সমৃদ্ধ দেশ গড়তে যুবশক্তি -আব্দুল্লাহ আল মারুফ

যুবশক্তি হলো সম্ভাবনাময় শক্তির নাম। চোখে সারাক্ষণ থাকে স্বপ্ন নামক বারুদ। এ স্বপ্নগুলো নিজেকে নিয়ে। নিজের দেশকে নিয়ে। কিভাবে নিজেকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা যায়? কিভাবে প্রিয় মাতৃভূমিকে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড় করানো যায়? জাতির খেদমতে কিভাবে নিজেকে সঁপে দেয়া যায়? এরকম হাজারো প্রশ্ন যুবসমাজের মনে উদয় হয়। এ প্রশ্নগুলো সমাধানের জন্য কোনো প্রশিক্ষণ নেয়া লাগবে না। লাগবে না বিদেশ ভ্রমণের মতো প্রকল্প হাতে নেয়া। চাই শুধু সদিচ্ছা। সদিচ্ছার মাধ্যমে যুবসমাজের সম্ভাবনাময় স্বপ্নের বারুদে আগুন ধরাতে হবে। বারুদে আগুন ধরিয়ে দিলে যেমন করে নিঃশেষ ছাই হয়ে যায় তেমনিভাবে এই স্বপ্নের বারুদে আগুন ধরালে এগুলো আর স্বপ্ন থাকবে না। এগুলোও বাস্তবে রূপ নেবে। যুবশক্তিকে একটি ভিন্ন ধরনের সাইক্লোনের সাথে তুলনা করা যায়। যে সাইক্লোন ধ্বংসের সাথে সমানতালে সৃষ্টি করে। ধ্বংস করে জড়তার শৃঙ্খল মূর্খতার দুয়ার, আলস্যের বাঁধন। সৃষ্টি করে নব উদ্দীপনা, নব উদ্ভাবন। সভ্যতার ইতিহাস বিনির্মাণের মূল কারিগর যুবসমাজ। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব মানবতার পরম বন্ধু হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুবক বয়সেই মানবতার দুর্দিনের কাণ্ডারি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তার সাহাবায়ে কেরামরাও যুবক বয়সে ইসলামের খেদমতে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। এই কাজে বিলিয়েছেন নিজেদের তাজা খুন। প্রাণ দিতেও দ্বিধাবোধ করেনি। আমাদের প্রাণের মাতৃভাষা বাংলাকে যারা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর বন্দুকের নিশানা হয়েছিল তারাও ছিল যুবক। ১৯৭১ সালে যেসব দামাল ছেলের রক্ত ও প্রাণের বিনিময়ে আমাদের এই স্বাধীন ভূখণ্ড তাদের সিংহভাগই ছিল টগবগে তরুণ।

মুদ্রার উল্টো পিঠের কথা বলতে গেলে অর্থাৎ সভ্যতাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়ার অপচেষ্টা যারা চালাচ্ছে তারাও যুবক। এই সমীকরণের আলোকে যুবসমাজকে গাড়ির চালক হিসেবে বিবেচনা করা যায়। একজন গাড়ির মালিক যেভাবে চালকের উপর আস্থা রেখে গাড়ির চাবি তুলে দেয় সেভাবে দেশকে গড়তে যুবকদের হাতে নিজেদের ইচ্ছা সমর্পণ করে পুরো জাতি। চালক যেদিকে গাড়ি নিয়ে যাবে যাত্রীদেরকে সেদিকে যেতে হবে। যুবসমাজ দেশকে যেভাবে পরিচালনা করবে জাতিকে সেভাবে পরিচালিত হতে হবে। যুবসমাজের মধ্যে সততা, দক্ষতা ও দেশপ্রেমের মনোভাব থাকলে দেশ সমৃদ্ধির পথে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আবার যুবসমাজ যদি অসৎ, অন্যায়ের ধারক এবং দেশবিদ্বেষী মনোভাবের অধিকারী হয় তাহলে দেশ গোল্লায় যাবে তা হলফ করে বলা যায়।

দেশকে সমৃদ্ধ করতে হলে সবার আগে দেশের সঠিক ইতিহাস জানতে হবে। প্রখ্যাত এক দার্শনিকের ভাষায় “অং ভধৎ ংড় ষড়ড়শ নবযরহফ ংড় ভধৎ ুড়ঁ পধসব ংড় ধযবধফ.” অর্থাৎ যে জাতি তার বিগত দিনের ইতিহাস বেশি জানার চেষ্টা করবে সে জাতি তত বেশি স্বকীয়তা বজায় রেখে মহীয়ান হওয়ার গৌরব অর্জন করবে। প্রাণের মাতৃভূমি বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করে তোলার জন্য তরুণ প্রজন্মকে দেশের সঠিক ইতিহাস জানতে হবে। সেই সাথে ইতিহাস সচেতন ও ইতিহাসকে সংরক্ষণ করতে হবে। বিশিষ্ট মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ‘ঝঃধহষু অ কড়পযধহবশ’-এর মতে ‘বাংলাদেশে একটি অসাধারণ সমরূপ জনগোষ্ঠী রয়েছে।’ সত্যিই জাতিগতভাবে ৯৮.০৭ শতাংশ বাংলাদেশী অভিন্ন। শতকরা নব্বই ভাগ মানুষ একই ধর্মে বিশ্বাসী। কমপক্ষে ৯৮ শতাংশ নাগরিকের মাতৃভাষা বাংলা। ঐতিহাসিক বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় যেসব রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে সেসব দেশেও সাধারণত এতো সমগোত্রীয় জনগোষ্ঠী দেখা যায় না। বাংলাদেশে নেই ধর্ম-বর্ণ বৈষম্য। তবে মাঝে মধ্যে কিছু উগ্র মানসিকতার লোকেরা সাম্প্রদায়িকতার ধোয়া তুলে দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চালায়। তাই এই অপশক্তির মোকাবেলায় যুবসমাজকে সোচ্চার হতে হবে। দেশের সঠিক ইতিহাস চর্চা করে জাতির সামনে তুলে ধরার জন্য অগ্রগামী হতে হবে।

