সর্বশ্রেষ্ঠ সফল ব্যক্তিত্ব হযরত মুহাম্মদ (সা) -মুহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত

সফলতা অর্জনের জন্য মানুষ বহু পদ্ধতি, বহু কৌশল অবলম্বন করে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে সফল ব্যক্তিত্বদের অনুসরণ করা। সফল মানুষদের সবাই অনুসরণ করতে চায়। সফলতা যেখানে যে পদ্ধতিতে, মানুষ ছুটে চলে সেখানে, ধাবিত হয় সেই পদ্ধতি অনুসরণে। সফলতা মানুষের তীব্র আকাক্সিক্ষত বিষয়। মানুষের সামগ্রিক কর্মতৎপরতাই সাফল্যের পেছনে ছুটে চলাকে কেন্দ্র করে হয়ে থাকে। তাইতো মানুষ খুঁজতে থাকেন সফল মানুষদের। পৃথিবীতে যারা সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন তারা সকলের কাছেই গ্রহণীয়, বরণীয় এবং অনুসরণযোগ্য হয়েছেন। মানুষ অনুসরণ করতে চায় এমন ব্যক্তিত্বদের যাদের অনুসরণ করে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে পৌঁছা যায়।
সাফল্যের স্বর্ণশিখরে পৌঁছার জন্য আমরা কতই না সফল ব্যক্তিত্বকে অনুসরণ করি। কত শত সফল ব্যক্তির জীবনী পড়ি। নিজে পড়ি অন্যকেও তা পড়তে, অনুসরণ করতে বলি। মাঝে মধ্যে আমাদের পিতা-মাতাও এমন সফল ব্যক্তিদের কথা শুনিয়ে সে অনুযায়ী আমাদের পথ চলতে বলেন। আমরা আমাদের শিক্ষকদের কাছ থেকে এমন অনেক ব্যক্তিত্বের লেকচার শুনেছি যাদের অনুসরণে এগিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের জীবনী আলোচনা করে আমাদের মোটিভেশন চালানো হয়েছে। আমরাও হরহামেশা লেখনীতে, বক্তব্য বিবৃতিতে বহু সফল ব্যক্তিত্বের উদাহরণ টেনে অন্যকে উপদেশ দিই অনুসরণের। এই সকল উপদেশ, মোটিভেশন সফলতার পানে ছুটে চলা ব্যক্তির জন্য আশাব্যঞ্জক। কিন্তু নিরাশার দিক হলো, আমরা যাদের জীবনী পড়ে, যাদের সফলতার উদাহরণ টেনে সাফল্যের মোটিভেশন চালাই তাদের সফলতা জীবনের পূর্ণাঙ্গ দিকে না হয়ে কোন না কোন একটা দিকে তারা সফলতার স্বাক্ষর রাখলেও তারাই আমাদের গোটা জিন্দেগির অনুসরণীয় সফল ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিগণিত হয়ে যান।
আমাদের অনেকেরই টেবিলে এ ধরনের অনেক সফল ব্যক্তিত্বের বইয়ের সমাহার থাকে। একবার আমি আমার এক বন্ধুর টেবিলে সফল ব্যক্তিদের জীবনীমূলক অনেক বইয়ের স্তূপ দেখে কৌতূহলবশত সবগুলো বই হাতে নিয়ে দেখলাম। বিশ্বের নামীদামি অনেক সফল ব্যক্তিত্বের বই ছিল সেখানে। বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম সফল ব্যক্তিত্ব এবং মনীষীদের এত্তসব বই সংগ্রহের উদ্দেশ্য কী? প্রত্যাশিত উত্তরই পেলাম তার কাছে, এসব সফল ব্যক্তিত্বের অনুসরণে জীবনটাকে সফল করতে চায় সে। আমার বন্ধুটির কাছে জানতে চাইলাম আচ্ছা বন্ধু, সর্বশ্রেষ্ঠ সফল ব্যক্তিত্ব কে? যার জীবনে কোনো ব্যর্থতা ছিল না, যিনি সর্বক্ষেত্রেই সফল ছিলেন, যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, যাকে নির্দ্বিধায় অনুসরণ করা যায়? আমার বন্ধুটি কিছুক্ষণ চিন্তা করেই জবাব দিল এমন সফল ব্যক্তিত্বতো একজনই তিনি হলেন সর্বশেষ নবী মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সা)। বন্ধুকে শেষ প্রশ্নটি করলাম সত্যই যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে টেবিলে রাখা সফল ব্যক্তিদের বইয়ের সারিতে হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর সিরাতগ্রন্থ বা জীবনীমূলক বই নেই কেন? আমার বন্ধুটি এ প্রশ্নে খানিকটা বিব্রত হলো, মাথা নিচু করে বলল, আসলে বিষয়টিতো সেভাবে ভাবিনি।
যিনি জীবনের সব দিকেই ছিলেন সফল, সব বিভাগেই ছিলেন শ্রেষ্ঠ। যিনি তার শৈশব, কৈশোর, যৌবন-বৃদ্ধ- সব বয়সেই অনুকরণীয়। যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ সফল ব্যক্তিত্ব এবং সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। আমরা বিষয়টি শতভাগ মুখে স্বীকার এবং অন্তরে বিশ^াস করলেও তাঁকে অনুসরণ করতে আমরা অনেকেই ভুলেই যাই। তার জীবনালেখ্য দিয়ে সফল জীবনের চিত্র অঙ্কন করতে আমরা অনেকেই পিছপা হই। আমাদের বক্তব্য বিবৃতি লেখনীতে আমরা তাঁর উদাহরণ টেনে আনতে শঙ্কোচ বোধ করি। কী দুর্ভাগ্য আমাদের! আমাদের পিতা-মাতাও তার জীবনী থেকে উদাহরণ আমাদের কমই দেন। শিক্ষকরা ক্লাসে যত বেশি পারেন বিভিন্ন সফল ব্যক্তিত্বের উদাহরণ দেন কিন্তু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উদাহরণ খুব কমই সামনে আনেন। তাহলে যাকে আমরা সর্বশ্রেষ্ঠ সফল ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকার করি তাকে অনুসরণ না করে কিভাবে আমরা সফল হওয়ার স্বপ্ন দেখি!
জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের জীবন। মানুষের জীবনের ব্যাপ্তি খুবই ছোট এবং সংক্ষিপ্ত সময়ের। পৃথিবীর বয়স যত বাড়ছে মানুষের গড় আয়ু তত কমছে। ক্ষুদ্র জীবনেও সফল হওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষা আর সুন্দর স্বপ্ন আমাদের। ক্ষুদ্র এই জীবনে মানুষকে সফলতার সিংহাসনে আরোহণ করতে হলে বহু বাধা অতিক্রম করতে হয়। পার হতে হয় নানা সময়ে নানা সঙ্কট। জন্মের পর থেকেই মানুষকে প্রতিবন্ধকতা টপকাতে হয়। শিশু-কৈশোর, তরুণ-যুবক, বৃদ্ধÑ এই সব বয়সের গণ্ডিতে নানা বাধা প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়েই মানুষকে সফলতার স্বাদ গ্রহণ করতে হয়। একটি কথা আছে, মানুষের জীবনের যত বাঁক, বাধা প্রতিবন্ধকতার তত হাঁক। এই বাধা প্রতিবন্ধকতার হাঁক-ডাক মাড়িয়েই মানুষকে সফলতার মঞ্জিলে পৌঁছতে হয়। কিন্তু যদি বলা হয় শিশু, কৈশোর তরুণ যুবক, বিবাহিত জীবন, বৃদ্ধ এবং মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি ধাপেই সফল ছিলেন শ্রেষ্ঠ ছিলেন এমন একজন ব্যক্তিত্বের নাম বলো। হিসাব করে বললে দেখা যায়, সচরাচর আমরা যাদের নাম বলি তারা কোনো একটি সময়ে কোনো একটি বয়সে কোনো এক বিষয়ে সফল ছিলেন। কিন্তু সব বয়সে সব সময়ে যিনি সফল ছিলেন, সব দিক থেকেই যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ সফল ব্যক্তিত্বের অধিকারী তিনি হলেন সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা)।
পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকে এ পর্যন্ত যত বীর-মহাবীর, নেতা-মহানেতা, রাজা-মহারাজা, সমাজসংস্কারক ও সফল ব্যক্তিত্বের আগমন ঘটেছে, এঁদের সবাই সভ্যতার বিভিন্ন অংশে অসামান্য অবদান রেখেছেন। পৃথিবীতে তাদের বহু অমর কীর্তি স্থাপিত হয়েছে তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এসব ব্যক্তি বহু জীবনদর্শন দিয়ে মানবজাতির উন্নয়নের জন্য কাজ করেছেন। এসব সফল ব্যক্তির অনুসরণ করেও অনেকেই সফলতার স্বর্ণশিখরে আরোহণ করেছেন। কিন্তু সফল এসব ব্যক্তিত্বের অবদান, চেষ্টা-সাধনা ও কৃতিত্ব অনেকাংশেই পূর্ণতা পায়নি। বরং তা ছিল আংশিক, অপরিপূর্ণ, জীবনের কোনো একটি বিষয়ে, কোনো একটি সময়ে বা ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু ইতিহাসে হযরত মুহাম্মদ (সা) এমনই একজন মাত্র ব্যক্তি ছিলেন যিনি জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সর্বত্র সফলতা ও কৃতিত্ব দিয়ে মানবজীবনের জন্য আদর্শ হয়ে রয়েছেন। তাঁর সফলতার এ অবদান শুধু ব্যক্তিজীবনেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং ব্যক্তিজীবন, সমাজজীবন, রাষ্ট্রীয়জীবন তথা সর্বক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সফল ব্যক্তিত্ব। একটি সুন্দর বসুন্ধরা বিনির্মাণে, একটি সফল ব্যক্তিত্বপূর্ণ জীবনগঠনে, পরিপূর্ণ অবদান, কীর্তি এবং দর্শন রয়েছে শুধুমাত্র তাঁর জীবনেই।
অসংখ্য সফল ব্যক্তিত্বের জীবনী আমাদের সামনে রয়েছে। তাদের বহু সাফল্যের নজিরও রয়েছে আমাদের সামনে। কিন্তু এর কোনো একটিই মানুষের পরিপূর্ণ জীবনটাকে বদলায়নি। এর কোনো একটিই কোন ব্যক্তির জীবনে পূর্ণাঙ্গ সফলতা এনে দেয়নি। বরং প্রতিটি ঘটনাই আংশিক বা কিয়দাংশ সফলতার মুখ দেখেছে। সফল ব্যক্তিদের প্রতিটি সাফল্যই ব্যক্তিকে পুরো না বদলিয়ে বা ভেতর থেকে না বদলিয়ে শুধু বাইরের পরিবেশটা বদলানোর চেষ্টা করেছে। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর সাফল্যের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, মানুষ ভেতর থেকে বদলে গিয়েছিল। শুধু বদলে যায়নি বরং তাদের পূর্ণাঙ্গ জীবনে সংঘটিত হয়েছিল আমূল পরিবর্তন। রাসূলের অনুসরণে একটি জাহেলি সমাজ আমূল পরিবর্তন হয়ে কল্যাণমুখী সমাজে পরিণত হলো। হযরত ওমর (রা)-এর মত দোর্দণ্ড প্রতাপশালী দাম্ভিক মানুষটি হয়ে গেলেন বিনয়ী সত্যনিষ্ঠ মানুষ। আওস এবং খাজরাজ গোত্রের দীর্ঘ ৪০ বছরের খুনকা বদলা খুনের নীতি পরিবর্তন হয়ে তারা হয়ে গেলেন পরস্পরের কল্যাণকামী। উচ্ছৃঙ্খল, মদখোর, হতাশ, যুবকেরা রাসূল (সা)-এর মত ব্যক্তিত্বের অনুসরণে বিলাসী জীবনের মুখে পদাঘাত করে আদর্শিক জীবনযাপন করতে শুরু করলেন। একটি বিধ্বস্ত ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে এলো আলোকিত একটি সমাজ। এমন সর্বশ্রেষ্ঠ সফল ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা) ছাড়া আর কে হতে পারেন?
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই সফল এবং শ্রেষ্ঠ ছিলেন। ছোটবেলা থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত রাসূল (সা)-এর জীবনের প্রতিটি ধাপই আমাদের জন্য অনুকরণীয় এবং অনুসরণীয়। ছোটবেলায় শিশুদের মধ্যে রাসূল (সা) ছিলেন আদর্শ শিশু। কারণ তিনি কখনো খেলার ছলেও শিশুদের আঘাত করেননি। রাসূল (সা) যখন কিশোর বয়সে উপনীত হন তখন তিনি আরবের জাহেলি সমাজের চিত্র দেখে ব্যথিত হন। সে সময়কার গোত্রে গোত্রে দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ বিগ্রহসহ বিধ্বস্ত সমাজের করুণ চিত্র রাসূল (সা) উপলব্ধি করেন। কিশোর হওয়ার পরও তিনি সবাইকে সাথে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। কিশোর হয়েও সফল হন তিনি। প্রতিষ্ঠা করেন হিলফুল ফুজুল সংগঠন। ২৫ বছর বয়সে আরবের ধনাঢ্য মহিলা হযরত খাদিজা (রা)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। হজরত খাদিজা (রা) ব্যবসার সকল দায়িত্ব রাসূল (সা)-এর ওপর অর্পণ করেন। রাসূল (সা) দক্ষতার সাথে সে দায়িত্ব পালন করেন। রাসূল (সা)-এর হাত ধরে ব্যবসার ব্যাপক উন্নতি হয়। সে হিসেবে রাসূল (সা) একজন সফল ব্যবসায়ীও বটে। ৪০ বছর ধরে চলা আওস এবং খাজরাজ গোত্রের দ্বন্দ্বের অবসান ঘটান রাসূল (সা)। কাবাঘর মেরামতের সময় হাজরে আসওয়াদ কারা স্থাপন করবে এ নিয়ে সৃষ্ট সংঘাত ও উত্তেজনা রাসূল (সা) সফলতার সাথেই সমাধান করেন।
৪০ বছর বয়সে নবুওয়ত লাভের মাধ্যমে রাসূল (সা)-এর শ্রেষ্ঠত্ব আরো বেশি উদ্ভাসিত হয়। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র প্রতিটি জীবনেই রাসূল (সা) একজন শ্রেষ্ঠ সফল ব্যক্তিত্ব। ব্যক্তিজীবনে তিনি মহানুভব, পরোপকারী, দয়ালু, দানশীল ও হৃদয়বান। পারিবারিক জীবনে তিনি শ্রেষ্ঠ শিশু, শ্রেষ্ঠ কিশোর, শ্রেষ্ঠ যুবক, শ্রেষ্ঠ স্বামী, শ্রেষ্ঠ পিতা। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে একাধারে তিনি শ্রেষ্ঠ সফল রাষ্ট্রনায়ক, শ্রেষ্ঠ সমাজসংস্কারক, শ্রেষ্ঠ সেনাপতি, শ্রেষ্ঠ সমরবিদ, শ্রেষ্ঠ কৌশলী, শ্রেষ্ঠ দার্শনিক, শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী। মদিনায় রাষ্ট্রগঠনে রাসূলের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। মদিনা সনদ প্রণয়ন করে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা রক্ষায় তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। যুদ্ধ-বিগ্রহে বিজয়ী হয়ে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। হুদাইবিয়ার সন্ধির মাধ্যমে তিনি সাফল্যের নব দিগন্ত উন্মোচিত করেছেন। মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তিনি সাফল্যের ষোলোকলা পূর্ণ করেছেন। এভাবে তার জিন্দেগির প্রতিটি ধাপের শ্রেষ্ঠত্ব ও সফলতা বর্ণনা করে সহজেই শেষ করা যাবে না।
রাসূল (সা)-এর সিরাত বা জিন্দেগি আমরা যে উদ্দেশ্য নিয়ে পড়ি তাতে শুধু আবেগতাড়িত হই। কারো ক্ষেত্রে এ আবেগ রাসূল (সা)কে জানতে উদ্বুদ্ধ করে মানতে নয়। এমন মুসলমানদের সংখ্যা নেহাত কম নয় যারা শুধু সওয়াব হাসিল করার জন্যই সিরাত তথা রাসূল (সা)-এর জীবনীচর্চার আগ্রহ পোষণ করে থাকে। কোথাও কোথাও খুবই ধুমধামের সাথে মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে, কোথাও মিষ্টি মণ্ডা বিতরণ, কোথাও ফুলের ছড়াছড়ি, কোথাও আগরবাতি ও আতর-লোবানের মাত্রাতিরিক্ত ছড়াছড়ি এবং কোথাও বিচিত্র আলোকসজ্জা দ্বারা উক্ত বিশ্বাসেরই অভিব্যক্তি ঘটে। দুর্ভাগ্যবশত, এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রেরণা নিয়ে রাসূল (সা)-এর জীবনী অধ্যয়ন করাতে আমরা খুব কমই সফল হচ্ছি। রাসূলের জীবনী থেকে জীবনের প্রতিটি ধাপের অনুসরণ করে তদনুসারে জীবনকে গড়ে তুলতে হবে- এরূপ মনোভাব দ্বারা আমরা উদ্বুদ্ধ হচ্ছি না। ফলে জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা সাফল্যও পাচ্ছি না। এ কথা অনস্বীকার্য যে, মানুষ হয়েও তিনি এমন অতুলনীয় সাফল্যমণ্ডিত জীবনের নমুনা পেশ করেছেন যা সমগ্র মানবজাতির জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। তাঁর জীবনে ছিল অনেক গুণের সমাহার। তার শ্রেষ্ঠত্বের কারণ এই যে, তার দৃঢ়তা-সাহসিকতা, নীতি-আদর্শ, কোরবানি-আত্মত্যাগ, দায়িত্বসচেতনতা, মানবতার সেবাসহ সামগ্রিক কাজই ছিল মানবতার কল্যাণে। তাইতো তিনি সফল হয়েছেন সর্বক্ষেত্রে, গড়েছেন এক পুণ্যময় জীবন যা আমাদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে রয়েছে এবং তাঁর মধ্যে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় আদর্শ রয়েছে।
আপনার প্রিয় ব্যক্তিত্ব কে? এমন প্রশ্নের জবাবে বহু লোককেই দেখেছি যারা তাদের প্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে হযরত মুহাম্মদ (সা)-কেই বেছে নেন। কিন্তু সামগ্রিক জীবনে হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর আদর্শ তারা অনুসরণ করেন না। তাদের জীবনাচরণ দেখলে সামান্যটুকুও বলার সুযোগ নেই যে, অমুকের ব্যক্তিত্ব হযরত মুহাম্মদ (সা)। এ সকল ব্যক্তি প্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে রাসূলকে মনোনীত করেন ঠিকই কিন্তু তার জীবনাদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন না। অথচ হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর জীবনাদর্শ থেকে সমভাবে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে একজন রাষ্ট্রনায়ক, একজন প্রশাসক, একজন শাসনকর্তা, একজন মন্ত্রী, একজন কর্মকর্তা, একজন মনিব, একজন চাকুরে, একজন ব্যবসায়ী, একজন শ্রমিক, একজন বিচারক, একজন শিক্ষক, একজন সেনাপতি, একজন বক্তা, একজন নেতা, একজন সংস্কারক, একজন দার্শনিক এবং একজন সাহিত্যিকও। সেখানে একজন পিতা, একজন সহযাত্রী ও একজন প্রতিবেশীর জন্য একই রকম অনুকরণীয় আদর্শ রয়েছে। মানুষ তার জীবনটিকে সাফল্যমণ্ডিত করতে যে সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম উৎকর্ষ অর্জন করা প্রয়োজন তার সবই আছে রাসূল (সা)-এর ব্যক্তিত্বে। এ জন্যই তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ সফল ব্যক্তিত্ব। সমগ্র মানবেতিহাসে অনুসরণীয় ‘শ্রেষ্ঠমানুষ’ কেবল এই একজনই।
রাসূল (সা) যে অনুকরণীয় অনুসরণীয় সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব তার ঘোষণা মহাগ্রন্থ আল কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা দিয়েছেন। প্রজ্ঞাময় মহান আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় তোমাদের জন্য রাসূল (সা)-এর জীবনেই রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ। (সূরা আহজাব : ২১) রাসূল (সা) যে সর্বশ্রেষ্ঠ সফল ব্যক্তিত্ব ছিলেন তা সবসময়ই আলোচিত এবং স্বীকৃত। আল্লাহ মানুষের হেদায়েতের জন্য পৃথিবীতে যত নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন, তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং তিনিই পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সফল ব্যক্তিত্ব, সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। মুসলমানতো বটেই, দুনিয়ার প্রায় সব অমুসলিম মনীষী, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, ঐতিহাসিকবেত্তা, গবেষক সকলেই সর্বশ্রেষ্ঠ সফল ব্যক্তি হিসেবে সাইয়েদুল মুরসালিন মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা)কে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দিয়েছেন তাদের বক্তব্য বিবৃতি লেখনীতে। আজকের এই অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে সফল জীবন গঠন করার জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ সফল ব্যক্তিত্ব হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর প্রকৃত অনুসরণের বিকল্প নেই।
লেখক : এমফিল গবেষক

SHARE

Leave a Reply