সম্প্রীতি বজায় রাখতে প্রয়োজন শাসকগোষ্ঠীর উপলব্ধি -সালাহউদ্দীন আইউবী

সময় বদলায়। দিন বদলায়। বদলায় যুগের পর যুগ। কিন্তু ফেরাউন নমরুদ আর আবু জাহেলরা একই চরিত্রের থেকে যায়। যুগে যুগে জুলুমবাজ শাসকগণ তাদের অপকর্ম নিষ্কণ্টক ও নিরাপদ করতে সত্যের পথে যারা কথা বলেন, যারা ন্যায়ের পথে চলেন, যারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন তাদের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হন। আবহমানকাল থেকেই মহান আল্লাহ তায়ালার অমিয় বাণীতে যারা জীবনকে সাজাতে চেয়েছেন, সেই বাণীর আলোকে জীবনকে সাজিয়েছেন তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়েও ন্যায়ের পক্ষে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ছিলেন। তাদেরকে যখন কোনোভাবেই থামানো যায়নি তখনই কারারুদ্ধ করে তাদের বাণী স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
পবিত্র কুরআনে আমরা কারাগারের অস্তিত্ব পাই হযরত ইউসুফ (আ)-এর সময় থেকেই। এছাড়াও মুসা (আ)কে কারাগারে প্রেরণের হুমকি দিয়েছিল ফেরাউন। সূরা ইউসুফের ৩৩ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন- “ইউসুফ বললো, হে আমার রব! এরা আমাকে দিয়ে যে কাজ করাতে চাচ্ছে তার চাইতে কারাগারই আমার কাছে প্রিয়! আর যদি তুমি এদের চক্রান্ত থেকে আমাকে না বাঁচাও তাহলে আমি এদের ফাঁদে আটকে যাবো এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হবো।”
ইউসুফ (আ)কে অন্যায়ভাবে ৭ বছর কারাগারে আটকে রাখা হয়েছিল। তবে যখন সত্য উন্মোচিত হয়েছে তখন আল্লাহ তায়ালা ইউসুফ (আ)কে যথাযথ মর্যাদা দান করেছেন। সূরা আশ-শুয়ারার ২৯ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে- “ফেরাউন বললো, যদি তুমি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে মাবুদ বলে মেনে নাও, তাহলে কারাগারে যারা পচে মরছে তোমাকেও তাদের দলে ভিড়িয়ে দেবো।” ফেরাউন মুসা (আ)কে ধমক দিয়ে কারাগারে নিক্ষেপের হুমকি দিচ্ছে এমনকি সেখানে পচে মরতে হবে এই ঘোষণা দিচ্ছে। আবু জাহেল বাহিনী প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সা.কে শিয়াবে আবু তালিবে প্রায় তিন বছর কারারুদ্ধ করে রেখেছিল। খিলাফত পরবর্তী সময়ে অনেক মুসলিম নামধারী শাসক সত্যের পথে অবস্থানকারী অনেক আলেমকে কারারুদ্ধ করেছে। প্রবল দাপটধারী শাসক দ্বিতীয় আব্বাসী খলিফা আবু জাফর আব্দুল্লাহ ইবনে মানসুর ইমাম আবু হানিফা (রহ)কে প্রধান বিচারপতির পদ গ্রহণের প্রস্তাব দেন। তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে খলিফা ক্রোধে ফেটে পড়েন। ক্রুদ্ধ খলিফা ইমাম আবু হানিফা (রহ)কে কারাগারে পাঠিয়ে দেন। সেখানে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে পাঁচ বছর আবদ্ধ থেকে কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

খলিফা আল মনসুর ইমাম সাদিক (রহ)কেও কারাবন্দি করেছিলেন এবং সেখানেই তাকে বিষপানে হত্যা করা হয়েছিলো। ইমাম মালেক ইবনে আনাস (রহ)ও একইভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। খলিফা মনসুরের ভ্রান্ত ফতোয়ার সমর্থন না করায় তাঁকে গ্রেফতার করে জনসম্মুখে চাবুক মারা হয়েছিল।
আব্বাসীয় খলিফা আল মামুন একান্ত মতবাদ উদ্ভাবন করেছিলেন। ইমাম আহমদ (রহ) এই মতবাদের বিরোধিতা করায় তাকে কারাগারে বন্দি করা হয়েছিল। সেখানে খলিফা মুতাসিম বিল্লাহ ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ)কে বিবস্ত্র করে চাবুক দিয়ে বেত্রাঘাত করেন। এমনকি তিনি চাবুকের আঘাতে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এই অবস্থায় খলিফা তাকে ছেড়ে দেন এই ভয়ে যে তিনি যে কোনো সময় মৃত্যুবরণ করতে পারেন। এই সময়টা ছিল রমজান মাস। আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ) রোজা রেখেছিলেন তাঁকে অর্ধমৃত অবস্থায় ইসহাক ইবনে ইবরাহিমের ঘরে নিয়ে আসা হয়। জ্ঞান ফিরলে তাঁকে বলা হয় আপনার শরীর থেকে প্রচুর রক্ত ঝরছে, আপনি রোজা ভেঙে ফেলুন। কিন্তু এ অবস্থায় আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ) জোহর আদায় করেন এবং বলেন হযরত ওমর ফারুক রা. আহত অবস্থায় নামাজ পড়েছিলেন।
তিনি সন্ধ্যায় ইফতার করেন এবং সেই জল্লাদদের ক্ষমা করে দেন কিন্তু মানুষকে গোমরাহকারী দরবারি আলেমদের ক্ষমা করেননি। তাঁর জানাজায় লাখো মানুষের ঢল নামে। সে জানাজা দেখে হাজার হাজার খ্রিষ্টান মুসলমান হয়ে যায়।

ইসলামের ইতিহাসে কারাবন্দি আলেমদের অন্যতম হলেন, ‘সাইয়িদুত তাবেয়িন’ বা তাবেয়িদের সর্দার হিসেবে খ্যাত সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব (রহ)। তিনি মদিনার সাত ফকিহের অন্যতম ও প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ছিলেন। ৮৪ হিজরিতে খলিফা আবদুল মালিক নিজের দুই পুত্র ওয়ালিদ ও সুলাইমানকে পরবর্তী খলিফা হিসেবে নিযুক্ত করেন। উভয়ের জন্য সবার কাছ থেকে বাইয়াত আহ্বান করেন। সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব উভয়ের জন্য বাইয়াত করতে অস্বীকৃতি জানান। কেননা একই সঙ্গে দুজনের হাতে আনুগত্যের শপথ নেয়ার কোনো বিধান ইসলামে নেই। তাঁর সিদ্ধান্তের ফলে শাসকগোষ্ঠী ক্ষুব্ধ হয়। মদিনার তৎকালীন গভর্নর হিশাম বিন ইসমাইল তাঁকে ৬০টি বেত্রাঘাত করেন এবং কারাগারে বন্দি করে রাখেন। এছাড়া সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িবের কন্যার জন্য খলিফা আবদুল মালিক নিজের পুত্রের বিয়ের প্রস্তাব দেন। তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং কুরাইশ বংশের একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেন। খলিফা এতে তাঁর ওপর আরো ক্রুদ্ধ হন এবং কারারুদ্ধ করার নির্দেশ দেন।
বর্তমান উজবেকিস্তানের ফারাগানার শাসক এক দাসীকে মুক্ত করেন। কিন্তু দাসীর ইদ্দত (নিষিদ্ধ সময়) শেষ না হতেই শাসক তাকে বিয়ে করেন। হানাফি মাজহাবের প্রখ্যাত ইমাম শামসুল আইম্মাহ মুহাম্মাদ বিন আহমাদ সারাখসি (রহ) ওই শাসকের বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম ঘোষণা করেন। এ খবর শুনে শাসক তাঁকে ১৫ বছর কারাগারের অন্ধকার কূপে বন্দি করে রাখেন।
হিজরি সপ্তম শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ আলেম শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ) শাম ও মিসরে বিভিন্ন সময়ে সর্বমোট সাতবার কারাবন্দি হন। বিভিন্ন ফতোয়া ও মাসয়ালার কারণে হিংসা ও বিদ্বেষের শিকার হয়ে তাঁকে বন্দি করা হয়। জীবনের পাঁচ বছরের বেশি সময় কারাগারে কাটিয়েছেন।
উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা মওদুদী (রহ)কে কয়েকবার কারারুদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি তার বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা তাকে ফাঁসির কাষ্ঠ থেকে বাঁচিয়েছেন।

জালিম শাসকদের জুলুমের এই ধারাবাহিকতা এখনো অব্যাহত। আজ প্রায় একযুগ হতে বসেছে বিশ্বনন্দিত দায়ী কোরআনের পাখি আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে কারাগারে রাখা হয়েছে। কারাগারে থাকা অবস্থাতেই মুহতারামের সম্মানিত আত্মীয়-স্বজনসহ অনেক শুভাকাক্সক্ষী দুনিয়া থেকে চলে গেছেন।
ধারণা করা হয়েছিল এক আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে আটকে রেখে ইসলামের কণ্ঠস্বর চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়া যাবে। কিন্তু ঘটনা ঘটল তার উল্টো। মাওলানা সাঈদী সাহেবের শূন্যতা পূরণে আল্লাহ তায়ালা এই ময়দান থেকেই ইসলামের পথে কথা বলার জন্য, অন্যায়ের বিরুদ্ধে জাগ্রত কণ্ঠ হিসেবে তৈরি করে দিলেন শত শত আলেমে দ্বীন। জুলুমবাজ শাসকগোষ্ঠীর ঘুম হারাম হয়ে গেল। যখনই কোনো আলেম ইসলামের পক্ষে কথা বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাজপথে স্লোগান দেন, ন্যায়ের পক্ষে জীবন বাজি রেখে অবস্থান নেন তখন সরকার ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। ৯০ ভাগ মুসলিম জনগোষ্ঠীর এই প্রিয় বাংলাদেশে শুরু হয় নমরুদ, ফেরাউন আর আবু জাহেলের সেই ষড়যন্ত্র। আটকে দেওয়া হয় সত্যের মিছিল। গুলি করে শহীদ করা হয় অসংখ্য মর্দে মুমিনকে। তাতেও থামে না কুরআনের প্রচারক আলেম-ওলামাদের কণ্ঠস্বর। একটুও ভীত হন না তাঁরা। বরং শহীদের রক্তে উজ্জীবিত হয়ে নব চেতনায় জাগ্রত করে আগামী প্রজন্মকে। ক্ষমতার মসনদে বসে থাকা হায়েনাদের কাঁপিয়ে তোলে তাদের হুঙ্কারে। থর থর করে কাঁপতে থাকা তলাবিহীন এই জুলুমবাজ শাসকগোষ্ঠী তাদের সকল কূটকৌশল প্রয়োগ করেও ব্যর্থ হয়। তাদের হাতে বাকি থাকে একটাই পথ। এই অন্যায় আর জুলুমের পথকে নিষ্কণ্টক করতে এক এক করে গ্রেফতার করতে থাকে বাংলাদেশের বরেণ্য আলেমদের। যাদেরকে গ্রেফতার করার সাহস দেখায়নি তাদের কাউকে করা হয় গুম আবার কাউকে করা হয় দেশছাড়া।

তাগুতের দোসর এই গোষ্ঠী আলেম-ওলামাদেরকে কারাগারে রেখে মাঠে নামে তাদের এজেন্ডা নিয়ে। নানা কৌশলে ফাটল ধরায় ইসলামপন্থী ও আলেম-ওলামাদের মাঝে। সুযোগ বুঝে আওয়াজ তোলে বাংলাদেশ থেকে ইসলামের নাম-নিশানা মুছে দেয়ার। রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে সংবিধান থেকে বাদ দেয়ার কথা বলতে থাকে প্রকাশ্যে। অন্যদিকে বিশ্বমানবতার হিদায়াত গ্রন্থ আল কুরআনকে অপমান করতে অবলম্বন করা হয় ঘৃণিত কৌশল। ফায়দা লুটার জন্য পার্শ্ববর্তী দেশের দাদা বাবুরাও এগিয়ে আসে। শাসকগোষ্ঠীর মদদে শুরু হয় দুর্বল অসহায়দের উপর অত্যাচার। ভাঙচুর করা হয় উপাসনালয়, আগুন দেয়া হয় বাড়িঘরে। বন্ধ করে রাখা হয় মিডিয়ার মুখ। মানুষ তাকিয়ে থাকে আলেম সমাজের দিকে। কেউ জেগে না উঠুক, কেউ কথা না বলুক, কেউ ন্যায়ের পথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে না নামুক, তবুও দেশবাসীর একটাই প্রত্যাশা আলেমসমাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলবেই।
কিন্তু কে বলবে? আছে কি সাহসী সেই অন্যায়ের প্রতিবাদকারী আলেমসমাজের প্রতিনিধিরা। তাঁদের প্রায় সবাইকে আটকে রাখা হয়েছে কারাগারে। কেউ কেউ সরকারের তোষামোদ করে একটু বলার চেষ্টা করলেও থামিয়ে দেয়া হয়েছে তাদের। সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি আশাবাদী যে আলেমসমাজকে নিয়ে তাদেরকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে এই পথ থেকে।
বাংলাদেশের মানুষ জানতে চায় অমুসলিম বন্ধুদের সাথে কিভাবে আচরণ করবে। মন্দির, গির্জা আর প্যাগোডায় যখন আক্রমণ হয় তখন তাঁরা কোন পথ অবলম্বন করবে। আর সেই জানানোর দায়িত্ব যাদের তাদেরকেইতো রাখা হয়েছে কারাগারে আটক করে।
লেখক : গবেষক, প্রাবন্ধিক ও ছাত্রনেতা

SHARE

Leave a Reply