সম্পাদকীয় – এপ্রিল’২০১৯

বাংলায় মুসলিম শাসনামলের অন্যতম স্মৃতিবহনকারী সংস্কৃতি ‘বাংলা নববর্ষ’। যার মাধ্যমে বাঙালি সমাজ পুরাতনকে ধুয়ে ফেলে নতুন উৎসাহ ও উদ্দীপনা সঞ্চার করে। এখন তা যদিও স্বকীয়তা হারিয়েছে অনেকাংশেই তবু এটি আমাদের অস্তিত্বের জানান দেয় বারবার। বাঙালিদের স্মরণ করিয়ে দেয় শেকড়ের কথা। বাংলা ভাষাভাষী সকল মানুষই বাঙালি। হোকনা সেটা বাংলাদেশের ভেতরে অথবা বাইরে। এ ভাষাকে লালন করে আমরা আমাদের জীবনপ্রবাহ চালিয়ে নেই। ধর্মীয় বিধিবিধানের পাশাপাশি বাঙালি সমাজে প্রচলিত প্রবহমান সংস্কৃতির সুবাসও বহন করে চলি। তবে যে সংস্কৃতি শিরক করার জন্য উসকে দেয় সে সংস্কৃতি থেকে অবশ্যই আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা যেমন আধুনিকতার মোড়কে পুরনো অনেক কুসংস্কারকে বাদ দিয়েছি তেমনি তাওহিদের কারণে শিরকমিশ্রিত ঐতিহ্যকে পরিহার করাও অবশ্য করণীয় বিষয়। বাংলা নববর্ষকে বুকে ধারণ করার জন্য এপ্রিল মাসের অনেক গুরুত্ব। তবে এটি মুসলিম জগতে বেদনার ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে অনেকদিন থেকে। ১৪৯২ সালের ১লা এপ্রিল ঐতিহাসিক গ্রানাডা ট্র্যাজেডি আমাদের বারবার কাঁদায়। ইহুদি-খ্রিষ্টানেরা এ দিনটিকে ‘অঢ়ৎরষ ঋড়ড়ষ’ তথা ‘এপ্রিলের নির্বোধ’ হিসেবে পালন করে। তারা মুসলমানদের নিরাপত্তার আশ্বাসে সেদিন মসজিদে একত্রিত করে মুসলিম আবাল-বৃদ্ধ-বনিতাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার মাধ্যমে ইতিহাসের সকল নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতাকে হার মানিয়েছে।
গত ১৫ মার্চ ’১৯ শুক্রবার জুমার নামাজের সময় নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচাচের্র কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ডিন অ্যাভিনিউতে অবস্থিত আল নূর ও লিনউডে সুবার্ব মসজিদে খ্রিস্টান সন্ত্রাসীদের বন্দুক হামলায় অন্তত ৫০ জন মুসলমানের নিহত হওয়ার ঘটনা বিশ্বের মুসলিমদের হতবাক ও শোকে স্তব্ধ করেছে। বেন্টন ট্যারেন্ট নামে ২৮ বছরের এক খ্রিস্টান যুবক ফেসবুক লাইভে গিয়ে অটোমেটিক রাইফেল হাতে প্রথমে আন নূর মসজিদে ঢোকে এবং প্রায় ২০ মিনিট ধরে গুলি চালায় নামাজরত মুসল্লিদের ওপর। এত সময় পরেও সে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর নীরব ভূমিকা মুসলমানদের জন্য প্রকাশ্য এক ষড়যন্ত্র সাথে সাথে বাংলাদেশের জন্য এক অশনিসঙ্কেত। ভয়াবহ এ ঘটনায় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছেন বাংলাদেশের ক্রিকেট দল। মহান আল্লাহ নিজ কুদরতে তাদের রক্ষা না করলে বাংলাদেশের ক্রিকেট ভবিষ্যৎ কী হতো তা কল্পনা করা যায় না।
মুসলমানদের অসচেতনতা ও অবহেলার জন্য প্রজন্ম আজ ইসলামী নীতিমালা ও রাসূলের সুন্নাত ভুলে গিয়ে আত্মহননের পথকে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করছে। না বুঝে পশ্চিমা সংস্কৃতি পালন করতে আমাদের যুবক-যুবতীদের আগ্রহ দেখে বিস্মিত হতে হয়। ইন্টারটেইনমেন্টের (চিত্তবিনোদন) নামে তারা নিজের দেহ-মন বিলিয়ে দিচ্ছে সমাজের কিছু বখাটের হাতে। মুসলিম অধ্যুষিত প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে আজ নাস্তিকদের চিন্তা চেতনার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। আজ বাঙালি, ভারতীয়, পশ্চিমা সংস্কৃতির মিশ্র প্রতিক্রিয়ার বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শত শত অপহরণ, ধর্ষণ, খুন ও আত্মহত্যার ঘটনা নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ, প্রশাসন ও সুশীলসমাজের প্রতিনিধিরা যত যুক্তিই উপস্থাপন করুক না কেন এর প্রকৃত ও আসল কারণ যে অপসংস্কৃতি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই আমাদের এসকল বিজাতীয় সংস্কৃতি সম্বন্ধে সাবধান থাকা জরুরি।
সম্প্রতি (১১ মার্চ) হয়ে গেল আলোচিত ডাকসু নির্বাচন। চেতনা ব্যবসায়ীদের বরাবরের মতো এবারও আসল মুখোশ উন্মোচন হয়েছে এর মাধ্যমে। কথায় কথায় মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ আর বিপক্ষ শক্তি নিয়ে জনগণের কান ঝালাপালা করে আসছিল ক্ষমতাসীন দলের অন্ধ নেতাকর্মীরা। সব কিছুতে দলীয়করণ নিয়ে ব্যস্ত এ দলটিকে ভদ্র জনগণ যেভাবে বয়কট করতে শুরু করেছে তা বারবার প্রমাণ হচ্ছে। জয়ী হতে পারবে না জেনেই তারা বস্তায় বস্তায় ব্যালট প্রস্তুত করতে থাকে রাতের মধ্যে। ঢাবির কুয়েত মৈত্রী হলে ছাত্রলীগ প্যানেলের প্রার্থীদের পক্ষে সিল মারা এক বস্তা ব্যালট পেপার ও বেগম রোকেয়া হলে ভোটকেন্দ্র থেকে তিনটি ব্যালটবাক্স ছাত্রলীগ কর্তৃক সরিয়ে ফেলা গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছে। এ ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্লাটফর্ম সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ভিপি প্রার্থী ‘নুরুল হক নুর’ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হাতে হামলার শিকার হয়। পরে স্বতন্ত্র জোটের দুই প্রার্থীকেও তারা আহত করে। এসব অনিয়ম দেখে ছাত্রলীগ বাদে ডাকসুর সব প্যানেল নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ এনে ভোট বর্জন করলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান নির্লজ্জের মতো দাবি করেন ‘ভোট সুষ্ঠু ও আনন্দমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে।’ গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, “আমাদের শিক্ষার্থীদের যে শৃঙ্খলাবোধ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ- এগুলো দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। এবং আশা করি এই যে উদাহরণ রাখলো আমাদের ছেলে এবং মেয়েরা, এটি আমাদের নতুন মাত্রায় অনুপ্রেরণা দেয়।” এরপর সারাদিন-সারারাতের একদলীয় বিজয়ের আশঙ্কায় যখন সাধারণ ছাত্ররা আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন শুধু আন্দোলনের ভয়েই নুরুল হক নুরকে ভিপি ঘোষণা দেয় ঢাবির ভিসি। ঘটনার পরম্পরায় মনে হচ্ছে বাংলাদেশের ভাগ্যাকাশে হতাশার কালো মেঘ। যে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ভিসি প্রকাশ্যে মিথ্যা কথা বলেন সে দেশে ভালো মানুষ কিভাবে তৈরি হবে তা এখন জনমনে প্রশ্নের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনিয়ম দেখতে দেখতে জনগণ এখন যেকোনো রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ উপজেলা নির্বাচনে শত চেষ্টা করেও ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত করতে না পারা।
ক্ষমতালোভী সরকারের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছাত্রসংগঠনের অযোগ্য, মেধাহীন, আদর্শহীন, চরিত্রহীন, অর্থলোভী, মাস্তান, চাঁদাবাজ, অস্ত্রবাজ, মূর্খতার কারণে এ জাতি এখন আর ছাত্ররাজনীতিকেও পছন্দ করে না। অথচ ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও ’৯১-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এদেশের ছাত্ররাজনীতির রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক অবদান। এ জন্য ছাত্ররাজনীতিকে পরিশীলিত ও জনবান্ধব করে তুলতে সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ও চেতনাবাজদের বয়কট করা সময়ের দাবি।

SHARE

Leave a Reply