সম্প্রচার নীতিমালা পঙ্গু প্রজার দেশে পরিণত করবে

 এরশাদ মজুমদার

Mediaমানুষের কথা বলার অধিকার তার জন্মগত। ভালো-মন্দ বোঝা ও যাচাই করার জ্ঞানবুদ্ধিও দিয়েছেন তার প্রতিপালক ও স্রষ্টা। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে জগতে তাঁর খলিফা করেই পাঠিয়েছেন। আল্লাহ পাকের বহু গুণ তিনি মানুষকে দিয়েছেন। মানুষকে ভাবতে শিখিয়েছেন। মানুষকে ভালো-মন্দের জ্ঞান দিয়ে সঠিক পথ কী তা দেখিয়ে দিয়েছেন। জগতে গণমানুষের প্রথম রাষ্ট্র হচ্ছে মদিনার রাষ্ট্র। এ রাষ্ট্রের প্রধান ছিলেন জগতের শেষ রাসূল সা: ও শেষ নবী মুহম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মোত্তালিব। সে সময়ে এ জগতে সাধারণ মানুষের কোনো রাষ্ট্র ছিল না। আল্লাহ পাকের ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার জন্যই নবীজী মদিনা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। মদিনা সনদ নিয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী মাঝে মধ্যেই কথা বলেন। তিনি ওয়াদা করেছেন মদিনা সনদ বাস্তবায়ন করবেন। কে বা কারা তাকে বুঝিয়েছেন, মদিনা রাষ্ট্র সেকুলার (ধর্মহীন) রাষ্ট্র ছিল। যদিও আমাদের দেশে সেকুলার শব্দটির অনুবাদ করা হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ। শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে ব্রিটেনে। ধর্মবিহীন জীবনযাপনে বিশ্বাসীরা রাজা বা রাষ্ট্রকে বুঝিয়েছেন যে রাষ্ট্র বা রাজার কোনো ধর্ম থাকতে পারে না। সেই শব্দটি কালক্রমে আমাদের দেশে চালু হয়ে গেছে। পাঠকসমাজ প্রশ্ন তুলতে পারেন যে, আমি ইসলামের দৃষ্টিতে বিষয়টি দেখছি। না, জগতের সব ধর্ম ও মত স্বীকার করে যে মানুষ শ্রেষ্ঠ জীব বা সেরা সৃষ্টি। মানুষের জন্যই এ জগৎ সৃষ্টি করা হয়েছে। শব্দই হচ্ছে ব্রহ্মা। তিনি একটি ধ্বনি দিয়েই জগৎ সৃষ্টি করেছেন। জগতে যত ভাষা আছে সব ভাষাই খোদার বা স্রষ্টার। সেই ভাষাতেই মানুষ নিজেকে প্রকাশ করে। জগতে যত খোদায়ি কিতাব আছে তা প্রকাশিত হয়েছে শব্দ আর ভাষার মাধ্যমে। যারা ভাষাবিদ তারা মনে করেন ভাষা কালক্রমে মানুষের চেষ্টাতেই তৈরি হয়েছে। যেভাবেই হোক না কেন, বোঝা গেল মানুষের জন্য ভাষা অপরিহার্য। ভাষার মাধ্যমেই মানুষ মতপ্রকাশ করে, লেনদেন করে। ভাষার মাধ্যমেই মানুষ তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কথা বলে।
প্রাচীন যুগে যখন রাজা বাদশাহরা ছিলেন না তখনো মানুষ গোত্র বা কৌম বা কওমভুক্ত হয়ে থাকত। নিজেদের ভেতর নিজেরাই কওমের নিয়মকানুন তৈরি করে জীবনযাপন করত। এর পরে রাজা বা বাদশাহ ব্যবস্থা আসে। রাজা বা বাদশাহরাও নিয়মনীতি তৈরি করে দেশ ও প্রজাদের পরিচালনা করতেন। এর ভেতর অত্যাচারী বাদশাহরাও ছিলেন। যেমনÑ ফেরাউন, নমরুদ, জার, সিজার। আধুনিক যুগেও আমেরিকার মতো অত্যাচারী সন্ত্রাসী অত্যাধুনিক রাষ্ট্র আছে। আবার আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের বাদশাহরাও জনগণের অধিকারকে স্বীকার করেন না। সেখানে কোনো গণতন্ত্র নেই। আবার চীন বা মিয়ানমারেও গণতন্ত্র নেই। এরা সবই কিন্তু জাতিসঙ্ঘের সদস্য। আমেরিকা গণতন্ত্র কায়েমের জন্য ভিনদেশ আক্রমণ করে ব্যাপক হারে মানুষ হত্যা করে। আমেরিকাই বিশ্ববাসীকে বুঝিয়ে দিয়েছে গণতন্ত্র, মানবতাবাদ ও কথা বলার অধিকার একটা স্লোগান মাত্র। আসল কথা হলো শক্তি। একসময় গণচীন বলত, ‘পাওয়ার কামস আউট অব ব্যারেল অব গান। মানে বন্দুকই ক্ষমতার উৎস। চীনে গণতন্ত্র নেই, তবুও আমেরিকা চীনের সাথে গভীর বন্ধুত্বে আগ্রহী। সৌদি আরবে চলছে রাজতন্ত্র বা বাদশাহি। সে দেশের বাদশাহর সাথে আমেরিকার রয়েছে গভীর বন্ধুত্ব। এর মানে গণতন্ত্র ও মানবতা বড় কথা নয়। সব কিছুই আমেরিকার স্বার্থ। তবে এ কথা স্বীকার করতে হবে যে আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোতে মত প্রকাশের অধিকার আমাদের চেয়ে হাজার গুণ বেশি, যদিও সেখানে রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্রসহ সব প্রকার প্রচারমাধ্যমকে করপোরেট হাউজগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। এসব হাউজও নাকি আমেরিকার সরকারগুলোকেও নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলাদেশ গরিব দেশ। রাজনীতিকেরা ওয়াদা করেছিলেন সোনার বাংলা উপহার দেবেন। না, আমরা সোনার বাংলা পাইনি। ’৭৪ সালে টিসিবি কর্তৃক মহান ভারত থেকে আমদানিকৃত সুন্দরী শাড়ি নিয়ে জাতীয় মজাদার আলোচনা হয়েছিল। সংসদে এর নাম দেয়া হয়েছিল সোনার বাংলা শাড়ি। সুন্দরী শাড়ি ছিল দশহাতি। পুরো শরীর ঢাকা যেত না। ওই শাড়ি পরলে ভেতরের সব কিছু দেখা যেত। ওই সময়েই বাসন্তীর জন্ম হয়েছিল। সে শাড়ির অভাবে জাল পরেছিল। সে ছবি ছাপা হয়েছিল ইত্তেফাকে। মহান ভারত বললাম এ কারণে যে, বন্ধুদেশ নিয়ে এখন কোনো মন্দ কথা বলা যাবে না। বন্ধুদেশ নিয়ে লেখার অভিযোগে আমার বিরুদ্ধে একবার মামলা হয়েছিল। যেকোনো মন্দ আইন থাকলেই পুলিশ থেকে শুরু করে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে। ভারতে সম্প্রচার নীতিমালা বা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন আইন চালু হয়েছে ব্রিটিশ আমলে। ব্রিটিশ আইনের মূল লক্ষ্য ছিল পরাধীন নাগরিকদের কঠোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণে রাখা। সে আইন এখনো ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে চালু আছে। কোনো সরকারই ওই সব আইনকে গণমুখী করেনি বরং নিবর্তনমূলক আইন দিন দিন বেড়ে চলেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নাগরিকদের শাস্তি দেয়ার জন্য ’৭৪ সালে স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট করেছেন। ব্রিটিশ আমলে করা নিবর্তনমূলক আইন ৫৪ ধারা এখনো জারি আছে। এই আইনের দ্বারা পুলিশ বা সরকার যেকোনো নাগরিককে কোনো কারণ না দেখিয়ে গ্রেফতার করতে পারেন। বিশেষ ক্ষমতা আইন বলে যেকোনো নাগরিককে আটক করে বিনা বিচারে আটক রাখতে পারে। রাজনীতিতে অসত্য বা মিথ্যা একটি বড় অস্ত্র বা হাতিয়ার। এর মাধ্যমে জগৎবাসী, দেশবাসী ও জনগণকে সহজেই বিভ্রান্ত করা যায়। অসত্য বা মিথ্যা কথা বলে ক্ষমতায় আসা যায়। মিথ্যা কথা বলা, মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করা আমেরিকা বা তার মিত্রদের ধর্মে পরিণত হয়েছে। লোকে বলে নিজেরাই টুইন টাওয়ার ধ্বংস করে বিশ্বব্যাপী অশান্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র আছে অভিযোগ করে সাদ্দামকে হত্যা করেছে, ইরাকের লাখ লাখ মানুষকে খুন করেছে। সেই ইরাক আজো অশান্ত এবং প্রতিদিন সেখানে মানুষ মারা যাচ্ছে। সেই অশান্তি সারা আরবে ছড়িয়ে পড়েছে।
রাজনীতিতে মিথ্যা বলা নিজ দেশের মানুষ বা বিদেশীদের বিভ্রান্ত করা এখন আমেরিকার ব্যবসা। বিশ্বব্যাপী দেশপ্রেমিকেরা আজ কোণঠাসা। বঙ্গবন্ধু সোনার বাংলা গঠনের কথা বলে দেশবাসীকে তার সাথে থাকার জন্য বা তাকে ভোট দেয়ার জন্য দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। দেশের মানুষ দরাজ দিলে ১৯৭০ সালে তার দলকে ভোট দিয়েছেন। তেমন কোনো বড় দল সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। তিনি বলেছিলেন, দশ টাকা মণ দরে চাল দেবেন। ছাত্রদের জন্য ছয় আনা দামে কাগজ দেবেন। না এর কিছুই তিনি করতে পারেননি। বরং ’৭৩-এর নির্বাচনে তার লোকেরা ভোটের বাক্স লুট করেছেন। ’৭৪-এ দেশে দুর্ভিক্ষ নেমে আসে। লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ’৭৫-এ এসে তিনি একদলীয় রাজনীতি চালু করে শত শত সংবাদপত্র বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সে সময়ে বঙ্গবন্ধুর সরকার হাজার হাজার দেশপ্রেমিক যুবককে হত্যা করেছে। আওয়ামী লীগের লোকেরা এসব সত্য সব সময় অস্বীকার করে এসেছে। বঙ্গবন্ধু একদল করেছিলেন ভিন্ন মতকে জোর করে দমিয়ে রাখার জন্য। তিনি মনে করতেন ভিন্ন মত না থাকলে দেশের উন্নতি হবে। তিনি কখনোই সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন না। শুধু কিছু দেশ ও কিছু লোককে সন্তুষ্ট করার জন্য সমাজতন্ত্রের কথা বলতেন। সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য তিনি সব সময় যা বিশ্বাস করেন না তা বলতেন। আওয়ামী লীগ কখনোই সমাজতান্ত্রিক দল ছিল না। শেখ সাহেব সিপিবি, জাসদসহ সব বামপন্থী দলের লোকদের হত্যা করেছেন। সে দিক থেকে শেখ হাসিনা অনেক বুদ্ধিমতী। তিনি পিতার শত্রুদের দলে টেনে নিয়ে নিজের অধীনে রেখে ব্যবহার করছেন। লোকে বলে তার ক্যাবিনেটের মূল মন্ত্রীরাই হচ্ছেন বাম ঘরানার লোক। এরাই তাকে বুদ্ধি দেয়।
বঙ্গবন্ধু সরাসরি প্রকাশ্যে একদল করে ভুল করেছিলেন। শেখ হাসিনা সে ভুল করছেন না। তিনি ঘোষণা দিয়ে একদলীয় শাসন চালু করে বাকশালের মতো দেশ চালাচ্ছেন। তার পিতা দমন করে বিরোধী দলকে ভীতসন্ত্রস্ত করে রেখেছিলেন। এখন শেখ হাসিনা বিরোধী দলের ওপর কঠোর দমননীতি চালাচ্ছেন। ২০১৩ সালে শত মানুষকে হত্যা করে বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপিয়েছেন। বিরোধী দলের রাজনীতি শুদ্ধ-কি-অশুদ্ধ বা ভুল কি না সে নিয়ে আলোচনা হতে পারে। বিরোধী দলকে সন্ত্রাসী বলে গালাগাল দেয়া ঠিক হচ্ছে কি না সে নিয়ে সব মহলেরই ভাবা দরকার। শেখ হাসিনাকে হয়তো কেউ বুদ্ধি দিয়েছেন যে, কঠোর দমননীতি অবলম্বন করলে বিরোধী মত ও দল আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে যাবে। এ ধরনের নীতি পাকিস্তানে আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, ভারতে ইন্দিরা গান্ধীও গ্রহণ করেছিলেন। আজ আর সেই পাকিস্তান নেই। দমননীতি দ্বারা যেকোনো দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন হয়। স্বৈর শাসকেরা এ বিষয়টি কখনোই বুঝতে চায় না। ইন্দিরা গান্ধীও সিভিল ডিক্টেটর ছিলেন। তিনি গণতন্ত্রের নাম নিয়ে দেশবাসীর সাথে প্রহসন করতেন। তারই দ্বৈতনীতির কারণে আজ কংগ্রেসের এমন করুণ অবস্থা হয়েছে। বাংলাদেশ আরব দেশ বা মিয়ানমার নয়। এ ধরনের দেশে গণতন্ত্র থাকে না, তাই সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রশ্নও আসে না। দমন নীতিকেই শাসকেরা ক্ষমতার উৎস বলে মনে করেই জনগণকে বাধ্য রাখে কিছুকালের জন্য।
আপনারা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অ্যাক্টের ইতিহাস পড়ুন। পাকিস্তান আমলে এমনকি আইয়ুবের আমলেও ডেপুটি কমিশনাররা পত্রিকার ডিক্লারেশন দিতে পারতেন। এখন তারা তা পারেন না। পত্রিকার ডিক্লারেশনের ব্যাপারে ডিসি অফিস শুধু পোস্ট অফিসের ভূমিকা পালন করেন। আমি নিজেই এ অভিজ্ঞতার অধিকারী। ওই অ্যাক্টের দাদা পরদাদা হলো ব্রিটিশ প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অ্যাক্ট। এখন পত্রিকা প্রকাশের অনুমতির জন্য প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত ছুটতে হয়। মাঝখানে থাকে এসবি, এনএসআই, ডিজিডিএফআই-সহ নানা ধরনের এজেন্সি। পত্রিকা প্রকাশের অনুমতি পাওয়া গেলেও আপনাকে সরকারি বিজ্ঞাপনের তালিকাভুক্ত করা হবে না। সে ক্ষেত্রেও নানা এজেন্সির ক্লিয়ারেন্স লাগে।
এখন তো অনলাইন পত্রিকা, সোস্যাল মিডিয়া, রেডিও, টেলিভিশন, ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার ইত্যাদি প্রকাশমাধ্যমকেও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। বহুকাল ধরেই পত্রিকাসহ বিভিন্ন প্রকাশমাধ্যম স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপ চালিয়ে যাচ্ছিল। সবাই মনে করে মতপ্রকাশের চেয়ে পত্রিকাকে বাঁচিয়ে রাখা অনেক বেশি জরুরি। আমার দেশ, দিগন্ত টেলিভিশন ও মাহমুদুর রহমান এর জ্বলন্ত উদাহরণ।
যেমন পুলিশ আইনের তেমন কোনো পরিবর্তন কিংবা সংস্কার আজো হয়নি। এ ব্যাপারে সব দলই এক রকম। ক্ষমতায় গেলে গণবিরোধী নিবর্তন কোনো আইনেরই সংস্কার হয় না। তখন সব দলইভাবে কিভাবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার কথা বলে নিজেদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করা যায়। চলমান সরকার ওই মনোভাবের কারণেই একটার পর একটা গণবিরোধী আইন করে চলেছে। তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে নতুন সম্প্রচার নীতিমালায়। নীতিমালা ঘোষণা করে সরকার তার মনের ভেতর পুষে রাখা গোপন মনোভাবকে প্রকাশ করে ফেলেছে। জগতের সব স্বেচ্ছাচারী (অটোক্রেট/ডিক্টেটর) সরকার বা শাসক হোক সিভিল অথবা সামরিক দমননীতির বা জুলুমের মাধ্যমেই জনগণকে অধিকারহীন করে রাখতে চায়। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমেই সরকার প্রমাণ করেছে জনমতের কোনো প্রয়োজন নেই বা জনমতকে তোয়াক্কা করার কোনো দরকার নেই। যেকোনোভাবেই হোক সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সিট বা সদস্যসংখ্যা থাকলেই যেকোনো সরকার যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারে এমন একটি ধারণা জনমনে ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। মিসরের মোবারক, ফিলিপাইনের মার্কোস, ইন্দোনেশিয়ার সুহার্তো, সিরিয়ার আসাদ তথাকথিত গণতন্ত্রের নমুনা। জেনারেল আইয়ুবও দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকার জন্য বেসিক ডেমোক্র্যাসি চালু করেছিলেন। তিনিই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের রাজনীতি থেকে নির্বাসনে দেয়ার জন্য এবডো বা প্রোডা আইন চালু করেছিলেন। মিসরের দিকে একবার তাকান, জেনারেল সিসি (লোকে বলে তিনি নাকি ইহুদি মায়ের সন্তান) নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজেই দেশের তথাকথিত নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। এই ভদ্রলোক এখন ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে ইসরাইলকে সমর্থন করছে। সৌদি বাদশাহও সিসিকে সমর্থন দিচ্ছেন। বাদশাহরা আরবে ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলা কৌশলে নিষিদ্ধ করেছেন।
বঙ্গকন্যা মহান শেখ হাসিনা যদি তার দৃষ্টিতে দেশের ভালোর জন্য এবডো, প্রোডা আইন করেন দেশবাসীর বলার কী আছে? গণতন্ত্রের হিসেবে সংখ্যাতত্ত্বের ভিত্তিতে মহান সংসদে তার এক শ’ ভাগ ক্ষমতা আছে। আমাদের দেশে এখন মহান শব্দটির ব্যবহার বেড়েই চলেছে। বলতে হবে মহান সংসদ, মহান বাহিনী, মহান আদালত, মহান রাষ্ট্রপতি, মহান বঙ্গমাতা, মহান বঙ্গপিতা, মহান বঙ্গভ্রাতা ও দেশবাসী চালু করতে পারেন। মুঘল বাদশাহরা, রোমের সিজাররা, মিসরের ফেরাউনরা নানা ধরনের সম্মানসূচক খেতাব ব্যবহার করতেন। ব্রিটিশ আমলেও এই নিয়ম ছিল। পাকিস্তান আমলেও ছিল। বাংলাদেশেও আছে। কয়েক দিন আগে এক ভদ্র বাঙালি মহান ভারত থেকে ‘পদ্মভূষণ’ খেতাব নিয়ে এসেছেন। বাঙালি বললাম এ কারণে যে, তিনি বাংলাদেশী হতে চান না। এখন বাংলাদেশের সব নাগরিকের পাসপোর্টে নাগরিকত্বের জায়গায় লেখা আছে বাংলাদেশী। কিন্তু সেমিনারে, আলোচনায়, প্রবন্ধ-নিবন্ধে তারা বাঙালিত্ব জাহির করতে চান। এমনকি আমাদের মহান প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির পাসপোর্টেও বাংলাদেশী লেখা রয়েছে। নিজেকে বাঙালি বলে জাহির করার এর পক্ষে তাদের যুক্তি বিজেপির হিন্দুত্ব বা হিন্দুত্বের মতো। আমি বহুবার বলেছি ভৌগোলিক কারণে আমাদের পরিচয় বাংলাদেশী। সংস্কৃতি সাহিত্যে ও ভাষার কারণে আমরা বাঙালি। জগতের ৩০ কোটি বাঙালি সবার স্বাধীন দেশ নেই। তাদের অনেকেই ভারতীয় বাঙালি, ভাষা হিন্দি, সংস্কৃতি ভারতীয় বাঙালিয়ানা, ধর্মীয়ভাবেও তারা সবাই বেদ উপনীষদ বা গীতায় বিশ্বাস করেন না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষিত একেবারেই আলাদা। এখানে ভাষা একটি। ৯০ ভাগ নাগরিকের ধর্মও এক। দশ ভাগ মানুষের ধর্ম হিন্দুয়ানি, খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ। আরো কিছু উপজাতিও আছে। এ দেশের সংস্কৃতি মুসলমান বা ইসলাম দ্বারা প্রভাবিত। আমার এ ব্যাখ্যার সাথে চলমান সরকারের দ্বিমত থাকতে পারে। কারণ তারা ভোট ছাড়া অন্য সব ইস্যুতে মাইনরিটিদের পক্ষে থাকে। তাই তারা মাঝে মধ্যেই বলেন, আমার নেত্রী নিয়মিত নামাজ পড়েন, রোজা রাখেন ও হজ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সব দেশেই সম্প্রচার নীতিমালা আছে। এমনকি সিএনএন, বিবিসি ও আলজাজিরারও সম্প্রচার নীতিমালা আছে। প্রধান মহান সত্য কথা বলেছেন। ওই সব নীতিমালার উদ্দেশ্য হলো মানুষের কথা বলা ও লেখার অধিকারকে রক্ষা করা। বাংলাদেশে সম্প্রচার নীতিমালার উদ্দেশ্য নাগরিকের অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে রাষ্ট্রের অধিকার রক্ষা করা। রাষ্ট্রকে ফেরাউন নমরুদে পরিণত করা। ফেরাউন নিজেকে খোদা বলে দাবি করত। ফেরাউনের আমলে দেশবাসী বা প্রজাদের কোনো অধিকার ছিল না। রাষ্ট্র যদি ফেরাউন হয় তাহলে তো নিজেকে সার্বভৌম খোদায়ি দাবি করতে পারে। আর আমরা রাষ্ট্রের ভয়ে তাকে সেজদা করব। তাই চলমান সরকার বা সংসদ এমন সব আইন তৈরি করছে যা জনগণকে সব সময় ভীতসন্ত্রস্ত রাখবে। একটা ভিতু জাতি কখনোই বিকশিত হতে পারে না। চলমান নতুন ও পুরাতন আইন বাংলাদেশকে মানসিকভাবে একটি পঙ্গু জাতির দেশে পরিণত করবে। মহান বন্ধু ভারতও চায় বাংলাদেশ তেমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হোক। সে জন্যই ভারত অন্ধভাবে মহান শেখ হাসিনা ও মহান আ’লীগকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তাই আমরা বলতেই পারি, জয় হিন্দ, জয় বাংলা, জয় আ’লীগ।
লেখক : কবি, ঐতিহ্য গবেষক

SHARE

Leave a Reply