সরকার চার দিকে ষড়যন্ত্রের সরষেফুল দেখছে

সাদেক খান

মহাজোটের মন্ত্রী-সান্ত্রীরা দেশে-বিদেশে নানা মুনি নানা মহাজন মহারথির সাথে নিরর্থক বিবাদ পাকিয়ে তুলে আর্থরাজনৈতিক সঙ্কট সামলাতে এখন লেজেগোবরে হচ্ছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ঢাকায় ঝটিকা সফরে এসে বাংলাদেশ সরকার ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে (উন্নয়ন কৌশল, নিরাপত্তা কৌশল, বাণিজ্য ও প্রযুক্তি হস্তান্তরবিষয়ক) ‘অংশীদারিত্বের সংলাপ’ চুক্তি স্বাক্ষর করলেন। আনুষ্ঠানিক একান্ত বৈঠকে এবং যাওয়ার আগে একটা প্রকাশ্য মতবিনিময় সভায় বলে গেলেনÑ তার দেশের জনপ্রতিনিধিদের চোখে আর সারা বিশ্বের গুণীজনদের চোখে গ্রামীণ ব্যাংক একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠান  (নোবেল বিজয়ী); ইঙ্গিত দিলেন তার প্রত্যাশা, কোনো সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে যেন স্বশাসিত ওই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগী ব্যবস্থাপনাকে ব্যাহত না করা হয়। এমন কোনো সবিশেষ সমালোচনা নয়, গ্রামীণবান্ধব আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও সহানুভূতির কূটনৈতিক অভিব্যক্তি মাত্র। সামনাসামনি কেউ কোনো আপত্তিও তুলল না। শুধু খবরের কাগজের হেডলাইনে ওই বক্তব্যকে একটা হুঁশিয়ারি বলে জাহির করল ইউনূস-বান্ধব মহল। হিলারির বিদায়ের পরপরই অর্থমন্ত্রী হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠলেন, হিলারির ওই বক্তব্য ‘অগ্রহণযোগ্য’। কূটনৈতিক পত্রালাপে ওই বক্তব্যের নীরব মতান্তর ব্যক্ত করা যেত, কিংবা কাজের মাধ্যমেই ওই ‘হুঁশিয়ারি’ উপেক্ষা করা যেত। কিন্তু না, মহাজোট সরকারের হিম্মত দেখাতে মন্ত্রীদের টেন্ডাইমেন্ডাই করতেই হবে।
জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী গুইডো ভেস্টারভেল ঢাকায় সরকারি সফর শেষে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সংবাদ সম্মেলন করে বললেনÑ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর ইউরোপের মধ্যে জার্মানি প্রথম দেশ যে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। তখন থেকে এ দেশের উন্নয়নে জার্মানি দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে। আগামীতে এ দেশের সাথে জার্মানির বাণিজ্য চার বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়ে যাবে। মাত্র কয়েক মাস আগেই আমাদের চমৎকার একটি বৈঠক হয়েছে। এটা আমার বাংলাদেশে প্রথম সফর। এটি একটি চমৎকার দেশ। এখানকার মানুষ খুব আন্তরিক। আমি ও আমার দেশের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
আমাদের মধ্যে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সাম্প্রতিক বাংলাদেশে বিভিন্ন স্তরের কর্মী নিহত হওয়ার ঘটনায় আমরাও উদ্বিগ্ন। আমরা আশা করছি, সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। আমি এখানে কিছু শেখাতে আসিনি। আমার সাথে শুধু রাজনীতিবিদ ও কূটনীতিকেরা নন, ব্যবসায়ীরাও এসেছেন। বাংলাদেশের সাথে জার্মানির বাণিজ্য বাড়ছে। আমরা বিনিয়োগের সম্ভাবনাগুলো দেখতে এসেছি। অবশ্য গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে আমরা সব রাজনৈতিক দলকে আহ্বান জানাই। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। গণতন্ত্র বিকশিত করতে মানবাধিকার, আইনের শাসন অত্যন্ত জরুরি। (উল্লেখ্য, হিলারি ক্লিনটন শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের গুম-খুনের ঘটনায় সবিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন)। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি বলেন, এটি আমাদের তৃতীয় বৈঠক ছিল। আমরা এখানে চমৎকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেছি। আলোচনায় আসা বেশির ভাগ ইস্যুর ব্যাপারে ইতোমধ্যেই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। আমরা আমাদের যৌথভাবে সহযোগিতা ও উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করছি। জার্মানি আমাদেরকে শিক্ষা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন খাতে সহযোগিতা করছে।

