সমাজ সংস্কার আন্দোলনে রাসূল সা. -আব্দুদ্দাইয়ান মুহাম্মদ ইউনুছ

‘‘আমি আমার রাসূলগণকে কেবলমাত্র এ উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছি এবং তাদের ওপর কিতাব ও মানদণ্ড নাজিল করেছি, যাতে মানবজাতি ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। (সূরা হাদীদ : ২৫) এই কথা পবিত্র কুরআনে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে দেয়া হয়েছে। ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে একটি সমাজ গড়ে তুলতে হলে এবং সমাজব্যবস্থায় কার্যকরভাবে ভারসাম্য ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা করতে হলে মানুষের সৃষ্টিকর্তার চেয়ে আর কাউকে প্রাধান্য দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এই প্রমাণপত্রের স্বাক্ষর রেখেছেন বিশ^নবী সা. তাঁর বর্ণিল জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। এজন্য তিনি যে নীতিগুলো গ্রহণ করেছেন তা মানবজাতির কল্যাণের জন্য আজীবন হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকবে। তাঁর নীতিগুলো ছিল-
সহজ ও সম্ভব কাজ করা (To begin from the possible Embrace opportunity): নবী করিম সা.-এর কাছে দুটি অপশন থাকলে তিনি সহজ অপশনটি গ্রহণ করতেন। হযরত আয়েশা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট কোনো দুটি কাজের মধ্যে যদি একটি বাছাই করার ইখতিয়ার দেয়া হতো তাহলে তিনি অপেক্ষাকৃত সহজটাই গ্রহণ করতেন যদি না সেটা কোনো গুনাহের কাজ হতো। যদি কোনো গুনাহের কাজ হতো তাহলে তিনি ছিলেন তা থেকে সবচেয়ে বেশি দূরে অবস্থানকারী। রাসূল সা. কখনও ব্যক্তিগত স্বার্থে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। (বুখারি ও মুসলিম) হযরত আনাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন সহজ কর কঠিন করো না, সুসংবাদ দাও- বীতশ্রদ্ধ করো না। (বুখারি ও মুসলিম)
সমস্যার মাঝে সম্ভাবনা খুঁজে বের করা (To see advantage in disadvantage): নবী করিম সা. সমস্যার মাঝে সম্ভাবনা খুঁজে বের করতেন। নেতিবাচক পরিস্থিতি থেকে ইতিবাচক করার। To see advantage in disadvantage বলেন, Successful leaders see the opportunities in every difficulty rather than the difficulty in every opportunity. অতি সম্প্রতি একটি রিসার্চ রিপোর্ট প্রকাশিত হয় সেখানে উল্লেখ করা হয় যে, বর্তমান বিশ্ব নেতৃত্বের মাঝে এরদোগানের অনন্য গুণ হচ্ছে তিনি কঠিন পরিস্থিতি থেকে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেন। যেমন ২০১৬ সালে সামরিক ক্যুর সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে এসে পুরো চক্রান্ত ভণ্ডুল করে দেন।
প্রয়োজনে স্থান পরিবর্তন করা ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা (To change the place of action): নবী করিম সা. তাঁর ভিশন বাস্তবায়নে প্রয়োজনে স্বস্থান পরিবর্তন করেন। যেমন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। আল্লাহ তায়ালা মক্কায় জিহাদ ফরজ করেননি। কেননা তখন মুসলমানদের শক্তি ও সামর্থ্য যা ছিল তা জিহাদ করার উপযোগী ছিল না। কিন্তু মদিনায় যাওয়ার পর শুধু জিহাদ ফরজ করেননি বরং যারা তাবুক যুদ্ধে বৈধ কারণ ছাড়া জিহাদে যান নাই তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছেন।
শত্রুকে বন্ধু বানানো (To make a friend out of an enemy- Qur’an 41:34): নবী করিম সা.-এর মূলনীতি ছিল শত্রুকে বন্ধু বানানো। হযরত আবু সুফিয়ান এই ক্ষেত্রে অন্যতম উদাহরণ। মক্কা বিজয়ের সময় তিনি ঘোষণা করেন যারা নিজ ঘরে অবস্থান করবেন তারা নিরাপদ। যারা কাবাঘরে আশ্রয় নিবেন তারা নিরাপদ। আর যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে আশ্রয় নিবে তারা নিরাপদ। এই ঘোষণায় একদিকে আবু সুফিয়ান খুশি হন অপরদিকে দলে দলে মানুষ ইসলাম কবুল করেন।
সঙ্ঘাত নয় শান্তি (The power of peace is stronger than the power of violence): নবী করিম সা. সংঘাত নয় শান্তির বার্তাবাহক ছিলেন। তিনি যুদ্ধের পরিবর্তে সন্ধিস্থাপনে বিশ্বাসী ছিলেন; মদিনা সনদ তারাই প্রমাণ। তিনি নিজের সুবিধাজনক স্থানে যুদ্ধ করার চেষ্টা করতেন (ঞড় নৎরহম ঃযব নধঃঃষব রহ ড়হব’ং ড়হি ভধাড়ৎধনষব ভরবষফ)। বদর যুদ্ধের স্থান নির্বাচন তারই প্রমাণ।
বিকল্প অপশন (ঘNot to be a dichotomous thinker): নবী করিম সা. মুতার যুদ্ধে আবদুল্লাহ ইবন আবি রাওয়াহা, মুসআব ইবন উমায়ের ও জাফর ইবন আবু তালেব-এই তিনজন সেনাপতির নাম উল্লেখ করেছেন।
সমাজ পরিবর্তনে ক্রমধারা অবলম্বন (Gradualism instead of radicalism): হঠাৎ করে পরিবর্তনের চেয়ে আস্তে আস্তে মানুষকে অভ্যস্ত করে সমাজ পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। যেমন মদ হারাম কয়েকটি স্তরে হয়েছে। প্রথম স্তরে মদে উপকারের চেয়ে অপকার বেশি তা তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয় স্তরে নামাজের সময় মদ খাওয়া নিষেধ করা হয়েছে। তৃতীয় স্তরে মদ পুরোপুরি হারাম করা হয়েছে।
ডাইনামিক (To be pragmatic in controversial matters): নবী করিম সা. বিতর্কিত বিষয়সমূহে ডাইনামিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তাবুক যুদ্ধে যারা গমন করেন নাই এবং মিথ্যা ওজর পেশ করেছেন আল্লাহর রাসূল সা. তাদের মিথ্যা বাহানা গ্রহণ করেছেন।

সার্বজনীনতা (Open your arms to everyone): তিনি সার্বজনীন আদর্শ প্রচার করেছেন। বিদায় হজের ভাষণ দেয়ার সময় যারা উপস্থিত ছিল সকলেই ঈমানদার ছিলেন। কিন্তু বিদায় হজের ভাষণে তিনি একটি বারের জন্য ‘হে ঈমানদারগণ’ অথবা ‘হে মুসলমানগণ’ বলে সম্বোধন করেন নাই। হে মানবতা- ‘ইয়া আইয়্যুহান্নাস’ বলে সম্বোধন করেছেন ৭ বার। এ থেকে বুঝা যায় যে, আল্লাহর রাসূল সা. এই ভাষণটি মুসলমানদের সামনে দিলেও তাঁর ভাষণের বিষয়বস্তু ছিল অনাগত কালের সমস্ত মানবতা। তাই আজকের প্রেক্ষাপটে অশান্ত পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে তাঁর এই ভাষণের দিকনির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি। মহান আল্লাহ হচ্ছেন রাব্বুল আলামিন। রাসূল সা. হচ্ছেন রাহমাতুললিল আলামিন। আর কুরআন হচ্ছে হুদাল লিননাস। আর মুসলমানেরা হচ্ছে ‘খায়রাহ উম্মাহ’ ‘উখরিযাত লিননাস’। অতএব, আকাশের চাঁদ ও সুরুজ যেমনিভাবে সকলের জন্য কল্যাণকর ও প্রয়োজনীয়। তেমনিভাবে ইসলাম মানবতা ও সৃষ্টিজগতের জন্য কল্যাণকর ও প্রয়োজনীয়।
সকলকে নিয়ে কাজ করা (Work together): নবী করিম সা. মদিনা সনদের মাধ্যমে ইয়াহুদি, খ্রিষ্টান, মুসলমান সকল ফেইথগ্রুপ নিয়ে মদিনায় শান্তিশৃংখলা প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নের রোডম্যপ তৈরি করেন। নবী করিম সা. মুনাফিকদের ভূমিকা জানা সত্ত্বেও তাঁর পক্ষ থেকে তাদেরকে বের করে দেন নাই। ওহুদের যুদ্ধে মুনাফিকরা নিজেরাই পালিয়ে আসে। উবাই ইবন সলুল মুনাফিকদের নেতা হওয়া সত্ত্বেও নবী করিম সা. তাঁর জামা তার মৃত্যুর পর তার কাফনের জন্য প্রদন করেন। নেলসন মান্ডেলা সাদাদের হাতে সাতাশ বছর কারাবন্দী থাকার পর সাদা-কালোর ব্যবধান ঘোচানোর ঘোষণা দেন। অথচ আল্লাহর রাসূলই সা. প্রথম ঘোষণা করেছেন, সাদা-কালোতে কোনো ভেদাভেদ নেই। মর্যাদার মানদণ্ড তাকওয়া। তিনি ইসলামের মূলনীতির সাথে আপস না করে নেটওয়ার্ক তৈরি করতেন এবং প্রয়োজনের আলোকে বিভিন্ন ফেইথ গ্রুপ বা দলের সাথে সন্ধি করতেন। (a coalition builder without compromising the core).
সমাজগঠনে একে অপরের সহযোগিতা (Support each other): আল্লাহর রাসূল সা. পরস্পরকে পরস্পরের ভাই হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং একে অপরকে সহযোগিতার তাগিদ দেন।
আপটুডেট তথ্য রাখা (Keep up to date): নবী করিম সা. তথ্য সংগ্রহের জন্য অনেক সাহাবাকে দায়িত্ব দেন। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য রাখতেন এবং তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন।
ক্ষুদ্র চিত্র নয় বড় চিত্র দেখা (See the bigger picture): নবী করিম সা. ক্ষুদ্র চিত্র বা স্বল্পমেয়াদি লাভের চেয়ে বড় চিত্র বা দীর্ঘমেয়াদি লাভের কথা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। হুদাইবিয়ার সন্ধি এবং হযরত আবু জান্দালের ক্ষত-বিক্ষত চেহারা দেখেও তাকে কাফেরদের কাছে ফেরত দান তারই উদাহরণ।
ভিশনারি ও কৌশলী (Articulation of the vision): ভিশন হচ্ছে দূরদৃষ্টি- Forward looking -the ability to think about or plan the future with great imagination and wisdom আল্লাহর রাসূল সা. ভিশনারি ও কৌশলী ছিলেন। দ্বীনের বিজয় আল্লাহর রাসূলের দীর্ঘমেয়াদি ভিশন ছিল এবং এই ভিশনই সাহাবাদেরকে উজ্জীবিত করেছে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে ইরশাদ করেন, “তিনিই প্রেরণ করেছেন আপন রাসূলকে হিদায়াত ও সত্যদ্বীন সহকারে, যেন এ দ্বীনকে অপরাপর দ্বীনের উপর জয়যুক্ত করেন। যদিও মুশরিকরা তা অপ্রীতিকর মনে করে।” (সূরা তওবা : ৩৩)। উক্ত ভিশন বাস্তবায়নের পথে সঙ্কট সন্ধিক্ষণে তিনি সঙ্গী সাথীদেরকে মিডটার্ম ভিশন দিয়ে আশান্বিত করেছেন। নবী করিম সা. খন্দকের যুদ্ধের সময় যখন পাথরে আঘাত করেন তখন আলোক রশ্মি বিচ্ছুরিত হয়। তখন তিনি বলেন, রোম বিজয় হবে। আবার আঘাত করলে আবার আলোকরশ্মি বিচ্ছুরিত হয়। তখন বলেন পারস্য বিজয় হবে। এই কথা শোনার পর মুনাফিকরা হাসাহাসি করতে লাগল এই বলে যে মদিনা রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছে আর রোম ও পারস্য সা¤্রাজ্য বিজয়ের স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় অল্প সময়ের ব্যবধানে রোম ও পারস্য বিজয় হয়। এই থেকে বুঝা যায় নেতৃত্বের গুণ হচ্ছে সঙ্কট সন্ধিক্ষণকে জনসাধারণকে নতুন স্বপ্ন দেখানো। নবী করিম সা. বলেন, এমন এক সময় আসবে মক্কা থেকে হাজরামাউত একজন সুন্দরী রমণী একাকী যাবে তার কোনো ভয় থাকবে না। মানুষ দরজা খুলে ঘুমাবে চুরি ডাকাতির শঙ্কা থাকবে না। মূলত এর মাধ্যমে সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তার স্বপ্ন তিনি মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন।
নবী করিম সা.-এর ভিশনারি ও কৌশলী নেতৃত্বের অনেক উদাহরণ রয়েছে। এর মধ্যে নি¤েœ কয়েকটি উল্লেখ করছি:
নবী করিম সা. মদিনায় হিজরতের অনেক আগে মুসআব রা.কে মদিনায় পাঠান সেখানে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরির জন্য। আবিসিনিয়ায় মুসলমানদের একদল প্রেরণ করেন। তাঁরা আবিসিনিয়ার বাদশাহর সাথে সাক্ষাৎ করে ইসলামের বার্তা পৌঁছান এবং এর ফলে নাজ্জাসি ইসলাম কবুল করেন। যার ফলে মুসলমানদের আন্তর্জাতিক শক্তি বৃদ্ধি পায়। হুদাইবিয়ার সন্ধিকালে কাফেররা যখন সন্ধিচুক্তিতে তাঁর নামের সাথে ‘রাসূলুল্লাহ’ শব্দটি মানতে সম্মত হয়নি এবং মুসলমানদের কেউ তা মুছতে রাজি হচ্ছে না তখন তিনি নিজ হাতে ‘রাসূলুল্লাহ’ শব্দটি মুছে দিয়ে সন্ধিচুক্তি করেন। এর ফলে দেখা যায় হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় মুসলমানদের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৪০০। আর মক্কা বিজয়ের সময় ছিল প্রায় দশ হাজার। কিন্তু বিদায় হজ্জের সময় ছিল লক্ষাধিক। হুদাইবিয়ার সন্ধিকে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে ফাতহুম মুবিন বলা হয়। এ থেকে বুঝা যায় কোন সুস্পষ্ট সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য অর্থাৎ Long Term target হাসিল করার জন কখনও কখনও Short Term Gain করার টার্গেট ত্যাগ করতে হয়। এটাই আল্লাহর রাসূলের জীবনের অন্যতম শিক্ষা। এই ক্ষেত্রে Strategic Change প্রয়োজনের আলোকে করতে হয়। চলমান কোনো কৌশল ফলপ্রসূ না হলে নতুন কৌশল অবলম্বন করতে হয়। খন্দকের যুদ্ধে হযরত সালমান ফার্সির পরামর্শ অনুসারে পরিখা খনন করা তাঁর দূরদৃষ্টির উদাহরণ। উসামা বিন যায়েদসহ তরুণ নেতৃত্ব তৈরি। যাতে নেতৃত্বের ধারা অব্যাহত থাকে। রাসূল সা. অনেক সময় গন্তব্যস্থলের উল্টো পথে প্রথমে রওয়ানা করতেন। এইভাবে আল্লাহর রাসূল সা.-এর জীবন থেকে অনেক কৌশল জানা যায় যা আজকের সময়েও আমাদেরকে সঙ্কটজনক সময়ে নির্দেশনা দান করে। ভিশন বাস্তবায়নে প্রয়োজনে যুদ্ধ করা (Motivation to fight) : রাসূলে কারিম সা. তাঁর ভিশন বাস্তবায়নে প্রয়োজনে যুদ্ধ করার জন্য অনুসারীদেরকে অনুপ্রাণিত করেন। এই কারণেই ইতিহাস সাক্ষী মুষ্টিমেয় সঙ্গী ও সমরাস্ত্র নিয়ে বদর যুদ্ধে আল্লাহর রাসূল সা. জয়ী হয়েছেন।
মানুষের জীবনে ভিশনের প্রভাব অনেক। ভিশনারি নেতাই কোনো একটি সংগঠন বা জাতিকে নতুন সম্ভাবনা দেখাতে পারে। চৌধুরী রহমতে এলাহী ও কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন। মাহাথির মুহাম্মদকে আধুনিক মালয়েশিয়ার স্বপ্নদ্রষ্টা বলা হয়। এইভাবে একেক দেশ একেকজন নেতা জাতিকে নতুন স্বপ্নে উদ্ভাসিত করে নেতৃত্ব দেন। ভিশনই কোনো একজন মানুষকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যপানে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে এবং অনেক মত ও চিন্তাধারার মানুষের মধ্যে চিন্তার ঐক্য সৃষ্টি করে। যেমন আল্লাহর রাসূল মুহাজির ও আনসারদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব ও চিন্তার ঐক্য সৃষ্টি করেন। ভিশন মানুষকে মালের কুরবানি দিতে উদ্ধুদ্ধ করে। হযরত আবু বকর তাবুক যুদ্ধে তাঁর ঘরে যা ছিল সব কিছুই আল্লাহর রাসূলের সামনে পেশ করেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আজও অসংখ্য মানুষ আপন আপন ভিশনকে সামনে রেখে ত্যাগ ও কুরবানির নজরানা স্থাপন করে যাচ্ছেন। ভিশন মানুষের সময়, আরাম আয়েশ ও শ্রম ত্যাগে অনুপ্রাণিত করে। লন্ডন মুসলিম সেন্টার প্রতিষ্ঠায় অনেকে হলিডের টাকা দেয়; সাপ্তাহিক বন্ধের দিন নিজ হাতে অন্যের কার পরিষ্কার করে উক্ত টাকা মসজিদে দান করে। ভিশনই বৈষয়িক স্বার্থ ত্যাগ করতে উদ্ধুদ্ধ করে। যেমন আসহাবে রাসূলগণ মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেছেন। ভিশন কষ্ট, নির্যাতন স্বীকারে উদ্ধুদ্ধ করে। যেমন হযরত বেলালসহ অসংখ্য সাহাবা নানা ধরনের জুলুম-নির্যাতন সহ্য করেন। আবু জান্দালকে জুলুম নির্যাতনে ক্ষত-বিক্ষত করা হলেও প্রতিরোধ করতে দেয়া হয়নি। ভিশন মানুষকে জীবন দিতে উদ্ধুদ্ধ করে। যেমন হযরত খাব্বাবসহ অসংখ্য সাহবা জীবন দান করেছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আজও অনেক মানুষগুলোর মুখেও হাসিমুখে জীবন দেন।
ভিশন মানুষকে অধ্যবসায়ী ও কঠোর পরিশ্রমী বানায়। যেমন মাওলানা রুমি ২৬ হাজার কবিতা সংবলিত মসনবী লিখেছেন; তিনি চেয়ারে বসেই ঘুমুতেন। ইমাম বুখারী একটি হাদিস সংগ্রহ করার জন্য তিন শত মাইল হেঁটেছেন। ভিশন মানুষকে কমিটেড বানায়। যেমন সাঈদ বদিউজ্জমান সাঈদ নুরুসি জেলখানাতে রেসালায়ে নূর লেখেন। মাওলানা মওদূদী ও সাইয়েদ কুতুব জেলখানায় তাফসির লিখেছেন। ইবন জারির তাবারি চল্লিশ বছর ধরে প্রতিদিন চল্লিশ পৃষ্ঠা গবেষণাধর্মী লেখা লেখেন। আধুনিক বিজ্ঞানের স্বপ্নদ্রষ্টা রজার বেকন জেলখানায় বসেই বিজ্ঞানের অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন। ভিশন মানুষের ইচ্ছাশক্তি তীব্র করে এবং উচ্চাশার জন্ম দেয়। যেমন হিটলার ঠেলা গাড়ির চালক ছিলেন; স্ট্যালিন জুতোর মুচি ছিলেন; মুসুলিনি মোদিদোকানে কাজ করতেন; এরদোগান লেবু বিক্রি করতেন; মোদি চা বিক্রি করতেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় প্রত্যেকেই নিজ নিজ দেশের শাসক হয়েছেন। এখানে একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ভিশনারিকে মানুষ অনেক সময় সমসাময়িক কালের মানুষেরা ভুল বুঝে। ইমাম ইবন তাইমিয়াকে কারাগারে দেয়া হয়েছিল। এইভাবে পৃথিবীর অনেক ভিশনারি মানুষকে কারাগারে জীবনের বিরাট অংশ কাটাতে হয়। নেলসন ম্যান্ডেলাও তাদের একজন।
ভিশন মানুষকে ত্যাগী বানায়। মূলত ত্যাগ ছাড়া স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয় না। আবার সুস্পষ্ট কোন টার্গেট না থাকলে ত্যাগ ও কুরবানি বৃথা যায়। তাই যারা আখেরাতের নাজাতের জন্য ত্যাগ করেন তারা এর ফল আখিরাতে পাবেন কিন্তু দুনিয়াতে এই ত্যাগের সুফল মিলে না। ত্যাগী কর্মীবাহিনী সংখ্যায় কম হলেও তাদের মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তন সম্ভব। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি মাত্র ১৭ জন নিয়ে বঙ্গ বিজয় করেন। ত্যাগ ও কুরবানি ছাড়া কোনো বিপ্লব সাধন সম্ভব হয়নি। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইমাম খোমেনির নেতৃত্বে যে বিপ্লব সাধিত হয় তার সফলতার জন্য একদিনেই দশ হাজারের বেশি মানুষ জীবন দান করে। তাদের রক্তে তেহরানে রক্তের স্রোতধারা প্রবাহিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই শাহের পতন হয়। স্বৈরাচারী বা জালিম সরকারের পতনের জন্যও ত্যাগ ও কুরবানির প্রয়োজন হয়।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার The Audicty of Hope, Dreams from my father বইতে উল্লেখ করেছেন যে, মাত্র কয়েকজন মানুষের সাথে মিটিং করার জন্য শত শত মাইল পাড়ি দিয়ে ক্যাম্পিং করেছেন। নেলসন ম্যান্ডেলা তাঁর Long Walk to Freedom বইতে তাঁর জীবনের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ উল্লেখ করেছেন। তিনি কিভাবে মাত্র দুই পাউন্ট সপ্তাহে উপার্জন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনা চালিয়েছেন। তিনি বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়ের শিরোনাম দিয়েছেন, The Struggle Is My Life। মূলত ১৯৭৪ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত জেল-জুলুমসহ নানা ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করেই নেলসন ম্যান্ডেলা সাউথ আফ্রেকিার প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন এবং বিশ্বের অবিসংবাদিত নেতা হিসাবে বরিত হন। এক কথায় ত্যাগ ছাড়া কোনো স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ঔ.গ. J.M. Barrie, Peter Pan যথার্থই বলেছেন, Dreams do come true, if only we wish hard enough. You can have anything in life if you will sacrifice everything else for it.”
জনসাধারণকে ভিশনের প্রতি উজ্জীবিত করা (Inspire/Motivate People) : নবী করিম সা. ভিশনের প্রতি জনসাধারণকে উজ্জীবিত করার সম্মোহনী শক্তির অধিকারী ছিলেন। মূলত হতাশ জনতাকে নতুন স্বপ্নে বিভোর করা নেতার কাজ। বর্তমান দুনিয়াতে যারা সফল নেতা হিসাবে বিবেচিত যেমন নেলসন ম্যান্ডেলা, বারাক ওবামা, এরদোগান, মাহাথির মোহাম্মদ ও ইমরান খান প্রত্যেকে জনতাকে উজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে পারদর্শী।
সমাজের প্রচলিত সমাজব্যবস্থার নেতিবাচক দিক তুলে ধরা (Proper understanding of the existing order) : রাসূলে কারিম সা. প্রচলিত সমাজব্যবস্থার দোষত্রুটি তুলে ধরে সমাজ পরিবর্তন কেন দরকার তা তুলে ধরে পরিবর্তনের সূচনা করেন (Initiate, guide and control change)। রাসূলে কারিম সা. সমাজ পরিবর্তনের স্লেøাগান তুলে ধরেন। এই ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন, “আল্লাহ তায়ালা কোন জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা নিজেরা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা না করে।” আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার স্লোগান ছিল ‘চেঞ্জ’। আর এরদোগানকে বলা হয় চেঞ্জ-মেকার।
আল্লাহর রাসূল সা. নেতা ছিলেন ম্যানেজার ছিলেন না: মহানবী বলেন, “মানবসমাজ হচ্ছে খনির মতো। জাহিলিয়াতের যুগে তাদের মধ্যে সর্বোত্তম যারা, ইসলামেও তারা হলেন সর্বোত্তম যদি তারা সত্যিকারভাবে ইসলামকে গ্রহণ করেন।” এই হাদিস থেকে বুঝা যায় যে, সকল মানুষের মধ্যে মেধা ও যোগ্যতা আছে। কিন্তু যেমনিভাবে স্বর্ণ, রৌপ্য, তেলসহ নানাধরনের খনিজসম্পদ রয়েছে তেমনিভাবে সকল মানুষের মাঝে একই ধরনের যোগ্যতা বা একই ফিল্ডের নেতৃত্বের গুণ নেই। একেকজন মানুষের মাঝে একেক ফিল্ডের নেতৃত্বের যোগ্যতা রয়েছে। কেউ চিকিৎসাশাস্ত্রে, কেউ প্রকৌশলীতে, কেউ সাংবাদিকতায়, কেউ জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধনায়, কেউ ইসলামী শরীয়াহ আর কেউ সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতৃত্ব প্রদান করেন।

নেতৃত্ব হলো দায়িত্বশীল আচরণের নাম। হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি রাসূলে কারিম সা.-কে বলতে শুনেছি, ‘‘সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমরা প্রত্যেকেই কিয়ামতের দিন (অধীনস্থদের) দায়িত্ব সম্পর্কে আল্লাহর কাছে জিজ্ঞাসিত হবে। সুতরাং একজন রাষ্ট্রনায়ক তিনি তার রাষ্ট্রের নাগরিকদের দায়িত্বশীল। তাকে তার অধীনস্থ নাগরিকদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হতে হবে। আর প্রত্যেক পুরুষ তার পরিবারের লোকদের দায়িত্বশীল। সে তার অধীনস্থ পরিবারের লোকদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। আর প্রত্যেক স্ত্রী তার স্বামীর পরিবারের লোকদের এবং তার সন্তানদের রক্ষণাবেক্ষণকারিণী। তাকে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। আর একজন দাস বা চাকর তার মালিকের সম্পদের দায়িত্বশীল এবং সে তা সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। সাবধান তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই আপন আপন অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে। (বুখারি ও মুসলিম) এই হাদিসে ‘রায়িন’ শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত এর শাব্দিক অর্থ হলো রাখাল। আল্লাহ তায়ালা নবী-রাসূলদেরকে নবুওয়াতের আগে ছাগলের রাখালের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। কেননা ছাগলকে নিয়ন্ত্রণ করা খুব সহজ বিষয় নয়।

হারিস আল আশয়ারী রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন, রাসূল সা. বলেন, আমি পাঁচটি জিনিসের ব্যাপারে তোমাদেরকে আদেশ করছি: ১. জামায়াতবদ্ধ হবে ২. নেতার আদেশ মন দিয়ে শুনবে ৩. নেতার আদেশ মেনে চলবে ৪. আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজ বর্জন করবে ৫. আর আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। (আহমদ ও তিরমিজি) আল্লাহর রাসূল সা. বলেন, ইন্নামাল ইমামু জুন্নাতুন- নেতা হচ্ছে ঢালস্বরূপ, যাকে সামনে রেখে লড়াই করা যায় এবং আত্মরক্ষা করা যায়। নবী করিম সা. আরও বলেন, “তোমরা যখন তিনজন সফরে বের হও। তোমাদের মধ্য থেকে একজনকে আমীর বানাও।” হযরত উমর ফারুক বলেন, ‘‘জামায়াত ছাড়া ইসলামের কোনো অস্তিত্ব নাই। আর নেতৃত্ব ছাড়া জামায়াতের কোনো ধারণা করা যায় না। তেমনিভাবে নেতৃত্বও অর্থহীন আনুগত্য ছাড়া।”

হযরত আওফ ইবন মালেক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা.কে বলতে শুনেছি তোমাদের নেতারাই উত্তম নেতা যাদেরকে তোমরা ভালোবাস এবং তারা তোমাদেরকে ভালোবাসে। তোমরা তাদের জন্য দু’আ করো আর তারা তোমাদের জন্য দু’আ করে। আর তোমাদের ঐসব নেতারাই নিকৃষ্ট নেতা যাদের প্রতি তোমরা বিক্ষুব্ধ এবং তারাও তোমাদের প্রতি বিক্ষুব্ধ। হযরত আওফ বলেন, আমি বললাম ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাদেরকে কি আমরা পদচ্যুত করতে পারবো না? রাসূলুল্লাহ বলেন না যতক্ষণ তারা তোমাদের মাঝে নামাজ কায়েম করবে, না যতক্ষণ তারা তোমাদের মাঝে নামাজ কায়েম করবে।
হযরত আয়েয বিন আমর থেকে বর্ণিত, একদিন হযরত উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ আমার কাছে এসে বললেন, বাপু হে শোন! আমি রাসূলুল্লাহকে বলতে শুনেছি নিকৃষ্ট দায়িত্বশীল হল রাগী বদমেজাজি ব্যক্তি। খবরদার আমি তোমাকে সাবধান করছি- তুমি যেন তাদের অন্তর্ভুক্ত না হও। (বুখারি ও মুসলিম) হযরত আয়েশা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ নরম আচরণকারী এবং যাবতীয় কার্যক্রমে তিনি নরম আচরণই পছন্দ করেন। (বুখারি ও মুসলিম) হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি রাসূলুল্লাহকে বলতে শুনেছি যে ব্যক্তি নরম ব্যবহার থেকে বঞ্চিত সে প্রকৃতপক্ষে যাবতীয় কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত। (মুসলিম)
মিনহাজুস সালেকিন গ্রন্থে উল্লেখ আছে, তিনটি গুণের অধিকারী না হয়ে কোনো ব্যক্তির আমর বিল মারুফ ও নেহি আনিল মুনকারের কাজে আত্মনিয়োগ করা উচিত নয়। গুণ তিনটি এই: ১. যাকে হুকুম দিবে বা নিষেধ করবে তার প্রতি দরদি হতে হবে। ২. যে বিষয়ে নিষেধ করবে সে বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞানের অধিকারী হতে হবে। ৩. যে ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করবে সেক্ষেত্রে পরিপূর্ণ ইনসাফ করতে সক্ষম হতে হবে। উক্ত গ্রন্থে আরও উল্লেখ আছে, আল্লাহ যখন কোনো জাতির কল্যাণ চান তখন তাদের উপর সহনশীল লোকের নেতৃত্ব দান করেন। তাদের মধ্যকার বিচারব্যবস্থা দায়িত্বজ্ঞানী লোকদের উপর অর্পণ করেন। আর অর্থসম্পদ দান করেন দানশীল লোকদেরকে। আর যখন কোনো জাতির অকল্যাণ চান তখন তাদের উপর নির্বোধ লোকদের নেতৃত্ব চাপিয়ে দেন। তাদের মধ্যে বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব অজ্ঞ লোকদের উপর অর্পণ করেন। আর ধনসম্পদ দান করেন কৃপণ লোকদের হাতে।
নেতা ও বস বা ম্যানেজার এর মাঝে কতিপয় পার্থক্য। নেতা ও ম্যানেজার এক নয়। লিডার ভিশন দেখায় কিন্তু ম্যানেজার তা বাস্তবায়নে পরিকল্পনা করে। নেতা আদরমাখা ভাষায় কথা বলে নির্দেশনা প্রদান করেন আর বস বা ম্যানেজার নির্দেশের সুরে নির্দেশনা দেন। ম্যানেজার ভীতি প্রদর্শন করে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে আর নেতা প্রীতিপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত করে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। ম্যানেজারের মধ্যে আমিত্ব প্রকাশ পায় কিন্তু নেতা ‘আমরা’ শব্দ উচ্চারণ করেন। কোনো ক্ষেত্রে কৃতিত্ব নিজের কীর্তি বলে প্রকাশ করেন না। বস বা ম্যানেজার অধীনস্থদের সময়মত আসার নির্দেশ দিয়ে নিজে সময়মতো আসেন না কিন্তু নেতা সময়ের আগেই এসে উপস্থিত হন। বস বা ম্যানেজার জটিল কোনো কাজ অধীনস্থরা করতে না পারলে তাদেরকে বকাবকি করেন কিন্তু নেতা বকাবকির পরিবর্তে নিজেই উক্ত জটিল কাজ করে সমস্যার সমাধান কিভাবে করতে হয় তা দেখিয়ে দেন। বস বা ম্যানেজার কাজ করার নির্দেশ দিয়ে নিজে অংশগ্রহণ করেন না কিন্তু নেতা নিজেই অধীনস্থদের সাথে কাজে শরিক থাকেন। বস বা ম্যানেজার ভুল-ত্রুটির জন্য অধীনস্থদের সমালোচনা করেন কিন্তু নেতা কখনও সমালোচনা করেন না বরং তারা যেন লজ্জিত না হয় সেদিকে খেয়াল রেখেই ভুল-ত্রুটি সংশোধন করেন। ম্যানেজার প্রশাসনিক কাজ করেন আর নেতা উদ্ভাবনী শক্তি ব্যবহার করেন। মানুষ নেতার অনুসরণ করে আর ম্যানেজারদের নির্দেশনায় কাজ করে। নেতা নতুন ডাইরেকশন ও ভিশন দেন আর ম্যানেজার নির্দিষ্ট নিয়মমাফিক মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করেন। বস টেবিলে বসে নির্দেশ দেন আর নেতা ফিল্ডে নেতৃত্ব দেন।
পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ (Involve the people in decision-making process): স্বৈরাচারী নেতৃত্ব কারো কথা শুনতে চায় না কিন্তু আদর্শ নেতারা জনগণকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পৃক্ত করেন। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি সন্তানের দুধ ছাড়ার বিষয়েও স্বামী-স্ত্রী পরামর্শক্রমে সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছে। তবে আল্লাহর দেয়া সীমারেখা এবং রাসূলুল্লাহর সুন্নাহর বাইরে কোনো ধরনের পরামর্শ নেয়ার সুযোগ নাই। পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ নবী-রাসূলদের নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আমরা দেখি হজরত ইবরাহিমকে যখন আল্লাহ নির্দেশ দেন ইসমাইলকে যবেহ করার জন্য। তখন ইবরাহিম (আ) ইসমাইলের কাছে গিয়ে বলেননি এটা আল্লাহর নির্দেশ তোমাকে কুরবানি করব, বরং বলেছেন, “হে আমার প্রিয় বৎস আমি স্বপ্নে দেখেছি তোমাকে যবেহ করতে। এই ক্ষেত্রে তোমার অভিমত কী?” উত্তরে ছেলে বলেন, আপনার প্রতিপালক যা করতে বলেছেন আপনি তা করুন আমাকে আপনি ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন। আমি নিচে নবী করিম সা.-এর জীবনে পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কয়েকটি উদাহরণ পেশ করছি :
ওহুদের যুদ্ধে নবী করিম সা.-এর ব্যক্তিগত ইচ্ছা ছিল মদিনা শহরের ভিতরে থেকেই যুদ্ধ করতে। কিন্তু যুবক এবং বদরের যুদ্ধে শরিক হতে পারেননি এমন সাহাবাদের পরামর্শে অধিকাংশের মতামতের আলোকে মদিনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করতে সিদ্ধান্ত নেন। যদিও পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়েছে যে অধিকাংশের মতামত সঠিক ছিল না। কিন্তু নবী করিম সা. সঠিক প্রক্রিয়ায় কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলে তা গ্রহণ করতেন Accept the outcomes of legitimate processes even if they are against what you want। খন্দকের যুদ্ধে সালমান ফার্সি রা.-এর পরামর্শে পরিখা খননের সিদ্ধান্ত নেন। অবশ্য প্রমাণিত হয়েছে যে তাঁর পরামর্শ কার্যকর বিবেচিত হয়েছে। এই থেকে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার যে, রাসূলে কারিম সা. উদ্ভাবনী চিন্তাকে গ্রহণ করতেন (Look for innovative solutions)। বদরের যুদ্ধে একজন অপরিচিত সাহাবার পরামর্শে প্রথম পর্যায়ে যে স্থানে মুসলমানরা অবস্থানের চিন্তা করেছিলেন তা ত্যাগ করে পানির নিয়ন্ত্রণ মুসলমানদের হাতে থাকবে এমন স্থানে অবস্থান গ্রহণ করেন। বদরের যুদ্ধে যুদ্ধবন্দীদের সম্পর্কে অধিকাংশ সাহাবার মত অনুসারে নবী করিম সা. সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন কিন্তু আল্লাহ তায়ালার পছন্দ ছিল হযরত ওমরের মত। তবে শিক্ষণীয় বিষয় এই যে, যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় সেই সময় আল্লাহ ওহি নাজিল করে তা বন্ধ করার পরিবর্তে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হবার পর ওহি নাজিল করে তা জানান।

অনেক সময় নেতৃত্ব পরার্মশ গ্রহণ করার পরিবেশ ও সুযোগ পান না। আবার কখনও কখনও তাঁরা আরও যতবেশি সিরিয়াস হলে সংশ্লিষ্ট সকলের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে সকলের অংশীদারিত্বের মনোভাব বৃদ্ধি পেতো সেই ধরনের উদ্যোগেরও অভাব থাকে। কঠিন পরিস্থিতিতে সকলের মাঝে চিন্তার ঐক্য সৃষ্টির প্রতিও নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা অনৈক্য বা বিভেদের ফলে আন্দোলন ও সংগঠন এত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে নেতৃত্ব বা বিরাট কর্মীবাহিনীকে শহীদ করে বা জেলে বন্দী করে রেখে সেই ধরনের কোনো ক্ষতি করা সম্ভব হয় না। কারণ শাহাদাতের ফলে ময়দান আরও উর্বর হয় কিন্তু ফেতনা বা অনৈক্যের ফলে আল্লাহর রহমত চলে যায়।

কৌশলগত বিষয়ে মতপার্থক্য যেমনিভাবে হতে পারে তেমনিভাবে Vested interest রক্ষায় শয়তানি ওয়াসওয়াসায় মতবিরোধ হতে পারে। কিন্তু স্বার্থের দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব বা দায়িত্বের লোভে কোন ধরনের মতবিরোধ ইসলামী আন্দোলনে কল্পনা করা যায় না। আঞ্চলিকতা বা গোত্রপ্রীতি ইসলামে নেই। তাই ইসলামী আন্দোলন এর নেতৃত্ব নির্বাচন বা মনোনয়নের ক্ষেত্রে আঞ্চলিকতা বা ব্যক্তিগত স্বার্থ বিচার বিবেচ্য থাকে না।
বর্তমান প্রেক্ষিতে যিনি যতটুকু অবদান রাখেন তা ইতিবাচক দৃষ্টিতে গ্রহণ করা দরকার। যিনি শুধু পরামর্শ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেন তাঁরা মাঠে ময়দানে সক্রিয় না থাকলেও তাঁদের পরামর্শ হয়তোবা গুরুত্বপূর্ণ। হয়তবা যিনি সব সময় মাঠে ময়দানে ব্যস্ত থাকেন তাঁর পক্ষে গবেষণা করার সময় নেই। যারা মাঠে ময়দানে সময় দেয়ার ফুরসত নেই। কিন্তু চিন্তা করার সুযোগ আছে তাঁদের চিন্তাশক্তি কাজে লাগাতে হবে। কেননা আল্লাহ পাক এই চিন্তাশক্তি দান করেছেন এবং তা কতটুকু কাজে লাগানো হয়েছে সে প্রশ্ন করবেন। অতএব, কোনো বিষয়ে তাঁদের পরামর্শ উপেক্ষিত হলেও মন খারাপ করার কারণ নেই। কারণ পরামর্শ দেয়ার মাধ্যমেই তাঁর দায়িত্ব শেষ হয়ে গেছে। যারা মাঠে ময়দানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন হয়তবা ময়দানের বাস্তব অবস্থা বিচার করেই তাঁরা উক্ত পরামর্শ গ্রহণ করা সমীচীন মনে করেন নাই। এই কথা ঠিক যে, ময়দানের কর্মীদের কাছে এমন কিছু বাস্তব তথ্য থাকে যার উপর ভিত্তি করে তাঁরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন। আর উক্ত সিদ্ধান্ত যদি ইতিহাসের গতিধারায় পর্যালোচনা করলে সঠিক প্রমাণিত না হয় তাহলেও আশা করা যায় আল্লাহ পাক সামষ্টিক সিদ্ধান্তের ফলে কাউকে পাকড়াও করবেন না। বদর যুদ্ধের পর বন্দীদেরকে কী করা হবে সে সম্পর্কে হযরত উমর রা.-এর পরামর্শ গৃহীত হয়নি। অধিকাংশের মতামতের আলোকে আল্লাহর রাসূল সা. সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আল্লাহ পাক পরবর্তীতে ওহি নাজিল করে জানিয়েছিলেন যে, আল্লাহ তায়ালা হযরত উমরের মতটিই পছন্দ করেছিলেন। কিন্তু পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে আল্লাহ তায়ালা উক্ত সিদ্ধান্তে বরকত রেখেছেন। এই ঘটনা থেকে এই কথাটি স্পষ্ট যে, কখনও কখনও সামষ্টিক সিদ্ধান্ত ভুল হতে পারে এবং একজন ব্যক্তির অভিমতও সঠিক হতে পারে। তবে কোনো ব্যক্তি নিজের মতকেই সঠিক বলে জিদ করে থাকার সুযোগ নেই। অধিকাংশের মতামতের ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। তা করা না হলে কোনো সংগঠনে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন। আর একটি সংগঠনে সাংগঠনিক শৃঙ্খলাই যদি না থাকে তাহলে উক্ত সংগঠন গঠনমূলক কোনো কিছু উপহার দেয়া কঠিন। আল্লাহর রাসূল সা. সকল বিষয়ে সবার সাথে পরামর্শ করার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করতেন। আর আসহাবে রাসূলগণ কোনো বিষয়ে তাঁদের মতামত দেয়ার আগে জানতে চাইতেন এই প্রসঙ্গে কোনো ওহি আছে কিনা? যদি ওহি না থাকে তাহলে তাঁরা পরামর্শ প্রদান করতেন। যেমন বদর যুদ্ধে জনৈক সাহাবীর পরামর্শক্রমে মুসলমানদের অবস্থানের স্থান নির্ধারণ করা হয়। এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে, ইসলামী শক্তির মাঝে যাঁরা যেই বিষয়ে অভিজ্ঞ তাঁরা সেলফ-মোটিভেটেড হয়েই উক্ত বিষয়ে চিন্তা ভাবনা করা দরকার এবং নির্দিষ্ট ফোরামে উক্ত পরামর্শ পৌঁছানো প্রয়োজন।

অনেক সময় দেখা যায় প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে সংশ্লিষ্ট সকল দায়িত্বশীল এক সাথে বসে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন না। এই ধরনের সঙ্কট সন্ধিক্ষণে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থী হয়ে যতটুকু সম্ভব সতর্কতা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। বদর যুদ্ধের সময় আল্লাহর রাসূল সা. জনৈক কম পরিচিত এক সাহাবীর পরামর্শক্রমে স্থান নির্ধারণ করেছিলেন। উক্ত সাহাবা নিজের পক্ষ থেকেই আল্লাহর রাসূল সা.কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন হে আল্লাহর রাসূল আপনি যে স্থান নির্ধারণ করেছেন তা কি আল্লাহর নির্দেশের ভিত্তিতে। যদি তা ওহির নির্দেশ প্রাপ্ত হয়ে করেন তাহলে আমার কোনো কথা নেই। আর যদি তাতে কোনো পরামর্শ দেয়ার সুযোগ থাকে তাহলে আমি আমার মতামত প্রদান করতে পারি। আল্লাহর রাসূল সা.-এর পক্ষ থেকে যখন পরামর্শ চাওয়া হয় তখন তিনি পানির নিকটবর্তী একটি স্থানে মুসলিম বাহিনীকে জমায়েত হওয়ার পরামর্শ দেন। এই ক্ষেত্রে সকল সাহাবার পরামর্শ গ্রহণ করেননি। কিন্তু উক্ত সাহাবার পরামর্শ যুক্তিযুক্ত মনে করে রাসূলে কারিম সা. তাঁর আগের মত পরিবর্তন করেন। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্তহীনতা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে দোদুল্যমানতা ক্ষতিকর। সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল হয়ে উক্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সচেষ্ট হওয়া জরুরি। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে যদি উক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া বা তার আউটকাম নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয় তাহলে উক্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে স্বতঃস্ফূর্ততা থাকে না।
লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply