সমাজ বিনির্মাণে যুবদের দায়িত্ব ও কর্তব্য -ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম

পৃথিবীতে এখন শতকরা ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ জন তরুণ-যুবক। আগামীর পৃথিবী গড়ার কারিগর তারাই। জাতিসংঘের হিসাব অনুসারে যাদের বয়স ১৪-৩০ তারাই তারুণ। যাদের বয়স ২৫-৪০ এর মধ্যে তারাই যুবক। একটি সমাজ সভ্যতা এবং রাষ্ট্রের পরিবর্তন-পরিবর্ধন ভাঙা এবং গড়ার সবচেয়ে বড় কারিগর যুবসমাজ। কারণ তারুণ্য মানেই উদ্দীপনা, উৎসুক, কৌতূহলী। তারুণ্য মানে বাধা না মানা। তীব্র স্রােতে পাড়ি দেয়া-ই তরুণদের ধর্ম। তারুণ্য একটি অদম্য শক্তি, অপ্রতিরোধ্য ঝড়। একটি দৃপ্ত শপথ। এগিয়ে যাওয়ার দুরন্ত বাসনা। এক অপরাজেয় মনোভিত্তি। তারুণ্য হচ্ছে অসাধ্য সাধনের কারিগর। অফুরন্ত প্রাণশক্তি আর সৃষ্টির উন্মাদনা-ই তারুণ্যের গৌরব। বদ্ধ কুঠিরের দুয়ার চূর্ণ করে যাওয়াটা এর অর্জন। চেতনাদৃপ্ত তরুণরা যখন জেগে ওঠে তখন সকল প্রতিবন্ধকতার সকল চড়াই-উতরাই মাড়িয়ে তারা বিজয় ছিনিয়ে আনে। তাদের ডায়েরিতে পরাজয়, হীনতা, নিচুতা নেই। বিজয়ের পুষ্পমালা তাদের পদচুম্বন করে। আর তারাই কেবল পারে জাতিকে একটি সোনালি সমাজ উপহার দিতে।
কিন্তু নতুন প্রজন্মকে মুসলিম জাতিসত্তার ইতিহাস ঐতিহ্য সবকিছু ভুলিয়ে দেয়া হচ্ছে। যুবসমাজের এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাকে নষ্ট আর ভ্রষ্টতা দিয়ে রুখে দেয়া চেষ্টা চলছে অনবরত। কারণ তরুণ সমাজকে বুদ করে রাখতে পারলে কেল্লাফতেহ। তারা যদি চুপ থাকে তাহলে আর আর কেউ দাঁড়াবে না। তারা যদি ডুবে যায় আর কেউ প্রতিবাদ করবে না। তারা যদি নিস্তব্ধ হয়ে যায় তাহলে আর গোটা জাতির ললাটে নামবে অমানিশা। পরাভূত হবে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। অতল গহবরে হারিয়ে যাওয়া জাতি আর পাবে না আলোর দিশা।
দুনিয়ার ইতিহাসে যেসব জাতি ধ্বংস হয়েছে তার অর্থ এই নয় যে তাদের সমস্ত বংশধর নিঃশেষ হয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে তাদের জাতীয় স্বাতন্ত্র্য ও বিশেষত্বের বিলুপ্তিই তাদের ধ্বংস হওয়ার সঠিক তাৎপর্য। আমরা যখন বলি, বেবিলনীয় জাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, মিসরের ফেরাউনি জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে, তখন আমরা এ কথায় বুঝাতে চাই যে বেবিলনীয় ও ফেরাউনি জাতি যে সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারক ছিল তার বিশেষত্ব ও সারবত্তা নিঃশেষ হয়ে গেছে, তাদের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গুণাবলির অবসান হয়েছে। বেবিলনীয়দের বংশধররা এখনো বেঁচে আছে কিন্তু তাদের জাতীয় স্বাতন্ত্র্য বিলীন হয়ে গেছে। প্রাচীন মিসরীয়দের বংশধররা এখনো অবশিষ্ট রয়েছে কিন্তু ফেরাউনি ও কিবতি সভ্যতা সংস্কৃতি বর্তমানে সম্পূর্ণরূপে অস্তিত্বহীন। তার কারণ হচ্ছে, এই জাতির বংশধররা তাদের পরবর্তী বংশধরদের নিকট নিজেদের জাতীয় বিশেষ উত্তরাধিকারকে হারিয়ে ফেলেছিল। কোন জাতির নতুন বংশধররা যদি নিজেদের জাতীয় স্বাতন্ত্র্য ও বিশেষত্ব হারিয়ে ফেলে অতঃপর অপর কোনো বিশেষত্ব গ্রহণ করে তা হলে তার অর্থ এই দাঁড়ায় যে সেই জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, বনি ইসরাইলিদের দশটি গোত্র বিলুপ্ত হয়ে গেছে, যাদের আজ কোন হদিস পাওয়া যায় না। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, তাদের সবাইকে হত্যা করা হয়েছে এবং এ জন্য তাদের অস্তিত্ব ও বংশধারা খতম হয়ে গেছে। বরং তার অর্থ হচ্ছে তাদের মধ্য থেকে ইসরাইলি হওয়ার অনুভূতি শেষ হয়ে গেছে এবং এদের বংশধররা নিজেদেরকে ইসরাইলি বংশধর বলে মনে করছে না। ইসরাইলি বিশেষত্ব ও ইসরাইলি সভ্যতা সংস্কৃতির পার্থক্যপূর্ণ গুণাবলি হারিয়ে ফেলার পর তারা দুনিয়ার অপরাপর জাতিসমূহের মধ্যে মিলে একাকার হয়ে গেছে। তারা যে ইসরাইলি এ কথা তাদের বংশধররা আজ জানেই না, এই দৃষ্টিতে বলা যায় যে, একটা জাতির টিকে থাকা সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে জাতির পরবর্তী বংশধরদের নিজেদের জাতীয় স্বাতন্ত্র্য ও বিশেষত্বকে টিকিয়ে রাখার মত যোগ্যতাসম্পন্ন করে গড়ে তোলার ওপর।
মুসলিম দুনিয়া নামে পরিচিত বিশাল ভৌগোলিক এলাকাসমূহ আমাদের পূর্বপুরুষরা কেবলমাত্র ইসলামী সভ্যতা ও আমরা যে জীবনব্যবস্থার দাবিদার তার প্রতিষ্ঠা এবং যে সমস্ত আইন বিধান ও জীবনযাত্রা প্রণালীকে আমরা নির্ভুল বলে বিশ্বাস করি তা কায়েম করার জন্যই অর্জন করেছিলেন। অপরাপর জাতিগুলোর মত মুসলিম জাতির স্থিতির জন্য ইসলামের নামে পরিচিত সভ্যতা, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা প্রণালীর যে উত্তরাধিকার আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের নিকট থেকে লাভ করেছি এবং যার দরুন আমরা অন্য জাতি থেকে এই মুসলিম নামক ভিন্ন জাতি হওয়ার গৌরব অর্জন করেছি তা যথাযথভাবে ভবিষ্যৎ বংশধরদের পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। পরবর্তী বংশধররাও একই রঙে রঙিন হয়ে উঠবে এবং তাদেরও আমরা সেই নীতি ও আদর্শে গড়ে তুলবো যাতে করে মুসলিম জাতি টিকে থাকতে পারে। ব্যক্তি হিসাবে কোন মুসলমান চিরঞ্জীব নয় কিন্তু মিল্লাত হিসেবে মুসলিম জাতি চিরঞ্জীব থাকতে পারে।
আমাদের পরবর্তী বংশধররা যদি বিদেশী ও বিজাতীয় সভ্যতা সংস্কৃতির অনুসারী হয়ে গড়ে ওঠে তাহলে ভবিষ্যতে মুসলিম জাতির অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তখন এই সুসলিম জাহান সেই নামেই অভিহিত হতে থাকবে যে আদর্শে তা গড়ে উঠবে। তখন আমাদের ঔরসজাত বংশধররা অবশ্য বেঁচে থাকবে কিন্তু আমাদের আদর্শিক উত্তরাধিকার শেষ হয়ে যাবে। যে উদ্দেশ্যে মুসলিম জাহান সৃষ্টি হয়েছিল, ইসলামী সভ্যতা সংস্কৃতির অনুপস্থিতির কারণে তার নাম চিহ্ন কোথায়ও অবশিষ্ট থাকবে না বরং তখন তা ভিন্নতর এক সভ্যতা সংস্কৃতির লীলাভূমিতে পরিণত হবে। যার ফলে আমাদের জাতীয় স্বাতন্ত্র্যের বিলুপ্তি ঘটবে। মুসলিম জাতি হিসাবে আমরা কেবল এ ভাবেই বেঁচে থাকতে পারি যদি আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে পাঠরত ও গড়ে ওঠা তরুণ বংশধররা ইসলামী সভ্যতার ধারক ও বাহক হয়ে বসবাস করতে পারে।
আমাদের তরুণ শিক্ষার্থীদের এ কথা গুরুত্ব সহকারে অনুভব করতে হবে যে, তাঁরা মুসলমান এবং এই ভূমিতে তাদেরকে মুসলিম জাতি হিসেবেই টিকে থাকতে হবে। মুসলিম জাতির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যাবলি অর্জন ও সংরক্ষণের প্রতি তাদের নিজেদের মধ্যেই এমন প্রেরণা ও আগ্রহ সৃষ্টি হওয়া দরকার যা হারিয়ে গেলে মুসলিম জাতির স্বাতন্ত্র্য থাকতে পারে না।
তা ছাড়া কোন জাতি রাষ্ট্রকে যদি পদানত করতে হলে সে সমাজের যুবক তরুণদেরকে ধ্বংস করে দিতে পারলেই কিন্তু যথেষ্ট। আজকের পশ্চিমারা আমাদের আকাশ সংস্কৃতির নামে আমাদের যুবচরিত্রকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য এক গভীর ষড়যন্ত্র করে চলছে। সমাজের সবচেয়ে বিপদসঙ্কুল পথ পাড়ি দিচ্ছে তরুণেরা। আমরা যদি বলি কে জাতিকে শক্তি, সাহস সিঞ্চন করে জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি গবেষণায় ইত্যদির মাধ্যমে স্বগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড় করাতে পারে? উত্তর হবে যুবসমাজ।
সুতরাং শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে নাস্তিক-মুরতা বানানোর প্রতিযোগিতা চলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। আমার প্রিয় যুবসমাজ আমাদের আত্মার হদয়ের স্পন্দন, জাতিকে এগিয়ে নেয়ার পাঞ্জেরী এবং দুরন্ত স্বপ্নের সেই মিনারগুলো ধুলায় ধূসরিত। আমাদের পতিপক্ষরা তারুণ্যের শক্তিকে আজ বিকল্প পন্থায় মোকাবিলার উদ্যোগ নিয়েছে পশ্চিমারা। আমাদের শত্রুরা যুবদের দিক কামান গোলা বারুদ নয়, বরং চরিত্র হননের প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে চলছে।
আজ যদি বলা হয় আমাদের দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব আজ ভূলুণ্ঠিত। যদি বলা হয় আমাদের দেশ বিপদের মুখোমুখি!! দেশের এক অংশকে শত্রুরা দখল করার পাঁয়তারা করছে। ১৮ কোটি মানুষের রক্তকণিকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু তার থেকে অনেক বড় বিপদসংকেত হচ্ছে আমাদের যুবসমাজকে ধ্বংস করে দেয়ার গভীর চক্রান্ত। কিন্তু জাতিবিনাশী এই পরিকল্পনা রুখতে আমরা একেবারে বেখবর। আমাদের তরুণ-তরুণীরা যদি নষ্ট হয়ে যায়। তাদের চরিত্র ভোঁতা হয়ে যায়। তাদের বুদ্ধি বিবেককে স্তব্ধ করে দেয়া যায়। যদি তাদেরকে আদর্শচ্যুত করা যায় তাহলে এর থেকে বড় বিপদ আর কী হতে পারে জাতির জন্য?
কিন্তু সমাজের সকল বিপদই যেন তরুণ-যুবকদের তাড়া করছে। অজানা এক আতঙ্ক আর উদ্বিগ্নতা তরুণ-যুবকদের ওপর ভর করেছে। অপসংস্কৃতির কালো থাবা, ইন্টারনেট প্রযুক্তির অভিশাপ, ড্রাগের মরণ কামড় যেন গোটা জাতি, সভ্যতা, সমাজকে অক্টোপাসের মতো আটকে ফেলেছে। নৈতিকতামুক্ত উন্নতি যেন তরুণ-যুবকদের অশান্তি আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। মায়ের জাতি নারীকে ব্যবহার করেছে পণ্য হিসেবে। ধর্মীয় শৃঙ্খলমুক্ত শিক্ষিত যুবক তরুণ যেন হিং¯্র, অসভ্য আর ইতর প্রাণীর স্বরূপ; কিন্তু সকল বাধা উপেক্ষা করেও বিশ্বব্যাপী শাশ্বত বিধান ইসলামের দিকেই ঝুঁকছে তরুণ-যুবকরা। ইসলাম আজকের আধুনিক জাহিলিয়াতকে মোকাবেলা করছে প্রতিনিয়ত।
আজকের পৃথিবীব্যাপী ইসলামের মূল চালিকাশক্তির উৎস হচ্ছে ছাত্র-যুব আন্দোলন। তাই বিরোধীদের সকল পরিকল্পনা যুবক-তরুণদের উত্থান রোধে ব্যয়িত। এক্ষেত্রে অপসংস্কৃতির আগ্রাসন, অপপ্রচার, বিভেদ, বিভ্রান্তি, অনৈক্য, আর নৈতিক চরিত্র ধ্বংসের সকল আয়োজন চলছে প্রতিনিয়ত। শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে নাস্তিক্যবাদী চিন্তা দিয়ে ঢেকে ফেলা হচ্ছে তরুণদের কোমলমতি মন-মানসিকতাকে। ইসলামের পুনঃজাগরণের ক্ষেত্রে মুসলিম যুবসমাজের ভূমিকা অনন্য।
কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় সেই সঙ্কল্পের কথাই প্রতিধ্বনিত হয়েছে- “থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে, কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে। দেশ হতে দেশ দেশান্তরে ছুটছে তারা কেমন করে, কিসের নেশায় কেমন করে মরছে যে বীর লাখে লাখে, কিসের আশায় করছে তারা বরণ মরণ-যন্ত্রণারে। রইব না কো বদ্ধ খাঁচায়, দেখব এ-সব ভুবন ঘুরে- আকাশ বাতাস চন্দ্র-তারায় সাগর-জলে পাহাড়-চূড়ে। আমার সীমার বাঁধন টুটে দশ দিকেতে পড়ব লুটেঃ পাতাল ফেড়ে নামব নিচে, উঠব আবার আকাশ ফুঁড়ে: বিশ্ব-জগৎ দেখব আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে।”
Roles and Responsibilities of Muslim Youth in the Modern World-Ummah is in need of brave, knowledgeable, sincere, and loyal Muslim youth. Their unwavering efforts and dedications for the cause of Islam never needed as badly as it is today.
The youth are the future of this Ummah, they are the flag bearers of Islam who carry the message of Islam to the next generation. The youth are brought out to take the divine message of Islam to various parts of the earth. Youth means the future; youth means that the Ummah stands the chance to regains its leadership role; youth means that the Ummah can be proud of its future. Muslim youth of today will be the leaders of the Ummah tomorrow. This is a role for which they ought to be prepared, by their families, educational institutions, and the society at large. Today, the sad reality is that the youth are lost” – they lack direction and they are in dire need of real Islamic leaders motivated by Islamic cause, to follow. Defeats and tragedies inflicted upon the Ummah today. Ummah is in need of brave, knowledgeable, sincere, and loyal Muslim youth. Their unwavering efforts and dedications for the cause of Islam is never needed as badly as it is today.
তরুণ-যুবকদের ইসলামের দিকে ঝুঁকে পড়াকে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করেছে- দ্য ক্লাশ অব সিভিলাইজেশনস গ্রন্থে শ্যামুয়েল পি হান্টিংটন ইসলামের দিকে তরুণ-যুবকদের ঝুঁকে পড়াকে দেখছেন আতঙ্ক হিসেবে। অনুসন্ধান করেছেন এর কারণ। তিনি লিখেছেন- “ইসলামের পুনঃজাগরণে যখন এশীয়রা তাদের অর্থনীতির বিপুল বিকাশের ফলে ক্রমান্বয়ে আরও দৃঢ় শক্তিসম্পন্ন হচ্ছে, মুসলমানেরা একই সঙ্গে তরুণরা ইসলামের ভেতর ফিরে যাচ্ছে; যেখানে তারা মনে করে তাদের পরিচয়, জীবনের অর্থ, স্থায়িত্ব, স্থিরতা, বৈধতা, উন্নয়ন, ক্ষমতা, আশা-আকাক্সক্ষা ইত্যাদির সূতিকাগার। তারা এক্ষেত্রে একটি শ্লোগান দ্বারা সবকিছু বুঝাতে চায়, আর তা হলো, ‘ইসলামই হলো সমাধান’। কিন্তু পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে প্রত্যাখ্যান করে এবং চূড়ান্তভাবে ইসলামের মধ্যে যাবতীয় সমস্যার সমাধান খুঁজে ফেরে।
সুতরাং, তাদের মতে ইসলামই অধুনা বিশ্বের একমাত্র পথ। ইসলামী পুনঃজাগরণের মাধ্যমে মুসলমানেরা সকল বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক আন্দোলন যা সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চাওয়া হয়। ধর্মীয় পুনঃজাগরণ আসলে একটি প্রধান ধারা, তবে তা চরমপন্থী নয়, আর তা বিস্তৃত; কিন্তু বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো-ছিটানো নয়। ইসলামী প্রতীক, বিশ্বাসসমূহ, আমলসমূহ, প্রতিষ্ঠানাদি, রাজনীতি এবং সাংগঠনিক তৎপরতা সমগ্র বিশ্বের মুসলমানদের দৃঢ়তা, আজ্ঞা এবং সমর্থন লাভ করে। যার পরিমাণ হবে বিলিয়ন মুসলমান, যার ব্যাপ্তি মরক্কো থেকে ইন্দোনেশিয়া এবং নাইজেরিয়া থেকে কাজাকিস্তান অবধি। তা ছাড়া বামপন্থী রাজনীতি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আর তেমন শক্তভাবে দাঁড়াতে পারেনি। উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক আন্দোলন নানা কারণে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি। কেননা গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেয়ার জন্য যে বুদ্ধিমত্তা ও শক্তি প্রয়োজন তা অপাশ্চাত্য দেশে খুবই সীমিত মানুষের মধ্যে রয়েছে। তাই এটি একটি পাশ্চাত্যমুখী এলিটভিত্তিক আন্দোলন, যার গণভিত্তি নেই বললেই চলে।”
মার্কিন মি. প্যাট্রিক বুকানন তাঁর ‘পাশ্চাত্যের মৃত্যু’ নামক গ্রন্থে লেখেন, ‘২০৫০ সাল পর্যন্ত আমেরিকার অবস্থা বর্তমান তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতো হয়ে যাবে। সেখানে মুসলমানদের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাবে। ২০৫০ সাল নাগাদ ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা ১৫ মিলিয়নে গিয়ে দাঁড়াবে। মুসলমানদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা বিবেচনা করে বলা হয়- “জার্মানি একদিন ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত হবে এবং ডয়েসল্যান্ডে ইসলামের সবুজ অর্ধচন্দ্র পতাকা উড়বে। জার্মানি শিগগির ইসলামের একটি শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হবে। জার্মানিতে মুসলমানদের সংখ্যা ৫০ লাখ। আমেরিকায় ৩০ বছরের মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা ইহুদিদের ছাড়িয়ে যাবে আশঙ্কা করা হয়েছিল। আঠারো বছর আগে আমেরিকার ম্যাসাচুসেট্স বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সি¤েপাজিয়ামে বলা হয়েছে-স্থানীয়ভাবে মুসলমানদের গ্রহণযোগ্যতা ও মুসলমানদের প্রতি ধর্মীয় সহনশীলতাও বাড়ছে। পাবলিক স্কুলসমূহে সাপ্তাহিক ছুটির ¯¦ীকৃতি এবং ক্যাফেটেরিয়ায় শূকরের মাংস পরিবেশন বন্ধ করা হয়েছে।
মুসলিম ছাত্রীরা আলাদা ক্লাসে সাঁতার শিখতে পারে ও জিমনেসিয়ামে পা সমান লম্বা পোশাক পরতে পারে। এই সবই হচ্ছে ৯/১১ ঘটনার এক বছরের মধ্যেই আমেরিকাতে মুসলমানদের সংখ্যা ৩০ হাজার এবং ইউরোপে বিশ হাজারেরও অধিক বৃদ্ধির ফল। বিশ্ব এখন পশ্চিমাবলয়ের বাইরের পানে ছুটে চলেছে। ধর্মীয় ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো তার স্থান দখল করে চলেছে।
ওয়েস্টফালিয়া (ডবংঃঢ়যধষরধ) অনুযায়ী আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে ধর্মনিরপেক্ষ করার অর্থাৎ রাজনীতি থেকে ধর্মকে বাদ দেয়ার অপচেষ্টা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে পড়ছে। পাশ্চাত্য সভ্যতা প্রায় নিঃশেষ হতে চলেছে। এডওয়ার্ড মরটিমার বলেন, ধর্ম ক্রমাগত আন্তর্জাতিক বিষয়াদির ওপর কর্তৃত্ব ও প্রভাব বৃদ্ধি করছে। সুদূর ভবিষ্যতে মোহাম্মদ জয়ী হয়ে বেরিয়ে আসবেন। আর সেটাই ইসলামী বিশ্ব। মুহাম্মদ সা.-এর আন্দোলনে সবচেয়ে তরুণ-যুবকরাই আলোড়িত করেছিল। দশ বছরের তরুণ আলী আবু জেহেল আর আবু সুফিয়ানের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে রাসূল সা.-এর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল।
রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন, “কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে আল্লাহর আরশের ছায়ার নিচে ঐ তরুণদেরকে বসার সুযোগ দিবেন, যারা বয়সের তরুণ সময়কে আল্লাহর পথে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।” (মিশকাত শরিফ) রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, “তরুণ বয়সের ইবাদতকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়। একজন বৃদ্ধের ইবাদতের চেয়ে আল্লাহ বেশি খুশি হন, সে তরুণ ও যুবকদের ইবাদতে, যারা যৌবন বয়সে আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত থাকে।” (আবু দাউদ) রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন, “হাশরের ময়দানে মানুষকে পাঁচটি বিষয়ের হিসাব দিতে হবে, তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, যৌবনকাল কিভাবে ব্যয় করেছে।” (মিশকাত)
রাসূলুল্লাহ সা. বিশ্বমানবতার কল্যাণে তরুণদের নিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম জনকল্যাণমূলক সংগঠন- “হিলফুল ফুজুুল যুবসংঘ” গঠন করেছিলেন। রাসূল সা. যখন দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে মাঠে নামেন সর্বাগ্রে তরুণরাই এগিয়ে এসেছিলেন। হযরত আবু বকর রা., হযরত উমর রা. তরুণ বয়সে ইসলাম কবুল করেন। আসহাবে কাহাফে যারা ছিলেন তাঁরাও তরুণই ছিলেন। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন, “হে নবী! আপনার কাছে আমি তাদের (আসহাবে কাহাফ)-এর ইতিবৃত্ত সঠিকভাবে বর্ণনা করেছি, তাঁরা ছিল কয়েকজন তরুণ। তাঁরা তাদের পালনকর্তার প্রতি ঈমান আনয়ন করেছিল এবং আমি তাদেরকে সৎপথে চলার শক্তি বৃদ্ধি করে দিয়েছি। (সূরা : কাহাফ : ১৩)
ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন বেলাল রা. ছিলেন তরুণ। হযরত ইবরাহিম আ. যখন মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে পাষণ্ড নমরুদের অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হন তখন তিনি ছিলেন তরুণ। সারা বিশে^ যুবকরা রয়েছে, আবার মুসলিম যুবকরাও রয়েছে। আমাদের উপর অর্পিত সাধারণ কিছু দায় দায়িত্ব রয়েছে; যা সকল সময়ের জন্য। আবার কিছু দায় দায়িত্ব রয়েছে, যা আমাদের সময়ের সাথে এবং আমাদের শতাব্দীর সাথে সম্পৃক্ত। যার ফলে এ বিষয়ে একান্তভাবে আলোচনা করা আমাদের কর্তব্যও বটে। আমাদের যুবসমাজই আগামীর সুন্দর ভবিষ্যৎ বিনির্মাতা এবং সুন্দর পৃথিবী গড়ার কারিগর। তাই বিষয়টি সম্পর্কে বিশদ আলোচনার অবকাশ রয়েছে।
যুবকগণ তাদের জীবনের সকল প্রকার ইচ্ছা ও চাওয়া পাওয়ার অন্তর্বর্তীকালে অবস্থান করায় তাদের মধ্যে এক উপচে পড়া শক্তি এবং বিপ্লবের প্রাণশক্তি দেখা যায়। দুপুরের সময় সূর্য যখন মধ্য আকাশে অবস্থান করে, তখন সূর্য সবচেয়ে বেশি গরম ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তেমনিভাবে যুবকগণও তাদের যৌবনের এ প্রারম্ভকালে জীবনের সবচেয়ে বিপ্লবী সময়কাল অতিবাহিত করেন। এ সময়ের গুরুত্ব এখান থেকেই উপলব্ধি করা যায়। এ সময় হলো এমন এক সময়, যে সময়ে একজন মানুষ সবচেয়ে বেশি অবদান রাখতে, প্রচেষ্টা চালাতে এবং দায়িত্বের বোঝা বহন করতে সক্ষম। এ জন্যই যুগে যুগে দাওয়াত এবং রিসালাতের গুরুদায়িত্ব এ যুবকদের উপরই অর্পিত হয়েছিলো। (চলবে)
লেখক : সহকারী সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা

SHARE

Leave a Reply