সশস্ত্রবাহিনীর অফিসার পদে দুঃসাহসিক ক্যারিয়ার -মুহাম্মদ ওমর গনি

[ তৃতীয় পর্ব ]

প্রথম দিনের কার্যক্রম

নিয়োগপ্রক্রিয়ার প্রাথমিক নির্বাচন ও লিখিত পরীক্ষার বৈতরণী পেরিয়ে যারা আইএসএসবিতে আসবেন, তাদের প্রথম দিন সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যে উপস্থিতি নিশ্চিত (রিপোর্ট) করতে হবে। এরপর তাদেরকে একটি স্বাগত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে চার দিনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পর্কে একটি ধারণা দেওয়া হয়। প্রথম দিনের সকালে বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষা (Intelligence Test)  এবং চিত্র প্রত্যক্ষকরণ ও বর্ণনাকরণ পরীক্ষার (Picture Perception and Description Test) মাধ্যমে কাজ শেষ হয়। স্ক্রিনিং টেস্টে উত্তীর্ণ প্রার্থীরা অতঃপর বিকেলে ব্যক্তিত্ব অভীক্ষায় অংশ নেবেন। এ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থীর মনোস্তাত্ত্বিক দিকসমূহ দেখা হয়। বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষা হয় বাচনিক (verbal) ও অবাচনিক (non-verbal) আঙ্গিকে। এতে এমসিকিউ (MCQ) ধরনের প্রশ্ন থাকে যা ওএমআর (OMR) এর মাধ্যমে যাচাই করা হয়ে অবাচিকে নানা ছবি/চিহ্ন দিয়ে প্রশ্ন করা হয়ে থাকে। একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নে নির্ধারিত সময়ে এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের নিয়মাবলি প্রার্থীদেরকে বিস্তারিতভাবে বুঝিয়ে দেয়া হয়। বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষায় যারা ন্যূনতম পাস নম্বর পাবেন না, তাদেরকে স্ক্রিন্ড আউট করা হয়। বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীরা পরবর্তী ধাপের চিত্র প্রত্যক্ষকরণ ও বর্ণনাকরণ পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন। এ পরীক্ষায় আংশিক অস্পষ্ট চিত্র প্রজেক্টরের মাধ্যমে দেখানো হয় এবং সেই ছবি দেখে প্রার্থীদের কল্পনামতো গল্প লিখতে বলা হয়। পরবর্তীতে নির্বাচকমন্ডলীর উপস্থিতিতে প্রার্থীরা নিজেদের লেখা গল্প নিয়ে দলগত আলোচনা করেন। এ ধাপেও আশানুরূপ ফলাফলে ব্যর্থ প্রার্থীদেরকে স্ক্রিন্ড আউট করা হয়। অবশিষ্ট প্রার্থীরা পরবর্তী তিন দিনের সম্পূর্ণ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অংশ নেবেন। স্ক্রিনিং টেস্টে উত্তীর্ণ প্রার্থীরা বিকেলে ব্যক্তিত্ব অভীক্ষায় অংশ নেবেন। এ লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থীর মনোস্তাত্ত্বিক দিকসমূহ দেখা হয়। এ পরীক্ষায় প্রার্থীরা বাংলা ও ইংরেজিতে বাক্য সমাপনী (Sentence Completion Test),ইংরেজিতে বাক্য রচনা (Word Association Test),বাংলা ও ইংরেজিতে ছবি দেখে গল্প লিখন (Thematic Appreciation Test)  এবং আত্মবিবরণী (Self Description) অভীক্ষায় অংশগ্রহণ করে থাকে। এ ছাড়াও বাংলা ও ইংরেজিতে দু’টি রচনা লিখতে হয়।
দ্বিতীয় দিনের কার্যক্রম

দলগত পরীক্ষার জন্য সাত-আটজন প্রার্থীকে নিয়ে আলাদা আলাদা দল গঠন করা হয়। এখানে নির্বাচক থাকবেন দল নিরীক্ষা কর্মকর্তারা (GTO)। এ দিন পাঁচটি ধাপে পরীক্ষা হয়। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থীদের দলগত কাজের ক্ষমতা ও শারীরিক দক্ষতা যাচাই করা হয়ে থাকে। প্রথমেই- দলগত আলোচনা (Group Discussion)। এ পর্বে বাংলা ও ইংরেজিতে দু’টি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর আলোচনা করতে হয়। তারপর প্রোগ্রেসিভ গ্রুপ টাস্ক (PGT) পর্বে একটি দলকে পর্যায়ক্রমে চারটি বাধা বা প্রতিবন্ধকতা পার করে এগিয়ে যেতে হয়। এরপর অর্ধ দলগত কাজ(HGT) গঠিত হয় তিন-চারজন প্রার্থীকে নিয়ে। এতে একটি বাধা অতিক্রম করতে হয়। পরবর্তীতে প্রার্থীগণ ইংরেজিতে উপস্থিত বক্তৃতায় অংশ নেয়। দ্বিতীয় দিনে গ্রাউন্ডে ব্যক্তিগত প্রতিবন্ধকতা (Individual Obstacle)হচ্ছে শেষ পরীক্ষা। এখানে একজন প্রার্থীকে একাকী আটটি আইটেম অতিক্রম করত হয়। এতে আইটেম হিসেবে রয়েছে- দীর্ঘ লম্ফ (Long Jump), জিগজ্যাগ (Zig Zag),, ওয়াল জাম্প (Wall Jump), উচ্চ লম্ফ (High Jump), বার্মা সেতু (Burma Bridge), টারজান সুইং (Tarzan Swing), রশি আরোহণ  (Rope Climbing) এবং ঝুলন্ত কাঠের গুঁড়ি (Swinging Log) থাকে। দ্বিতীয় দিনের সর্বশেষ ইভেন্ট হলো সাক্ষাৎকার (Interview)। মুক্ত ও অবাধ এ সাক্ষাৎকারে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ও পরিবারের তথ্যাদি এবং তার শিক্ষাগত বিষয়াদি সম্পর্কিত আলোচনা হয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমসাময়িক প্রেক্ষাপট নিয়েও বাক্যালাপ হয়ে থাকে। একজন ডেপুটি প্রেসিডেন্ট একজন প্রার্থীর সাক্ষাৎকার নিয়ে থাকেন।

তৃতীয় দিনের কার্যক্রম

সকালে পরিকল্পনাকরণ (Planning Exercise),, নেতৃত্বকাজ (Command task), পারস্পরিক সমঝোতা মূল্যায়ন(Mutual Assessment Test) এবং শেষে সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে দিনটির কার্যক্রম সমাপ্ত হয়। প্ল্যানিং এক্সসারসাইজে একটি গল্পের মধ্যে বেশ কিছু সমস্যা তুলে করা থাকে। প্রার্থীদের সমস্যাবলি চিহ্নিত করে সমাধান করতে হয়। কমান্ড টাস্কে প্রত্যেক সদস্যকে তিন-চারজনের একটি গ্রুপের দলনেতা বানানো হয়। তাকে পুরো দল নিয়ে একটি বাধা নির্দিষ্ট সময়ে অতিক্রম করতে হয়। পারস্পরিক সমঝোতা মূল্যায়ন পর্বে প্রার্থীদের বিচারিক ক্ষমতা যাচাই করা হয়। এখানে একজন প্রার্থী নিজেকেসহ তার দলের অন্য প্রার্থীদের সেরা তালিকা করতে বলা হয়। এরপর অবশিষ্ট প্রার্থীদের (যাদের সাক্ষাৎকার হয়নি) সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে শেষ হয় তৃতীয় দিনের কার্যক্রম।
শেষ দিনের কার্যক্রম

শেষদিন কোন পরীক্ষা থাকে না। নির্বাচকমন্ডলী প্রত্যেক প্রার্থীর বিগত তিন দিনের কার্যক্রম পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা, বিশ্লেষণ এবং মূল্যায়ন করে থাকেন। তারপর নির্বাচিত ও প্রত্যাখ্যাতদের ফলাফল আইএসএসবি প্রেসিডেন্টের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠাবেন। নির্বাচিত প্রার্থীদেরকে সবুজ কার্ড দেয়া হয়। আর প্রত্যাখ্যাতদেরকে দেয়া হয় লাল কার্ড। সবুজ কার্ডটিতে উল্লেখিত তারিখ থেকে এক বছর পর্যন্ত থাকে এ ফলাফলের মেয়াদ। এরপর প্রার্থীদেরকে স্ব-স্ব বাহিনীর প্রথানুযায়ী চিকিৎসা পরীক্ষা (Medical Test)  করাতে হয়। মেডিক্যাল টেস্টে উত্তীর্ণ প্রার্থীদেরকে নিজ নিজ বাহিনী হতে যোগদান নির্দেশিকা প্রদান করা হয়। অন্য দিকে প্রথমবার স্ক্রিন্ড আউট অথবা প্রত্যাখ্যাত প্রার্থীরা প্রথানুযায়ী দ্বিতীয়বার সুযোগ নিতে পারবেন। তবে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পাঁচ মাস এবং স্ক্রিন্ড আউট হওয়ার চার মাসের মধ্যে সেই প্রার্থী আইএসএসবিতে আসতে পারবেন না।

পরিশিষ্ট
প্রার্থীদেরকে প্রেরিত কলআপ লেটারে আইএসএসবি’তে অবস্থানকালীন চার দিনের প্রস্তুতি সম্পর্কে বিস্তারিত বলা থাকে। যেমন, প্রার্থীদেরকে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার মূল সনদপত্র, প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য জিনিসপত্র, লেখার সরঞ্জামাদি (২বি পেন্সিলসহ), পরিধেয় বস্ত্রাদি ইত্যাদি অবশ্যই সঙ্গে নিতে হয়। অন্য দিকে ক্যামেরা, অডিও/ভিডিও, ছুরি, মোবাইল ফোন, পোষা প্রাণী, নেশাজাতীয় দ্রব্য/পণ্য, আগ্নেয়াস্ত্র এবং সরকারের নিষিদ্ধ জিনিসপত্র সাথে আনা যাবে না। এ ছাড়াও মূল্যবান কোনো কিছু সঙ্গে আনা যাবে না। উল্লেখ্য, আইএসএসবি’র ওয়েবসাইটwww.issb-bd.orgএ প্রয়োজনীয় প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা আছে। আগ্রহী প্রার্থীরা প্রয়োজনে ই-মেইল করতে পারেন info@issb-bd.orgঠিকানায়। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে অনেক প্রার্থী আইএসএসবি’তে নির্বাচন সংক্রান্ত বিবিধ কোচিং করে নানা বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েন। এতে করে অনেকেই নিজেদের স্বাভাবিক যোগ্যতা অনুযায়ী ফলাফল অর্জনে ব্যর্থ হন। মূলত আইএসএসবিতে নির্বাচনের জন্য কোচিংয়ের প্রয়োজন হয় না। তবে ISSB  তে কী কী ঘটে সে সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়ার জন্য কোচিংয়ের সাহায্য নেয়া যেতে পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে যেন, কোচিং এ শেখানো সবকিছু মুখস্থ উগড়ে দিয়ে আসা না হয়। সে ক্ষেত্রে সহজেই বাদ পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। পরিশেষে, সশস্ত্রবাহিনীতে যোগ দেয়ার স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি সে স্বপ্ন পূরণে প্রার্থীদেরকে আন্তরিক ও সচেষ্ট হতে হবে। সৎ, সাহসী, প্রাণচঞ্চল, কর্মঠ এবং আত্মত্যাগী তরুণ-তরুণীদের জন্য একটি সম্ভাবনাময় কর্মসংস্থান হতে পারে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনী।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর একটি শাখা। এই বাহিনী বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পরে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাঙালি সেনা ও মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয়।

ঘ) চূড়ান্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা : আইএসএসবি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদেরকে চূড়ান্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে।
ঙ) চূড়ান্ত নির্বাচন এবং যোগদান নির্দেশিকা : স্বাস্থ্য পরীক্ষায় চূড়ান্ত যোগ্যতা অর্জন সাপেক্ষে প্রার্থীদেরকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত ঘোষণা করা এবং পরবর্তীতে স্ব স্ব বাহিনী কর্তৃক যোগদান নির্দেশিকা প্রদান করা হয়।
ব্যক্তিগত বাধা অতিক্রম : পরীক্ষায় ভাল করার জন্য এক ধরনের প্রস্তÍুতি দরকার। এ ক্ষেত্রে পরীক্ষার্থীকে ২ মিনিট ৩০ সেকেন্ড সময়ের মধ্যে ৮টি বাধা অতিক্রম করতে হয়। এগুলো হলো- উচ্চ লম্ফ (চার ফুট উচ্চতা), দীর্ঘ লম্ফ (নয় ফুট), টারজান সুইং, বার্মা ব্রিজ, উপরে ঝুলানো টায়ারের মধ্যে দিয়ে পার হওয়া, মানকিজ রোপ, Jig jug obstacle। এই বাধাসমূহে পাস করার জন্য শারীরিকstamina সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় কৌশলের প্রসঙ্গ বাদ দিলেও এই আড়াই মিনিট সময় পরিপূর্ণরূপে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন প্রার্থীর শারীরিক staminaবৃদ্ধি। সে জন্য প্রত্যহ কমপক্ষে ২ মাইল জগিং করা দরকার।
Presidential viva-
এতে ভালো করার জন্য সুন্দরভাবে কথা বলার দক্ষতা রপ্ত করতে হবে। ভাইভাতে জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ঠিকভাবে বুঝে অল্প কথায় সঠিক উত্তর দিতে হবে। ISSB পরীক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ অংশে ভালো করার জন্য সাম্প্রতিক ঘটনাবলি, বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের উপরে পড়াশোনা করতে হয়।
সশস্ত্রবাহিনীতে চাকরি পাওয়ার যোগ্যতা অর্জনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তÍুতি নেয়া প্রয়োজন। একই সাথে যেমন শারীরিক প্রস্তুতি দরকার পাশাপাশি ভাষার ওপরে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এ জন্য প্রার্থীকে বাংলা এবং ইংরেজি উভয় ভাষায় লেখ্য ও কথ্য উভয় দিকেই যোগ্যতা বৃদ্ধি করার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা দরকার। এর জন্য জ্ঞান বৃদ্ধির পাশাপাশি অনুশীলন চালিয়ে যাওয়া দরকার নিষ্ঠার সাথে।

সেনাবাহিনীর বিভাগ বা কোরসমূহ :
সেনাবাহিনীর বিভাগ বা কোরগুলোর নাম খুব সংক্ষিপ্ত এবং সহজবোধ্য করে নিচে দেয়া হলো :
আর্মড ট্যাঙ্ক বা সাঁজোয়া বাহিনী
আর্টিলারি কামান বা গোলন্দাজ বাহিনী
সিগন্যালস- এরা ওয়্যারলেস, টেলিফোন, রাডার ইত্যাদির মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন ও রক্ষা করে।
ইঞ্জিনিয়ার্স- এরা যাবতীয় ইঞ্জিনিয়ারিং কাজ ছাড়াও পদাতিক বাহিনীর কাজও করতে সক্ষম।
ইনফ্যান্ট্রি পদাতিক বাহিনী
অর্ডিন্যান্স যুদ্ধ ও শান্তিকালীন সময়ে ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন সাজসরঞ্জাম, পোশাক, নিত্য ব্যবহারের দ্রব্যসামগ্রী সরবরাহ করে।
আর্মি সার্ভিস কোর : এরা সেনাবাহিনীর ফ্রেশ এবং ড্রাই রেশন, গাড়ি, চলাচলের তেল ইত্যাদি সরবরাহ করে।
এএমসি (আর্মি মেডিক্যাল কোর) : সেনাসদস্য ও তার পরিবারের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করে।

ইএমই (ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোর) : বিভিন্ন ধরনের যন্ত্র তৈরি ও গাড়িসহ অন্যান্য বিভিন্ন যন্ত্র ও যন্ত্রাংশের মেইন্ট্যানেন্সের কাজ করে।
এইসি (আর্মি এডুকেশন কোর) : সেনাবাহিনীর বিভিন্ন স্কুল ও প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করে।
মিলিটারি পুলিশ : এরা সেনানিবাসের ভেতর পুলিশিং, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি কাজে নিয়োজিত থাকে।

এ ছাড়াও আর্মি ডেন্টাল কোর, রিমাউন্ড ভেটেরিনারি অ্যান্ড ফার্ম কোর, ক্লারিক্যাল কোর ইত্যাদি আরও কিছু ছোটখাটো কোর বা বিভাগ রয়েছে।
সেনাবাহিনীর পদবিসমূহ :
সেনাবাহিনীতে মূলত তিনটি ক্যাটাগরি রয়েছে :
নন কমিশন্ড অফিসার (এনসিও) ও অন্যান্য পদবি
সৈনিক
ল্যান্স কর্পোরাল
কর্পোরাল
সার্জেন্ট

জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার (জেসিও)
ওয়ারেন্ট অফিসার
সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার
মাস্টার ওয়ারেন্ট অফিসার
অনারারি লেফটেন্যান্ট
অনারারি ক্যাপ্টেন

অফিসার
সেনাবাহিনীতে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট থেকে জেনারেল পর্যন্ত মোট ১০টি পদ আছে।
সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট
ক্যাপ্টেন
মেজর
লেফটেন্যান্ট কর্নেল
কর্নেল
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল
মেজর জেনারেল
লেফটেন্যান্ট জেনারেল
জেনারেল

অফিসার হতে হলে যে যোগ্যতাসমূহ থাকতে হয় :
একজন সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট সেনাবাহিনীর সবচেয়ে জুনিয়র র‌্যাঙ্কের কমিশন্ড কর্মকর্তা। এ জন্য তাকে মিলিটারি একাডেমিতে চার বছরের প্রশিক্ষণ সফলতার সাথে শেষ করার পাশাপাশি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ প্রফেশনাল থেকে গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করতে হয়। তবেই তার নাম কমিশন্ড অফিসার হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়।
সাধারণত সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট থেকে লেফটেন্যান্ট হতে এক বছর সময় লাগে। যোগ্যতা অর্জন ও পদোন্নতি পরীক্ষায় পাস সাপেক্ষে তিন বছর চাকরি সম্পন্ন হলে ক্যাপ্টেন পদে পদোন্নতি হয়। একইভাবে সাধারণত যোগ্যতা অর্জন ও পদোন্নতি পরীক্ষায় পাস সাপেক্ষে আট বছর চাকরি সম্পন্ন হলে মেজর পদে পদোন্নতি হয়। লেফট্যানেন্ট কর্নেল এবং পরবর্তী পদবিসমূহ মেজর জেনারেল এবং তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত পদোন্নতি পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত হয়। অর্থাৎ মেজর থেকে লেফট্যানেন্ট কর্নেল এবং তদূর্ধ্ব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট যোগ্যতা অর্জন করা ছাড়াও উক্ত বোর্ডের অনুমোদন লাগবে।
কারা কিভাবে সেনা অফিসার হয় তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াও আরো যা যা লাগে :
মূলত এইচএসসি পাসের পর একজন সেনাকর্মকর্তা হবার জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতা থাকা সাপেক্ষে আবেদন করতে পারে। এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের সেনা অফিসারদের মধ্যে একটি বড় অংশই আসে ক্যাডেট কলেজ থেকে। কিন্তু এর মানে এই না যে ক্যাডেট কলেজে পড়লেই সেনা অফিসার হতে পারবে। বাংলাদেশের ক্যাডেট কলেজগুলো থেকে প্রতি বছর আনুমানিক কম বেশি ৬০০ (১২টি ক্যাডেট কলেজে প্রতি ব্যাচে ৫০ জন করে) জন যদি পাস করে বের হয়, এর মধ্যে আর্মিতে সুযোগ পায় কিন্তু গড়ে মাত্র ৮০-১০০ জন। কারণ প্রতি ব্যাচে অফিসার হিসেবে বাকি ৫০০ জন কিন্তু অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে।
এছাড়া বাকি অফিসাররা আসেন দেশের অন্যান্য বেসামরিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে। কাজেই সেনা অফিসার হতে গেলে এই সব মেধাবী ছেলেমেয়ের সাথে প্রতিযোগিতায় নামতে হবে আপনাকে। এখানে বুয়েট, মেডিক্যাল বা অন্যান্য ভর্তি পরীক্ষার সাথে পার্থক্য এটাই যে শুধুমাত্র মেধার বিচারে সেনা অফিসার নির্বাচন করা হয় না। মেধা অবশ্যই অনেক বড় একটা ফ্যাক্টর কিন্তু এর সাথে আরও অনেক বিষয় বিবেচনা করা হয়।

সেনা অফিসার হতে বিএমএ’তে ক্যাডেট হিসেবে সুযোগ পেতে হলে যে পরীক্ষাগুলো দিতে হয় :
বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে অফিসার হওয়ার জন্য ক্যাডেট হিসেবে যোগ দিতে যে কয়টি পরীক্ষা দিতে হয় তা হচ্ছে :
প্রাথমিক মেডিক্যাল
প্রাথমিক ভাইভা
লিখিত পরীক্ষা
আইএসএসবি : চার দিনব্যাপী আইকিউ, মনোস্তাত্ত্বিক, ভাইভা, নেতৃত্বের গুণাবলি, কমিউনিকেশন স্কিল, প্ল্যানিং, শারীরিক যোগ্যতা ইত্যাদির ওপর পরীক্ষা। উল্লেখ্য যে, বাংলাদশে শুধুমাত্র ক্যাডেট কলেজের শিক্ষার্থীরাই সরাসরি আইএসএসবি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারে।
চূড়ান্ত মেডিক্যাল ও সাঁতার পরীক্ষা
চূড়ান্ত ভাইভা

পরীক্ষাগুলোর বিষয় ও ধারাবাহিকতা :
প্রথমেই হয় প্রাথমিক মেডিক্যাল এবং ভাইভা পরীক্ষা। অনেকের ধারণা খুব লম্বা না হলে আর্মি অফিসার হওয়া যায় না। কিন্তু সত্য হচ্ছে, অফিসারদের জন্য ন্যূনতম উচ্চতা ৫ ফুট চার ইঞ্চি। বয়স ১৮ থেকে ২১। এ ছাড়াও ভাইভা পরীক্ষাতে পরীক্ষার্থীর বিশেষ করে ইংরেজিতে দক্ষতা ও কমিউনিকেশন স্কিল দেখা হয়।
এই প্রাথমিক মেডিক্যাল ও ভাইভা উত্তীর্ণ প্রার্থীদেরকে লিখিত পরীক্ষার জন্য ডাকা হয় যা ক্ষেত্রবিশেষে প্রাথমিক পরীক্ষার এক থেকে দুই মাসের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়। লিখিত পরীক্ষা অনেকটা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার আদলে হয়। প্রতিটি লং কোর্সে যোগদানের জন্য গড়ে আনুমানিক বিশ থেকে ত্রিশ হাজার পরীক্ষার্থী থাকলেও লিখিত পরীক্ষাতে এক-দেড় হাজারের বেশি উত্তীর্ণ হয় না। এই এক থেকে দেড় হাজার থেকে আবার গড়ে ৮০-৯০ জন চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হন আইএসএসবির (আন্তঃবাহিনী নির্বাচন পরিষদের) চার দিনব্যাপী পরীক্ষার মাধ্যমে।

ভর্তিপ্রক্রিয়ার সময় ও সংখ্যা :
বছরে দুইবার এই ভর্তিপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। নির্দিষ্ট কোন কোটা নেই এখানে যে কত জন ভর্তি করা হবে। যোগ্যতা সাপেক্ষে কোন ব্যাচে যেমন ১৮০ জনকে নির্বাচিত করা হয়েছে তেমনি যোগ্য কাউকে না পাওয়ায় মাত্র ৪০ জনকে নির্বাচিত করার ইতিহাসও আছে। এখানে সংখ্যা পুরো করতে গিয়ে কখনও মানের সাথে সমঝোতা করা হয় না। এবং এখানকার নির্বাচকরা সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করতে পারেন বলেই স্বীকৃত। অনেক জেনারেলের ছেলে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে এরকম ঘটনা আছে ভূরি ভূরি। বাবার পরিচয়, রাজনৈতিক প্রভাব, মামা চাচার টেলিফোন সব কিছুকে উপেক্ষা করে যাচ্ছে বলেই এই সিলেকশন পদ্ধতি নিয়ে কোনো বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে বলে কখনও শোনা যায় না।
নির্বাচনের ক্ষেত্রে মেধার পাশাপাশি আর যেসব বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন:
বুঝতেই পারছেন এতগুলো পরীক্ষায় পাস করতে হলে আপনার যোগ্যতার পাশাপাশি ধৈর্যও থাকতে হবে। অন্যান্য সকল অ্যাডমিশন টেস্টের (বুয়েট, মেডিক্যাল, বিশ্ববিদ্যালয়) মত ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পরই সেনাবাহিনীতে আফিসার পদে ভর্তির জন্য আবেদন করা যায়। অন্যান্য প্রায় সব অ্যাডমিশন টেস্টে শুধু মেধার ভিত্তিতে নির্বাচন করা হলেও সেনাবাহিনী এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এখানে মেধার পাশাপাশি তার মানসিকতা, নেতৃত্ব প্রদানের গুণাবলি, কমিউনিকেশন স্কিল, ইংরেজিতে দক্ষতা, ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড ইত্যাদি নানা বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড বলতে একজন গরিব কিন্তু সৎ স্কুল মাস্টারের ছেলেকে একজন ঘুষখোর আমলার ছেলের চেয়ে প্রেফার করা হয়। এ ছাড়া শারীরিক যোগ্যতার বিষয়টি তো আছেই।
সেনা অফিসারদের পড়াশোনা :
এইচএসসি পাসের পর সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেও অফিসার হওয়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে মিলিটারি একাডেমিতে দুই বছরের প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করা এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইদানীং কালে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ প্রফেশনাল এর) অধীনে গ্র্যাজুয়েশন সফলভাবে শেষ করা। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার আগে সরকারি গেজেটে তার নাম প্রকাশিত হবে না।
এর পরবর্তী সময়ে তাকে উচ্চতর পড়াশোনা এবং পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করতে হয়। নিজের পেশাগত বিষয়ের ওপর বাধ্যতামূলক চার-পাঁচটি কোর্স ছাড়াও স্টাফ কলেজ, ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ, এমআইএসটি, AWC কোর্স, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ প্রফেশনাল সহ দেশে ও বিদেশে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করতে হয় সেনা অফিসারদেরকে। ইঞ্জিনিয়ার অফিসারদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে সিভিল, ইলেকট্রিকাল অ্যান্ড মেকানিক্যাল, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে হয়।
অনেকে দুই বা ততোধিক বিষয়ের ওপর পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। সেনাবাহিনীতে পিএইচডি করা অফিসারের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। কাজেই আমাদের মধ্যে প্রচলিত ধারণা যে এইচএসসি পাস করলেই অফিসার হওয়া যায় তা যে কতটা ভ্রান্ত তা আশা করি বুঝতে পেরেছেন।
এ ছাড়াও বাধ্যতামূলক যে সকল কোর্সে অংশগ্রহণ করতে হয় তা হলো-
ক) বেসিক কোর্স : কোর ভেদে সাধারণত ৪ মাস হতে ১০ মাস সময়সীমার হয়, সাধারণত সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট/ লেফটেন্যান্ট অবস্থায় এই কোর্স করানো হয়। প্রতিটি অফিসারকেই নিজ নিজ প্রফেশনাল জ্ঞান প্রদান করাই এই কোর্সের উদ্দেশ্য।
খ) অস্ত্রের উপর কোর্স : সব অফিসারকেই অস্ত্র চালনায় অত্যন্ত দক্ষ শুটার করে তোলার জন্য বিএমএতে দুই বছর প্রচুর অনুশীলন ও এই বিষয়ে পড়াশোনা করতে হয়। অফিসার হবার পর পুনরায় লেফটেন্যান্ট অবস্থায় তিন মাসব্যাপী একটি কোর্স করানো হয়, যাতে আগের শেখা বিষয়গুলো তারা ঝালিয়ে নিতে পারে। সাধারণভাবে বলা যায় যে, এই প্রশিক্ষণ গ্রহণের ফলে প্রতিটি অফিসারই সব ধরনের অস্ত্র সম্পর্কে বিস্তারিত তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করে, এক একজন দক্ষ মার্কসম্যান হয়ে ওঠে এবং সব ধরনের অস্ত্র চালনায় প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসী হয়। সেনা অফিসারদের মধ্যে অনেক স্নাইপারও রয়েছেন।
গ) কমান্ডো কোর্স : প্রায় তিন মাস সময়সীমার এই কোর্সটি প্রচন্ড কষ্টসাধ্য একটি কোর্স, যা প্রত্যেক সেনা অফিসারকে বাধ্যতামূলকভাবে করতে হয়। এই কোর্সে প্রতিটি অফিসারকে অমানুষিক কষ্টের মধ্যে রাখা হয়। এমনিতেই বিএমএর প্রশিক্ষণ প্রচন্ড কষ্টসাধ্য। অফিসার হবার এক থেকে দুই বছরের মধ্যে এই কমান্ডো কোর্স করতে হয়। এই তিন মাসের কষ্ট এমনকি বিএমএ কোর্সের কষ্টকেও হার মানায়।
প্রায় প্রতিদিনই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ৬ কি. মি. থেকে ৪০ কি. মি. পর্যন্ত দৌড়, অ্যাসল্ট কোর্স (বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম), টানা দৌড়ে উঁচু উঁচু ৭টি পাহাড় অতিক্রম, আনআর্মড কম্ব্যাট ট্রেনিং (মার্শাল আর্টের সামরিক সংস্করণ), ট্র্যাকিং, ম্যাপ অনুসরণ করে দুর্গম লাকায় ডে মার্চ বা নাইট মার্চ, কমান্ডো কৌশল অনুসরণ করে শত্রু এলাকার ভেতরে প্রবেশ করে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনার অনুশীলন, খাবার ছাড়া দুর্গম এলাকায় বেঁচে থাকার সারভাইভাল ট্রেনিং, উড়ন্ত হলিকপ্টার থেকে র‌্যাপেলিংসহ অনেক দুঃসাহসিক প্রশিক্ষণ নেয়ার পাশাপাশি রণকৌশলের ওপর পড়াশোনা করতে হয় এ সময়।
এ ছাড়া নির্বাচিত অফিসাররা আরও ৬ মাসব্যাপী কমান্ডো প্রশিক্ষণ নেয় যেখানে উপরে উল্লেখিত প্রশিক্ষণ ছাড়াও আরও অনেক দুঃসাহসিক প্রশিক্ষণ পরিচালিত হয়। প্যারাশুট নিয়ে ফ্রি ফল, জাম্প মাস্টার, রিগ্যার ইত্যাদি কমান্ডো অনুশীলনের অন্তর্গত। এ ধরনের প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিতদের জাতিসংঘে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কমান্ডোদের মটো হচ্ছে ‘ফড় ড়ৎ ফরব’. এই প্রশিক্ষণ চলাকালে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। ক্যাজুয়াল্টি তো অহরহ ঘটে। প্রতিটি সেনা অফিসারই এক একজন বেসিক কমান্ডো।
ঘ) জুনিয়র স্টাফ কোর্স : এ কোর্সটিও বাধ্যতামূলকভাবে সকল ক্যাপ্টেন র‌্যাঙ্কের অফিসারদের করতে হয়। এটি চার মাসব্যাপী এবং সম্পূর্ণ পড়ালেখার একটি কোর্স। এখানে রণকৌশল বা ট্যাকটিকস সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেয়া হয়।
উপরের সব কোর্সই মানের দিক থেকে বিশ্বমানের এবং প্রতিটি কোর্সেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশী অফিসার যোগদান করেন। শুধু উপমহাদেশের অফিসাররা নন, মধ্যপ্রাচ্যের, আফ্রিকা, ইউরোপ মহাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ক্যাপ্টেন এবং মেজর র‌্যাঙ্কের অফিসাররা এসব সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে বাংলাদেশে আসেন এবং আমাদের প্রশিক্ষণের মানের ভূয়সী প্রশংসা করে থাকেন। এমনকি আধুনিক বিশ্বে পরাশক্তি হিসেবে পরিচিত ইউএস আর্মি এবং মেরিন অফিসার এবং সেনারা এই ধরনের প্রশিক্ষণে অংশ নেয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাথে প্রতি বছরই যৌথ সামরিক অভিযান চালায় যা ‘ব্যালান্স বাফেলো’ এক্সারসাইজ নামে পরিচিত।
যারা বাংলাদেশ আর্মির অফিসারদের প্রশিক্ষণের স্ট্যান্ডার্ড সম্পর্কে সন্দীহান, তাদের জন্য আশা করি ওপরের তথ্যগুলো সহায়ক হবে।
এছাড়া আরও অনেক কোর্স আছে যেগুলো চাকরির সিনিয়রিটি অনুযায়ী সম্পন্ন করতে হয়। এর মধ্যে অনেক কোর্স দীর্ঘ সময়ব্যাপী পরিচালিত হয় যেগুলো সফলভাবে সম্পন্ন করলে প্রতিটির জন্য আলাদাভাবে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ প্রফেশনাল হতে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়। এ ছাড়া আরও কয়েকটি কোর্স হচ্ছে-
PSC মেজরদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোর্স হচ্ছে ডিফেন্স সার্ভিস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কোর্স। এটি এক বছরব্যাপী একটি কোর্স, যেটি সফলভাবে সম্পন্ন করলে অফিসাররা নামের শেষে PSC  লেখেন।
NDC-ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে এই কোর্স অনুষ্ঠিত হয়। এখানে আর্মির কর্নেল পদবির অফিসারসহ বেসামরিক প্রশাসনের নির্বাচিত কিছু জয়েন্ট সেক্রেটারি, পুলিশের ডিআইজিরা একসাথে এই কোর্স করেন।
NDC-এটিও কর্নেল এবং তদূর্ধ্ব পদবিদের জন্য একটি কোর্স।
AFWC– Armed Forces War Course,  এটি লেফটেন্যান্ট কর্নেল এবং তদূর্ধ্ব র‌্যাঙ্কের অফিসারদের জন্য।
উপরোক্ত চারটি কোর্স সম্পন্নকারী অফিসাররা তাদের নামের শেষে সংক্ষেপে কোর্সের নামগুলো উল্লেখ করেন। এই চারটি কোর্সেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশী সিনিয়র অফিসাররা যোগদান করেন।
আরও অসংখ্য কোর্স আছে আর্মির বিভিন্ন কোরের অফিসারদেরকে ওই কোরের ওপর একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। যেমন ইনফ্যান্ট্রি, আর্টিলারি, আর্মর্ড ইত্যাদি কোরের অফিসারদের দেশে এবং পরে চীন, পাকিস্তান, তুরস্ক, ভারত ইত্যাদি দেশ থেকে এক বছরের জন্য কোর্স করিয়ে আনা হয়। ইঞ্জিনিয়ার্স, ইএমই, অর্ডিন্যান্স অফিসাররা বুয়েট, এমআইএসটিসহ দেশে বিদেশে বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। অর্থাৎ প্রতিটি কোরের অফিসারকেই তার নিজ নিজ পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর জন্য এবং নিজের পেশায় একজন বিশেষজ্ঞ হবার জন্য প্রতিনিয়ত দেশে এবং বিদেশে বিভিন্ন কোর্সে গিয়ে পড়াশোনা করতে হয়।
এভাবে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট থেকে শুরু করে জেনারেল পর্যন্ত প্রতিনিয়ত একজন অফিসারকে প্রচন্ড পড়াশোনার মধ্যে থাকতে হয়। কেউ পড়াশোনার বিষয়ে সিরিয়াস না হলে তার ক্যারিয়ার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পদোন্নতিও একেবারেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এভাবে প্রতিনিয়ত প্রশিক্ষণ ও পড়ালেখার ফলে একজন অফিসারের কর্মদক্ষতা বাড়তে থাকে এবং তার সিনিয়রিটির সাথে সাথে পেশাগত উৎকর্ষ লাভ করে।
যারা পড়াশোনায় ফাঁকি দেয়ার ইচ্ছায় আর্মিতে অফিসার হিসেবে জয়েন করতে চান, তারা কিন্তু নিশ্চিত ধরা খাবেন।

সৈনিকদের সাথে সেনা অফিসারদের নিয়মিত শরীর চর্চা :
গুটিকয়েক হেডকোয়ার্টারে কর্মরত অফিসার ছাড়া ইউনিটে কর্মরত সকল সেনা অফিসারকে (লেফটেন্যান্ট কর্নেল পর্যন্ত) সকালে পিটি এবং বিকেলে গেমসসহ সব ধরনের প্রশিক্ষণে সেনাসদস্যদের সাথে অংশগ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। এ জন্যই অন্য যে কোন বাহিনীর থেকে সেনাবাহিনীতে সৈনিক ও অফিসারদের মধ্যে কমরেডশিপ বেশি, কারণ তারা এক সাথে কষ্ট করে।
(এখানে খানিকটা অপ্রাসঙ্গিক হলেও কমরেডশিপের অসংখ্য উদাহরণের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনীর সাথে মুখোমুখি লড়াইয়ে শহিদ লেফটেন্যান্ট মুশফিক যিনি মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের একমাত্র বীর উত্তম, তার কথা বলা যায়, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শান্তিবাহিনীর হাত থেকে তার সাথে থাকা সৈনিকদেরকে বাঁচানোর জন্য মরণপণ লড়ে গেছেন। আজও অনেক সেনা তার কথা বলতে গিয়ে চোখের জলে বুক ভাসান)।
শুধু তাই না, সব অফিসারকে এছাড়াও প্রতি বছর দুইবার শারীরিক যোগ্যতার পরীক্ষা দিতে হয়। এই পরীক্ষার অনেক আইটেমের মধ্যে শুধু দু’টি আইটেমের কথা বলি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ৩ কিলোমিটার ও ১৬ কিলোমিটার দৌড়। বুঝতেই পারছেন, ফিটনেস না থাকলে আপনার আমার পক্ষে এগুলো করা সম্ভব না। এ ছাড়াও প্রতি বছর এদের ওজন নেয়া হয়।
শারীরিক যোগ্যতা আর ওজন নিয়ন্ত্রণে না রাখতে পারলে পদোন্নতি চিরতরে বন্ধসহ বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়। কাজেই নিজেদের প্রয়োজনেই সাধারণত কোন অফিসারই ফিটনেসের সাথে কম্প্রোমাইজ করে না।

বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে যে বিষয়গুলোর ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয় :
ক) একাডেমিক প্রত্যেককে বাধ্যতামূলকভাবে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করতে হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ প্রফেশনালের অধীনে। এ ছাড়াও ট্যাক্টিক্স বা রণ কৌশলসহ অন্যান্য সামরিক বিষয়াবলির ওপর বিশদ জ্ঞানার্জন করতে হয়। প্রশিক্ষণ দুই বছরের হলেও গ্র্যাজুয়েশন করতে তিন বছর লাগে। এর ধারাবাহিকতায় কমিশনের পর সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট অবস্থায় এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। এখানে সায়েন্স এবং আর্টসের বিষয়গুলো ছাড়াও অতিরিক্ত কিছু বিষয় পড়ানো হয়। একজন সায়েন্সের স্টুডেন্টের বিষয়গুলো সাধারণত এ রকমÑ
বাংলা, ইংরেজি, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ম্যাথমেটিক্স, (আর্টস এর ছাত্রদের জন্য ইকোনমিকস, পলিটিক্যাল সায়েন্স ইত্যাদি)
সামরিক বিষয় যেমন- ম্যাপ রিডিং, ট্যাক্টিকস, মিলিটারি হিস্ট্রি, মিলিটারি সায়েন্স, ন্যাশনাল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিস, মিলিটারি ল, অ্যাডমিনেস্ট্রেশন অ্যান্ড মোরাল, কমান্ড অ্যান্ড লিডারশিপ ইত্যাদি।
সামরিক বিষয়গুলো সব ক্যাডেটকে বাধ্যতামূলকভাবে অধ্যয়ন করতে হয়।
খ) শারীরিক প্রশিক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এক্ষেত্রে ধীরে ধীরে শারীরিক উৎকর্ষ এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয় যে দুই বছরের মধ্যে প্রত্যেকের ফিটনেস অসাধারণ হয়ে ওঠে।
গ) অস্ত্র প্রশিক্ষণ : পয়েন্ট টু টু বোর রাইফেল থেকে শুরু করে পিস্তল, রাইফেল, সাব মেশিনগান, লাইট মেশিনগান, রকেট লঞ্চার, গ্রেনেড, বিভিন্ন ধরনের এক্সপ্লোসিভসহ ইত্যাদি প্রচলিত প্রায় সব ধরনের অস্ত্র চালনায় অত্যন্ত দক্ষ করে তোলা হয় প্রত্যেক সেনা অফিসারকে। সাধারণত প্রত্যেক সেনা অফিসারই একজন দক্ষ বা শার্প শুটার হিসেবে বিবেচিত।
ঘ) চারিত্রিক প্রশিক্ষণ : অA gentleman or gentlewoman should lead a life of HONESTY and INTEGRITY. He or she shall not LIE, CHEAT or STEAL|। এইটা মিলিটারি একাডেমির HONOUR CODE নামে পরিচিত যা প্রত্যেক ক্যাডেটকে শুধু মানতেই হয় না, আত্মস্থ করতে হয়। চারিত্রিক বিষয়ে বিএমএ তে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। এমন ঘটনাও রয়েছে, যারা প্রায় দুই বছর প্রশিক্ষণ নেয়ার পর অফিসার হওয়ার ঠিক আগে আগে ছোটখাটো অনেক কারণে একাডেমি থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।
এছাড়াও প্রত্যেককে কমান্ড এবং লিডারশিপের ওপর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এক একজন দক্ষ কমান্ডার হিসেবে গড়ে তোলা হয়। এসবের বাইরেও ধর্মীয় বিষয়, নিয়মিত ড্রিল, হর্স রাইডিং, ভেহিক্যাল ড্রাইভিং, র‌্যাপেলিং বা হেলিকপ্টার থেকে র‌্যাপেলিং, প্যারা জাম্পিং, স্কুবা ড্রাইভিং ইত্যাদি নানা রকম প্রশিক্ষণ দেয়া হয় ক্যাডেটদেরকে।
কমিউনিকেশন স্কিল বৃদ্ধি করতে পাবলিক স্পিকিংয়ের পর্যাপ্ত অনুশীলনসহ ল্যাংগুয়েজ ল্যাবরেটরিতে সঠিকভাবে বাংলা ও ইংরেজি উচ্চারণের প্রশিক্ষণ (বিএমএ ছাড়া এ রকম ল্যাংগুয়েজ ল্যাবরেটরি সম্ভবত শুধুমাত্র ব্রিটিশ কাউন্সিলেই আছে) দেয়া হয় সব ক্যাডেটকে। এ কারণে প্রায় সব সেনা অফিসারেরই সাধারণত বাংলা ও ইংরেজিতে কমিউনিকেশন স্কিল বেশ ভালো হয়ে থাকে।
তবে সততা বা চরিত্রের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব থাকে সবসময়। কর্তৃপক্ষ যদি মনে করে যে কারো সততার কোনো অভাব আছে বা চারিত্রিক কোনো সমস্যা আছে তাহলে তাকে যে কোনো পর্যায়েই একাডেমি থেকে বহিষ্কার করা হয়। এ ছাড়াও প্রশিক্ষণের সময় ইনজুরড হয়েও অনেককে বাড়ি চলে যেতে হয়। অনেকে আবার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে স্বেচ্ছায় বিএমএ থেকে চলে যায়। প্রতি ব্যাচে বা কোর্সে গড়ে ১০-১৫ জন এ ধরনের বহিষ্কারের শিকার হয়।

ইউএন মিশনে বাংলাদেশের সেনাদের এত চাহিদার কারণও মিশনে সেনাদের দায়িত্ব :
ইউএন এ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এত চাহিদার কারণের পেছনে রয়েছে বেশ কিছু বিষয়। অনেকেরই একটা ধারণা আছে যে, আমাদের সেনাবাহিনী এমনকি হয়ে গেল যে সারা দুনিয়ায় এত চাহিদা। এই গরিব দেশের আর্মির অস্ত্র সাজসরঞ্জাম কি-ই বা আছে। দুনিয়ায় এত উন্নত দেশের আর্মি আর সাজসরঞ্জাম থাকতে কেন বাংলাদেশ ইউএন এ সর্বোচ্চ সংখ্যক সেনা পাঠাচ্ছে।
আসলে বাংলাদেশ আর্মির মতো এত সস্তায় এত ভালো পারফরম্যান্স অন্য কোনো আর্মির কাছে ইউএন পায় না বলেই এদের এত চাহিদা। ন্যাটোসহ অন্যান্য ফোর্স চৌকস হলেও ভীষণ ব্যয়বহুল। একই সাথে আছে ডিসিপ্লিনের ব্যাপার, বিশেষত আফ্রিকার দেশগুলোতে অবাধ যৌনাচারে অভ্যস্ত সেনা সদস্যদের এইডস আক্রান্ত হবার আশঙ্কা। সেদিক থেকে আমাদের দেশের সেনারা অনেক নিরাপদ।
এখন আসি মিশন এলাকায় আমাদের সেনাদের কাজ প্রসঙ্গে। মিশন চলে যুদ্ধরত বা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে। এসকল বেশির ভাগ দেশেই সরকারের বিরোধী বিদ্রোহী গ্রুপ থাকে যারা সুযোগ পেলে ইউএন ট্রুপসের ওপরও হামলা চালায়। তাদের নিবৃত্ত করে যুদ্ধরত বা যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কিন্তু খুব সহজ কাজ নয়। বিশেষত সেই দেশগুলো যখন আফ্রিকার (কিছু ক্ষেত্রে যুদ্ধরত, কিছু ক্ষেত্রে আধা সভ্য বা বর্বর) মানুষে পরিপূর্ণ। কিন্তু আমাদের সেনারা এই দুরূহ কাজটি অত্যন্ত সফলভাবে করে যাচ্ছে এবং সারা বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার পাশাপাশি দেশকে প্রচুর রেমিট্যান্স দিচ্ছে। বহিঃবিশ্বের মানুষ যে কয়টি কারণে বাংলাদেশের নাম জানে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইউএন মিশনে সর্বোচ্চ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে।
প্রায়ই একটা কথা শোনা যায় যে আমাদের সেনাবাহিনী যুদ্ধ করারা উপযোগী কি না। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কিন্তু আমাদের সেনাদের প্রায়ই যুদ্ধাবস্থার মধ্যে কাজ করতে হয়। আইভরি কোস্টে যখন যুদ্ধ দানা বেঁধেছিল তখন কিন্তু আমাদের দেশের সেনারাই শান্তিরক্ষায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। এর আগে কঙ্গোতে শান্তিরক্ষা করতে গিয়ে বিপ্লবীদের সাথে যুদ্ধে বেশ কয়েকবার হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
মিশনে যুদ্ধ করতে যে সরঞ্জামাদি লাগে, সেগুলো জাতিসংঘের নিয়মানুযায়ী না হলে তার ভাড়া পাওয়া যায় না। জাতিসংঘ কর্তৃক এই নিয়ম করা হয়েছে যাতে করে ভালো সরঞ্জামাদির মাধ্যমে শান্তিরক্ষীদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। অথচ আমাদের সেনারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুরনো এবং ঝুঁকিপূর্ণ সরঞ্জামাদি দিয়ে মিশন করে আসেন। নইলে সরকারের মোটা অঙ্কের টাকা লাগতো এ সব সরঞ্জাম কিনতে। তারা পুরনো সরঞ্জাম নিয়ে যায় এই মোটিভেশনে যে, আমাদের দেশ গরিব, নতুন সরঞ্জাম কেনার পয়সা নেই। কষ্টটা না হয় আমরাই করি।
জাতিসংঘ থেকে যখন ইন্সপেকশনে আসে, তখন, সাধ্যের সব কিছু দিয়ে সেই পুরনো জিনিসগুলোকে ‘যুদ্ধোপযুক্ত’ হিসেবে সার্টিফাই করায় তারা। কারণ, যুদ্ধোপযুক্ত না হলে রিম্বার্সমেন্টের টাকা পাওয়া যাবে না। রিম্বার্সমেন্টের এই টাকা কিন্তু সেনারা নিজেরা পায়না। পায় সরকার। মিশনে সেনাদের থাকার জন্য পাকা ঘর পাওয়ার কথা। জাতিসংঘ সেই ঘর না দিতে পারলে বিনিময়ে টাকা দেয়। আমাদের সেনারা বেশির ভাগ সময়েই তাঁবুতে থাকে। তাঁবুতে থাকার কারণে প্রাপ্ত মোটা অংকের পুরো টাকাটাই কিন্তু সরকারি কোষাগারে জমা হয়।
আমরা গার্মেন্টসসহ অন্যান্য অনেক শিল্পের মাধ্যমে রাজস্ব আয়ের ব্যাপারে অবগত আছি। একই সাথে এটাও সত্য যে, এদেশেই শ্রমিকদের প্রাপ্য সামান্য বেতনের জন্য রাজপথে নামতে হয়। তেমনি বিপুল পরিমাণ রাজস্ব প্রদানকারী সেনাবাহিনীর এই রূপটি কিন্তু আমাদের অগোচরেই থাকে। চোখের সামনে আমাদের শুধু ভাসে জলপাই রঙের নির্মমতা। দুর্ভাগা আমরা, কত ডেডিকেশন নিয়ে কাজ করলে আফ্রিকার একটা দেশের দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে বাংলাকে অধিষ্ঠিত করে দেশকে এমন বিরল সম্মান এনে দেয়া যায় কখনো ভেবেছেন কি?
প্রায়ই একটা কথা শোনা যায় যে আমাদের আশপাশের দেশ যদি আমাদের আক্রমণ করে তাহলে আমাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধোপে টিকবে না। আসলে এই আশঙ্কা কতটুকু সত্যি বা মিথ্যা :
এই ব্যাপারটি একটি খুব কমন আলোচনার বিষয়। কোন দেশের প্রকৃত সামরিক শক্তি কখনই সেই দেশ প্রকাশ করে না। এটি টপ সিক্রেট বিষয়। আর যুদ্ধে জিততে কিন্তু শুধু সামরিক শক্তিই একমাত্র নিয়ামক নয়। এর সাথে আরও অনেক বিষয় জড়িত। আমি কোন সামরিক বিশ্লেষণ এখানে করবো না। একজন মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসারের সাথে এই নিয়ে একদিন কথা হয়েছিল। ওনার বক্তব্য খুব ভালো লেগেছিল। সেটাই এখানে তুলে দিলাম :
“প্রথমত বাংলাদেশের ভূমি প্রকৃতি এমন যে এখানে যারা আক্রমণ করতে আসবে তারা চলাচল ও জায়গা দখলের ক্ষেত্রে মারাত্মক সমস্যায় পড়বে। এজন্য বাংলাদেশকে বলা হয় DEFENDERS PARADISE আমাদের দেশে আর্মির সাতটি ডিভিশন আছে। সামরিক সূত্র অনুযায়ী কমপক্ষে একুশটি ডিভিশন নিয়ে এখানে আক্রমণ করতে হবে। যা করতে গেলে এমনকি ভারতেরও পাকিস্তান এবং চীনের বর্ডার সংলগ্ন সেনানিবাস থেকে সৈন্য আনতে হবে, সীমান্ত প্রায় অরক্ষিত রেখে, যা তারা কখনই করতে চাইবে না।
এরপর যদি প্রচলিত যুদ্ধ ব্যবস্থায় আমরা না পারি, তখন আমরা গেরিলা যুদ্ধ শুরু করবো। যেমনটি আমরা করেছিলাম ১৯৭১ সালে। তখন আমাদের রেগুলার আর্মি ছিল না। শুধু আমরা কয়েকজন অফিসার আর বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও আর্টিলারি রেজিমেন্টের সৈনিকেরা দেশের মানুষের সাথে মিলে যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিলাম এবং পাকিস্তানিদের পরাস্ত করেছিলাম। এরপরও না পারলে হবে টোটাল পিপলস ওয়ার, যার মাধ্যমে ভিয়েতনাম ইউএস-এর মত পরাশক্তিকে পরাজিত করেছিল।’’

SHARE