শেখ হাসিনা

সাংবাদিকদের সামনে কোনো তরফেই কোনো মতান্তরের লক্ষণ দেখা যায়নি। অথচ ডাট দেখিয়ে এক দিন পরই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলো, ২৩ জুন দুই দেশের আনুষ্ঠানিক বৈঠক শেষে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা আগে থেকে তৈরি করা। ওই বিবৃতি পড়ে শুনিয়ে (বৈঠকে) আলোচনার যে উদ্ধৃতি তিনি দিয়েছেন, তাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিস্মিত। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ‘স্বাধীন নাগরিকসমাজ’, ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’, ‘বাংলাদেশের সাম্প্রতিক মানবাধিকার পরিস্থিতি’, ‘সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড ও খুনিদের শাস্তি দেয়া’ ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ করেছেন, বাস্তবে এসব বিষয়ে বৈঠকে কোনো আলোচনাই হয়নি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দুই দেশের আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলেন জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশের গণমাধ্যম নিয়েও জানতে চান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি নির্বাচনের প্রক্রিয়া ও নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী করা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সরকারের নেয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে গুইডো ভেস্টারভেলকে অবহিত করেন। এসব বিষয়ে হালনাগাদ পরিস্থিতি জেনে সন্তোষ প্রকাশ করেন জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। মন্ত্রণালয় মনে করে, জার্মানির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা আলোচনার মূল প্রসঙ্গ তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন। কারণ বৈঠকে মানবাধিকার ও সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের মতো বিষয়গুলো আলোচনায় আসেনি।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অসন্তোষ ও হতাশা জানাতে ২৫ জুন সকালে জার্মানির চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে (ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত) তলব করা হয়। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন পররাষ্ট্রসচিব মোহাম্মদ মিজারুল কায়েস। তিনি জার্মানির শীর্ষ ওই কূটনীতিককে বলেন, ‘বাংলাদেশ যেকোনো বিষয় নিয়ে পুরোপুরি স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার সাথে আলোচনায় রাজি আছে। তবে যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়নি, তা নিয়ে জনসমক্ষে মন্তব্য করা শুধু বাস্তবতার অপব্যাখ্যাই নয়, বরং তা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা দীর্ঘ দিনের সম্পর্ক নষ্ট করার কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে।’
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে সংবাদ সম্মেলনে স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, এসব প্রতিবেদনে বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে নিজস্ব মতামতের প্রতিফলনও ঘটানো হয়েছে। এক কথায় প্রচার মাহাত্ম্যের জাঁক বজায় রাখতে সরকার বাহাদুর জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘মিথ্যুক’ সাব্যস্ত করে জার্মান রাষ্ট্রদূতকে ডেকে কথা শোনালেন। এমন বাড়াবাড়িতে ‘চার দশক ধরে বাংলাদেশ ও জার্মানির মধ্যে গড়ে ওঠা’ হিতকর সুসম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি না তার তোয়াক্কা করার প্রয়োজন নেইÑ এমনই ভাব দেখাল সরকার বাহাদুর!
