সম্পাদকীয় ২০১৯ জানুয়ারী

শুভ নববর্ষ। নতুন দিনগুলো শুভ হোক সকলের।

গাড়ির চাকা ঘুরতে ঘুরতে এগিয়ে যায় সামনে। এ সময় টায়ারের প্রতিটি অংশ একবার উপরে আরেকবার নিচে নামে। একই নীতি মেনে চলে ঘড়ির কাঁটাগুলো। সময়ের বলয়ে বারোটি মাসও আমাদের মাঝে ফিরে আসে সেভাবেই। প্রত্যাশার সাথে আমরা বরণ করে নেই নতুন বছরকে। কত ঘটনাবলি আর অতীত ইতিহাসে সংযুক্ত সাক্ষী হয়ে গেল ২০১৮ সাল। এই ফিরে আসা কার ভাগ্যে কতবার থাকে; কতটুকু থাকে তার সঠিক কোন মাত্রা কেউ জানে না। এখান থেকে শিক্ষা নিলে হয়তো ক্ষমতার পালাবদল সমন্ধে পরিষ্কার আভাস পেত সবাই। নিজের চাহিদা বুঝে সময় ক্ষেপণ না করে হয়তো অন্যকে প্রাধান্য দিত অবলীলায়। কিন্তু লোভীদের ক্ষেত্রে সৎ উপদেশ কার্যকর হয় না। আল্লাহভীরু প্রতিটি মুসলমান মনে করে সুসময় আর দুঃসময় সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। পবিত্র কুরআনের ভাষ্যানুযায়ী- 
“সময়ের কসম, নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত; কিন্তু তারা নয়, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে তাকিদ করে সত্যের এবং তাকিদ করে সবরের।” (সূরা আল-আসর)

পৃথিবীর অতীত ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যুগে যুগে অধিকাংশ ক্ষমতাসীন ব্যক্তি ইসলামের শাশ^ত বিধান মেনে নিতে পারেনি। ইসলামের রাহবারদেরও প্রধান দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিকেই ইসলামের সুমহান আদর্শের পয়গাম সর্বাগ্রে পৌঁছে দেয়া। মসনদের অযোগ্য ঐসব ব্যক্তি ক্ষমতার মোহে ইসলামকে অগ্রাহ্য করে রাহবারদের প্রতি চালিয়েছিল অবর্ণনীয় নির্যাতন। ফলে বেশির ভাগ সময়ই ইসলাম প্রতিষ্ঠিত সরকারবিরোধী অবস্থান থেকে লড়ে গেছে সত্যের সংগ্রামে। সময়ের প্রেক্ষাপটে কেউ করে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান। কেউ আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করেই নিভু নিভু পদক্ষেপে এগিয়ে যায় সামনে। ওরা জানে এই পথে চলা খুবই কঠিন; এই পথ হলো রক্তপিচ্ছিল-কণ্টকাকীর্ণ। আল্লাহকে খুশি করতে এর প্রতিটি পদক্ষেপ রাখতে হয় খুব সাবধানে। প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি বাক্যমালা, শব্দ চয়ন, প্রতিটি কর্মতৎপরতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষিত হয়ে চলছে তারই সুমহান কুদরতে। এভাবে চলতে চলতে সময়ের প্রেক্ষাপটে কোন কোন স্থানে আল্লাহর রাজ কায়েম হয়েছে কিছুদিনের জন্য। সময়ের বিপদ-মুসিবতকে ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করে যাওয়ার নামই সৎসাহস। সময়ের কঠোরতা বরণ করে নেয়াকেই বলে ঈমানের অগ্নিপরীক্ষা।

সামাজিক অবক্ষয় বা নীতি নৈতিকতার অবক্ষয় আজ আমাদের দেশে যুবক সম্প্রদায়কে ধ্বংসের অতল গহবরে নিমজ্জিত করে চলছে। তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার, অশ্লীল সংস্কৃতির আগ্রাসন, অবাধে মাদক সেবন যুবকদের চরিত্র হনন করে আজ তারা একটি সেবাদাস পঙ্গু জাতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় দৈন্যতার কারণে কাক্সিক্ষত ধর্মীয় শিক্ষা অর্জনে তারা বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। আত্মভোলা, দিক-নির্দেশনাহীন হয়ে তারা আজ সামাজিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলেছে। কখনো পরিস্থিতির চাপে গুজবীয় জঙ্গি মৌলবাদের অপবাদে এক অন্ধকার আতঙ্কে ভুগে আমাদের সম্ভাবনাময় যুবসমাজ। এই অবস্থা চলতে দেয়া যায় না। যত দ্রুত সম্ভব এই ভয়াবহ পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে হবে। এখনো সব শেষ হয়ে যায়নি; এখনো এ পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই ধর্মীয় অনুশাসনের প্রয়োগ ঘটিয়ে তাদের ফিরিয়ে আনার যথাযথ ব্যবস্থা করতে হবে। এরপর সমাজ ও পরিবারকে সুনির্দিষ্ট ভূমিকা পালন করতে হবে। সমাজে উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে সৎকাজের; আর মন্দ কাজের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পারিবারিক বন্ধন জোরদার করে ছোট থেকেই ধর্মচর্চা ও নীতি নৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে। পাশাপাশি পারিবারিক সচেতনতা ও মূল্যবোধের চর্চার দিকটি বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে। সর্বোপরি সবাইকে নিজ নিজ পরিমণ্ডলে প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

সামনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। গণতান্ত্রিক দেশগুলোর চিরাচরিত নিয়মানুযায়ী নির্বাচন এলে মানুষের মনে থাকে আনন্দঘন উৎফুল্ল ভাব। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় একটি নির্বাচনে আমেজ আর উৎসাহ ভরে চলে প্রচারণাকার্যক্রম। জনগণের সুচিন্তিত ও সঠিক মতামতের প্রতিফলন ঘটিয়ে একজন জনবান্ধব সরকার প্রতিষ্ঠা হয়। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশ দেখছে তার পুরো উল্টো চিত্র। একদলীয় বাকশালী আমলে এই নির্বাচনী মাঠে চলছে জাহেলিয়াতের নিকৃষ্ট বর্বরতা। সরকারি দল সহিংস হয়ে বিরোধী দলের ওপর একের পর এক হামলা-মামলা আক্রমণ করে যাচ্ছে অবিরত। নির্বাচনের প্রচারণা শুরুর পর থেকেই উত্তাপ-উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় যাওয়া আসার পথেই হামলার শিকার হচ্ছে। দিন গত হওয়ার সাথে সাথে লাঠিসোটা নিয়ে হামলা আর পুলিশের মাধ্যমে আজগুবি মামলা করিয়ে গ্রেফতারের ঘটনাও বাড়ছে সমানতালে। হামলার সাথে সাথে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটছে ভয়াবহভাবে। এভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গুম, খুন, গ্রেফতারের মাধ্যমে এক ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি করে নির্বাচনে নিজ দলের অবৈধ বিজয় সুনিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে স্বৈরাচারগোষ্ঠী। তবে সত্যের অতন্ত্র প্রহরীদের দমিয়ে রাখতে পারে না কোন জবর দখলকারী। সাহসে ফুলকি দুলিয়ে এগিয়ে চলে তাঁরা। সত্য প্রতিষ্ঠার অবিরাম পথচলায় তাদের প্রেরণা জোগায় শাহাদাতের রক্তমাখা ইতিহাস। দ্বীন প্রতিষ্ঠায় যারা কাজ করে তারা সার্বভৌম ক্ষমতার অধিপতি আল্লাহর সাহায্যেই তো বীরদর্পে চষে বেড়ায় পৃথিবীর জমিন। 

SHARE

Leave a Reply