতালি দিয়ে কৃত্রিম ব্যাখ্যার আশ্রয় নেয়, তবে বুঝতে হবে যে, তার মধ্যে আল্লাহর জন্যও বিশ্ব-জাহানের প্রচলিত নিয়মের বাইরে অস্বাভাবিক কোনো কিছু করা সম্ভবপর নয়।

যে ব্যক্তি এরূপ মনে করে, আমি জানতে চাই যে, সে আল্লাহকে মেনে নেয়ার কষ্টই বা করতে যাচ্ছে কেন? আর যদি সে এ ধরনের জোড়াতালির ব্যাখ্যা এ জন্য করে থাকে যে, আধুনিক যুগের তথাকথিত যুক্তিবাদীরা এ ধরনের কথা মেনে নিতে প্রস্তুত নয়, তাহলে আমরা তাকে জিজ্ঞেস করি, জনাব! তথাকথিত সেসব যুক্তিবাদীকে যে কোনোভাবেই হোক স্বীকার করতেই হবে, এ দায়িত্ব আপনার ঘাড়ে কে চাপিয়ে দিয়েছিল? কুরআন যেমনটি আছে ঠিক তেমনিভাবে যে তাকে মেনে নিতে প্রস্তুত নয়, তাকে তার অবস্থার ওপর ছেড়ে দিন। তার স্বীকৃতি আদায় করার জন্য কুরআনকে তার চিন্তাধারা অনুযায়ী ঢেলে সাজাবার চেষ্টা করা, যখন কুরআনের মূল বক্তব্য প্রতিটি শব্দ এ ঢালাইয়ের বিরোধিতা করছে, তখন এটা কোন ধরনের প্রচার এবং কোন বিবেকবান ব্যক্তি একে বৈধ মনে করতে পারে?

তারা চাচ্ছিল ইবরাহিমের ক্ষতি করতে কিন্তু আমি তাদেরকে ভীষণভাবে ব্যর্থ করে দিলাম। (সূরা আম্বিয়া: ৭০) অর্থাৎ ইবরাহিম (আ) যখন এই ঘটনাটি ঘটিয়েছিলেন তখন তিনি বয়সে যুবকই ছিলেন। ইসলামে হজরত ইবরাহিম (আ) খলিলুল্লাহ বা আল্লাহর বন্ধু হিসেবে পরিচিত। হজরত ইবরাহিম (আ) ছিলেন হজরত নূহ (আ)-এর বংশধর। তাঁর পিতা ছিলেন মূর্তি উপাসক। পক্ষান্তরে মহান আল্লাহ নবুয়তদানের মাধ্যমে হজরত ইবরাহিম (আ)-কে একাত্মবাদের সন্ধান দেন এবং তাঁর গোত্রকে একাত্মবাদে আহ্বান করার আদেশ দেন। এ নিয়ে বাবার সঙ্গে হজরত ইবরাহিম (আ)-এর মতের অমিল হয় এবং তাঁর বাবা তাঁকে পাথর নিক্ষেপ করে মেরে ফেলার হুমকি দেন। কিন্তু হজরত ইবরাহিম (আ) ছিলেন মহান আল্লাহর একাত্মবাদ প্রচার এবং তাঁর বংশকে সঠিক পথে পরিচালনায় দৃঢ় সঙ্কল্পবদ্ধ। পরে তিনি তাঁদের দেব-দেবীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে থাকেন।
গবেষক এবং ইতিহাসবিদগণ হজরত ইবরাহিম (আ)-এর এলাকাকে ব্যাবিলন বলে মত প্রদান করেন। যার প্রধান বা স¤্রাট ছিলেন নমরূদ। তাফসির মতে, তাঁর সম্প্রদায় ও নমরূদ সম্মিলিতভাবে তাঁকে আগুনে পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত নেয়। ঐতিহাসিক বর্ণনা মতে, এক মাস ধরে সমগ্র শহরবাসী বিরাট গর্ত করে, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করে এবং আগুনে পোড়ানোর যাবতীয় আয়োজন করে। এই আয়োজনের খবর ছড়িয়ে পড়লে দলে দলে লোক জড়ো হতে থাকে। এরপর আগুন জ্বালানো হয় এবং সাত দিন ধরে আগুনের মাত্রা বাড়ানো হয়। সাত দিনের মাথায় আগুন এত তীব্র হয় যে, তাঁর কাছে মানুষ এমনকি পশুপাখির যাওয়াও অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে হজরত ইবরাহিম (আ)-কে আগুনে নিক্ষেপ সম্ভব হচ্ছিল না। এরপর শয়তান এসে ‘মিনজানিক’ নামক এক ধরনের নিক্ষেপ যন্ত্র ব্যবহার করে হজরত ইবরাহিম (আ)-কে আগুনে নিক্ষেপের পদ্ধতি শিখিয়ে দেয়।

তাফসির মতে, যখন ইবরাহিম (আ)-কে মিনজানিক নামক নিক্ষেপ যন্ত্রের মাধ্যমে আগুনে ফেলা হচ্ছিল, তখন সব ফেরেশতা এবং পৃথিবী ও বেহেশতের সব প্রাণিকুল চিৎকার করে মহান আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানিয়ে বলে যে, হে আমাদের প্রতিপালক, আপনার বন্ধুর (খলিলুল্লাহর) একি বিপদ? মহান আল্লাহ তাঁদের সবাইকে অনুমতি দিলেন হজরত ইবরাহিম (আ)-কে সাহায্য করার জন্য। ফেরেশতাগণ সাহায্য করার জন্য হজরত ইবরাহিম (আ)-এর অনুমতি চাইলেন। আর ঈমানি শক্তিতে বলীয়ান হজরত ইবরাহিম (আ) উত্তর দিলেন, ‘আমার জন্য আমার আল্লাহই যথেষ্ট। মাজহারির মতানুসারে এ সময় হজরত জিবরাইল (আ) বলেন, কোনো প্রয়োজন হলে আমি (জিবরাইল আ.) হাজির আছি। উত্তরে হজরত ইবরাহিম (আ) বলেন; প্রয়োজন তো আছেই তবে তা আপনার (জিবরাইল আ.) কাছে নয়, পালনকর্তার (আল্লাহর) কাছে।
এমন শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্তে হজরত ইবরাহিম (আ)-কে সেই মহাশক্তিশালী আগুনে নিক্ষেপ করা হয়। পবিত্র কুরআনের সূরা আম্বিয়ার ৬৯ নম্বর আয়াত অনুসারে মহান আল্লাহ এ সময় বলেন, ‘হে আগুন, তুমি ইবরাহিমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।’ তাফসীর মতে, মহান আল্লাহর এই আদেশের পর হজরত ইবরাহিম (আ) অগ্নিকুণ্ডে আরাম-আয়েশে সাত দিন অবস্থান করেন। তাঁর আশপাশের সবকিছু এমনকি তাঁর হাত-পা বাঁধার জন্য ব্যবহৃত রশি বা দড়িও পুড়ে ছাই হয়ে যায়, কিন্তু হজরত ইবরাহিম (আ)-এর কিছুই হয়নি। ইতিহাস মতে, পরবর্তীতে হজরত ইবরাহিম (আ) বলেন, এই সাত দিন আমি যে সুখভোগ করেছি, সারা জীবনেও ভোগ করিনি।

হজরত ইবরাহিম (আ) ১৬৯ বছর বেঁচে ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। ধারণা মতে, খ্রিস্টপূর্ব ১৬৪৪ অব্দে তাঁর মৃত্যু হয় এবং তাঁকে ফিলিস্তিনের পশ্চিমতীরে অবস্থিত পুরাতন হেবরন শহরের পাটরিআরক্স নামক গুহায় সমাহিত করা হয়। একই স্থানে তাঁর স্ত্রী সারাহ, আরেকজন স্ত্রী রেবেকা, পুত্র ইসহাক এবং পুত্রবধূ লিয়াহর কবর রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানে একটি মসজিদের ভিতরে বুলেটপ্রুফ কাচ দিয়ে হজরত ইবরাহিম (আ)-এর কবর সংরক্ষিত আছে। অন্যদিকে তুরস্কের সানলিন উরফা নামক স্থানে হজরত ইবরাহিম (আ)-এর জন্মস্থান ও আগুনে নিক্ষেপের স্থানকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে ‘খলিলুল্লাহ মসজিদ’। সেখানে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রও গড়ে উঠেছে। আর লেকের পাশে রয়েছে মনোরম বাগান, আগুনের মাঝেই মহান আল্লাহ তাঁর বন্ধু ইবরাহিম (আ)-এর জন্য এরকম সুশোভিত বাগান তৈরি করেছিলেন বলে একাধিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। (চলবে)

লেখক : সহকারী সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা

SHARE

Leave a Reply