সম্পাদকীয়

দীর্ঘ ক্লান্তির পর কার না ইচ্ছে করে একটু অবকাশ নিতে! একটু ফুরসত পেলে মনটা যেন আনন্দে নেচে ওঠে। কিন্তু এই আনন্দ কি সবার ভাগ্যে জোটে? কারো কারো জীবনে এমন ফুরসতের মুহূর্তেও বিষাদের ছবি ভাসে দু’চোখ জুড়ে। তেমনটি ঘটে গেলো বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার জীবনে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছুটি’ কবিতাটি এখনও কিশোর মনের ভাবনায় আন্দোলিত করে। কবি লিখেছেন- মেঘের কোলে রোদ হেসেছে/ বাদল গেছে টুটি/ আজ আমাদের ছুটি ও ভাই / আজ আমাদের ছুটি/ কী করি আজ ভেবে না পাই/পথ হারিয়ে কোন বনে যাই/ কোন মাঠে যে ছুটে বেড়াই/সকল ছেলে জুটি।
ছুটির সংবাদে যেমন কিশোর মনে রঙিন স্বপ্নের জোয়ার ভাসে; তেমনি বড়দের ক্ষেত্রেও। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা অস্ট্রেলিয়া সফরে যাত্রার প্রাক্কালে তিনি যে বিবৃতি দিয়ে গেলেন তাতে বোঝা যায় ছুটি কারো কারো জীবনে বিতৃষ্ণা ও অভিশাপ বয়ে আনে।
২. বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় ‘বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট’। এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতি সাধারণ মানুষের যে আস্থা ও বিশ্বাস ছিল, সমকালীন সঙ্কট ও বিতর্কিত এই অদ্ভুত পরিস্থিতি সৃষ্টির মাধ্যমে সেই আস্থা ও বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করা হয়েছে। প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেল আমাদের সর্বোচ্চ আদালতপাড়া ও প্রধান বিচারপতির পদটিও। প্রধান বিচারপতির বিদেশ যাত্রাকালে তার মৌখিক ও লিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে গেলো তিনি অসুস্থ নন। তিনি পুরোপুরিই সুস্থ। তাকে বাধ্যতামূলক ছুটি দেয়া হয়েছে এবং তিনি সর্বোচ্চ আদালতকে কলুষিত না করার জন্য এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তিনি হয়তো আদালতের মানকে সমুন্নত রাখার স্বার্থে নিঃশব্দে বিদেশে পাড়ি জমালেন। কিন্তু আসলেই কি আমাদের সর্বোচ্চ বিচারালয়ের সুখ্যাতি ও সুনাম অক্ষুণœ থাকবে?
৩. বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের গুরুত্বপূর্ণ বিচারক ছিলেন এস কে সিনহা। বেশ কয়েকজনকে তথাকথিত যুদ্ধাপরাধীর অপরাধে ফাঁসি নিশ্চিত হওয়ার ব্যাপারে তার ভূমিকায় খুব অল্প সময়ে ক্ষমতাসীনদের কাছে তিনি বেশ আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। কিন্তু হঠাৎ করে সরকার তার প্রতি বিরাগভাজন হয়ে ওঠার কারণটি তিনি নিজেও বিশ্লেষণ করে বলেছেন, একটি রায় নিয়ে রাজনৈতিক মহল, আইনজীবী ও বিশেষভাবে সরকারের মাননীয় কয়েকজন মন্ত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে ব্যক্তিগতভাবে যেভাবে সমালোচনা করেছেন, এতে আমি সত্যিই বিব্রত। আমার দৃঢ় বিশ্বাস সরকারের একটা মহল আমার রায়কে ভুল ব্যাখ্যা প্রদান করে পরিবেশন করায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার প্রতি অভিমান করেছেন, যা অচিরেই দূরীভূত হবে বলে আমার বিশ্বাস।
তবে সরকারের আস্থাভাজন প্রিয় মানুষটি অপ্রিয় হয়ে ওঠার গল্পটি হলো- সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে দেয়া রায়। যারপরনাই অবৈধ পথে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি সরকারের মনে আঘাত করেছে। তখন থেকে সরকার প্রধান বিচারপতিকে অপসারণের বিষয়টি আমলে নেন। মন্ত্রী মহোদয়রা বিবৃতি দিতে থাকেন- প্রধান বিচারপতি ক্যানসারে আক্রান্ত। তাকে বিদেশ পাঠাতে হবে। অবশেষে বোঝা গেল নানান মারপ্যাঁচে তিনি বিদেশ যেতে বাধ্য।
উল্লেখ্য, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে ১১টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে। বিদেশে অর্থ পাচার, অনিয়ম, দুর্নীতি, নৈতিক স্খলনসহ আরো অনেক গুরুতর বিষয় উঠে এসেছে সেখানে। তবে এত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রধান বিচারপতিকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেয়ায় আইনি জটিলতা আরো ঘনীভূত হয়ে উঠল। আর সাধারণ মানুষ এস কে সিনহার পূর্বেকার সকল রায় ও বিচারিক কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। রীতিমতো তাকে তুলোধোনা করছেন। আর এমন প্রশ্ন থাকাটাই স্বাভাবিক।
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে দেয়া রায়টি ভুল হিসেবে সাব্যস্ত করে সরকার প্রধান বিচারপতির প্রতি নাখোশভাব প্রকাশ করেছে। যুদ্ধাপরাধসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রায় নিয়ে সরকার কেন প্রশ্ন তুলেনি এই বিষয়টি আজ মানুষের মুখে মুখে। যাই হোক বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত প্রাঙ্গণ তার স্বকীয়তা ফিরে পাক। কোনো একটি গোষ্ঠীর প্রভাববলয়ে যেন আর কলুষিত ও প্রশ্নবিদ্ধ না হয় এই প্রতিষ্ঠানটি। দেশের গণতন্ত্র ক্যানসারে আক্রান্ত না হয়ে আবারো পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠুক। সাধারণ মানুষ তার মৌলিক অধিকার ফিরে পাবে খুব শিগগিরই এমনটি প্রত্যাশা। বাংলাদেশের ভাগ্যাকাশে যে কালো মেঘের ঘনঘটা তা দূরীভূত হয়ে একটি সোনালি সূর্য উদিত হবে সেই অভিপ্রায় আমাদের সকলের। হ

SHARE

Leave a Reply