যুবশক্তির মূল্যায়ন : বর্তমান প্রেক্ষিত

একটি দেশ সমৃদ্ধ হওয়ার পেছনে যাদের অবদান অনস্বীকার্য তারা হলো সে দেশের যুবসমাজ। তাদের সম্ভাবনাময়ী স্বপ্নগুলো থাকে দেশকে নিয়ে। দেশের কল্যাণ কিভাবে হবে সে পন্থা আবিষ্কারের জন্য মত্ত হয়ে থাকে। কিন্তু বড়ই পরিহাস। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয় অনেক বেশি অবহেলার শিকার যুবসমাজ। যে চোখে তারা দেশের অগ্রগতির স্বপ্ন দেখার কথা সে চোখে এখন হতাশার প্রতিচ্ছবি দেখতে বাধ্য হচ্ছে। দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পড়াশোনা শেষ করেও পাচ্ছে না পছন্দের চাকরি। ফুরিয়ে যাচ্ছে কর্মক্ষমতা, মিলছে না কর্মসংস্থান। এই কঠিন ক্রাইসিস মোকাবেলার সক্ষমতা অর্জন হয়নি যুবসমাজের। যার প্রেক্ষিতে নিজেদের অজান্তে জড়িয়ে পড়ছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। সদস্য হচ্ছে বিপথগামী গোষ্ঠীর। এভাবে প্রতি বছর সম্ভাবনাময় যুবসমাজের বিরাট অংশকে দেশের বোঝা ও কাজের অনুপযোগী হিসেবে ঘোষণা করা হচ্ছে। এ অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার জন্য অনেকে কারণ হিসেবে দেখাবে শিক্ষার মধ্যে কর্মমুখী শিক্ষার অভাব। কিন্তু যুবসমাজকে কাজে না লাগানোর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো সদিচ্ছার অভাব। দেশের কর্তাব্যক্তিরা শুধু ভিন্নমত পোষণ করার কারণে অনেক মেধাবী যুবককে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগে চলছে এক ধরনের লুকোচুরি খেলা। ঐতিহ্যগতভাবে ডিপার্টমেন্টে ফার্স্ট হওয়া শিক্ষার্থী ঐ ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক হওয়ার অধিক হকদার। একটি অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কারণে ফার্স্ট হওয়া শিক্ষার্থী তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই জায়গা দখল করে নিচ্ছে তুলনামূলকভাবে কম মেধাবী শিক্ষার্থী। তথাকথিত সিন্ডিকেটের মতের সাথে তার মতের মিল থাকার কারণে শিক্ষকদের সম্মানিত চেয়ার সে উপহার হিসেবে পাচ্ছে। দেশের প্রথম শ্রেণীর সরকারি চাকরি পেতে হলে বিসিএস পরীক্ষায় পাস করতে হয়। কিন্তু এই বিসিএস পরীক্ষাতেও দলীয়করণ করা হয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর ভাইভা বোর্ডে গেলে বিভিন্ন অজুহাত সৃষ্টি করে বাদ দেয়া হচ্ছে মেধাবী ও যোগ্য প্রার্থীদের। চাকরিরত অবস্থায় পদোন্নতি পাওয়া একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। দুঃখের বিষয় হলো ভিন্নমত পোষণকারী ব্যক্তিকে এক্ষেত্রে হতাশ হতে হয়। অনেক সময় মিডিয়ার কল্যাণে এরকম হতভাগাদের নাম দেখতে পাই। যারা যোগ্যতা ও বয়সের দিক থেকে সিনিয়র হয়েও জুনিয়র সহকর্মীদের অধীনে কাজ করে। এভাবে সবক্ষেত্রে চলছে নীরব জুলুম।

এরূপ হীনম্মন্যতা পরিহার করলেই উপরোক্ত সমস্যাগুলো সমাধান হয়ে যাবে। দেশকে সমৃদ্ধশালী করে তুলতে কোনো কিছুর অভাব নেই। আমাদের আছে আল্লাহপ্রদত্ত প্রাকৃতিক সম্পদ- গ্যাস, কয়লা, চিনামাটি, বালি, পাথর ইত্যাদি। আছে অজ¯্র নদী-নালা। আরো যেসব দেশীয় সম্পদ আছে সেগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করা গেলে আমাদের সমৃদ্ধির চাকা দ্রুত ঘুরবে।
এই অপার সম্ভাবনাময়ী ভূখণ্ডকে সমৃদ্ধশালী করে গড়ে তুলতে প্রয়োজন দেশের আমলা, শাসকগোষ্ঠী, বিরোধীমতের মানুষসহ আম জনতার ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস। এই দেশে জন্মগ্রহণকারী প্রত্যেক নাগরিককে তার বৈধ অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। যুবশক্তির কাক্সিক্ষত মূল্যায়ন সময়ের দাবি।
‘দেশপ্রেমিক, নৈতিকতাবোধ সম্পন্ন সৎ ও দক্ষ কোনো গোষ্ঠীর হাতে দেশ পরিবর্তনের চাবিকাঠি’- এই স্বপ্ন দেখে ঘুমোতে যায় দেশের আপামর জনতা। এমন একটি প্রত্যাশা আপনার, আমার, আপামর জনতার।

লেখক : শিক্ষার্থী, তামীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা

SHARE

Leave a Reply