সরকার গণতন্ত্রের সব উপাদান ধ্বংস করেছে

এ দেশে গণতন্ত্র টিকে থাকার জন্যই এসেছে। এ দেশে গণতন্ত্র আনা ও টিকিয়ে রাখার জন্য ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তান আন্দোলন, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ইত্যাদি আন্দোলন সংগ্রামে জনগণের ত্যাগ কুরবানি অপরিসীম। সুতরাং এ দেশে গণতন্ত্র টিকে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমান ক্ষমতাসীনদের মুখে গণতন্ত্র রক্ষার অমিয় বাণী শুনলে মানুষ আনন্দিত নয়, আতঙ্কিত হয়। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বাবা, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্রের অগ্নিপুরুষ শেখ মুজিবুর রহমান হঠাৎ প্রেসিডেন্ট হয়ে ‘বাকশাল’ গঠন করলে স্বাধীন দেশে প্রথম গণতন্ত্রের মৃত্যু হয়। শেখ হাসিনার দলের কর্মীরা ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর দিনদুপুরে রাজধানীর পল্টনে মিডিয়ার সামনে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে কয়েকজন মানুষ খুন করে গণতন্ত্রকে কবর দিয়েছিল। এভাবে ১/১১ এর ক্ষেত্র তৈরি করা হয়। দেশে আসে মইন উদ্দিন ফখরুদ্দীনের উদ্ভট তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এরপর শেখ হাসিনা স্বস্তির সাথে বলেছিলেন, ‘এ সরকার আমাদের আন্দোলনের ফসল।’
প্রথম টার্মে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৯৮ সালে যেদিন আওয়ামী লীগ নেত্রী ঘোষণা দিলেন, এ দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হবে, ঠিক পরের দিনই বৃষ্টির মধ্যে কমলাপুর বস্তি উচ্ছেদ করে শত শত নারী, শিশু, অসহায়কে জাতীয় ঈদগাহ মাঠে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছিল তার সরকার। আজ প্রধানমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, কোনো অনির্বাচিত ব্যক্তি-গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে না। অথচ ১৯৯৪-৯৫ সালে অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়কের দাবিতে উপর্যুপরি হরতাল দিয়ে, ভাঙ্চুর, জ্বালাও পোড়াও করে দেশের জানমালের অপূরণীয় ক্ষতি করা হয়েছে। এখন সে আন্দোলনের নেত্রী বলছেন, ‘তত্ত্বাবধায়কের দাবি জানালে দেশে কোনো নির্বাচন হবে না।’ এ এক উদ্ভট কথা তার কণ্ঠে শুনল দেশের মানুষ। অর্থাৎ তিনি চাচ্ছেন নির্বাচন না দিয়ে আজীবন ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে ধরে থাকতে।
বর্তমান সরকার গণতন্ত্রের সব উপাদান ধ্বংস করেছে। বিরোধী দলকে দেখামাত্র গুলি কিংবা নির্যাতন, বিরোধী দলের বেশির ভাগ নেতা জেলখানায়, তাদের বিরুদ্ধে ভূরি ভূরি মামলা, সভা-সমাবেশের ওপর বেআইনি নিষেধাজ্ঞা, বিরোধী দলের প্রচারমাধ্যম বন্ধ, প্রশাসনে নজিরবিহীন দলীয়করণ, দেশের অর্থনীতি ধ্বংস, নতজানু পররাষ্ট্রনীতি ইত্যাদি দ্বারা প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে গণতন্ত্র ও সুশাসন রোধের। প্রধানমন্ত্রী যখন কোনো বিদেশী রাষ্ট্রদূতকে বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র টিকে থাকবে, তখন সংক্ষুব্ধ জনগণের মনে এ আশঙ্কা জাগা খুবই স্বাভাবিক যে, দেশে হয়তো গণতন্ত্র থাকবে না। না থাকলে টেকা-না টেকার প্রশ্ন আসে না।
ভারতের কাছ থেকে ন্যায়সঙ্গত দাবি আদায় করতে ব্যর্থ হয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদার কথাও যেন ভুলতে বসেছে। প্রকাশ ঘটছে চরম দেউলিয়াত্বের। এবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপুমনি সীমান্তচুক্তি বাস্তবায়ন ও তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনার জন্য নয়াদিল্লি সফর করে এসেছেন। তিনি সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং এবং প্রধান বিরোধী দল বিজেপির নেতাদের সাথে বৈঠক করেছেন এ বিষয়ে। এসব বৈঠকে আশ্বাস ছাড়া তিনি আর কোনো কিছু অর্জন করতে পারেননি। সীমান্তচুক্তি বা তিস্তার পানিবণ্টনে কোনো অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের এক সপ্তাহ না যেতেই নয়াদিল্লিতে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় থাকা বাংলাদেশের হাইকমিশনার বিজেপির চরম বিতর্কিত নেতা নরেন্দ্র মোদির সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। রাষ্ট্রদূতের এই সাক্ষাৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। বর্তমান ক্ষমতাসীনেরা নিজেদের সেকুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে দাবি করে আসছেন। কিন্তু রাষ্ট্রদূত এমন এক ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করে সহযোগিতা চাইছেন যিনি শুধু ভারতে নয়, গোটা বিশ্বে একজন ধর্মান্ধ উগ্র হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। পশ্চিমা বিশ্বের অনেক দেশ তাকে এসব দেশ সফরের অনুমতি পর্যন্ত দিচ্ছে না। তার নেতৃত্বে ২০০২ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় গুজরাটে শত শত মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। ভারতের সচেতন নাগরিকেরা পর্যন্ত তার নৃশংস ও ঘৃণীত অপকর্মের জন্য লজ্জাবোধ করে। প্রধান বিরোধী দলের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকার পরও ভারত সফররত বিদেশী অতিথিরা তাকে এড়িয়ে চলেন। কিন্তু বাংলাদেশের ‘অসাম্প্রদায়িক’ সরকার এখন নরেন্দ্র মোদির কাছে সহযোগিতা চাইছে। বাংলাদেশের মানুষ জানে, ভারতের কংগ্রেস আওয়ামী লীগের বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষক। কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকার পরও তাদের সরকার যেখানে ন্যায়সঙ্গত দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে নরেন্দ্র মোদির মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান হবে এমনটি আশা করা বাতুলতা ছাড়া আর কিছু নয়। প্রকৃতপক্ষে এই সাক্ষাতের মাধ্যমে মোদির মতো নিন্দিত ব্যক্তিকে মর্যাদা দেয়া হচ্ছে। এই বৈঠকের মাধ্যমে ভারতের আগামী নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির এই প্রচারণার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে যে, বাংলাদেশের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দেশের কূটনীতিক তার সাথে বৈঠক করে তার অপরিহার্যতা প্রমাণ করেছেন। তার সাম্প্রদায়িক কলঙ্কের দাগও মুছে ফেলতে এই বৈঠক সহায়ক হবে। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের দেশ-বিদেশে এমন নৈতিক পতন দেশের ভাবমর্যাদা দারুণভাবে ক্ষুণ করেছে।

SHARE

Leave a Reply