সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও আনুগত্য -প্রফেসর মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম

اِنَّمَا الۡمُؤۡمِنُوۡنَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا بِاللّٰہِ وَ رَسُوۡلِہٖ وَ اِذَا کَانُوۡا مَعَہٗ عَلٰۤی اَمۡرٍ جَامِعٍ لَّمۡ یَذۡہَبُوۡا حَتّٰی یَسۡتَاۡذِنُوۡہُ ؕ اِنَّ الَّذِیۡنَ یَسۡتَاۡذِنُوۡنَکَ اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ یُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ وَ رَسُوۡلِہٖ ۚ فَاِذَا اسۡتَاۡذَنُوۡکَ لِبَعۡضِ شَاۡنِہِمۡ فَاۡذَنۡ لِّمَنۡ شِئۡتَ مِنۡہُمۡ وَ اسۡتَغۡفِرۡ لَہُمُ اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ.

বঙ্গানুবাদ
প্রকৃত মু’মিন তারাই; যারা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং রাসূলের সাথে কোনো সমষ্টিগত কাজে শরিক হলে তাঁর কাছ থেকে অনুমতি গ্রহণ ব্যতীত চলে যায় না। যারা আপনার কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে, তারাই আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে। অতএব তারা আপনার কাছে তাদের কোনো কাজের জন্য অনুমতি চাইলে আপনি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অনুমতি দিন এবং তাদের জন্য আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, মেহেরবান। (সূরা নূর : ৬২)

সূরা পরিচিতি ও নামকরণ
সূরা আন-নূর আল-কুরআনের ২৪তম সূরা। এতে ৯টি রুকু, ৬৪টি আয়াত, ১৩১৭টি শব্দ এবং ৫৭৮০টি অক্ষর রয়েছে। নূর (نُورٌ) শব্দটি অত্র সূরায় মোট সাতবার উল্লেখ রয়েছে। ৩৫তম আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ (আল্লাহ্ নভম-ল ও ভূম-লের নূর বা জ্যোতি)। রাসূলুল্লাহ সা. আল্লাহর নির্দেশে এ সূরার নাম ‘সূরাতুন নূর’ বলে উল্লেখ করেছেন।
নূর (نُورٌ) শব্দটি একবচন, انوار (আনওয়ার) বহুবচন। এর অর্থ আলোক, জ্যোতি, চাঁদের কিরণ, দিনের আলো ইত্যাদি। ‘নূর’ এমন জিনিসকে বুঝায় যার সাহায্যে জিনিসগুলো প্রকাশিত ও উদ্ভাসিত হয়। অর্থাৎ যা নিজেই প্রকাশিত হয় এবং অন্যান্য জিনিসকেও অন্ধকার থেকে আলোকিত করে। আল-কুরআনে শব্দটি বেশ কয়েকটি অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়।
যেমন- ১. ‘দ্বীন ইসলাম’ (সূরা তাওবাহ : ৩২) ২. ‘হিদায়াত’ (সূরা ইবরাহিম : ১) ৩. ‘ঈমানের আলো’ (সূরা আনআম : ১২২) ৪. ‘হাদী’ বা পথ প্রদর্শক। (সূরা নূর : ৩৫) ৫. ‘দিনের আলো’ (সূরা আনআম : ১) ৬. ‘চাঁদের কিরণ’।

নাযিলের সময়কাল
সর্বসম্মত মতে সূরাটি মাদানি এবং এটি বনি মুস্তালিক যুদ্ধের পর নাযিল হয়। তবে বনি মুস্তালিকের যুদ্ধ কখন সংঘটিত হয় এ ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বিখ্যাত ঐতিহাসিক মুহাম্মদ ইবন ইসহাক বলেন, বনি মুস্তালিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ষষ্ঠ হিজরিতে। এ পর্যায়ে হজরত আয়িশা রা. ও অন্যান্য সাহাবীদের থেকে বর্ণিত বিপুলসংখ্যক নির্ভরযোগ্য হাদিসের বর্ণনা এরই সমর্থক।
আবার কেউ কেউ বলেন বনি মুস্তালিকের যুদ্ধ সংঘটিত হয় পঞ্চম হিজরির শাবান মাসে। উক্ত অভিযান হতে ফিরে আসার একমাস পর এ সূরাটি নাযিল হয়। অতএব এ সূরাটি বনি মুস্তালিক যুদ্ধের পর পঞ্চম অথবা ষষ্ঠ হিজরিতে নাযিল হয়েছে। (তাফহীমুল কুরআন, ৯ম খ-, পৃ. ৫৮-৫৯)

সূরা নূরের আলোচ্য বিষয়