এরপর ৩০ জুন যখন দশ মাস ধরে ‘মন কষাকষি’র পর পদ্মা সেতুর ঋণচুক্তি বাতিল করল বিশ্বব্যাংক, তখন বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিকে ‘সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য’ ঘোষণা করে কূটনৈতিক সদাচারের সবক দিতে লাগলেন বিশ্বব্যাংক কর্মকর্তাদের। বললেন : ‘(বিশ্বব্যাংকের) বিবৃতিতে যে ভাষা ও ভাব ব্যক্ত করা হয়েছে, বিশ্বব্যাংক সে রকম বিবৃতি তাদের কোনো সদস্যদেশ সম্পর্কে দিতে পারে কি না সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আমার মনে হয়, এটি বিশ্বব্যাংকের মন্তব্য নয়। এটি বিশ্বব্যাংকের বিদায়ী সভাপতি রবার্ট জোয়েলিকের ব্যক্তিগত মন্তব্য।’

এরূপ ঘটনা এখন নিত্য-নৈমিত্তিক

পরদিন বললেন, ‘শনিবার আমি সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বিশ্বব্যাংকের বিজ্ঞপ্তি প্রদানের যৌক্তিকতা সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করেছি এবং সে জন্য তাদের বিজ্ঞপ্তিটি অগ্রহণযোগ্য মনে করেছি। আমি আরো বলেছি, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ তারা তুলে ধরেছে এবং সে সম্বন্ধে আমরা কোনো পদক্ষেপ নিইনিÑ এ কথাটিও সঠিক নয়।’ তথা বিশ্বব্যাংকও ‘মিথ্যুক’। তারপর পদ্মা সেতু নিয়ে অর্থায়ন বিশ্বব্যাংক, বিগত বিএনপি সরকারের দুর্নীতির কারণেই বন্ধ রেখেছিল, সরকারিভাবে এই দাবি করে তারই প্রচেষ্টায় কী করে ঋণচুক্তি সম্পাদিত হলো সেই কৃতিত্বের বিশদ বিবরণ দিয়ে তিনি মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্বব্যাংকের কাছে বার্তা দিলেন : ‘পদ্মা সেতু প্রকল্পের ঋণচুক্তি বাতিল অনাকাক্সিক্ষত ও রহস্যজনক। এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকের বিজ্ঞপ্তি জারি করাটা অসম্মানজনক। বিষয়টি বিশ্বব্যাংকের পুনর্বিবেচনা করা উচিত। আমরা তাদের পুনর্বিবেচনার জন্য অপেক্ষা করব।’ প্রায় সাথে সাথেই বিশ্বব্যাংকের নয়া প্রধান জিম ইয়ং কিমের তরফে সরাসরি জবাব মিলল, ‘পদ্মা সেতু বাতিলের সিদ্ধান্ত সঠিকভাবে নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের মঙ্গলের বিষয়ে আমরা সজাগ। কিন্তু বিশ্বব্যাংক কখনো দুর্নীতি সহ্য করে না।’
কিন্তু তাতেও মহাজোট সরকারের মন্ত্রী-সান্ত্রীদের গলাবাজি আর পাল্টা দোষারোপের প্রচারবাদ্য ক্ষান্ত দিলো না। সান্ত্রীরা রা তুলল, বিশ্বব্যাংকই দুর্নীতিবাজ। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তৃতায় খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়াজ তুললেন, ‘আমরা ঋণ নিই, সুদসহ অর্থ ফেরত দিই। ভিক্ষা নিই না। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে, কারো দান-খয়রাতে নয়। ত্যাগ-তিতিক্ষা করেই তা অর্জন করেছি। বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির সম্ভাবনার কথা বলে ঋণচুক্তি বাতিল করল। তারা নিজেরাই চুক্তির মেয়াদ বাড়াল, আবার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তা বাতিল করে দেয়। যেখানে একটি পয়সাও খরচ হয়নি, সেখানে দুর্নীতির অভিযোগ আসে কী করে? মূলত বিএনপি সরকারের সময় (দাতারা) যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে প্রকল্প বাতিল করে দেয়। আমরা ক্ষমতায় এসে তা পাওয়ার চেষ্টা করি। যেখানে টাকা খরচ হলো সেখানে দুর্নীতি হলো না, আর যেখানে একটি পয়সাও খরচ হলো না, সেখানে তারা দুর্নীতির গন্ধ পেল। ঋণচুক্তি বাতিল করে দিলো।’ বাংলাদেশে যে ছোট-বড় ঠিকাদারি বা চাকরি পাওয়ার আগেই কিংবা কোনো ব্যাংকঋণ বা ঋণপত্র মঞ্জুরির জন্যও আগাম ঘুষ দেয়ার রেওয়াজ পাকাপোক্তভাবে চালু, সে কথা প্রধানমন্ত্রী কিংবা তার নেতাকর্মীদের অজানা নয়। যা হোক, বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী আরো বললেন : ‘চলতি বাজেটে ৫৫ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দ আছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সাথে আলোচনা করেছি এবং এখান থেকে ২৪ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করতে পারি। এ জন্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। এ টাকা দিয়ে কাজ শুরু করতে পারি। এ ছাড়া অর্থমন্ত্রী সেতুর জন্য বাজেটে আলাদা করে কিছু টাকা রেখেছিলেন। বাজেট থেকে সেতু নির্মাণ করতে গেলে উন্নয়নকাজ কিছুটা কমাতে হবে। তবে সেতুটা হলে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হবে। সেতু নির্মাণের জন্য ২২ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের সভরেইন বন্ড ছাড়া হবে। সারচার্জ আরোপ করা হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি কর্মসূচি বা পিপিপিতে তিন হাজার কোটি টাকা আছে। এ টাকা দিয়ে আমরা কাজ শুরু করতে পারি।’
মূল সেতু করতে ১৫ হাজার কোটি টাকা লাগবে। নদী শাসনে দরকার সাত হাজার ২০০ কোটি টাকা। জাজিরা সংযোগ সড়ক  তৈরিতে এক হাজার ৩৫০ কোটি এবং মাওয়া সংযোগ সড়ক করতে লাগবে ৩১০ কোটি টাকা।
২০১২-১৩ অর্থবছরে তিন হাজার ১৯৮ কোটি টাকা, ২০১৩-১৪ সময়ে সাত হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সাত হাজার ৭৮৬ কোটি এবং ২০১৫-১৬ সময়ে লাগবে তিন হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা।
‘প্রবাসীরা কাজ শুরু করে দেয়ার জন্য বলছেন। তারা আরো বেশি করে টাকা পাঠাবেন বলে জানিয়েছেন। এমনকি স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা টিফিনের টাকা দিতেও রাজি। গরিব কৃষকেরাও টাকা দেয়ার কথা জানিয়েছেন।’
‘(বিশ্বব্যাংকের চুক্তি মোতাবেক পরামর্শক নিয়োগ) জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন কমিটি কানাডিয়ান কোম্পানিকে বাছাই করে। বিশ্বব্যাংক তা অনুমোদন দেয়। পরে যখন তারা দুর্নীতির কথা উঠাল, আমি বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্টকে দরপত্র বাতিল করে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের কথা বলি। অনুরোধ করি, সময় নষ্ট করবেন না। কাজ শুরু করুন। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, তাদের মনে কী ছিল জানি না, তারা দরপত্র বাতিল করেনি। কিন্তু দেড় বছর পর তারা অ্যাকশন নিলো। আজ সামান্য ছুতা ধরে তারা দেশের সর্বনাশ করল। এটা মেনে নেয়া যায় না। কোনো বাঙালি মেনে নিতে পারে না। সময় নষ্ট করে কেন তারা খরচ বাড়াল, তার জন্য তাদের কাছে জরিমানা চাওয়া উচিত।’

সিএনজি চালকদেরকে এভাবেই পেটায় সরকারের পুলিশ বাহিনী

‘বিশ্বব্যাংক একটা ব্যাংক, জানি না এ ব্যাংকের অডিট (নিরীক্ষা) হয় কি না। এ ব্যাংকে যারা কাজ করেন তাদের কার্যক্রম পরীক্ষা করা হয় কি না। সেখানে টাকা-পয়সা কী হচ্ছে, তার হিসাব-নিকাশ চাওয়ার অধিকার আমাদের আছে। আমরা বিশ্বব্যাংকের অংশীদার। তাদের হিসাব-নিকাশ বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে হবে। এটা আমাদের দাবি।’
মহাজোটের অর্কেস্ট্রা বলতে থাকল, ‘শাবাশ’। আর দেশের মধ্যেই ওয়াকিবহাল মহলে ফিস ফিস রব উঠল, ‘মতিভ্রম’। এর আগে জাতীয় সংসদকইে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার নেতাকর্মীদের রা শনাক্ত করে বিশ্বব্যাংককে দোষারোপ করেছিলেন : ‘যেখানে তারা (বিশ্বব্যাংক) এক পয়সা ছাড় দেয়নি, সেখানে দুর্নীতি হলো কী করে? বরং এর পেছনে কারা আছে, তাদের কী উদ্দেশ্য, তা খোঁজ নেয়া দরকার।’ তিনি বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে পাল্টা দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বলেন, ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও ফোর্বস ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন পড়ে দেখা হোক। তাহলেই আসল দুর্নীতি কোথায় আছে, তা জানা যাবে।’ অর্থাৎ বিশ্বব্যাংকের এই অবস্থানের পেছনে ষড়যন্ত্রের আলামত পেলেন তিনি।
এত দিন সরকারের ধুয়া ছিল, ষড়যন্ত্র করছে জামায়াত-বিএনপিচালিত বিরোধী জোট, যাদের লক্ষ্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করা। এখন সরকারের নতুন ধুয়া তোলা হয়েছে, দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র। জার্মানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বব্যাংক কেন এ দেশের সরকারের বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্র’ করছে, সেটা এখনো নির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না সরকার। তবে বিদেশী ষড়যন্ত্রের জুজুর ভয় আরো তারস্বরে ক্ষমতাসীন মহল চেঁচিয়ে বলতে শুরু করেছে যখন বিডিআর বিদ্রোহে অভিযুক্তদের ‘গণবিচার’ প্রক্রিয়ায় ‘গলদ’ রয়েছে দাবি করে তা এখনই স্থগিত করার আহ্বান জানাল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। একই সাথে ব্যাপক বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ থাকা ‘এলিট বাহিনী’ র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ভেঙে দিয়ে একটি নতুন ‘বেসামরিক’ বাহিনী গড়ে তোলার সুপারিশ করেছে নিউ ইয়র্ক-ভিত্তিক এ সংস্থা।
২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় সন্দেহভাজন ও অভিযুক্তদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ এবং র‌্যাবের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এইচআরডব্লিউ বলেছে, বিচারের জন্য আটক অন্তত ৪৭ জন বিডিআর সদস্য হাজতে থাকা অবস্থায় নিহত হয়েছেন। ওই সময় আটক প্রায় ছয় হাজার বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) সদস্য ন্যায়বিচার পাবেন কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।
সামরিক বাহিনী বিদ্রোহ দমন করতে চাইলেও সরকার তখন তা করতে দেয়নি। পরে সামরিক বাহিনী থেকে অভিযোগ আসে সরকার সামরিক বাহিনীর স্বার্থ সংরক্ষণ করছে না। সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতনদের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভেরও সৃষ্টি হয়।
তদন্তকারী গোয়েন্দা হেফাজতে মৃত ৪৭ জনের মধ্যে বেশির ভাগই হৃদরোগে মারা গেছেন বলে সরকারের তরফে বলা হয়েছে। ওই প্রতিবেদন প্রকাশকালে প্রশ্ন ওঠে, এতগুলো হৃদরোগপ্রবণ ব্যক্তি কী করে সামরিক প্রশিক্ষণ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষায় টিকে থেকে চাকরিতে বহাল ছিলেন?
বিভিন্ন সংস্থার নির্যাতনে ৪৭ জনের যে মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে তা সর্বনিম্ন সংখ্যা। আমরা নিশ্চিত, নির্যাতনেই এদের মৃত্যু হয়েছে। নির্যাতনে নিহত অনেকেরই ময়নাতদন্ত হয়নি, শুধু লাশ ফেরত দেয়া হয়েছে।
আটক জওয়ান পরিবারের সদস্য, আইনজীবী এবং নিহতদের ময়নাতদন্তের রিপোর্টের ভিত্তিতে জানা যায়, আটক জওয়ানদের হাত ও পায়ের পাতায় প্রায়ই পেটানো হতো। কয়েকজন জানিয়েছেন, তাদের ছাদ থেকে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হতো। যারা এসব নির্যাতনের পরও প্রাণে বেঁচে গেছেন, তাদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাদের অনেকেরই কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে অথবা আংশিক পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।
প্রতিবেদনে এমন একটি স্বাধীন তদন্তকারী ‘টাস্কফোর্স’ গঠনের দাবি করা হয়েছে যার সদস্যদের বিশেষজ্ঞতা, ক্ষমতা এবং ব্যাপক তদন্তের সক্ষমতা থাকবে। এই টাস্কফোর্স বিডিআর বিদ্রোহের সন্দেহভাজনদের ওপর অত্যাচার, অন্যায় আচরণ এবং বিচারবহির্ভূত মৃত্যুর অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি করবে।
জবাবে সরকারের তরফে গণমাধ্যমে পাঠানো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, গত ৪ জুলাই প্রকাশিত হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তা ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও কল্পনাপ্রসূত’। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) এক বিবৃতিতেও প্রতিবেদনটিকে বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলা হয়েছে।
র‌্যাব-পুলিশের পক্ষ থেকেও সংবাদ সম্মেলন করে বলা হয়, ‘এ মনগড়া প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করছে র‌্যাব। দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করতে এবং অপরাধী ও জঙ্গিবাদ উৎসাহিত করতে দেশের কিছু ভুঁইফোড় মানবাধিকার সংগঠনের সহায়তায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এ ধরনের উদ্দেশ্যমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, আইনপ্রতিমন্ত্রী গয়রহের আবোলতাবোল বক্তব্যে ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বৈদেশিক হস্তক্ষেপের ষড়যন্ত্র’ আর মিথ্যার বেসাতি বলে যে গালাগাল এসেছে, তার বিবরণ অপ্রাসঙ্গিক। তবে সরকার যে চার চক্ষেই দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের সরষেফুল দেখছে, সেটা দেশবাসীর কাছে এখন স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়েছে।
লেখক : বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply