সম্পাদকীয়

মিয়ানমারে মুসলমানদের ওপর যে নির্যাতন চলছে তা যেন জাহিলিয়াতকেও হার মানিয়েছে। আজ তাদের ভোটারাধিকার নেই; নেই জাতীয় পরিচয়পত্র। রোহিঙ্গা আজ তাদের উপাধি। নিজ দেশে তারা পরাধীন। অথচ আরাকান রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলমানদের রয়েছে সোনালি এক ইতিহাস। ১৯৮২ সালে সামরিক সরকার এক বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন পাসের মাধ্যমে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়। সেই থেকে ধীরে ধীরে উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের যে চিত্র আমরা দেখছি সেটাই কিন্তু শেষ নয়। পর্দার অন্তরালে রয়ে গেছে আরো অনেক বেশি নির্যাতন ও নিষ্ঠুরতার বাস্তবচিত্র। তবে আমরা যা দেখছি তা কোনো সহৃদয়বান ব্যক্তি সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না। সম্প্রতি বাংলাদেশে রোহিঙ্গা মুসলমানদের অনুপ্রবেশ চলছে দুর্দান্ত গতিতে। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাদের সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসছে। তাদের খাদ্য, চিকিৎসা, পুনর্বাসনের বিষয়টা নিয়ে ভাবছেন সকলে। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মিডিয়াতে অনেকেই তুলাধোনা করে ফেলছেন অং সান সু চিকে। তার শান্তিতে নোবেল কেড়ে নেয়ার দাবিও করেছেন অনেকেই। বাংলাদেশ সরকার বরাবরই মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশে প্রবেশের ব্যাপারে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছেন। সরকারবিরোধীরা রোহিঙ্গাদের প্রতি সদয় হয়ে বাংলাদেশে তাদের আশ্রয় ও পুনর্বাসন করার ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। তবে সরকার ও বিরোধী পক্ষ উভয়ের ভূমিকা ছিল নীরব। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট পতœী বাংলাদেশ সফরে এসে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেন এবং তাদেরকে সহযোগিতার জন্য বিশ্ববাসীর প্রতি আহবান জানান। বিদায়বেলায় তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী অনেকটা নড়েচড়ে বসেন, আগের সুর বদলিয়ে এখন বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে সর্বাত্মক সহযোগিতার জন্য আহবান ব্যক্ত করেন। আসলে একটু খাবার কিংবা সাময়িক আশ্রয়দানের মাধ্যমে কি রোহিঙ্গা মুসলমানদের মৌলিক সমস্যা সমাধান হবে? রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে না; মানবিক মূল্যবোধ ও মানবসভ্যতাকে পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। আজ সময় এসেছে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের নাগরিকত্ব বাতিল ও বিতাড়নের পেছনের কারণ উদঘাটনের। আমরা হয়তোবা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে একটু ত্রাণ দিয়ে খুশিতে গদগদ; তাদের প্রতি দায়িত্বের সবটুকু পালনের তৃপ্তির ঢেঁকুুর তুলছি। আমরা যদি তাদের প্রতি নির্যাতনের ইতিহাস না খুঁজে চুপ করে বসে থাকি তাহলে পরবর্তীতে মিয়ানমারের ভাগ্যবরণ করতে হবে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে নির্যাতিত ও নিপীড়িতদের মধ্যে অন্যতম মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানরা। মানবিকতার এমন বিপর্যয় সত্যিই দুঃখজনক। যারা পুরো বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নোবেল বিজিত; মানবতার রক্ষক হিসেবে নিজেদেরকে পরিচয় দেন আজ তারা মুখে কুলুপ এঁটে দিয়েছেন। নিন্দা প্রকাশ, উদ্বেগ জানানো, আর শান্তি প্রতিষ্ঠার আহবানের মধ্যেই যেন তাদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ। সেলুকাস! আজ মুসলমানদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ কি নেই! জাতীয় চেতনার কবি মতিউর রহমান মল্লিøক তাই আহবান করেনÑ এখানে কি কেউ নেই খোদার রঙে জীবনকে রাঙাবার/ এখানে কি কেউ নেই খোদার রাহে জীবনকে বিলাবার/এখানে কি নেই খালিদের মতো কেউ/ এখানে কি নেই সালাদ্দীন সম কেউ/ এখানে কি নেই তারিকের মত কেউ/ এই দুর্দিনে অভিযান চালাবার।
ইতিহাস সাক্ষী, ইসলামবিদ্বেষীদের কথার তুবড়িতে যদি আজ মুসলিম উম্মাহ গা ভাসিয়ে দেয়; আপসকামিতায় মেতে উঠে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকে তাহলে সামনে আরো বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে। তাই আর দেরি না করে রোহিঙ্গা মুসলমানদের অধিকার আদায়ে মুসলিমবিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে উঠতে হবে; নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় নিজেদেরকে জাগতে হবে, আওয়াজ তুলতে হবে বজ্রকণ্ঠে। হ

SHARE

Leave a Reply