সুখী, সুন্দর ও আদর্শ সমাজ বিনির্মাণের জন্য সূরা আন-নূরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধি-বিধান নাযিল করা হয়েছে। যেমন-
এক. ব্যভিচারমুক্ত সমাজগঠনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ (আয়াত : ০১-০৩)। দুই. সমাজ থেকে মিথ্যাচার ও মিথ্যা অপবাদ তথা ‘কযফ’ দূরীকরণের পদক্ষেপ গ্রহণ (আয়াত : ৪-৫)। তিন. স্বামী-স্ত্রীর প্রতি অপবাদ সংক্রান্ত ‘লিআন’এর বিধান (আয়াত : ৬-১০)। চার. আয়িশা (রা.)-এর বিরুদ্ধে অপবাদ বা ‘ইফ্ক’ খ-ন (আয়াত : ১১-২৬)। পাঁচ. অপরের গৃহে প্রবেশের নিয়মনীতি ও পর্দার বিধি-বিধান (আয়াত : ২৭-৩১)। ছয়. বিবাহের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কিত বিধান (আয়াত : ৩২)। সাত. দাস-দাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও বেশ্যাবৃত্তি নিষিদ্ধকরণের বিধান (আয়াত : ৩৩)। আট. মানবজীবনে মুক্তির জন্য আল্লাহর বিধানই মেনে চলার আহবান (আয়াত : ৩৪-৪৬)। নয়. মুনাফিকদের স্বভাব বিশ্লেষণ (আয়াত : ৪৭-৫০; ৫৩)। দশ. আল্লাহ ও রাসূলের অনুসারীরা সফলকামী (আয়াত : ৫১-৫২; ৫৪)। এগারো. প্রকৃত মুমিনরা খিলাফতের দায়িত্ব প্রাপ্ত হওয়ার ঘোষণা (আয়াত : ৫৫-৫৭)। বারো. পারিবারিক শিষ্টাচার সংক্রান্ত নিয়ম কানুন (আয়াত : ৫৮-৬১)। তেরো. ইসলামী নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য (আয়াত : ৬২-৬৪)। (তাদরিসুল কুরআন সিরিজ- ৪৫ : সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও আনুগত্য পৃ. ৯-১৩)

শানে নুযুল
পঞ্চম হিজরিতে অনুষ্ঠিত আহজাবের যুদ্ধে সারা আরবের কাফেররা যুক্তফ্রন্ট গঠন করে মদিনা আক্রমণ করে। কাফেরদের সেনাপতি ছিল আবু সুফিয়ান। কাফেরদের আক্রমণের সংবাদ রাসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট আগেই পৌঁছেছিল। তাই তিনি সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শে মদিনার সমতল ভূমিতে এক বিরাট পরিখা খননের কর্মসূচি গ্রহণ করেন। তিন হাজার সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে তিনি এই পরিখা খননের কাজ আরম্ভ করেন। রাসূল সা. নিজেও এ কাজে অংশ গ্রহণ করেন। সাহাবীগণ তাঁর সঙ্গে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু মুনাফিকরা কাজে অলসতা করছিল। এমনকি পরিখা খননের নামে প্রতারণা করছিল। তারা সুযোগ বুঝে পেছন থেকে সরে পড়ত এবং বাড়ি চলে যেত। আর মুসলমানরা একান্ত প্রয়োজন হলে রাসূলুল্লাহ সা.-এর অনুমতিক্রমে ছুটি নিয়ে বাড়ি যেতেন এবং কাজ শেষে ফিরে আসতেন। তখন এ আয়াত নাযিল হয়।
(তাফসিরে মাযহারী, ৮ম খ-, পৃ. ৪১৬)

নির্বাচিত আয়াতের ব্যাখ্যা
অত্র আয়াতে প্রথমে প্রকৃত মু’মিনের পরিচয় প্রদান কল্পে দু’টি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে।
এক. মনে প্রাণে আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন (اِنَّمَا الۡمُؤۡمِنُوۡنَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا بِاللّٰہِ وَ رَسُوۡلِہٖ ) ‘মু’মিন তো তারাই; যারা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে।’
দুই. সাংগঠনিক বা সমষ্টিগত কাজে শরিক হয়ে ছুটির প্রয়োজন হলে দায়িত্বশীলের অনুমতি গ্রহণ (وَ اِذَا کَانُوۡا مَعَہٗ عَلٰۤی اَمۡرٍ جَامِعٍ لَّمۡ یَذۡہَبُوۡا حَتّٰی یَسۡتَاۡذِنُوۡہُ) ‘এবং রাসূলের সাথে কোনো সমষ্টিগত কাজে শরিক হলে তাঁর কাছ থেকে অনুমতি গ্রহণ ব্যতীত চলে যায় না।’
যেসব ব্যক্তি এ দু’টি গুণ অর্জন করবেন তাদেরকে মহান আল্লাহ প্রকৃত মু’মিন হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, (اِنَّ الَّذِیۡنَ یَسۡتَاۡذِنُوۡنَکَ اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ یُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ وَ رَسُوۡلِہٖ) ‘যারা আপনার কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে, তারাই আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে।’
দায়িত্বশীলের নিকট কেউ ছুটি প্রার্থনা করলে আয়াতের শেষাংশে তাদের জন্যে দু’টি করণীয় সম্পর্কে বলা হয়েছে।
এক. ছুটির কারণ জানার পর দায়িত্বশীল ইচ্ছা করলে ছুটি দিতে পারেন আবার নাও পারেন। অর্থাৎ মহান আল্লাহ এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলকে এখতিয়ার প্রদান করেছেন। তাই আল্লাহ বলেন, (فَاِذَا اسۡتَاۡذَنُوۡکَ لِبَعۡضِ شَاۡنِہِمۡ فَاۡذَنۡ لِّمَنۡ شِئۡتَ مِنۡہُمۡ) ‘অতএব তারা আপনার কাছে তাদের কোনো কাজের জন্য অনুমতি চাইলে আপনি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অনুমতি দিন।’
দুই. দায়িত্বশীল যাকে ছুটি প্রদান করলেন তার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন। একজন মু’মিন সবসময় দ্বীনকে দুনিয়ার উপর অগ্রাধিকার দিবেন। কিন্তু কেউ কেউ ছোটখাটো ব্যক্তিগত কোনো অজুহাতে দ্বীনি কাজ বা দ্বীনি আন্দোলনের কাজ থেকে দূরে থাকার জন্য চাতুরতার আশ্রয় নিয়ে ছুটি নিয়ে থাকেন। তাই মহান আল্লাহ দায়িত্বশীলের উদ্দেশ্যে বলেন, (وَ اسۡتَغۡفِرۡ لَہُمُ اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ) ‘এবং তাদের জন্য আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, মেহেরবান।’
অত্র আয়াতের মর্ম অনুধাবনের সুবিধার্থে আমরা তিনটি বিষয় আলোচনা করতে পারি। যথা-
এক. রাসূল সা. তথা দায়িত্বশীল কোনো বিশেষ কাজের নির্দেশ দিলে ইসলামী শরিয়াতে তার গুরুত্ব।
দুই. রাসূল সা. তথা দায়িত্বশীলদের নিকট ছুটি গ্রহণের পদ্ধতি।
তিন. রাসূল সা. তথা দায়িত্বশীলদের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের গুরুত্ব।

এক. রাসূল সা. তথা দায়িত্বশীলের পক্ষ থেকে নির্দেশের শরঈ গুরুত্ব
অত্র আয়াতে ইসলামী নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। রাসূল সা. যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ সামষ্টিক কাজে মুসলমানদেরকে একত্রিত হওয়ার জন্য বলেন, তখন ঈমানের দাবি হলো সকলের একত্রিত হওয়া। একত্রিত হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সা.-এর অনুমতি ছাড়া সমাবেশ থেকে চলে যাওয়া কোনোমতেই জায়েজ নয়।
মহান আল্লাহ আল-কুরআনের বহু স্থানে মুসলিম উম্মাহকে আদেশ করেছেন জীবনের সকল ক্ষেত্রে তাঁর রাসূলের নির্দেশের অনুসরণ করার জন্য। তাই রাসূলুল্লাহ সা.-এর নির্দেশের অনুসরণ মূলত আল্লাহ তায়ালার আদেশ পালন। যে এই নির্দেশের অনুসরণ করল না, সে মূলত আল্লাহ তায়ালার আদেশেরই বিরুদ্ধাচরণ করল। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন,
مَنۡ یُّطِعِ الرَّسُوۡلَ فَقَدۡ اَطَاعَ اللّٰہَ ۚ وَ مَنۡ تَوَلّٰی فَمَاۤ اَرۡسَلۡنٰکَ عَلَیۡہِمۡ حَفِیۡظًا
‘‘যে লোক রাসূলের হুকুম মান্য করবে সে আল্লাহ্রই হুকুম মান্য করল। আর যে লোক বিমুখতা অবল¤¦ন করল, আমি আপনাকে (হে মুহাম্মদ), তাদের জন্য রক্ষণাবেক্ষণকারী নিযুক্ত করে পাঠাইনি।’’ (সূরা নিসা : ৮০)
মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘‘রাসূল সা. তোমাদের জন্য যা নিয়ে এসেছেন তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক।’’ (সূরা হাশর : ৭)
রাসূলুল্লাহ সা.-এর পরে তাঁর স্থলাভিষিক্ত এবং ইসলামী দলের আমিরের আনুগত্যের ব্যাপারেও একই বিধান। ফকিহগণ সবাই একমত যে, এ আদেশ একটি ধর্মীয় ও ইসলামী প্রয়োজনের খাতিরে জারি করা হয়েছে, এরূপ প্রয়োজন প্রতি যুগেই হতে পারে, তাই এটা বিশেষভাবে রাসূলুল্লাহ সা.-এর মজলিসেরই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়; বরং মুসলমানদের প্রত্যেক ইমাম ও আমির তথা রাষ্ট্রীয় কর্ণধার ও তার মজলিসের এ বিধান, তিনি সবাইকে একত্র হওয়ার আদেশ দিলে তা পালন করা ওয়াজিব এবং বিনা অনুমতিতে ফিরে যাওয়া বৈধ নয়।
(মা‘রেফুল কুরআন, ৬ষ্ঠ খ-, পৃ. ৪৯৩)

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সা. বলেছেন,
مَنْ أَطَاعَنِي فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ ، وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ عَصَى اللَّهَ ، وَمَنْ أَطَاعَ أَمِيرِي فَقَدْ أَطَاعَنِي ، وَمَنْ عَصَى أَمِيرِي فَقَدْ عَصَانِي
যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল, সে আল্লাহর আনুগত্য করল। যে আমার অবাধ্যতা করল, সে আল্লাহর অবাধ্যতা করল। অনুরূপ যে আমিরের আনুগত্য করল সে আমারই আনুগত্য করল এবং যে আমিরের অবাধ্যতা করল, সে আমারই অবাধ্যতা করল। (বুখারি ও মুসলিম)

দুই. রাসূল সা. তথা দায়িত্বশীলদের নিকট ছুটি গ্রহণের পদ্ধতি
একজন মু’মিন সবসময় দ্বীনকে দুনিয়ার উপর অগ্রাধিকার দিবেন। ছোটখাটো ব্যক্তিগত কোনো অজুহাতে দ্বীনি কাজ বা দ্বীনি আন্দোলনের কাজ থেকে দূরে থাকতে পারবে না। দ্বীনি কাজের উপর ব্যক্তিগত বা দুনিয়াবি কাজকে অগ্রাধিকার দেয়া মুনাফেকি আচরণ। মহান আল্লাহ বলেন, “তোমরা কি আখেরাতের পরিবর্তে দুনিয়ার জীবনে পরিতুষ্ট হয়ে গেলে? অথচ আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনের উপকরণ অতি অল্প।” (সূরা তাওবা : ৩৮)
যারা দুনিয়াবি বিষয়কে আল্লাহ, রাসূল ও ইসলামী আন্দোলনের উপর প্রাধান্য দিবে তাদেরকে হুঁশিয়ারি দিয়ে সূরা তাওবার ২৪তম আয়াতে আরো বলা হয়েছে, “আল্লাহ্, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করা থেকে (দুনিয়ার বিষয়) অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর, আল্লাহ্র বিধান আসা পর্যন্ত, আর আল্লাহ্ ফাসেক সম্প্রদায়কে হিদায়েত করেন না।”
সুতরাং কখনও একান্ত প্রয়োজন দেখা দিলে দায়িত্বশীলের কাছে নিজের সমস্যার কথা উল্লেখ করে ছুটি চাইতে হবে। দায়িত্বশীল চিন্তা করে দেখবেন যে, কোনটির প্রয়োজন বেশি? তিনি যদি ব্যক্তিগত কাজের চেয়ে সামষ্টিক বা দ্বীনি কাজ বেশি জরুরি মনে করে ছুটি না দেন তবে মন খারাপ করা যাবে না। এ প্রসঙ্গেই অত্র আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, “অতএব তারা আপনার কাছে তাদের কোনো কাজের জন্য অনুমতি চাইবে।” অর্থাৎ কোনো ন্যায়সঙ্গত কারণ ছাড়া ছুটি চাওয়া বৈধ নয়। তবে যদি কোনো প্রকৃত কারণ দেখা দেয়, তাহলে আমিরের নিকট অনুমতি চাইতে হবে। অনুমতি পাওয়া গেলে তবেই যাওয়া যাবে।
এরপর মহান আল্লাহ দায়িত্বশীলদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আপনি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অনুমতি দিন এবং তাদের জন্য আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।” অর্থাৎ দায়িত্বশীলের কাছে কারণ বর্ণনার পর অনুমতি দেয়া বা না দেয়া তাঁর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। তিনি যদি মনে করেন যে, সামগ্রিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অনুমতি প্রার্থনাকারীর ব্যক্তিগত প্রয়োজন থেকে সামষ্টিক প্রয়োজন বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে অনুমতি না দেয়ার অধিকার তাঁর রয়েছে। এমতাবস্থায় একজন মু’মিনের কোনো অভিযোগ থাকা উচিত নয়।
যারা অনুমতি চাইবে তাদের সতর্ক করে দেয়া হয়েছে যে, অনুমতি চাওয়ার মধ্যে যেন তোমাদের কোনো ছলচাতুরী না থাকে এবং সামগ্রিক প্রয়োজন থেকে ব্যক্তি প্রয়োজন যেন প্রাধান্য না পায়। এ রকম হলে তা গুনাহ হবে। অতএব রাসূল সা. অথবা তাঁর স্থলাভিষিক্ত অথবা ইসলামী দলের দায়িত্বশীলকে শুধু অনুমতি দিয়েই ক্ষান্ত হলেই চলবে না; বরং যাকেই অনুমতি দেয়া হবে সাথে সাথে এ কথাও বলে দেবেন যে, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করে দিন।

তিন. রাসূল সা. তথা দায়িত্বশীলদের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের গুরুত্ব
শরীরে জীবনীশক্তি না থাকলে মানুষ যেমন গতিশীলতা হারিয়ে ফেলে, তেমনিভাবে যে কোনো সংগঠন বা রাষ্ট্রের নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য না থাকলে সাংগঠনিক গতিশীলতাও হারিয়ে ফেলে। ফলে সংগঠনের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। সংগঠনের মূল উপাদান হচ্ছে আনুগত্য। যে সংগঠনে আনুগত্য নেই, সে সংগঠনে শৃঙ্খলা নেই। আর শৃঙ্খলাই যদি না থাকে, তাহলে সংগঠনে বহু লোকের ভিড় জমলেও এর কোনো মূল্য নেই। আনুগত্যহীন সৈন্যবাহিনী কোনো যুদ্ধে সফলকাম হতে পারে না। অনুরূপভাবে আনুগত্যহীন জাতি রাখালবিহীন মেষপালের ন্যায়; যাদের ধ্বংস অনিবার্য।
জীবনের সর্বস্তরেই আনুগত্য ও শৃঙ্খলা আবশ্যক। ইসলামে আনুগত্যের তাৎপর্য হলো জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহ ও রাসূলের আদেশ অনুযায়ী চলতে হবে, নিষেধকৃত বিষয় থেকে বিরত থাকতে হবে। জীবনের সবকিছু একমাত্র আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য উৎসর্গ করতে হবে।
মু’মিনগণ জীবনের কোনো ক্ষেত্রে কখনও এ আনুগত্য পরিহার করতে পারে না। এটি ঈমানের একটি মৌলিক দফা। রাসূলুল্লাহ সা. তথা ইসলামী নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনে শৈথিল্য করা বড় ধরনের অপরাধ। আল-কুরআন ও আল-হাদিসে আনুগত্যের পুরস্কার, অমান্যকারীদের ভয়াবহ পরিণামসহ এর গুরুত্ব সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। নি¤েœ এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-
১. আনুগত্য করতে আল্লাহর নির্দেশ
আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং আমিরের আনুগত্য করা প্রত্যেক মু’মিনের জন্য ফরজ। মহান আল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ্র নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা বিচারক তাদের। তারপর যদি তোমরা কোনো বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি প্রত্যর্পণ কর, যদি তোমরা আল্লাহ্ ও কেয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম।’’
(সূরা নিসা : ৫৯)
২. আনুগত্যকারীরা আল্লাহর ভালোবাসা প্রাপ্ত হয়
মহান আল্লাহর ভালোবাসা ও ক্ষমা পেতে হলে অবশ্যই রাসূলের আনুসরণ করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘হে রাসূল! আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহ্ও তোমাদেরকে ভালোবাসেন এবং তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ্ ক্ষমাকারী ও দয়ালু।” (সূরা আলে ইমরান : ৩১)
৩. আনুগত্যের মাধ্যমে জান্নাত লাভ করা যায়
আনুগত্যশীলদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে। তাই মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করবে, তাকে তিনি এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশ দিয়ে সর্বদা ঝর্ণা প্রবাহিত হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে, তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দিবেন।” (সূরা ফাতাহ : ১৭)
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন,
كُلُّ أُمَّتِي يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ إِلَّا مَنْ أَبَى قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَنْ يَأْبَى قَالَ مَنْ أَطَاعَنِي دَخَلَ الْجَنَّةَ وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ أَبَى
আমার সকল উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে কিন্তু তারা নয় যারা (আমাকে) অস্বীকার করবে। প্রশ্ন করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার উম্মতের মধ্যে আবার কারা আপনাকে অস্বীকার করবে? তিনি বললেন, যে আমার আনুগত্য করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে আমার অবাধ্য হলো সে-ই আমাকে অস্বীকার করল। (বুখারি)
৪. আনুগত্যকারীরা নিয়ামতপ্রাপ্ত লোকদের সঙ্গী হবেন
আনুগত্যশীল বান্দারা আখিরাতে নবী, সিদ্দিক, শহীদ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গের সঙ্গী হবেন। তাই মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যে কেউ আল্লাহ্র হুকুম এবং তাঁর রাসূলের হুকুম মান্য করবে, তাহলে যাদের প্রতি আল্লাহ্ নেয়ামত দান করেছেন, সে তাদের সঙ্গী হবে। তারা হলেন নবী, সিদ্দিক, শহীদ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গ। আর তাদের সান্নিধ্যই হলো উত্তম।’
(সূরা নিসা : ৬)
৫. আল্লাহ ও রাসূলের অমান্যকারীদের প্রতি ইহকালে ও পরকালে অভিস¤পাত
আনুগত্যহীনদের প্রতি আল্লাহ লা’আনত বর্ষণ করবেন। তাই আল্লাহ বলেন, ‘‘যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ্ তাদের প্রতি ইহকালে ও পরকালে অভিস¤পাত করেন এবং তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন অবমাননাকর শাস্তি।’’
(সূরা আহযাব : ৫৭)
মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘অতএব যারা তাঁর নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তারা যেন তাদের ওপর বিপর্যয় নেমে আসা অথবা যন্ত্রণাদায়ক আজাবের ভয় করে।’ (সূরা নূর : ৬৩)
৬. আনুগত্যহীনদের আমল বিনষ্ট হবে
আনুগত্যহীন ব্যক্তিদের সৎকর্মসমূহ আল্লাহ গ্রহণ করবেন না। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ্র আনুগত্য কর, রাসূলের সা: আনুগত্য কর এবং নিজেদের কর্ম বিনষ্ট করো না।’’ (সূরা মুহাম্মাদ : ৩৩)
৭. রাসূলের নির্দেশ অমান্য করা কুফরি
আল্লাহ ও রাসূলের সা. নির্দেশ অমান্য করা কুফরি। মহান আল্লাহ বলেন, বলুন, আল্লাহ্ ও রাসূলের আনুগত্য প্রকাশ কর। বস্তুত যদি তারা বিমুখতা অবল¤¦ন করে, তাহলে আল্লাহ্ কাফেরদিগকে ভালোবাসেন না।’’ (সূরা আলে ইমরান : ৩২)
মহান আল্লাহ বলেন,
فَلَا وَ رَبِّکَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ حَتّٰی یُحَکِّمُوۡکَ فِیۡمَا شَجَرَ بَیۡنَہُمۡ
‘‘হে রাসূল! তোমার রবের শপথ, যে ব্যক্তি তোমাকে তাদের মধ্যকার ফয়সালাকারী মেনে নিতে পারে না, সে কখনও মু’মিন নয়।’’ (সূরা নিসা : ৬৫)
৮. আনুগত্য শুধু সৎ কাজে, অসৎ কাজে নয়
আল্লাহ ও রাসূলের সা. নির্দেশ শর্তহীনভাবে পালন করতে হবে। আর দায়িত্বশীলের নির্দেশ শর্তযুক্তভাবে পালন করতে হবে। অর্থাৎ দায়িত্বশীলের আনুগত্য শুধু সৎ কাজে, অসৎ কাজে নয়। হযরত আলী রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সা. বলেন, আল্লাহর নাফরমানির কাজে আনুগত্য নেই, আনুগত্য কেবল মা’রুফ বা নেক কাজে। (বুখারি, আবু দাউদ)
মহান আল্লাহ বলেন,
وَ تَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡبِرِّ وَ التَّقۡوٰی ۪ وَ لَا تَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡاِثۡمِ وَ الۡعُدۡوَانِ ۪ وَ اتَّقُوا اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ
‘‘সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহ্কে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ্ কঠোর শাস্তিদাতা।”
(সূরা মায়িদা : ২)
৯. ব্যক্তি পরিবর্তনে আনুগত্যের পরিবর্তন করা যাবে না
দায়িত্বশীল পরিবর্তন হলে আনুগত্যের কোনো পরিবর্তন করা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘আর মুহাম্মদ একজন রাসূল বৈ তো নয়! তাঁর পূর্বেও বহু রাসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। তাহলে কি তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে?’’ (সূরা আলে ইমরান : ১৪৪)
১০. দায়িত্বশীল পছন্দ হোক আর না হোক আনুগত্য করা ফরয
সকল দায়িত্বশীল সমান মানের হয় না। ব্যক্তি হিসেবে কাউকে পছন্দ নাও হতে পারে। কিন্তু দায়িত্বশীলকে পছন্দ হোক আর না হোক তারপরও আনুগত্য করতে হবে। আবদুল্লাহ ইবন উমর রা. বর্ণনা করেন, রাসূল সা. বলেন,
السَّمْعُ وَالطَّاعَةُ عَلَى الْمَرْءِ الْمُسْلِمِ فِيمَا أَحَبَّ وَكَرِهَ مَا لَمْ يُؤْمَرْ بِمَعْصِيَةٍ فَإِذَا أُمِرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلاَ سَمْعَ ، وَلاَ طَاعَة
“প্রত্যেক মুসলমানের উপর (দায়িত্বশীলের নির্দেশ) শ্রবণ করা ও আনুগত্য করা অবশ্য কর্তব্য, তা তার পছন্দ হোক বা অপছন্দ হোক, যতক্ষণ পর্যন্ত না পাপাচারের আদেশ দেয়া হবে। অতঃপর পাপাচারের আদেশ দেয়া হলে তা শ্রবণ করা ও আনুগত্য করার কোনও অবকাশ নেই।”
(বুখারি; নাসায়ী, ইবনে মাজাহ)
১১. হাবশি গোলামও যদি আমির হয় তার আনুগত্য করতে হবে
আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেন, “তোমরা শ্রবণ কর ও আনুগত্য কর, যদিও আঙুরের মতো ক্ষুদ্র মাথাবিশিষ্ট কোনো হাবশি গোলামও তোমাদের শাসক নিয়োগ করা হয়।” (বুখারি, ইবনে মাজাহ, বায়হাকি)
আবু নাজীহ ইরবাজ ইবন সারিয়াহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূল সা. আমাদের উদ্দেশ্যে এমন এক বাগ্মিতাপূর্ণ ভাষায় বক্তব্য প্রদান করলেন যে, তাতে আমাদের হৃদয় গলে গেল আর চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হতে লাগল। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! এটা যেন আপনার বিদায়ী উপদেশ। আপনি আমাদের আরো উপদেশ দিন। তিনি বললেন, ‘‘আমি আল্লাহর ব্যাপারে তাকওয়া অবলম্বনের জন্য তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি। আরো উপদেশ দিচ্ছি, তোমরা তোমাদের নেতার অনুসরণ ও আনুগত্য করবে। যদিও হাবশি গোলাম তোমাদের আমির নির্বাচিত হয়। আর তোমাদের মধ্যে যে জীবিত থাকবে সে অনেক মতভেদ দেখতে পাবে। তখন তোমাদের কর্তব্য হবে, আমার সুন্নাত আঁকড়ে ধরা সৎপথপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদিনের আদর্শ অনুসরণ করা। এ সুন্নাত ও আদর্শকে খুব মজবুতভাবে ধারণ করবে। আর (ধর্মের মধ্যে) সকল প্রকার নবসৃষ্ট বিষয় থেকে দূরে থাকবে। জেনে রাখো, প্রত্যেকটি বিদআতই পথ ভ্রষ্টতা।’’ (রিয়াদুস সালেহিন)

১২. সুদিনে-দুর্দিনে, খুশি-বেজার সকল অবস্থায় আনুগত্য ফরজ
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেন,
عَلَيْكَ السَّمْعَ وَالطَّاعَةَ فِي عُسْرِكَ وَيُسْرِكَ، وَمَنْشَطِكَ وَمَكْرَهِكَ، وَأَثَرَةٍ عَلَيْكَ
সুদিনে-দুর্দিনে, সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি এবং তোমার অধিকার খর্ব হওয়ার ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলের নির্দেশ শ্রবণ করা ও আনুগত্য করা তোমাদের জন্য অপরিহার্য। (মুসলিম)

আয়াতের মৌলিক শিক্ষা
প্রকৃত মু’মিন হওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর ক্ষমা ও জান্নাত লাভের জন্যে বিশেষভাবে কয়েকটি শিক্ষা লাভ করতে পারি-
১. আন্তরিকভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে মানতে হবে। (إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آَمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ)
২. রাসূলুল্লাহ সা.-এর তিরোধানের পর মুসলিম খলিফা বা দায়িত্বশীলের আনুগত্য করা ফরয।
৩. বর্তমান মুসলিম বিশে^ যেহেতু কোনো একক জামাআত মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্বের আসনে নেই। সুতরাং যে দেশে যে দল বা সংগঠন ইসলাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত হয়েছে এবং কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী দল পরিচালনা করছে, সে দেশে সেই দলের আনুগত্য করা মুসলমানদের জন্য ফরয।
৪. সামষ্টিক কোনো কাজে অংশগ্রহণ করে দায়িত্বশীলের অনুমতি ছাড়া চলে যাওয়া যাবে না। অর্থাৎ ইসলামী সংগঠনের দায়িত্বশীলের পক্ষ থেকে কোনো কাজের নির্দেশ প্রদান করা হলে বিনা অনুমতিতে তা থেকে অনুপস্থিত বা কাজ না করার জন্য ছোটখাটো ওজর বা বাহানা পেশ করা যাবে না।
৫. ছুটি দেয়া বা না দেয়া আমীর/দায়িত্বশীলের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রয়োজন বর্ণনা করার পরও আমির যদি মনে করেন, সামগ্রিক প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যক্তিগত প্রয়োজনের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাহলে অনুমতি না দেয়ার পূর্ণ অধিকার তিনি রাখেন। এ অবস্থায় একজন মু’মিন এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ করা বা মনে কষ্ট রাখা ঠিক হবে না।
৬. অনুমতি চাওয়ার মধ্যে যদি সামান্যতম ছলচাতুরীও দখল থাকে অথবা সামগ্রিক প্রয়োজনের ওপর ব্যক্তিগত প্রয়োজনকে প্রাধান্য দেয়ার প্রবণতা সক্রিয় থাকে, তাহলে এ হবে একটি গোনাহ। কাজেই রাসূল সা. ও তাঁর স্থলাভিষিক্তের শুধুমাত্র অনুমতি দিয়েই ক্ষান্ত হলে চলবে না বরং যাকেই অনুমতি দেবেন সঙ্গে সঙ্গে একথাও বলে দেবেন যে, আল্লাহ তোমাকে মাফ করুন।

লেখক : প্রফেসর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply