সাংবাদিক শিমুল হত্যা ও বিবেকের দায়বদ্ধতা – সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

সাংবাদিকরা সমাজ ও রাষ্ট্রের দর্পণ। জাতির জাগ্রত বিবেক। প্রতিদিন সংবাদপিপাসু মানুষের কাছে নতুন নতুন খবর নিয়ে হাজির হন গণমাধ্যমকর্মীরা। নির্যাতিত ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের শেষ ভরসাস্থল হিসেবে সাংবাদিকদের শরণাপন্ন হন। আর সাংবাদিকরা জাতির সামনে তুলে ধরেন সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, সাফল্য-ব্যর্থতা ও সাফল্য-সম্ভাবনার কথা। কিন্তু সেই সাংবাদিকরা যখন নির্যাতিত হন এবং অনেক সময় নিজেদের জীবন হারাতে হয় তখন আমাদের গন্তব্য কোথায় তা অবশ্য ভাববার খোরাক সৃষ্টি করে। আর এমন প্রশ্নই এখন সচেতন মানুষের কাছে।
মূলত সাংবাদিকদের দায়িত্ব হলো সত্য ও বাস্তবতাকে গণমানুষের কাছে যথাযথভাবে উপস্থাপন করে মানুষকে সত্যসন্ধিৎসু করে তোলা। আমাদের দেশের সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কাঙ্গাল হরিনাথ থেকে শুরু করে অদ্যাবধি বাংলার সাংবাদিক সমাজ সে দায়িত্বই পালন করে আসছেন। কিন্তু তাদের এই পথচলা অতীতে যেমন কণ্টকমুক্ত ছিল না, এখনও নয়। আগামী দিনে কী হবে তা অবশ্য সময়ই বলে দেবে। কিন্তু জাতির জাগ্রতবিবেক গণমাধ্যমকর্মীরা যে প্রতিনিয়ত নিগ্রহের শিকার এ কথা তো অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
গণমাধ্যমকর্মী নিগ্রহের ঘটনায় মোটেই নতুন কিছু নয়। আবহমানকাল থেকেই সাংবাদিকরা জুলুম-নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন এবং এখনও হচ্ছেন। তারা যেমন নির্যাতিত হয়েছেন ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে, ঠিক তেমনিভাবে অন্যরাও এ ক্ষেত্রে মোটেই পিছিয়ে নেই। বরং গণমাধ্যমকর্মীদের কর্তব্যনিষ্ঠা ও পেশাদারিত্ব যখনই যার বিপক্ষে গেছে বা ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দলীয় ও এলিট শ্রেণির স্বার্থে আঘাত লেগেছে তখনই তাদের ওপর নেমে এসেছে বর্ণনীয় নির্যাতন ও নিগ্রহের ঘটনা।
এমনকি অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকর্মীদের জীবন দিয়েও প্রায়শ্চিত্য করতে হয়েছে। আর সংখ্যাটাও একেবারে নগণ্য নয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের দেয়া তথ্যানুযায়ী শুধুমাত্র ২০১৬ সালেই ১১৭ জন গণমাধ্যমকর্মী নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে সন্ত্রাসী হামলা ও নানাবিধ হুমকির মুখোমুখি হয়েছেন ৩৭ জন, ক্ষমতাসীন দল ও অঙ্গসংগঠনের দ্বারা নিগৃহীত হয়েছেন ২১ জন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক ৯ জন। মামলার শিকার হয়েছেন ৯ জন। আর ২০১৫ সালে গোটা বিশ্বে ১১০ জন সাংবাদিক নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
মানুষ মাত্রই স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চায়। সে প্রক্রিয়ার ব্যত্যয় ঘটা মোটেই কাক্সিক্ষত নয়। কিন্তু তা-ই হচ্ছে প্রতিনিয়ত আমাদের দেশে। শুধু নির্দিষ্ট কোনো পেশাজীবী নয় বরং প্রত্যেক শ্রেণি ও পেশার মানুষই কমবেশি নিগ্রহের শিকার হয়ে থাকেন। কিন্তু আমাদের দেশের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ প্রবণতা অন্য সমাজ-রাষ্ট্রের তুলনায় অনেকটাই বেশি। আর এ প্রবণতা থেকে আমাদের দেশের সাংবাদিক সমাজও মোটেই আলাদা নয়।
গণমাধ্যমকর্মীরা সর্বজনশ্রদ্ধেয় হওয়ায় কাক্সিক্ষত ছিল। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। পেশাগত কর্তব্যনিষ্ঠার কারণেই সাংবাদিকদের বিভিন্নভাবে নিগ্রহের শিকার হন প্রতিনিয়ত। প্রাণ দিতে হচ্ছে অকাতরে। স্বজনহারাদের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। সে ধারাবাহিকতায় অস্বাভাবিক মৃত্যুর পরোয়ানা বোধ হয় সাংবাদিক শিমুলের আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা-ই ছিল। তাইতো একটি তাজা প্রাণ ঝরে গেল গত ২ ফেব্রুয়ারি। শাহজাদপুর পৌরমেয়র ও তার সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে গুলিবিদ্ধ দৈনিক সমকালের শাহজাদপুর প্রতিনিধি আব্দুল হাকিম শিমুল নিহত হলেন। এদিকে নিহত সাংবাদিকের নানী রোকেয়া শোক সইতে না পেরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। কারণ, শিমুলের মৃত্যুর ঘটনা স্বাভাবিক ছিল না, যা সত্যিই হৃদয়বিদারক। কিন্তু আমরা শুধুই দর্শকের ভূমিকায়। এসব ভাগ্যবিড়ম্বিত গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য আমরা কিছুই করতে পারছি না। আমাদের ব্যর্থতা তো সেখানেই।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, গত ২ ফেব্রুয়ারি শাহজাদপুর পৌরমেয়রের ছোট ভাই পিন্টু ও তার সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী কর্তৃক শাহজাদপুর সরকারি কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি বিজয় মাহমুদকে উঠিয়ে নিয়ে মেয়রের বাড়িতে আটক করে বেধড়ক মারপিট করে হাত-পা ভেঙে গুরুতর আহত করে। ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয় ছাত্রলীগ কর্মী-সমর্থকরা বিক্ষোভ করে। এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ কর্মী-সমর্থকরা পৌরসভার মেয়র হালিমুল হক মিরুর মনিরামপুর মহল্লার বাসভবন ঘেরাও করলে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে পৌরমেয়র হালিমুল হক মিরু তার শটগান থেকে গুলি ছুঁড়লে ঘটনাস্থলে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে দৈনিক সমকালের শাহজাদপুর প্রতিনিধি আব্দুল হাকিম শিমুল গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন এবং পরে তিনি চিকিৎধীন অবস্থায় মারা যান।
এখানেই শেষ নয়। গত ২৬ জানুয়ারি সুন্দরবন রক্ষার দাবিতে ‘গ্যাস-তেল রক্ষা জাতীয় কমিটি’র ডাকে হরতাল চলাকালে ঢাকায় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক এহসান বিন দিদার ও ক্যামেরাম্যান আবদুল আলীম পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়। ফলে তারা উভয়ে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। কিন্তু এ ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের এখনও আইনের আওতায় আনা হয়নি, যা রীতিমত দুঃখজনক।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাংবাদিক পেটানো একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। এটিএন বাংলার সাংবাদিক নিগ্রহের ঘটনায় সরকারের রহস্যজনক নীরবতা দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক সাংবাদিক নিগ্রহের ঘটনায় বিভিন্ন মহল থেকেই প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। এমনকি পুলিশের আইজিও পুলিশ কর্তৃক সাংবাদিক নিগ্রহের ঘটনাকে দুঃখজনক আখ্যা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছেন। কিন্তু দায়ীদের কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে এখন পর্যন্ত জানা যায়নি।

মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গত ২৭ জানুয়ারি মৌলভীবাজার জেলার শমসেরনগরে শাহ তোরণের ফলক উন্মোচন শেষে সাংবাদিক নির্যাতন বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘সাংবাদিক নির্যাতন পুলিশ করে না। মাঝেমধ্যে ধাক্কাধাক্কি লেগে যায়, এটা স্বাভাবিক। আপনারা দু’জন বন্ধু যদি একসঙ্গে চলেন ধাক্কাধাক্কি তো লেগেই যায়। এই ধরনের একটা কিছু হয়েছে।’ যা ২৮ জানুয়ারি প্রায় সকল জাতীয় দৈনিকসহ অনলাইন পোর্টালগুলোতে ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে।
এ ঘটনায় একটি অভিযোগও নিয়েছে পুলিশ। পাশাপাশি হামলার ঘটনায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ দুঃখ প্রকাশও করেন। কিন্তু এত কিছুর পরও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্যে দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ হতাশই হয়েছেন বৈকি। মূলত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্যকে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার নামান্তরই মনে করছেন সচেতন মহল। এভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে সাংবাদিক পেটানোর ঘটনা যদি ‘ধাক্কাধাক্কি’ বলা হয় তাহলে নিগ্রহের সংজ্ঞাটা নতুন করে করতে হবে বৈকি!
মূলত আমাদের দেশে রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, হয়রানি ও আক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশে রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে সাংবাদিক নির্যাতনের হার ছিল ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে ২০১৪ সালে এই হার হয়েছে ৩৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এর প্রায় ২৩ শতাংশ নির্যাতনই হয়েছে পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশের হাতে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাইরে সরকারি কর্মকর্তাদের হাতে ১১ শতাংশ আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। বাকস্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংগঠন আর্টিকেল-১৯ এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করেছে। সংগঠনটি সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য একটি কার্যকর সুরক্ষা কৌশল ও নীতিমালা করাসহ কয়েকটি সুপারিশ করেছে।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আর্টিকেল-১৯ এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ‘ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন ইন বাংলাদেশ-২০১৪’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনে ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালে রাষ্ট্রযন্ত্রের বাইরে সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে ৬৬ দশমিক ৩১ শতাংশ। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের হাতে ৩৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে। ২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে সাংবাদিকদের হয়রানির পরিমাণ বেড়েছে ১০৬ শতাংশ। হয়রানির মধ্যে মানহানির দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলাও রয়েছে। ২০১৩ সালে হয়রানির ঘটনা ছিল ৩৩টি; ২০১৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮টিতে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ১০টি ফৌজদারি মামলা হয়েছে।
প্রতিবেদনের ভাষ্যমতে, ২০১৪ সালে মোট ২১৩ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে আক্রমণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে চারজন হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন। গুরুতর জখম হয়েছেন ৪০ জন। আর শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৬২ জন সাংবাদিক। হত্যাকান্ডের শিকার চার সাংবাদিক হলেন শাহ আলম মোল্লা, সরদার নিপুণ, দেলোয়ার হোসেন ও জি এম বাবর আলী।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়Ñ সম্পাদক, প্রকাশক ও সাংবাদিক নেতাসহ ১৩ জন মিডিয়া ব্যক্তিত্বকে আদালত অবমাননার অভিযোগের মুখোমুখি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান খান, ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান প্রমুখ। গত বছর আটজন ব্লগার ও অনলাইন ব্যবহারকারীসহ ১৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ১৩ জনকে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের আওতায় গ্রেফতার করা হয়। আক্রান্ত সাংবাদিকদের মধ্যে ১৯ জন হুমকির শিকার হয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঘটা সহিংস ঘটনার একটিরও বিচারের মাধ্যমে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি দেয়ার তথ্য কালেভদ্রেও পাওয়া যায়নি। এসব ঘটনার মধ্যে মাত্র পাঁচটি ঘটনার তদন্ত শেষ করা হয়েছে। ২৭ শতাংশ ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়াধীন। আর প্রায় ৭০ শতাংশ ঘটনা আইনের আওতার বাইরে রয়েছে। ৫৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ আক্রমণের ঘটনায় কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অধিকাংশ ঘটনায় আক্রান্ত সাংবাদিকেরা সাধারণ ডায়েরিও করেননি। অন্যান্য ঘটনার ক্ষেত্রে পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
শুধু যে রাষ্ট্রীয়ভাবে সাংবাদিকরা নির্যাতিত হচ্ছেন তাই নয়, স্বার্থান্ধ রাজনীতিবিদদের ক্যাডার ও সন্ত্রাসী চরমপন্থীদের হাতে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত, এমনকি খুন হচ্ছেন সাংবাদিকরা। ‘সমকাল’-এর ফরিদপুর জেলা সাংবাদিক গৌতম দাস ২০০৫-এর ১৭ নভেম্বর তার কার্যালয়ে আততায়ীর হাতে নৃশংসভাবে নিহত হন। ২০০৪-এর ১৫ জানুয়ারি ‘সংবাদ’-এর খুলনা প্রতিনিধি মানিক সাহা আততায়ীর বোমার আঘাতে নিহত হন। একই বছর ২৭ জুন খুলনা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক জন্মভূমি’ সম্পাদক হুমায়ুন কবির বালু এবং ‘দৈনিক সংগ্রাম’-এর খুলনা ব্যুরো চিফ শেখ বেলাল উদ্দিন নিহত হন। বগুড়া থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক দুর্জয় বাংলা’র বার্তা সম্পাদক দীপঙ্কর চক্রবর্তী বাড়ির সামনে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে নিহত হন ২০০৪-এর ৩ অক্টোবর। ‘দৈনিক আজকের কাগজ’-এর মানিকছড়ি প্রতিনিধি কামাল হোসেন খুন হন ২০০৪-এর ২২ আগস্ট।
শ্রীমঙ্গল থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক পূবালী বার্তা’র সম্পাদক সৈয়দ ফারুক আহমেদ ২০০২-এর ৩ আগস্ট নিহত হন। খুলনা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক পূর্বাচল’ এর সাংবাদিক হারুনুর রশিদ খোকন নিহত হন ২০০২-এর ২ মার্চ। একই বছর খুলনা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক অনির্বাণ’-এর সাংবাদিক সরদার শুকুর হোসেন নিহত হন। ২০০১-এর ২০ জুলাই ‘দৈনিক যুগান্তর’-এর নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি আহসান আলী নিহত হন। ‘দৈনিক জনকণ্ঠ’-এর বিশেষ প্রতিনিধি শামসুর রহমান যশোরে নিজ কার্যালয়ে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন ২০০০-এর ১৬ জুলাই।
১৯৯৯-এর ১৩ মার্চ নিহত হন খুলনা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক লোকসমাজ’-এর রফিকুল ইসলাম রফিক। যশোর থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক রানার’ সম্পাদক আর এম সাইফুল আলম মুকুল নিহত হন ১৯৯৮-এর ১২ জুন। একই বছর একই দিনে নিহত হন চুয়াডাঙ্গা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক দিনবদল’-এর স্টাফ রিপোর্টার বজলুর রহমান এবং সাতক্ষীরা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক পত্রদূত’-এর সাংবাদিক খন্দকার রেজাউল করিম। উল্লেখ্য ‘দৈনিক পত্রদূত’-এর সম্পাদক এসএম আলাউদ্দিনও আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছিলেন। এখানেই শেষ নয় বরং এই ফিরিস্তি আরও সুদীর্ঘ।
সাম্প্রতিক সময়ে গোটা বিশ্বেই সাংবাদিকতা পেশা কিছুটা হলেও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। যদিও আমাদের দেশে এ প্রবণতা অন্য দেশের তুলনায় অনেকটাই বেশি। মূলত অপরাধ, মতানৈক্য ও দমন-পীড়নের খবর চাপা দেয়ার জন্য সরকার ও অপরাধীদের পুরনো কৌশলের পাশাপাশি নতুন নতুন সব হুমকির মোকাবিলা করতে হচ্ছে সাংবাদিক সমাজকে। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্র সরকার স্টপ অনলাইন পাইরেসি অ্যাক্ট (সোপা) ও প্রোটেক্ট ইন্টারনেট প্রোভাইডার অ্যাক্ট (পিপা) নামে দুটি আইন করার উদ্যোগ নেয়ায় ‘মুক্ত সাংবাদিকতার’ চর্চাও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, “তথ্য অপ্রকাশিত থাকলে রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা যে কোন অনিয়মের ঘটনাও চাপা পড়ে যায়। তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে সেন্সরশিপ বিশ্বের যে কোন জাতিগোষ্ঠীর জন্যই এক ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন। আমাদের জোরালোভাবে এর মোকাবেলা করতে হবে।”
যাহোক সাংবাদিকতা পেশা গোটা বিশ্বের ