সমুদ্র বিজয় নাকি মহা-পরাজয় প্রফেসর

ড. মোহাম্মদ আবদুর রব

Prochchedদক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ (বাংলাদেশে পরিচিত) বা নিউ মুর আইল্যান্ড (ভারতে পরিচিত) বঙ্গোপসাগরের ছোট জনবসতিহীন সাগরমুখী দ্বীপ। এটি গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ অঞ্চলের উপকূলে অবস্থিত। এবং বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার উপকূলবর্তী দ্বীপ।
১৯৭০ সালে ভোলা সাইক্লোনের পরবর্তীকালে বঙ্গোপসাগরে এর আবির্ভাব ঘটে, এবং কিছুকাল পরে এর অস্তিত্ব বিলীন হয়। স্থায়ী জনবসতিহীন এই অঞ্চলে তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের অস্তিত্বের সমূহ সম্ভাবনা থাকায় ভারত এবং বাংলাদেশ সরকার যৌথভাবে এর সার্বভৌমত্ব দাবি করে।
এই এলাকার বাংলাদেশ-ভারতের সীমানা বিভাজক হাডড়িয়াভাঙ্গা নদীর মূলস্রোত যেহেতু দ্বীপের পশ্চিম ভাগ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, সেহেতু ‘নদীর মূল স্রোতধারার মধ্যরেখা নীতি’ বা Thalweg doctrine অনুযায়ী বাংলাদেশ দ্বীপটিকে নিজ দেশের অন্তর্ভুক্ত মনে করছে। অপর দিকে ভারতীয় দাবি হচ্ছে, নদীর মূলস্রোত পরিবর্তনশীল। সার্বভৌমত্ব প্রদানের এই বিষয় এবং দুই দেশের মধ্যে সামুদ্রিক সীমা প্রতিস্থাপন ‘র‌্যাডক্লিফ লাইন’ পদ্ধতি অনুযায়ী বড় আকারের বিতর্কের অংশ হয়ে ওঠে।
১৯৭০ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মোহনার অদূরে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ জেগে ওঠে। নদীর মোহনা থেকে দুই কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। ১৯৭৪ সালে একটি আমেরিকান স্যাটেলাইটে আড়াই হাজার বর্গমিটার এ দ্বীপটির অস্তিত্ব ধরা পড়ে। পরে রিমোট সেন্সিং সার্ভে চালিয়ে দেখা গিয়েছিল, দ্বীপটির আয়তন ক্রমেই বাড়ছে এবং একপর্যায়ে এর আয়তন ১০ হাজার বর্গমিটারে দাঁড়ায়। তবে অনেকে দাবি করেন, ১৯৫৪ সালে প্রথম দ্বীপটির অস্তিত্ব ধরা পড়ে। দ্বীপটির মালিকানা বাংলাদেশ দাবি করলেও ভারত ১৯৮১ সালে সেখানে সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে তাদের পতাকা উড়ায়। ভারতের যুক্তি, ১৯৮১ সালের আন্তর্জাতিক জরিপ অনুযায়ী দক্ষিণ তালপট্টির পূর্ব অংশটির অবস্থান ভারতের দিকে, যা ১৯৯০ সালের ব্রিটিশ অ্যাডমিরালটি চার্টেও স্বীকৃত।
মার্চ, ২০১০ এ বিবিসির খবর অনুযায়ী দ্বীপটি বর্তমানে ২ মিটার সমুদ্রতলে নিমজ্জিত। সম্প্রতি ২০১৪ সালে ৭ জুলাই আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের রায় অনুযায়ী দ্বীপটি ভারতের সমুদ্রসীমায় পড়েছে। তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া )

ভারতে কাছে পরাজয়
আমাদের সরকার আগের মতো এবারও ভারতের সঙ্গে বঙ্গোপসাগর বণ্টনে মহাজয় হয়েছে বলে তুমুল হইচই শুরু করেছে। কিন্তু নির্মোহ বিবেচনায় মিয়ানমারের মতো এবারও বাংলাদেশ এ বণ্টনে ঠকেছে দারুণভাবে। এ বিষয়ে ভারত দারুণ সন্তুষ্ট। বাংলাদেশ যদি সমুদ্র বিজয় করত প্রকৃত অর্থে তবে তাতে ভারতের এরূপ আনন্দিত হবার কোনই কারণ থাকতো না। নিতান্ত রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে বোকা দেশবাসীকে দারুণ রাজনৈতিক ধোঁকা দিতেই সরকারের এমন মহা-প্রপাগান্ডার হট্টগোল। ভারতের সাথে বঙ্গোপসাগরের সীমানা বণ্টনে এ রায়ে বাংলাদেশ তার সমুদ্রসীমায় জেগে ওঠা বাংলাদেশের সার্বভৌমাঞ্চল দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের মালিকানা ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে। এতে ভারতের সংবাদমাধ্যম হিসেবেই বাংলাদেশ বঞ্চিত হয়েছে প্রায় ১০০ T.C.F. (Tmiltion cultic fect) প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ সম্ভারের ন্যায্য মালিকানা থেকে। যে চারটি মূল কারণে বাংলাদেশ এবার ভারতের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের সীমানা বণ্টনে দারুণভাবে মার খেয়েছে বা পরাজিত হয়েছে সে চারটি বিষয় হলো:
প্রথমত: সমুদ্রায়তনের বণ্টনের হিসেবে ভারত বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় ৬ গুণ বেশি উপকূলীয় সমুদ্র ঞ.ঝ (Territorial Sea) এবং ৩ গুণ বেশি মহীসোপান অঞ্চল C.S (Continental Shelf) লাভ করেছে। বণ্টনচিত্রের মানচিত্রেই এই পরাজয় সুস্পষ্ট। এখানে উল্লেখ্য, ভারত ও মিয়ানমার উভয়দেশই বঙ্গোপসাগরের হাইড্রোকার্বন সমুদ্র মহীসোপান ও উপকূলীয় ভূভাগের সিংহভাগ লাভ করেছে। বাংলাদেশ ঐ দুই দেশের উপকূলাঞ্চলে নামে মাত্র অংশ লাভ করেছ। মূলত বাংলাদেশই ঐ দুই দেশের কাছে নিজের যৌক্তিক প্রাপ্য উপকূলীয় খনিজসমৃদ্ধ বেশির ভাগ সমুদ্রাঞ্চল হারিয়েছে।
দ্বিতীয়ত: ভারত ও মিয়ানমারের উপকূলীয় সমুদ্রাঞ্চলে পরাভূূত বাংলাদেশ দু’টি দেশ দ্বারা গভীর সমুদ্রে নিষ্পেশিত হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ গভীর সমুদ্রে খুবই অপ্রতুল সমুদ্রাঞ্চলে (মহীসোপানে) অধিকার লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। উপরন্তু, ভারত এবং মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র বণ্টন চিত্রের মানচিত্র দেখেই বুঝা যায়, বাংলাদেশ মূলত গভীরসমুদ্রে ‘অঞ্চলবদ্ধ’ (Zone locked) হয়ে পড়েছে। ১৬ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ- যার পলিতে ও নামেতে বঙ্গোপসাগরের অস্তিত্ব- সেই বঙ্গোপসাগরের গভীর প্রদেশে (Deep Sea) যাবার জন্য বাংলাদশের মাত্র কয়েক কি. মি. বহিঃগমনদ্বার উন্মুক্ত রয়েছে। এটা বাংলাদেশের বড় পরাজয়।
তৃতীয়ত: বদ্বীপীয় ভূমি বাংলাদেশের ভূরূপতাত্ত্বিক প্রাকৃতিক নিয়মে নিয়ত: দক্ষিণে প্রভাবিত হয়ে বেড়ে চলেছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় জানা যায় প্রতি দশকে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের ভূবর্ধন (Land Accretion) প্রক্রিয়ায় ১০-১৫ কি. মি. হারে বিবর্ধিত হয়ে চলেছে। কিন্তু ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে ভূমি ও পানিসীমা স্থিরকৃত করার এই চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের Baseline, territorial sea, continental shelf ও exclusive economic zone ইত্যাদি স্থায়ী নির্ধারণ করে দেয়ায় ভবিষ্যতে বাংলাদেশের উপকূল রেখা তথা বেইস লাইন আরো একশত কি. মি. দক্ষিণে বেড়ে গেলেও বাংলাদেশের বঙ্গেভপসাগরের EEZ (Exclusive Economic Zone) বা C.S (Continental Shelf)  ভাগে আর এক ইঞ্চিও পাবে না। আর এতেই এ সমুদ্রাঞ্চল বণ্টনে আমাদের হয়েছে দারুণ পরাজয়।
চতুর্থত: এ রায়ে ভারত আমাদের সার্বভৌম সমুদ্র সীমায় জেগে ওঠা হাড়িয়াভাঙ্গা এবং রায়মঙ্গল নদীর মোহনায় পসিজ: দ্বীপ দক্ষিণ তালপট্টি লাভ করেছে। দ্বীপটির সংলগ্ন উপকূলীয় সমুদ্রাঞ্চল খনিজ, মৎস ও অন্যান্য সমুদ্র সম্পদে দারুণ সম্ভাবনাময়। নদীদ্বয়ের মূল মধ্য-স্রোত দ্বীপটির পূর্বদিকে প্রবাহিত হওয়ায় ‘মধ্য- স্রোত নীতি’ বা Mid Channel Doctrine অনুযায়ী দক্ষিণ তালপট্টি সর্ববিচারে বাংলাদেশেরই ভূভাগ। কিন্তু ‘দ্বীপপটি ডুবে গেছে’ ‘এর অস্তিত্ব নাই’ ইত্যাদি ধুরন্ধর, আত্ম-ধ্বংসী অপপ্রচারে এখন তা ভারতের অংশে। ভারতের পত্রপত্রিকাই দক্ষিণ তালপট্টির (তাদের ভাষায় ‘নিউমুর দ্বীপ’) অস্তিত্ব ও তা লাভের ফলে ভারতের মহা লাভবান হবার কথা প্রচার করছে। উপরন্তু বর্তমানের যে কোনো ভূ-উপগ্রহ চিত্রেও (Google Earth Satellite Imageries) দ্বীপটির অস্তিত্ব বর্তমান।

মিয়ানমারের কাছে পরাজয়
ইটলস (ITLOS) রায়ে বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রসীমায় বাংলাদেশের অধিকার অর্জনে দেশব্যাপী সরকারি সিদ্ধান্তে বিজয় উৎসব করা হয়েছে। কেউ বলেছেন, ‘এটা এক মহাবিজয়’, আবার কেউ বলেছেন এ রায়ে ‘এক মাইলফলক অর্জন’ হয়েছে। কেউবা এটা বাঙালির ‘সমুদ জয়’ বলেও মহাআত্মতৃপ্তি লাভ করেছেন। রাজনৈতিক মহলে এটা নিজ নিজ দলের নেতার বিশেষ অর্জন বলে উদযাপনের ধুম পড়েছে। কেউ বুঝে কেউবা না বুঝেই লম্ফঝম্ফ শুরু করেছেন; কিন্তু আমার বিবেচনায় বিষয়টা এখনও খুবই অস্পষ্ট এবং দারুণভাবে প্রশ্নসাপেক্ষ। বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যকার বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ট্রাইব্যুনালের (ইটলস) গত ১৪ মার্চের রায় নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মনে নানা অভিব্যক্তির অভ্যুদয় ঘটেছে। এ মামলার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য যেমন গুরুত্ববহ তেমনি বিষয়টি ততোধিক জটিলও। বাংলাদেশের উপকূলীয় ভূ-ভাগের ভূ-রূপতাত্ত্বিক গঠন, উপকূলীয় সমুদ্রাঞ্চলের দ্বীপময় অগভীর বঙ্গোপসাগরের তলদেশের অবস্থা এবং বাংলাদেশের সমুদ্র-শরিকদের উপকূলীয় কাঠামো বাংলাদেশকে বিশেষ অসুবিধাময় পরিস্থিতিতে নিপতিত করেছে।
বর্তমান সরকার ঘটনা কী ঘটেছে বা এর ফলাফল কী হতে যাচ্ছে তা চিন্তা না করেই মিডিয়ায় এবং সংসদে অতি উৎসাহে নিজেদের পিঠ চুলকাতে শুরু করে দিয়েছেন। তারা বেমালুম ভুলে গিয়েছেন ১৯৭৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গোপসাগরের জরিপের কথা প্রথম শুরু করলেও তিনি এর কোনো অগ্রগতি ঘটাতে পারেননি। ১৯৭৫ সালের পরে জিয়াউর রহমান সাহেব তা আবার শুরু করলে ভারত কানাডিয়ান সার্ভে জাহাজকে নৌবাহিনী দ্বারা তাড়া করে। পরে প্রেসিডেন্ট জিয়া দক্ষিণ তালপট্টির দিকে বাংলাদেশের নৌবাহিনীকে পাঠানোর উদ্যোগ নেন এবং তার মৃত্যুর পর বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অধিকারের প্রশ্ন চাপা পড়ে যায়।
বাংলাদেশের সমুদ্রাঞ্চলের অধিকারের ব্যাপারে প্রথম যৌক্তিক ও জোরালো উদ্যোগ গ্রহণ করেন শহীদ জিয়াউর রহমান। তার শাসনকালে রিয়ার অ্যাডমিরাল এম এইচ খানের নেতৃত্বে দক্ষিণ তালপট্টি ও বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও সমুদ্র সম্পদ আহরণের নানা উদ্যোগ নেয়া হয়। ওই সময় NOAMI নামক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে বঙ্গোপসাগরের ওপর কয়েকটি গবেষণাকার্য পরিচালনা করা হয়। প্রফেসর ড. মনিরুজ্জামান মিয়া (ঢাবি), ড. এম আই চৌধুরী (জাবি), প্রফেসর ড. হাবিবুর রহমান (রাবি) এবং প্রফেসর ড. আইনুন নিশাত (বুয়েট) এসব গবেষণা কার্যক্রমে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। শহীদ কমোডর রাব্বানী এবং কমোডর খুরশেদ আলমও (বাংলাদেশ নৌবাহিনী) বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের আঞ্চলিক সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত গবেষণা ও আইনি তৎপরতায় বিশেষ অবদান রাখেন। কিন্তু মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে নীতিনির্ধারণী এ সর্বশেষ আলোচনা ও উদ্যোগ নেয়া হয় বিগত ২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। তখন এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপদেষ্টা ড. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরীর উদ্যোগে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবুল কালাম মাহমুদকে (কায়েস) এ বিষয়ের সেলের প্রধান করে কমোডর (অব:) মোহাম্মদ খুরশেদ আলমকে উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়। তখন থেকেই এ ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রগতি শুরু হয়। এ ক্ষেত্রে ধারণা করা হয়, বঙ্গোপসাগরে এবং সংলগ্ন অঞ্চলে মার্কিনি স্বার্থ থাকায় ওই সময় থেকে বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরের মিয়ানমার উপকূলীয় অঞ্চলের দাবি-দাওয়া নিয়ে মামলা আন্তর্জাতিক ফোরামে বিশেষ গুরুত্ব পেতে থাকে। ২০০৯ সালে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর ওই মামলা অব্যাহত থাকে এবং জনাব মাহমুদের পরিবর্তে কমোডর (অব:) খুরশেদ আলমকে চুক্তিভিত্তিক অতিরিক্ত সচিবের দায়িত্ব দিয়ে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের দাবি-দাওয়া সংক্রান্ত আনক্লস সেলের (UNCLOS CELL) নেতৃত্ব দেয়ার ভার অর্পণ করা হয়। তিনি যথেষ্ট যোগ্যতার সঙ্গে সাধ্যানুযায়ী এ বিষয়ে পরাঙ্গমতার পরিচয় দেন।
সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে যে, জার্মানির হামবুর্গে ‘ইটলস’ (ITLOS) রায়ের ফলে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের ১২ নটিক্যাল মাইল আঞ্চলিক সমুদ্রাঞ্চল (Territorial Sea) এবং এ থেকে বেইসলাইন (Base Line) ধরে সোজা দক্ষিণে আরও ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত একান্ত অর্থনীতিক জোন (Exclusive Economic Zone) লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। শুধু তাই নয়, এ রায়ের ফলে বাংলাদেশ উপকূল থেকে ১ লাখ ১১ হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্রাঞ্চলে (EEZ) একচ্ছত্র সম্পদাহরণের অধিকার পেল। যেহেতু এ রায় অপরিবর্তনীয় এবং এতে কোনো পক্ষই আপিল করতে পারবে না তাই এখন থেকে বঙ্গোপসাগরের এ বিপুল জলরাশিতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব কায়েম হবে। শুধু তাই নয়, এ রায়ের মাধ্যমে (সংবাদমাধ্যমের ভাষ্যে), দক্ষিণে আরও ২০০ নটিক্যাল মাইল মহীসোপানেও (Continental Shelf) বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে (শুধু সম্পদের ওপর)। অর্থাৎ বঙ্গোপসাগরে এ রায়ের ফলে প্রায় ২ লাখ বর্গ কিলোমিটারের বেশি অঞ্চলে বাংলাদেশের এখতিয়ার প্রতিষ্ঠিত হলো। আগে ভারত ও মিয়ানমার দেশ দু’টির বঙ্গোপসাগরে ‘সমদূরত্ব পদ্ধতি’র দাবি উপস্থাপনের ফলে (Equi-distance claims) বাংলাদেশের দাবিকৃত সমুদ্রাঞ্চল তির্যকভাবে এসে এক বিন্দুতে কৌণিকভাবে মিশে বাংলাদেশের পূর্বদিকের এবং পশ্চিমদিকের উপকূলীয় সীমানা বরাবর ইইজেড (EEZ) এবং একইভাবে মহীসোপানাঞ্চলের (C.S) জলাঞ্চলের দাবিকৃত এলাকাকে সঙ্কীর্ণ করে বহুগুণ কমিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানের ‘ইটলস’ (ITLOS) রায়ে, বার্তামাধ্যমের প্রচারিত বক্তব্যমতে, এ এলাকাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাংলাদেশের অনুকূলে বিস্তৃত করেছে। একই সঙ্গে, যদি না রায়ের প্রচারিত বিবরণ সঠিক হয়, তবে বাংলাদেশ তার যৌক্তিকভাবে দাবিকৃত আঞ্চলিক সমুদ্রসীমা, একান্ত অর্থনীতিক জোন এবং মহীসোপানের সমুদ্রাঞ্চলে অচিরেই বিপুল সামুদ্রিক সম্পদ আহরণের অনুকূল সুবিধা লাভ করতে শুরু করবে।
আদতে বাংলাদেশের উপকূলাঞ্চল অবতল (Concave) আকৃতির ভূ-কাঠামোর হওয়ার ফলে এবং ভারত-মিয়ানমারের উপকূলীয় ভূ-গঠন উত্তল (Convex) হওয়ায় বাংলাদেশের আঞ্চলিক সমুদ্রাঞ্চল নির্ধারণের মূল ভিত্তিরেখা বা বেইসলাইন (Base Line) নির্ধারণ খুবই জটিল হয়ে যায়। এর ফলে এ দেশের (বাংলাদেশের) বঙ্গোপসাগরেও আঞ্চলিক সমুদ্রাঞ্চল (ঞ.ঝ) এবং কন্টিগুয়াস জোন (ঈ.ত) চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়া হয়েছে বিতর্কিত এবং প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলাদেশের উপকূলীয় দ্বীপমালাগুলো মূলত ব-দ্বীপীয় (উবষঃধরপ) নব-পলল গঠিত দ্বীপ। এগুলো একসময় মূল বদ্বীপীয় ভূ-ভাগের সঙ্গে মিলে প্লাবন সমভূমিকা দেশের মূলভাগের দক্ষিণাঞ্চলকে প্রবর্ধিত করে আরও দক্ষিণে ক্রমান্বয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরের জলরাশির বিভিন্ন ভাগের অঞ্চলে বাংলাদেশের এখতিয়ার বা দাবি প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি বা ‘বেইস লাইন’ (ইধংব খরহব) বাস্তবে ক্রম পরিবর্তনশীল থাকবে। তাই বর্তমান ‘ইটলস’-এর রায়ে যে সমুদ্রাঞ্চলকে আমাদের ‘আঞ্চলিক সমুদ্রসীমা’ (ঞ.ঝ), ‘একান্ত আর্থনীতিক জোন’ (ঊঊত) বা মহীসোপান (ঈঝ) হিসেবে নির্ধারিত করে দেয়া হলো, সে সীমারেখা বাংলাদেশের উপকূলাঞ্চলে নিকট বা দূর-ভবিষ্যতে নতুন নতুন চর বা দ্বীপ গঠন প্রক্রিয়ায় আরও প্রবর্ধিত হয়ে দক্ষিণে কিংবা পূর্ব-পশ্চিমে বেড়ে চললে ওই ন্যায়পরতার হিসেবে চিহ্নিত সীমানা ও আয়তনও পরিবর্তিত হতে বাধ্য। জানি না এ রায়ে এ বিষয়ে এর কিরূপ প্রতিবিধান বিধৃত হয়েছে।
চরম জনভারাক্রান্ত ও সম্পদ বঞ্চিত বাংলাদেশ যেহেতু মূলত বঙ্গোপসাগর থেকে জেগে ওঠা একটি বর্ধিষ্ণু রাষ্ট্র, সেহেতু আমরা ভূমি, খাদ্য, জ্বালানি এবং যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সমুদ্রের ওপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল। তাই বাংলাদেশের জন্য এ অপরিসীম গুরুত্ববহ সমুদ্রাঞ্চলে আমাদের মালিকানা প্রতিষ্ঠায় জাতি অত্যন্ত সচেতন ও সংবেদনশীল। জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সংক্রান্ত ১৯৬০ (’৬৭) সালর (টঘঈখঙঝ-ওও) মাত্র ৬৬টি রাষ্ট্র ১২ নটিক্যাল মাইল আঞ্চলিক সমুদ্রাঞ্চল (ঞ.ঝ) মেনে তাতে স্বাক্ষর করে। ৮টি দেশে ২০০ ন.মা. দাবি করে এবং বড় বড় নৌশক্তিগুলো এতে মোটেই স্বাক্ষর করতে রাজি হয়নি। যে ৬৬টি, ১২ ন.মা. (ঞ.ঝ)-এ রাজি হয়েছে দেশগুলোর বেশির ভাগের উপকূলই খুবই গভীর এবং ভূ-বৃদ্ধির কোনো সম্ভাবনা বা সমুদ্র সম্পদের আহরণের সম্ভাবনাও সেগুলোর বিশেষ নেই। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার গঠন এমন যে, দক্ষিণে এক শ’ মাইল চলে গেলেও সেখানে সমুদ্রের গভীরতা মাত্র কয়েক ফ্যাদম। অর্থাৎ অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে ২০-৩০ মাইল কিংবা তার চেয়ে দূরে পলি জমে নতুন ভূমি জেগে উঠতে পারে। এভাবে আমাদের দক্ষিণের উপকূলের আরও দক্ষিণে ব-দ্বীপ গঠনের সাধারণ প্রক্রিয়ায় অগভীর মহীসোপানে ভূমি দক্ষিণে সম্প্রসারিত হয়ে বাংলাদেশের আঞ্চলিক সমুদ্রাঞ্চল, কন্টিগুয়াম জোন (ঞঝ ্ ঈত) বহুদূর দক্ষিণে সম্প্রসারিত হবে। তার ফলে এদেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারণের বেইসলাইনও (ইধংব খরহব) আরও দক্ষিণে যাবে। তখন তো বর্তমানের ইটলসের (ওঞখঙঝ) রায়ে নির্ধারিত বেইসলাইন, আর্থনীতিক জোন ও মহীসোপানের (ঊঊত ধহফ ঈড়হঃরহবহঃধষ ঝযবষভ) নির্ধারিত সীমানাও বদলে যেতে বাধ্য।
সংবাদপত্রের খবর এবং বিভিন্ন জনের বক্তব্য থেকে জানা যায় যে, ইটলসের এ রায়ের ফলে বাংলাদেশ মিয়ানমারের দাবিকৃত উপকূলীয় সমুদ্রে বিপুল ভূমির আশাতিরিক্ত (আমাদের দাবির চেয়েও বেশি) জলাঞ্চল লাভ করেছে। এখানেও সংবাদপত্রে প্রকাশিত নানা মানচিত্রে ভিন্ন ভিন্ন সীমারেখা চিহ্নিত মানচিত্র ও খণ্ডচিত্র আমাদের বিভ্রান্ত করছে। ওইসব বক্তব্য এবং চিত্র থেকে যতটুকু অনুধাবন করা যায় তা থেকে বলা যায়, আসলে এ রায়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের দাবিকৃত মূল চিত্রের খানিকটা পরিবর্তন হলেও ওই বিভাজন রেখাটি মূলত দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রলম্বিত হয়ে বাংলাদেশের মূল দাবিকৃত বিপুল সমুদ্রাঞ্চলকে গ্রাস করে নিয়েছে। ফলে মিয়ানমার তার দাবিকৃত মহীসোপানের হাইড্রোকার্বন সমৃদ্ধ (গ্যাস ও খনিজ তেল) বেশির ভাগ ব্লকের মালিকানা পেয়েছে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ দূরবর্তী গভীর সমুদ্রের তুলনামূলকভাবে কম সম্ভাবনাময় অঞ্চলেই তার ঊ.ঊ.ত-এর মালিকানা পেয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, মিয়ানমারের সন্নিকটের মহীসোপানেই সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রামাণ্য প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ আবিষ্কৃত হয়েছে। সুতরাং এখানেও আত্মতৃপ্তির কোনো কারণ নেই। ইটলসের (ওঞখঙঝ) রায়ের ফলে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার ২০১৪ সালে নিষ্পত্তিতব্য মামলার ইন্টারন্যাশনাল পারমানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশনের রায়ের ফলাফল যে একইভাবে প্রভাবিত হবে তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। কারণ ভারতের মামলার আরজিতে ‘ল’ অব ইক্যুটির স্থলে তাদের উপস্থাপিত ‘ইক্যুইডিস্টেন্স প্রিন্সিপল’ যা ‘সমদূরবর্তী নীতি’ সে গ্রহণ করেছে। এখানে জ্ঞাতব্য যে ভারত, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ার (আন্দামান সাগরে) সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণে ওই ‘ইক্যুইডিস্টেন্স প্রিন্সিপল’ ভিত্তি করে বিবাদ নিরসন করেছে। তা ছাড়া ভারত একটি আঞ্চলিক শক্তি। নৌশক্তিতে অগ্রগণ্য। তাই ভারত মিয়ানমারের মতো তার স্বার্থের বিপক্ষে যাওয়া রায় কিছুতেই মানবে বলে মনে হয় না। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারণীতে (বাংলাদেশের পশ্চিমাংশের উপকূলে) বাংলাদেশকে একটি ক্রমবর্ধমান ব-দ্বীপীয় রাষ্ট্র হিসেবে উপকূলীয় সীমানা নির্ধারণী হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর ‘মূল-মধ্যরেখা নীতি’ (গরফ-পযধহহবষ ঞযধষবিম উড়পঃৎরহব) অনুসরণে ভারতের সঙ্গে নিষ্পত্তিতে অগ্রসর হতে হয়।
কিন্তু ওই একই ‘ইক্যুইটি প্রিন্সিপল’ বা ন্যায়পরতার নীতির মাধ্যমে ভারত-বাংলাদেশ সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তি করার কারণে বাংলাদেশ ভারতের কাছে তার দাবিকৃত (যৌক্তিক) সমুদ্রাঞ্চলের (ঊঊত এবং ঈঝ) ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত হলো। আর ভারত তার ঈপ্সিত দাবির স্বপক্ষে তার শক্তিশালী প্রচারমাধ্যমের সাহায্যে বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মোহনার নতুন দ্বীপ দক্ষিণ তালপট্টিকে মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে।
অনেকে বলে থাকে, বৈজ্ঞানিক নদীশাসন পদ্ধতির মাধ্যমে ভারত ওই দ্বীপটিকে ধ্বংস করে ফেলেছে। তথাপি এখনও ভাটার সময় ভূ-উপগ্রহচিত্রে দক্ষিণ তালপট্টি অস্তিত্ব পরিদৃষ্ট হয়।
পরিশেষে এ কথা অবশ্যই বলা যায়, ইটলস রায়ের মাধ্যমে আমরা আমাদের ইইজেড-এর পূর্বাঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ বিশাল সম্পদ সম্ভাবনাময় (তেল-গ্যাসসমৃদ্ধ) ব্লকগুলো থেকে বঞ্চিত হয়েছি এবং ইটলসের রায়সম্ভূত সীমানির্ধারণী রেখা পশ্চিম দিকে তির্যকভাবে চলে গিয়ে বাংলাদেশের অংশের ইইজেড এবং এর ধারাবাহিকতায় মহীসোপানকেও কৌণিকভাবে সঙ্কীর্ণ করে দেবে।
সমুদ্রাঞ্চল বণ্টনে বাংলাদেশের নিয়োজিত ভাড়াটে বিশেষজ্ঞদের অযোগ্যতা ও মীরজাফরী তৎপরতায় বাংলাদেশের প্রতি হতাশ হয়ে বাংলাদেশের একজন সৎ বিদেশী বিশেষজ্ঞের পদত্যাগের খবরটি আমরা সবাই অবগত। শুধু তাই নয় বাংলাদেশের নিয়োজিত বিশেষজ্ঞদের মধ্যে একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূতের নিয়োগ আমাদেরকে অবাক করেছে। পরিশেষে বলা যায়, ‘ভারত-বাংলাদেশ’ কিংবা ‘মিয়ানমার-বাংলাদেশ’ কোন বণ্টনেই বাংলাদেশ ন্যূনতম লাভবান হয়নি। তা হলে সমুদ্র বিজয় বলে এত আত্মপ্রসাদ কেন?
লেখক : প্রফেসর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply