সময়, শ্রম ও বাস্তবতা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ -মো: কামরুজ্জামান (বাবলু)

বাংলায় একটি প্রবাদবাক্য রয়েছে- “সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়”। এই প্রবাদটির মধ্যে শ্রম ও সময় এবং এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের একটি অসাধারণ মানদণ্ড তুলে ধরা হয়েছে। তবে আমরা সচরাচর মানুষকে কাজের প্রতি আগ্রহী করার জন্য আরেকটি প্রবাদ বাক্যের আশ্রয় নিয়ে থাকি। আর সেটি হলো- “পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি”। অর্থাৎ জীবনে সফল হতে হলে পরিশ্রম করতে হবে। পৃথিবীর বুকে যারাই নিজ কর্মে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়েছেন এবং ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছেন তাদের একজনও এমন খুঁজে পাওয়া যায় না যিনি ব্যক্তিজীবনে কঠোর পরিশ্রমী ছিলেন না। ওপরের দুটো প্রবাদ বাক্যকে একসাথে বিবেচনায় নিয়ে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হলে যা দাঁড়ায় তা হলো- কোনো মুহূর্তকেই হেলায় নষ্ট না করে সর্বদা পরিশ্রম করে যেতে হবে। যখন মন চাইবে পরিশ্রম করবো, আবার যখন মন চাইবে না অলস সময় কাটাবো- এটা কখনো সফল জীবনের সহায়ক নয়। তার মানে হলো পরিশ্রমকে যেমন মূল্য দিতে হবে, তেমনি সময়কেও মূল্য দিতে হবে, অর্থাৎ সময়ের কাজ সময়ে করতে হবে।
আর এর সাথে ইসলাম ধর্ম জুড়ে দিয়েছে এমনই এক বিধান যা পুরো বিষয়টিকে একদিকে করেছে সৌন্দর্যমণ্ডিত, অপরদিকে করেছে শান্তি ও স্বস্তিদায়ক। মহান আল্লাহর মনোনীত একমাত্র ধর্ম ইসলামের সেই বিষয়টি হলো তাকদির বা ভাগ্য তথা আল্লাহ প্রদত্ত ফায়সালার আলোকে জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলিকে অবশ্যম্ভাবী হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয়া। অর্থাৎ ইসলামের আলোকে একজন মুসলমান মনে করেন জীবনে সফলতার জন্য তাকে কঠোর পরিশ্রমী হতে হবে তথা শ্রমের মূল্য দিতে হবে এবং সময়ের কাজ সময়ে করতে হবে। তবে এর মধ্য দিয়ে যতটুকু অর্জন করা সম্ভব হবে তাতেই তিনি মনেপ্রাণে সন্তুষ্ট থাকবেন।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “(হে নবী) তুমি বলো, হে রাজাধিরাজ (মহান আল্লাহ) তুমি যাকে ইচ্ছা সাম্রাজ্য দান করো এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নাও এবং যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করো, আর যাকে ইচ্ছা অপমানে পতিত করো। তোমারই হাতে রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয়ই তুমি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাশীল। তুমি রাতকে দিনের ভেতরে প্রবেশ করাও এবং দিনকে রাতের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে দাও। আর তুমিই জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করে আনো এবং মৃতকে জীবিতের ভেতর থেকে বের করো। আর তুমিই যাকে ইচ্ছা বেহিসাব রিজিক দান করো।”র
তবে, এর মানে কখনোই এটা নয় যে ইসলাম ভাগ্যের ওপর সবকিছু ছেড়ে দিয়ে পরিশ্রম না করার জন্য উৎসাহিত করছে। মোটেই তা নয়; বরং এটাই ইসলামের বাড়তি সৌন্দর্য, স্বস্তি ও শাশ্বত শান্তির উপায়। একজন নাস্তিক বা অমুসলিম যখন কঠোর পরিশ্রম করে কোনো কিছু পেতে ব্যর্থ হন তখন তিনি প্রচণ্ডভাবে হতাশ হয়ে পড়েন। বিশেষ করে যখন দেখতে পান যে তার মতো অথবা তার চেয়েও কম পরিশ্রম করে অনায়াসেই আরেকজন সেটা অর্জন করেছেন। এটা হরহামেশাই হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে একজন মুসলমানের জীবনই কেবল ব্যতিক্রমধর্মী। কারণ একজন প্রকৃত মুসলমান এমন পরিস্থিতিতে মোটেই হতাশ না হয়ে ধরে নেন হয়তোবা এটাই আল্লাহ তার জন্য ভালো মনে করেছেন, তাই যতটুকু অর্জন করা সম্ভব হয়েছে তাই যথেষ্ট, আর আল্লাহ তো পরকালে এর চেয়ে বহুগুণ বেশি প্রদান করবেন। এভাবেই একজন প্রকৃত মুসলমান সর্বাবস্থায় সামান্যতম বিচলিত না হয়ে সন্তুষ্টচিত্তে কাজের ময়দানে সক্রিয় থাকেন।

সহজ উদাহরণ
বিষয়টি পরিষ্কার করতে কয়েকটি সহজ উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। বিগত ২০১৬ সালে বিশ্বের এই মুহূর্তেই এক নাম্বার পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে কট্টরপন্থী রিপাবলিকান প্রার্থী এবং অনেকটাই বেসামাল প্রকৃতির ধনকুবের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। নিশ্চয়ই ২০১৬ সালের ওই নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্র বা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য আরো অনেকেই বহুদিন আগে থেকে মনে প্রাণে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আর তাদের মধ্যে শিক্ষা-দীক্ষা, যোগ্যতা ও জ্ঞানে অনেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু শেষমেশ ট্রাম্পই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। এটাই হলো তাকদির। একই বাসে অনেকে যাচ্ছিলেন, পথে বাস দুর্ঘটনায় এক ব্যক্তি নিহত হলেন এবং তার পাশের সিটের অপর ব্যক্তির কিছুই হলো না, প্লেন দুর্ঘটনায় পাশাপাশি সিটে বসা দু’জনের একজন নিহত হলেন, আরেকজন বেঁচে গেলেন, লঞ্চডুবিতে ভালো সাঁতার জানা অনেকেই মারা গেলেন সাঁতার না জানা কেউ কেউ অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেন, একই আলো বাতাস ও পরিবেশে বসবাস করছেন অনেকের মধ্যে হঠাৎ একজন মারা গেলেন, একই বাবা-মায়ের সন্তান একই যতেœ বেড়ে উঠছেন অথচ একেকজন একেক বিষয়ে দক্ষ, একেক জনের চিন্তা ও রুচি একেক রকম। এভাবে, হাজারো উদাহরণ দেয়া যেতে পারে যার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। এতে পরিষ্কার বোঝা যায়- সবকিছুর পরও তাকদিরের একটি বিষয় রয়েছে, মহান সৃষ্টিকর্তার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
এখানে প্রশ্ন আসতে পারে, কই তাহলে তো কোনো কিছু না পেলে নাস্তিকরা সব কিছু ওলটপালট করে দিতেন। কিন্তু আমরা তো তা দেখি না। বাস্তবতা হলো অনেক সময়ই অনেক কিছু দেখা যায় না। ব্যর্থ নাস্তিক কিংবা তাকদিরে অবিশ্বাসীরা হয়তোবা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানোর সুযোগ পান না। কিন্তু সত্যিকার অর্থে একজন বিশ্বাসী মুসলমান যেভাবে সর্বাবস্থায় এক প্রশান্ত আত্মা নিয়ে সময় পার করেন, তা নাস্তিক বা অবিশ্বাসীদের পক্ষে অনেকাংশে অসম্ভব। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “পার্থিব জীবন খেলাধুলা, (হাসি) তামাশা, জাঁকজমক (প্রদর্শন), পরস্পর অহংকার প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা, ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়ানোর চেষ্টা সাধনা ছাড়া আর কিছুই নয়।”রর পবিত্র কুরআনে আরো বলা হয়েছে- “এ পার্থিব জীবন তো খেল-তামাশা ছাড়া কিছুই নয়। আর পারলৌকিক জীবনই তো প্রকৃত জীবন; যদি ওরা জানতো। ”ররর ইসলামের এই বাণীগুলো একজন বিশ্বাসী মুসলমানকে সর্বাবস্থায় যে ধীর-স্থিরতা দান করে যা লাভ করা একজন অমুসলিম কিংবা নাস্তিকের পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। হতাশা আর মানসিক অশান্তিতে সর্বক্ষণ ভুগতে থাকেন নাস্তিকরা- সেটা তারা মুখ ফুটে প্রকাশ করুক আর না করুক। অবশ্য দু-একটি ব্যতিক্রম ঘটনা থাকতে পারে। কিন্তু ব্যতিক্রম কখনো উদাহরণ হতে পারে না।

ইসলামে শ্রমের তাগিদ
এবার দেখা যাক, সকল অবস্থায় আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীল ও তাকদিরের প্রতি আস্থা থাকা সত্ত্বেও ইসলাম পরিশ্রমের প্রতি মানুষকে কতটা তাগিদ দিয়েছে এবং শ্রমের প্রতি ইসলাম কতটা শ্রদ্ধাশীল। বুখারি শরিফের এক হাদিসে বর্ণিত আছে, “মেকদাম (রা:) বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কারও জন্য স্বহস্তে উপার্জিত অর্থে কেনা খাবার অপেক্ষা উত্তম খাদ্যবস্তু আর কিছু হতে পারে না। আল্লাহ তায়ালার পয়গম্বর দাউদ (আ:) নিজ হাতে উপার্জন দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করতেন।”রা পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ আরো বলেন, “সালাত সমাপ্ত হলে জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং (কাজ ও শ্রম দানের মাধ্যমে) আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা, অর্থ-সম্পদ) সন্ধান (সংগ্রহ) করো, আর আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো। আশা করা যায় তোমরা কল্যাণ লাভ করবে। এ ছাড়াও কুরআনে বলা হয়েছে, “(হে মানুষ!) আমরা পৃথিবীতে তোমাদের কর্তৃত্ব দান করেছি এবং সেখানেই রেখে দিয়েছি তোমাদের জীবনের উপকরণ (অর্থাৎ পৃথিবীর বুকেই তোমরা জীবিকার সন্ধান ও সংগ্রহ করো)।
একইভাবে কুরআন ও হাদিসের বহু স্থানে পরিশ্রম করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। প্রকৃত অর্থে- মানুষ তেমনটিই দুনিয়া ও পরকালে লাভ করে থাকেন যেমনটি সে কর্ম করবে। আল্লাহ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় পবিত্র কুরআনে বলে দিয়েছেন, যে পরিশ্রম করবে না, চেষ্টা সাধনা করবে না- আল্লাহ কখনো তাকে সফলতা দেবেন না। এটাই আল্লাহর নীতি। দুনিয়াতে যারা যত বেশি পরিশ্রমী তারা তত বেশি উন্নতি সাধন করে। এ ক্ষেত্রে কে কতটা পাপ করলো আর পাপ করলো না সেটা মুখ্য নয়, কারণ পাপের আসল বিচার হবে পরকালে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “এটা ঠিক আল্লাহর এ রীতি অনুযায়ী হয়েছে, যে রীতি অনুযায়ী তিনি কোনো জাতিকে কোনো নিয়ামত দান করে ততক্ষণ পর্যন্ত তার মধ্যে কোনো পরিবর্তন সাধন করেন না যতক্ষণ না সেই জাতি নিজেই নিজের কর্মনীতির পরিবর্তন সাধন করে? আল্লাহ সবকিছু শুনেন ও সবকিছু জানেন?
শ্রম ও কর্মের মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে সফলতা অর্জন করতে গিয়ে অনেকেই আবার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। ইতিহাসসচেতন সবাই জানেন আমেরিকার অবকাঠামোগত উন্নতির মূলে কী ভয়াবহ নির্যাতনের ইতিহাস রয়েছে। হাজার হাজার আফ্রিকান নিগ্রোকে বছরের পর বছর পশুর মতো খাটিয়ে সেখানে অবকাঠামোগত উন্নতি সাধন করা হয়েছে। দুই স্তর, এমনকি তিনস্তরের পাতাল ট্রেন লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। সেই সফলতার মূলে রয়েছে হাজারো অসহায় নিগ্রোর বঞ্চনার ইতিহাস। প্রায় একই চিত্র দেখা যায় পৃথিবীর সর্বত্র। অধিকাংশ উন্নতি ও সফলতার পেছনের ইতিহাস বড়ই নির্মম। বহির্বিশ্ব থেকে দৃষ্টি দেশের প্রতি নিবন্ধ করলে সেখানেও প্রায় একই চিত্র দেখা যায়। আজকে যারা বড় বড় শিল্পপতি ও ভূ-সম্পত্তির মালিক তাদের প্রায় সবাই তাদের বিত্তবৈভব গড়ে তুলেছেন অন্য মানুষকে বঞ্চিত করে। যারা তাদের রক্ত পানি করে এই সম্পদ অর্জনে সহায়তা করেছেন তারাই চরম বঞ্চনার শিকার হয়েছেন।

ইসলামের শ্রমনীতি
কিন্তু এ ক্ষেত্রেও ইসলামের শ্রমনীতি বড়ই মধুর। ইসলাম নির্যাতনমূলক সকল পন্থাকে সরাসরি হারাম ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি শ্রমিককে তার ন্যায্যমূল্য ঘাম শুকানোর আগেই পরিশোধের তাগিদ দিয়েছে। শ্রমিকের ন্যায্য প্রাপ্য মজুরি পরিশোধের বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “শ্রমিকের শরীরের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।” (ইবনে মাজাহ) কাজ সম্পাদন করামাত্রই শ্রমিককে তার প্রাপ্য পারিশ্রমিক প্রদান করা মালিকের সর্বপ্রধান দায়িত্ব। এ ব্যাপারে ইসলামের প্রথম কাজ হলো, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি প্রদান। রাসূল (সা) বলেছেন, “শ্রমিকের পারিশ্রমিক নির্ধারণ না করে তাকে কাজে নিযুক্ত করবে না।” (বুখারি, বায়হাকি) রাসূল (সা) আরো বলেছেন, “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিযোগ উত্থাপন করবেন। তার মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তি হচ্ছেন, যে ব্যক্তি কাউকে শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ করে তার দ্বারা পূর্ণ কাজ আদায় করা সত্ত্বেও তাকে পারিশ্রমিক প্রদান করেন না।” (বুখারি, দ্বিতীয় খন্ড)
নিজের স্বার্থ আদায়ে মানুষ নানা কূটচালের আশ্রয় নিয়ে থাকে। অনেক সময় অপরের সম্পদ গ্রাস করার উদ্দেশ্যে ক্ষমতাসীনদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলা হয়। দীর্ঘ কষ্ট ও শ্রমে তিলে তিলে গড়ে তোলা অপরের ধন-সম্পদ লুট করা হয়। মহান আল্লাহ এই কাজ না করতে জোর নির্দেশনা দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা নিজেদের মধ্যে অবৈধ পন্থায় একে অপরের অর্থসম্পদ খেয়ো না এবং সেগুলো শাসকদের সামনেও এমন কোনো উদ্দেশ্যে উত্থাপন করো না, যাতে করে তোমরা জেনে বুঝে পরের সম্পদের কিছু অংশ খাওয়ার সুযোগ পাও।
এ ধরনের শঠতা ও ঠগবাজির কোনো স্থান ইসলামে নেই। ইসলাম সব সময়ই বৈধ পন্থায় ব্যবসা-বাণিজ্য করাকে উৎসাহ প্রদান করে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অপরের অর্থসম্পদ অন্যায় অবৈধ উপায়ে খেয়ো না। তবে পারস্পরিক ইচ্ছা ও সন্তুষ্টির ভিত্তিতে ব্যবসা করলে ভিন্ন কথা।”রী আবার ব্যবসা বাণিজ্য করতে গিয়ে কিংবা লেনদেন ও ভাগ-বাটোয়ারার সময় অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ তার কাছের লোকদের দ্বারাই প্রতারণার শিকার হন। মহান আল্লাহ চমৎকারভাবে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “যারা ওজনে কম দেয় তাদের জন্য ধ্বংস। তারা যখন লোকদের কাছ থেকে কিছু মেপে নেয়, তখন পুরোপুরি নেয়। আর যখন তাদের মেপে বা ওজন করে দেয় তখন কম করে দেয়। তারা কি ভেবে দেখে না, তারা সেই কঠিন দিনে পুনরুত্থিত হবে, যেদিন সকল মানুষ স্বীয় প্রতিপালকের সম্মুখে দণ্ডায়মান হবে। পবিত্র কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে, “যারা অন্যায়ভাবে এতিমের অর্থ-সম্পদ ও সহায় সম্পত্তি ভোগ দখল করে, তারা মূলত আগুন দিয়ে নিজেদের উদর ভর্তি করে। অচিরেই তাদের পোড়ানো হবে জ্বলন্ত আগুনে।

দারুণ ফর্মুলা
সত্যিই আল্লাহ ঘোষিত একমাত্র সত্য ধর্ম ইসলামের বিধানগুলো বড়ই মনোমুগ্ধকর। একজন খাঁটি মুসলমান কাউকে না ঠকিয়ে বা কারো সাথে শঠতার আশ্রয় না নিয়ে এবং কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে জীবনে সফলতা অর্জন করবেন এবং কোনো কারণে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে না পৌঁছালে কারো প্রতি বিরূপ হবেন না কিংবা মানসিক কষ্টেও ভুগবেন না। কী চমৎকার! শুধু তাই নয়, এভাবে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সে যা অর্জন করবেন তা আবার পশ্চিমা জগতের পুঁজিবাদের ধারক-বাহকদের মতো কুক্ষিগত করে রাখবেন না। সেই অর্থ দেশের কল্যাণে, গরিব মানুষের কল্যাণে এবং অসহায় আত্মীয় স্বজনের স্বার্থে ব্যয় করবেন। কিন্তু এতে তিনি মোটেই নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত বলে মনে করবেন না। কারণ এর বিনিময়ে তিনি পরকালের অনন্ত জীবনে সফলতা লাভ করবেন। পৃথিবীর জীবনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অর্থ-সম্পদের সুষম বণ্টনের কী এক দারুণ ফর্মুলা!
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “এই সাদাকা (জাকাত) নির্দিষ্ট করে দেয়া হলো ফকিরদের জন্য, মিসকিনদের জন্যে, সাদাকা আদায়-বন্টন বিভাগের কর্মচারীদের জন্য, তাদের জন্য (ইসলামের পক্ষে) যাদের মন আকৃষ্ট করা উদ্দেশ্য হবে, দাসমুক্তির জন্য, ঋণে নিমজ্জিতদের সাহায্যের জন্য, আল্লাহর পথে এবং পথিকদের সাহায্যের জন্য। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আরোপিত একটি ফরজ। পবিত্র কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে, “আত্মীয়স্বজনকে তাদের প্রাপ্য দাও এবং অভাবী ও পথিকদের দাও তাদের প্রাপ্য। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই অপব্যয় করো না। কারণ অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর অপরের কল্যাণে সম্পদ ব্যয়ে যে লস নেই সেই প্রসঙ্গে কুরআনে বলা হয়েছে, “যারা আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ ব্যয় করে তার উদাহরণ হচ্ছে সেই বীজের মত যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়। আর প্রতিটি শীষে একশতটি করে দানা থাকে। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অতিরিক্ত দান করেন। আল্লাহ সুপ্রশস্ত সুবিজ্ঞ।
শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণের দোহাই দিয়ে পৃথিবীতে সমাজতন্ত্র থেকে শুরু করে যত মতাদর্শই আসুক না কেন শেষমেশ তার সবই ভোগবাদ ও জুলুমবাজিতে পরিণত হয়েছে। মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্যকে বিবেচনায় নিয়ে একটি শান্তিময় ও সুশৃঙ্খল শ্রমনীতির কথা বলা হয়েছে শুধুমাত্র ইসলাম ধর্মে। আজ গোটা পৃথিবীজুড়ে এটা প্রমাণিত। বিষয়টি হৃদয় থেকে উপলব্ধি করার জন্য শুধু এই তথ্যই যথেষ্ট যে প্রতি বছর পৃথিবীজুড়ে প্রায় ১০ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করছেন- এদের সিংহভাগই অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল দেশের বাসিন্দা। শুধুমাত্র জাপানেই প্রতি বছর ২০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করছেন- তবে, গণতন্ত্রের লেবাসে একনায়কতান্ত্রিকভাবে শাসিত বাংলাদেশে অপশাসনের বিস্তৃতি এবং শোষণ ও বঞ্চনার পটভূমিতে পরিস্থিতি দিনকে দিন খারাপ হচ্ছে। গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান “বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ”-এর ২০১৩ সালের এক জরিপে দেখা যায় বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ১০ হাজার লোক আত্মহত্যা করেন-
এভাবে, নানা মানদণ্ডে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, চেষ্টা-সাধনা ও শ্রমের মাধ্যমে একইসাথে শারীরিক ও মানসিকভাবে সফলতা অর্জনের ক্ষেত্রে এবং নিজের সফলতার সঙ্গে সঙ্গে গোটা মানবজাতিকে সুসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সফলতার দিকে এগিয়ে নিতে ইসলামী জীবন বিধানের কোনো বিকল্প নেই। কারণ অন্য কোনো মতাদর্শ কিংবা পদ্ধতিতে শ্রমের ন্যায্যমূল্য প্রদানের ব্যাপারে মৌখিক স্বীকৃতি দেয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রেই কার্যত দেখা যায় বিপরীত দৃশ্য অর্থাৎ জুলুমবাজি বা শোষণ। আমরা যদি একটু গভীরভাবে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের পটভূমি আলোচনা করি তাহলেও আমরা এমনই এক বাস্তবতা দেখতে পাই। বঞ্চিত শ্রমজীবীদের রক্ত বেয়েই বিশ্বব্যাপী আজ স্বীকৃতি লাভ করেছে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। এবার শ্রমিক দিবসের প্রেক্ষাপট নিয়ে একটু আলোকপাত করা যেতে পারে।

শ্রমিক দিবসের রক্তস্নাত ইতিহাস
অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে ইংল্যান্ডের সমাজবিজ্ঞানী ও সমাজসংস্কারক রবার্ট ওয়েন সর্বপ্রথম শ্রমিকদের আট ঘণ্টা শ্রম, আট ঘণ্টা মনোরঞ্জন এবং আট ঘণ্টা বিশ্রামের তত্ত্ব দিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচিত হন। তবে, দ্রুত শিল্পায়ন আর অধিক মুনাফার জন্য শিল্প মালিকরা শ্রমিকদের কাজের কোনো সময় বেঁধে দিতে রাজি ছিলেন না। এ সময় শ্রমিকরা সপ্তাহের ছয় দিনে দৈনিক ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা, এমনকি তারও বেশি সময় কাজ করতে বাধ্য হতেন। তাই শ্রমিক সংগঠন ও প্রতিবাদী শ্রমিকরা সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা শ্রমের দাবিতে ইউরোপজুড়ে আন্দোলন ছড়িয়ে দেন।
আজ থেকে ১৩০ বছর আগে ১৮৮৬ সালের মে মাসে শ্রমঘণ্টা ৮ ঘণ্টা নির্ধারণের দাবিতে আমেরিকার শিকাগো শহরের ‘হে মার্কেটে’ নির্যাতিত শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ জনসভায় মালিক এবং সরকারপক্ষের বর্বরোচিত আক্রমণ, গুলিবর্ষণ ও হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়েই ‘মহান মে দিবস’-এর সূচনা হয়। সেই দিন মালিক ও সরকার শ্রেণীর নির্দেশে গুলি চালানো হলে ঝরে যায় ১০ শ্রমিকের জীবন। আর রক্ত ঝরে আরো অনেকের। এতেও জনতার জোয়ার থামিয়ে দিতে পারেনি শোষক শ্রেণী।
১ মে শুরু হওয়া শ্রমিকদের এ আন্দোলন অব্যাহত ছিল আরও কয়েক দিন। চলতে থাকে ধর্মঘটও। ৩ মে একটি ফসল কাটার কারখানার সামনে শ্রমিক সভায় পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালালে প্রাণ হারান আরও ৬ শ্রমিক। হত্যার প্রতিবাদে ৪ মে হে মার্কেট স্কয়ারে স্মরণাতীত কালের বৃহত্তম শ্রমিক সমাবেশে আবারও বর্বরোচিত হামলা চালায় পুলিশ। প্রাণ হারায় আরও ৪ শ্রমিক। পরে ৬ অক্টোবর মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত চার শ্রমিক নেতাকে ফাঁসি দেয়া হয়। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। গড়ে ওঠে শ্রমিক-জনতার বৃহত্তর ঐক্য। অবশেষে দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র-সরকার-
তিন বছরের মাথায় ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে শিকাগো ট্র্যাজেডিকে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করার ঘোষণা দেয়া হয়। সেই থেকে আজ অবধি শ্রমিকের ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের সংগ্রামী চেতনার অমিত তেজ সঞ্চারের দিন হিসেবে এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ১৮৯০ সাল থেকে প্রতিবছর দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হতে শুরু করে ‘ মে দিবস’ নামে। বর্তমানে পৃথিবীর ৮০টি দেশে মে দিবস বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে ১লা মে সরকারি ছুটি থাকে। এই ৮০টি দেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং স্বার্থরক্ষায় এই দিনে বিভিন্ন কর্মসূচি নেয়া হয়।

বাংলাদেশের শ্রম আইন
সংশোধিত শ্রম আইন সংসদে পাসের ২৭ মাস পর ২০১৫ সালের সেপ্টেস্বরে এই আইনের বিধিমালার গেজেট প্রকাশ করা হয়। বিধিমালায় শ্রমিকদের বছরে দুটি বোনাস দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া আউটসোর্সিং এবং এক্সপোর্ট অরিয়েনটেড কোম্পানিগুলোকেও আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
৫০ জনের বেশি শ্রমিক আছে-এমন কারখানার জন্য শ্রমবিধিমালার আওতায় একটি ‘সেফটি কমিটি’ গঠনের কথা বলা হয়। ওই কমিটি শ্রমিকদের নিরাপত্তার সার্বিক বিষয়গুলো দেখবে মর্মেও বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়। কমিটিতে মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা থাকবেন বলেও বলা হয়। বিধিমালায় রপ্তানিমুখী শিল্পের আয়ের ০.৩ শতাংশ দিয়ে মালিক-শ্রমিকদের জন্য একটি তহবিল গঠনের কথাও বলা হয়েছে। নতুন বিধিমালায় ১৯টি অধ্যায়ে ৩৬৭টি বিধি এবং তাতে সাতটি তফসিল রয়েছে।
কিন্তু এই বিধিমালার কিয়দংশও পালন করছে না অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান। তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকান্ডে শতাধিক ব্যক্তির মৃত্যু ও সাভারের রানা প্লাজা ধ্বসে সহস্রাধিক শ্রমিকের প্রাণহানিতে আন্তর্জাতিক মহলের ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে বাংলাদেশ। আর তারই পটভূমিতে ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই শ্রম আইন সংশোধন করে সরকার। এর আগে ২০০৬ সালে শ্রম আইন প্রণয়ন করা হলেও তার বাস্তবায়নে গত সাত বছরে কোনো বিধিমালা না হওয়ায় বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হচ্ছিল। সংশোধিত শ্রম আইন প্রণয়নের পর বিধিমালার দাবি আরো জোরদার হয়।
নতুন বিধিমালায় পোশাক শ্রমিকদের উৎসবভাতাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতদিন শ্রমিকরা উৎসবভাতা পেলেও তা আইনে ছিল না। বিধিতে ভাতার বিষয়টি উল্লেখ থাকায় মালিকরা তা দিতে আইনতভাবে বাধ্য থাকবেন। কোনো মালিক না দিলে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ থাকবে। নতুন বিধির মাধ্যমে আউটসোর্সিং শ্রমিকদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। ফলে তাদের জন্য নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ হবে। আর তাদের নিয়োগদাতারাও শ্রম আইন মানতে বাধ্য থাকবেন-

তিক্ত বাস্তবতা
বিশ্ব-ব্যবস্থাপনার এক নির্মম বাস্তবতা হলো শ্রমজীবী মানুষ আজও চরমভাবে বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। এখনো পৃথিবীর বহু দেশে মানুষ পরিশ্রমের বিনিময়ে ন্যায্যমূল্য পান না। আর বাংলাদেশের বাস্তবতা আরো ভয়াবহ। সাংবাদিকতার সুবাদে আমার দেখার সুযোগ হয়েছে, এখনো রাজধানী ঢাকা শহরে অসংখ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলোতে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ করতে হয়, নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি মাত্র ৩ থেকে ৪ মাস। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদেরই আবার শ্রমিক দিবসের র‌্যালিতে সামনের কাতারে দেখা যায়, শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে বড় বড় বুলি আওড়াতে দেখা যায়। অথচ বছরের পর বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এসব প্রতিষ্ঠানকে যেই শ্রমিকরা টিকিয়ে রেখেছেন এবং মালিকদের মোটা অংকের অর্থ-উপার্জনে সহায়তা করছেন সেই মালিকরা একটু সদয় হলে কতই না ভালো হতো!
রাস্তাঘাট মেরামতসহ বিভিন্ন নির্মাণকাজে বিপুলসংখ্যক নারীশ্রমিককে দেখা যায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে শুধুমাত্র নারী হওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই একই কাজ করার পরও পুরুষের তুলনায় নারী শ্রমিকদের বেতন কম দেয়া হয়। লাখ লাখ খেটে খাওয়া নারীকে বঞ্চিত করা হয় তার ন্যায্য পারিশ্রমিক থেকে। এ ছাড়া বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে নারীদের বঞ্চনার বিষয়টি প্রায় সবারই জানা। এভাবে দেশের বিভিন্ন সেক্টরে- কী সরকারি কী বেসরকারি- শ্রমিকদের বঞ্চনার বিষয়টি একটি স্বাভাবিক রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।

জাতীয় কবির প্রতিবাদ
দেখিনু সেদিন রেলে
কুলি ব‘লে এক বাবু সাব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে!
চোখ ফেটে এলো জল,
এমনি ক‘রে কি জগৎজুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?
যে দধীচিদের হাড় দিয়ে ঐ বাষ্প-শকট চলে,
বাবু সাব এসে চড়িল তাহাতে, কুলিরা পড়িল তলে।
বেতন দিয়াছ? চুপ রও যত মিথ্যাবাদীর দল!
কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোর পেলি বল?
রাজপথে তব চলিছে মোটর, সাগরে জাহাজ চলে,
রেলপথে চলে বাষ্প-শকট, দেশ ছেয়ে গেল কলে,
বলত এসব কাহাদের দান! তোমার অট্টালিকা
কার খুনে রাঙা? ঠুলি খুলে দেখ, প্রতি হঁটে আছে লিখা।
তুমি জান নাক, কিন্তু পথের প্রতিধূলি কণা জানে,
ঐ পথ, ঐ জাহাজ, শকট, অট্টালিকার মানে!
অসহায়, অবহেলিত ও অধিকারহারা শ্রমজীবী মানুষকে নিয়ে এমন দরদমাখা কথাগুলো যেন জাতীয় কবি তথা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কণ্ঠেই শোভা পায়। ঘুমন্ত মুসলিম জাতিসত্তাকে জাগিয়ে তোলার কবি নজরুল তার ‘কুলি মজুর’ কবিতায় শ্রমজীবী মানুষকে নিয়ে এই চমৎকার কথাগুলো বলেছেন। যখন শ্রমজীবী মানুষ ও তাদের অধিকার নিয়ে এতসব সভা, সমাবেশ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম হতো না, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে এমন জাঁকজমকভাবে কোনো দিবসও পালন করা হতো না, শ্রমিক দিবসে গণমাধ্যমের পাতাজুড়ে এতসব খবরও প্রকাশিত হতো না, ঠিক সেই সময় কতই না গভীরভাবে বঞ্চিত শ্রমিকদের নিয়ে ভেবেছিলেন দরদি কবি কাজী নজরুল ইসলাম!
আজ এত বছর পরে যখন পয়লা মে আসে, ব্যাপকভাবে শ্রমিক দিবস পালন করা হয়, রঙবেরঙের পোস্টারে সর্বত্র ছেয়ে যায়, গণমাধ্যমে শ্রমিক দিবস পালনের খবর প্রচারিত হয়, টক শোতে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা হয়, পত্রিকার পাতাজুড়ে ছাপা হয় সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয়-কলাম, রাজপথে বের করা হয় বড় বড় র‌্যালি, তখনও কেমন যেন এক শূন্যতা অনুভূত হয়। মনে হয় এসব অনুষ্ঠান সর্বস্ব মানুষগুলো বিষয়টিকে কেবলই একটি উৎসবের মতো পালন করছেন, হৃদয়ের গভীর থেকে কিছুই অনুভব করছেন না। কারণ এই মানুষগুলোই পরক্ষণে খেটে খাওয়া, অধিকারহারা দুর্বলদের সাথে দুর্ব্যবহার শুরু করে। যুগের পর যুগ এমন দৃশ্যই আমরা দেখে আসছি। সবলরা প্রতিনিয়ত দুর্বলদের বঞ্চিত করছেন এবং নিজেদের আরাম-আয়েশের জন্য খেটে খাওয়া মানুষগুলোকে দিয়ে ইচ্ছেমতো ফরমায়েশ খাটাচ্ছেন।

খুব জানতে ইচ্ছে হয়
একজন সামান্য কুলিকে কোনো এক বাবুর অপমানের খবর শুনে কতটাইনা ব্যথিত হয়েছিলেন বিদ্রোহী কবি ও এককালের দুখুমিয়া কাজী নজরুল ইসলাম! খুব জানতে ইচ্ছে হয়, আজ যখন হাত থেকে চায়ের কাপ কিংবা পিরিচ পড়ে ভেঙে যাওয়ার ‘বিরাট’ অপরাধে ছ্ট্টো কাজের মেয়েটির হাতে ও গায়ে জ্বলন্ত লোহার শলাকা দিয়ে শেক দেয়া হয় কিংবা কাজের মেয়েকে গণধর্ষণ করে ভবনের ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেয়া হয়, তখন নজরুল বেঁচে থাকলে কী লিখতেন? জানতে ইচ্ছে হয়, যখন লাখ লাখ শ্রমিকের রক্ত পানি করা শ্রমের ওপর দিয়ে গার্মেন্টস শিল্পের মালিকরা কোটিপতি বনে যান এবং সামান্য বেতনের শ্রমিকরা সেই তিমিরেই পড়ে থাকেন, তদুপরি কর্মস্থলে তাদেরকে বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়, নজরুল এসব দেখতে পেলে কী লিখতেন? বৃদ্ধবয়সী রিক্সাচালকের গালে যখন তার ছেলে কিংবা নাতীর বয়সী তরুণ বা যুবক ঠাস করে চড় বসিয়ে দেয় ভাড়া বেশি চাওয়ার অভিযোগে, নজরুল তখন কী লিখতেন? পরীক্ষায় বেশি মূল্য পেতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের যৌন চাহিদা যখন ছাত্রীকে মেটাতে হয়, তখনইবা নজরুল কী লিখতেন? বিচারকের মহান আসনে বসে যখন টাকার কাছে বিক্রি হন বিচারক কিংবা ক্ষমতাসীনদের হাতের পুতুলে পরিণত হন তখনই বা নজরুল কী লিখতেন? যখন ক্ষমতার দাপটে একশো মেয়েকে ধর্ষণ করার পর ধর্ষণের সেঞ্চুরি পালন করা হয়, সেই দৃশ্য দেখেই বা নজরুল কী লিখতেন?
আরো জানতে ইচ্ছে করে শ্রমিক দিবসের সমাবেশে বড় বড় বুলি আওড়ানোর পর মন্ত্রী মহোদয় যখন দুর্নীতি ও ঘুষের টাকায় নিজের ভাগ্য গড়েন, সন্তানদের বিদেশে পড়াশুনা করতে পাঠান, বিদেশী ব্যাংকে অর্থ পাচার করেন এবং দেশের শ্রমজীবী মানুষকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেন, তখন নজরুলের কবিতার ভাষা কেমন হতো? খুব জানতে ইচ্ছে করে ছোট ছোট শিশুদের দিয়ে যখন নানাধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করিয়ে তাদেরকে সামান্য টাকা পারিশ্রমিক দেয়া হয় ছোট বলে, তখন নজরুলের হৃদয়ের হাহকারের কাব্যিক ভাষা কী হতো? আরো অনেক কিছু জানতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ওপর মহলের নাখোশ হওয়ার ভয়ে আমার মতো হয়তো অনেকেরই অনেক কিছু জানার আগ্রহ থাকলেও শেষমেশ সেই সুযোগ আর মেলে না।
লেখক : সাংবাদিক
তথ্যসূত্র
র আল-কুরআন, সূরা-০৩, আলে-ইমরান, আয়াত-২৬-২৭
রর আল-কুরআন, সূরা-৫৭, আল-হাদিদ, আয়াত-২০
ররর আল-কুরআন, সূরা-২৯, আনকাবুত, আয়াত-৬৪
রা সহীহ আল-বুখারি, হামিদিয়া লাইব্রেরি, দ্বিতীয় খন্ড, হাদিস-১০৬৬
– আল-কুরআন, সূরা-৬২, আল-জুমুয়া, আয়াত-১০
– আল-কুরআন, সূরা – ০৭, আল-আরাফ, আয়াত-১০
– আল-কুরআন, সূরা – ০৮, আল-আনফাল, আয়াত-৫৩
– আল-কুরআন, সূরা – ০২, আল-বাকারা, আয়াত-১৮৮
– আল-কুরআন, সূরা – ০৪, আন-নিসা, আয়াত-২৯
– আল-কুরআন, সূরা – ৮৩, আল মোতাফফিফিন, আয়াত-১-৬
– আল-কুরআন, সূরা – ০৪, আন-নিসা, আয়াত-১০
– আল-কুরআন, সূরা – ০৯, আন-তাওবা, আয়াত-৬০
– আল-কুরআন, সূরা – ১৭, বনি ইসরাইল, আয়াত-২৬-২৭
– আল-কুরআন, সূরা – ০২, আল-বাকারা, আয়াত-২৬১
– উইকিপিডিয়া, আত্মহত্যা, সবশেষ আপডেট-ফেব্রুয়ারি ২০১৮
– দৈনিক কালের কণ্ঠ, জাপানে আত্মহত্যা কমানোর পরিকল্পনা, ২৬ জুলাই ২০১৭ (এএফপির বরাত)
– দৈনিক যুগান্তর, আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে, ১০ অক্টোবর ২০১৭
– উইকিপিডিয়া, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস, সবশেষ আপডেট- নভেম্বর ২০১৭
– দৈনিক প্রথম আলো, আজ প্রজ্ঞাপন জারি : অবশেষে শ্রমবিধি চূড়ান্ত, উৎসবভাতা বাধ্যতামূলক, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫

SHARE

Leave a Reply