সম্পাদকীয় – মে’ ২০১৯

সম্পাদকীয় - মে' ২০১৯আমাদের সামনে হাতছানি দিয়ে ডাকছে পবিত্র রমজান মাস। এই মাসের বড়ত্ব, গুরুত্ব ও মহত্ত্বের মূলে রয়েছে আল্লাহর কালাম পবিত্র কুরআন নাজিল। কদরের রাতে লাওহে মাহফুজে সমগ্র কুরআন সংরক্ষণ করার পর এই মাসেই আরবের হেরাগুহায় সর্বপ্রথম কুরআনের আয়াত নাজিল শুরু হয়। রাসূলের (সা) তেইশ বছরের নবুওয়্যাতি জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রয়োজন অনুসারে অল্প অল্প করে সমগ্র কুরআন নাজিল সম্পন্ন হয়। এই কুরআনের আলোকে আমরা যেন ব্যক্তিগত জীবনের সকল দিক ও আমাদের সামষ্টিক জীবনের সাথে সম্পর্কিত নানান দিক তথা সমাজব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, অর্থব্যবস্থা, সাংস্কৃতিকব্যবস্থা, রাজনৈতিকব্যবস্থাসহ মানুষের জীবন সংশ্লিষ্ট যাবতীয় ব্যবস্থা আল্লাহর দেখানো বিধান মোতাবেক পরিচালনা করতে পারি এ জন্যই তিনি আমাদের এত বড় নেয়ামত দান করেছেন। কিন্তু আমরা পবিত্র কুরআনের বিধান না মেনে মানুষের মনগড়া বিধান মানার কারণে নানারকম সমস্যায় জর্জরিত হচ্ছি প্রতিদিন। নৈতিকশিক্ষা বিবর্জিত এ সমাজ আজ এক অশান্তির স্থানে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীর কোথাও যেন মানবতা নেই। মানবতার নামে যারা বিভিন্ন বুলি আওড়ায় ওদের হাতেই মানবতা লঙ্ঘিত হচ্ছে বারবার। এখন এক অসভ্য প্রজন্মের হাতে সমাজের চাবিকাঠি। পিতার হাতে সন্তানের নিরাপত্তা নেই। নেই সন্তানের হাতে বাবা-মার নিরাপত্তা। শিক্ষকের হাতে ছাত্রীর নিরাপত্তা নেই। শ্লীলতাহানি, ধর্ষণ, গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার ঘটনা শুনে কোন বিবেকবান মানুষের স্থির থাকা সম্ভব নয়। সমাজের হর্তাকর্তাদের অবহেলার কারণে অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা, খুন, গুম, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ছিনতাইয়ের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এইসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কোন আঁচ পেলেই সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছে সাধারণ দেশপ্রেমী মানুষ। কারণে অকারণে তাদের গ্রেফতার, হয়রানি, বিচারিক হত্যাকাণ্ড ও বন্দুকযুদ্ধের ভয়ে মানুষের প্রতিবাদ করার ভাষাও হারিয়ে গেছে। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য আল্লাহর বিধানের কাছে আত্মসমর্পণ করা ও পবিত্র কুরআনের সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ছাড়া মানবতার মুক্তির আর কোনো ব্যবস্থা নেই।
মে মাস শ্রমিক আন্দোলনের জন্য ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহনকারী এক মাস। শ্রমিকরা সৃজনের কারিগর ও মানবতার বন্ধু। সমাজে আর দশজন মানুষের মতো শ্রমিকরাও মানুষ। বিশ্ব সভ্যতার অণু থেকে অট্টালিকা; লোহা থেকে মোটরগাড়ি, রেল, উড়োজাহাজ সবকিছু নির্মাণ ও পরিচালনাই শ্রমিকের ঘামের মাধ্যমে হয়। আবার মানুষের প্রয়োজনীয় ও মৌলিক বিষয়াদির বন্দোবস্ত তাদের হাতেই হয়। এরপরও অবহেলিত জীবন যাপন করতে হয় তাদের। এ বৈষম্য মেনে নেয়ার মতো নয়। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে আন্দোলনের মাধ্যমে আদায় করা কিছু অধিকার তারা ভোগ করলেও অনেক ন্যায্য অধিকার থেকে এখনো বঞ্চিত রাখা হয় তাদের। শুধু তাই নয় শ্রমিকদের যথাযথ সম্মানের দৃষ্টিতেও দেখা হয় না আমাদের সমাজে। আমরা ভাবি, সমাজের উচ্চস্তরের মানুষরা সম্মানের ও গৌরবের কাজ করছে। এ জন্য বেশিরভাগ সুযোগ-সুবিধা তাদের জন্য বরাদ্দ। তার ফলে শ্রমিকদের নিচু শ্রেণীর মনে করে বঞ্চিত করছি প্রতিনিয়ত। অথচ এই তথাকথিত নিচু শ্রেণীর শ্রমিকরাই চিরকাল মাঠে, ঘাটে, অন্দরে, মিল-ফ্যাক্টরি, কল-কারখানায় ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে অবিরত।
মে মাসের ১১ তারিখ পৃথিবীর ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। কোটি কোটি মুমিনের হৃদয়ে শেকড় গাঁথা মহাগ্রন্থ আল কুরআনকে বাজেয়াপ্তের ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছিল ভারতের কতিপয় উগ্রবাদী হিন্দু। ১৯৮৫ সালের ১২ এপ্রিল পদ্মপল চোপরা ও শীতল সিং কুরআনের সকল আরবি কপি ও অনুবাদ বাজেয়াপ্ত করার জন্য কলকাতা হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করে। রিটে বলা হয়, কুরআনে এমন কিছু আয়াত আছে যেখানে কাফির ও মুশরিকদের হত্যা এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রেরণা দেয়া হয়েছে, তাই এই গ্রন্থ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্ম দিতে পারে। মিসেস পদ্মা খাস্তগীর এই মামলা গ্রহণ করে এবং এ বিষয়ে তিন সপ্তাহের মধ্যেই অ্যাফিডেভিট প্রদানের জন্য রাজ্য সরকারের প্রতি নির্দেশ দেয়। এই গর্হিত ঘটনার প্রতিবাদে সারাবিশে^র মুসলমানদের ন্যায় বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমান প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। ১০ মে জুমার নামাজ শেষে বায়তুল মোকাররম মসজিদ থেকে হাজার হাজার ইসলামী ছাত্র-জনতা মিছিল ও সমাবেশে মিলিত হলে লাঠিচার্জ করে পুলিশ। পরদিন ১১ মে চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিমতলা ঈদগাহ ময়দানে আয়োজিত সমাবেশে ১৪৪ ধারা জারি করে পুলিশ। এহেন পরিস্থিতিতে ইসলামী জনতা শুধুমাত্র দোয়া করে সমাবেশস্থল ছেড়ে চলে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তা না দিয়ে জনতার ওপর গুলি বর্ষণ করা হয়। এতে কুরআনের সৈনিক স্কুলছাত্র, কৃষক, রিকশাওয়ালা ও রেল শ্রমিকসহ গুলিবিদ্ধ হয়ে ৮ জন শাহাদাত বরণ করেন। কুরআনের অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা যেখানে সকল মুসলমানের কর্তব্য সেখানে ইসলামী জনতার ওপর গুলি বর্ষণ করে ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় রচনা করেছিল বাংলাদেশের তৎকালীন পুলিশ। বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের নিদের্শদাতা ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াহিদুজ্জামান মোল্লা পরে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা হন। কিন্তু বর্বরোচিত এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি। অপরদিকে সত্য-ন্যায়ের সেনানীরা আল্লাহর কালামের মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালায়। আটজন শহীদ ও শতাধিক আহত গাজির রক্তে রঙিন সেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাটি আজও আমাদের প্রেরণার বাতিঘর। সে দিনের শহীদ আর আহতদের ত্যাগের মহিমা বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যে নবচেতনা জাগ্রত করে তোলে। মাজলুম পরিবারের দোয়া ও শহীদি রক্তের স্রোতধারা বৃথা যায়নি। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এ মামলা খারিজের জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলকে নির্দেশ দেয়। দুই দিন না যেতেই ১৩ মে ১৯৮৫ কলকাতা হাইকোর্ট মামলাটি খারিজ করে দেয়। ঘাতকেরা নিয়েছিল মায়ের কলিজা ছেঁড়া সোনার মানিক কিন্তু কুরআনের প্রতি ভালোবাসা তারা কেড়ে নিতে পারেনি। ভাই হারানো বোনের হৃদয়ফাটা কান্না, সন্তানকে পিতার চিরবিদায়ের বেদনা, স্ত্রীর বুকে স্বামী না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার যন্ত্রণা, আত্মীয়-স্বজন ও সহপাঠীদের বেদনা, প্রিয় সংগঠনের সাথীদের বুকভরা হাহাকার ও নয়নভরা অশ্রু সবই যেন ইতিহাসের সাক্ষী। রাত গভীর মানেই সোনালি প্রভাতের হাতছানি। তাই আমাদের বিশ্বাস, রমজান ও কুরআনের শিক্ষা নিয়ে পথ এগোতে থাকলে আল্লাহর সাহায্য মানবতার জন্য অপেক্ষা করছে।

SHARE

Leave a Reply