সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই বাস্তবতা উপলব্ধি প্রয়োজন

বাংলাদেশে এখন অনেকেই ভাবতে শুরু করেছেন সরকারের মেয়াদ শেষে নির্বাচন না হলে কী হবে? দেশের চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সরকারপক্ষের বিপর্যয়ের পর প্রধানমন্ত্রীর সংসদে রাখা বক্তব্যে এ বিষয়টি আরো বেশি আলোচিত হচ্ছে। বাংলাদেশের সংবিধানে একমাত্র নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তনের ব্যবস্থার কথা বলা আছে। এর বাইরে কিছু হলে সেটি সংবিধানের কোনো বিধান মতে যে হবে না তাতে সন্দেহ নেই। সংসদের মেয়াদ শেষে আরো মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি কেবল দেশ কোনো যুদ্ধপরিস্থিতিতে জড়িয়ে গেলেই সম্ভব হয়। এর বিকল্প হতে পারে সংবিধানের বাইরের কোনো ব্যবস্থা। আদালতের পরিভাষায় ডকট্রিন অব নেসেসিটি। অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা পরিবর্তনের পর এটিকে আইনি কাঠামোয় নিয়ে আসতে এটি বিচার বিভাগের একধরনের আবিষ্কার।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর সংবিধানের যে সংস্করণ প্রকাশ করা হয়, তার সাথে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হওয়ার পর সংবিধানের যে সংস্করণ তার সাথে বহু ক্ষেত্রেই গরমিল রয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রের সংশোধনের এখতিয়ার কার অথবা বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারবে, এ বিষয়টি অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞপর্যায়ের যে বিতর্ক, তার পরিবেশও এখন রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন না। বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে অসচ্ছল লোকেরা পুরনো কাপড়ে তালি দিয়ে আরো কিছু দিন পরার চেষ্টা করে। কিন্তু একটি পর্যায়ে সে কাপড় তালি দিয়েও আর পরার অবস্থায় থাকে না। বাংলাদেশের সংবিধানে ছেদ-ব্যবচ্ছেদ এত বেশি হয়েছে যে, এটি ক্রমান্বয়ে পরিশীলিত হওয়ার পরিবর্তে যেন পরস্পরবিরোধী অনুচ্ছেদে একেবারেই অমসৃণ হয়ে পড়ছে। আর এ ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ‘জুডিশিয়াল অ্যাকটিভিজম’।
বাংলাদেশের রাজনীতির ক্রান্তিকাল যেন এখন ক্রমেই এগিয়ে আসছে। এ ধরনের ক্রান্তিকালে দেশী-বিদেশী নানা পক্ষ সক্রিয় হয়ে ওঠে। সব পক্ষই যে এ দেশের কল্যাণ চাইবে এমনটি নয়। মতিঝিলে হেফাজতের সমাবেশের রক্তক্ষয়ী দমনের পরামর্শ দিয়ে যারা স্বস্তি অনুভব করেছিলেন, তারা চার সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের পর স্বস্তিতে নেই। বিদেশের কারো করুণা পেতে গিয়ে দেশের মানুষের আস্থা হারানোর সঙ্কট যে এখন সরকারি দলের সামনে হাজির হয়েছে, তা তৃণমূলের আওয়ামী লীগ নেতারা তীব্রভাবে অনুভব করছেন। ভিন্ন দলের নেতাদের ফাঁসিতে ঝুলানো বা রাজনীতি নিষিদ্ধ করার আয়োজন যাদের পরামর্শে নেয়া হোক না কেন, তারা আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে তৃণমূল নেতারা মনে করছেন। গণতান্ত্রিক রাজনীতির মধ্য দিয়ে শক্তি অর্জন করা আওয়ামী লীগ নির্মূলের রাজনীতির ফাঁদে পা দিতে গিয়ে কী অর্জন হয়েছে, সে হিসাব এখন অনেকেই করছেন। যারা এ পথে আওয়ামী লীগকে ঠেলে দিয়েছেন, তারা ক্ষমতার স্বাদ নেয়ার পর এখন বলতে শুরু করেছেন আওয়ামী লীগের ব্যর্থতার দায় তারা নেবেন না। বাস্তবতা উপলব্ধি প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই করবেন।
অন্যদিকে দেশের সাধারণ মানুষ যাদের হাতেই মূলত দেশের উন্নয়ন ও ক্ষমতার পালাবদল নির্ভর করে তারা নিজেদের অধিকার ও আত্মমর্যাদার দাবিতে এখনই সোচ্চার হতে হবে। যত দ্রুত তা করা যাবে ততই দেশ ও দশের মঙ্গল।

SHARE

Leave a Reply