সম্পাদকীয় – মার্চ ২০১৯

১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। তারপর থেকে একের পর এক মর্মান্তিক ইতিহাসের পালাবদল ঘটতে থাকে এদেশের ভাগ্যে। পরাধীনতার সেই অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯৭১-এ দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধে। আমরা ফিরে পাই প্রতীক্ষিত স্বাধীনতা। এ যেন বাংলাদেশের এক অমূল্য অর্জনের নাম। যার অন্যতম উদ্দেশ্য; দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারবে ও কথা বলতে পারবে। কারণ পৃথিবীর গণতান্ত্রিক প্রতিটি দেশেই বাকস্বাধীনতা একজন মানুষের সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু স্বাধীনতার প্রকৃত সুখ ভোগ করতে পারছে না আপামর জনতা। রাষ্ট্রের একজন এলিট শ্রেণীর নাগরিক হয়েও ধর্মীয় চেতনা বিশ্বাস ও লালনের কারণেই রাষ্ট্রীয় অবহেলার শিকার হয়ে ধুকে ধুকে চলে গেলেন বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল এক নক্ষত্র ‘কবি আল মাহমুদ’। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি’২০১৯ (রোজ শুক্রবার) চলে গেলেন দেশ ও জনতার এই কবি। জীবনের অধ্যায়গুলো পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই আল মাহমুদের একেকটি কবিতা একেকটি সময়কে ধারণ করে। সোনালি কাবিন রচনার পর কবি পৌঁছে গিয়েছিলেন খ্যাতির শীর্ষে। একসময় কবির জীবনে নেমে আসে পরিবর্তন। স্রষ্টার রহমধারায় তিনি খুঁজে পান পথের দিশা। নিজেকে পরিচিত করতে থাকেন বিশ্বাসীদের কাতারে। কালিমায়ে শাহাদতের পথ ধরে ফিরে আসেন ইসলামের ছায়াতলে। এরপরে তিনি দিনকে দিন কলম চালাতে থাকেন ইসলামের পক্ষে, নৈতিকতার পক্ষে। ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ লিখে কবি আল মাহমুদ বাংলাদেশে একজন বিতর্কিত লেখক হিসেবে পরিচিত হন। মুক্তিযোদ্ধা হয়েও তিনি তাঁর বিশ্বাসের কারণে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ছোবলে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হন। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের আরেকটি কলঙ্কিত অধ্যায়। এরপরেও তিনি আবহমান বাংলার রূপকে কবিতায় আবদ্ধ করেন জীবন্ত চিত্র সহকারে। কবিতাকে তিনি জীবনের প্রতিচ্ছবিতে রূপায়ন করেছেন নিপুণ কারিশমায়-
“কবিতা তো ছেচল্লিশে বেড়ে ওঠা অসুখী কিশোর

ইস্কুল পালানো সভা, স্বাধীনতা, মিছিল, নিশান
চতুর্দিকে হতবাক দাঙ্গার আগুনে
নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসা অগ্রজের কাতর বর্ণনা।
কবিতা চরের পাখি, কুড়ানো হাঁসের ডিম, গন্ধভরা ঘাস
ম্লান মুখ বউটির দড়ি ছেঁড়া হারানো বাছুর
গোপন চিঠির প্যাডে নীল খামে সাজানো অক্ষর
কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার।”
কবি আল মাহমুদ এভাবেই প্রাণ ও প্রকৃতির অপার রূপ সঞ্চার করেছেন। মানুষের জীবন, আবহমান বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতিকে স্বপ্ন, ছন্দ, গন্ধ নিংড়িয়ে সৌন্দর্যের রস সৃষ্টি করেছেন। তিনি বাংলা সাহিত্যকে তাঁর মননের বিচ্ছুরণের মাধ্যমে ঋদ্ধ এবং ঋণী করে গেছেন। কাব্য রচনার ক্ষেত্রে কবির দীর্ঘদিনের অভ্যাস, অর্জিত জ্ঞান, অধীত মনীষা, আত্মোপলব্ধিজাত অন্তর্নিহিত তাৎপর্যময় চিত্রকল্প, উপমা, উৎপ্রেক্ষা মিলিয়ে মিলিয়ে সাজিয়েছেন। কবি আল মাহমুদ জীবনকে দেখেছেন কবিতার ভেতর, কবিতাকে করে তুলেছেন জীবনের ভাষ্য। ফলে তাঁর জটিল চিন্তাও হয়ে উঠেছে সহজবোধ্য। তাঁর পক্ষপাত শিকড়ের প্রতি, যে শিকড় গ্রামের কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় গ্রথিত। অন্যদিকে স্বাদেশিকতা ও আন্তর্জাতিকতা বোধের যুগ্ম-স্বাক্ষর রয়েছে তাঁর কবিতায়। রাজনৈতিক চেতনা তাঁকে করে তুলেছে জনবান্ধব।
স্বাধীনতার ঐ লাল সূর্যটা আজও জ্বলছে বাংলার আকাশে। অথচ লক্ষ লক্ষ বেকার যুবকের অব্যক্ত কান্নার নোনাজল; পক্ষ-বিপেক্ষর দ্বন্দ্ব-সংঘাতে বলি হওয়া নিরপরাধী মানুষের চেপে রাখা দুঃখ; গায়েবী-আজগুবী মামলার ফাঁদে আটকে পড়া বেকসুরের আত্নবেদনা; বিচারিক-নির্বিচারিক হত্যাকাণ্ড; গুম-খুন-বন্দুকযুদ্ধের মহড়ায় এখন দৃশ্যমান স্বাধীনতার তিক্ত অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশ যেন আজ টেনশনের রাজধানী। রক্ত দিয়ে কেনা লাল সবুজের পতাকাকে শকুনের কালো থাবা যেন ক্ষত-বিক্ষত করে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।
“আজ নেই বর্গী, নেই ইংরেজ, নেই পাকিস্তানী হানাদার
আজ তবু কেন আমার মনে শূন্যতা আর হাহাকার
আজ তবু কি লাখো শহীদের রক্ত যাবে বৃথা
আজ তবু কি ভুলতে বসেছি স্বাধীনতার ইতিকথা?”
[হায়দার হুসেইন]
এক বিশেষ দলের হাতেই আজ বন্দী আমাদের স্বাধীনতা। এইভাবে আর চলতে দেয়া যায় না। এই স্বদেশভূমির স্বকীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে আজ দিকে দিকে একদল সাহসী ও প্রত্যয়ী অভিযাত্রী প্রয়োজন। সাহসের ফুলকি দুলিয়ে দুর্বার গতিতে অগ্রসর হবে যারা। জাতির ঘুম ভাঙ্গাতে একদল মুয়াজ্জিনের আজ খুব বেশী প্রয়োজন। একদল দৃঢ় মনোবল তারিক বিন যিয়াদের প্রয়োজন। সময়োপযোগী ভূমিকা পালন করতে প্রয়োজন ওমরের মতো দুরদর্শী সেনানায়ক। খালিদ বিন ওয়ালিদের মতো তীক্ষ্ণ ও ক্ষিপ্র সেনানী।

SHARE

Leave a Reply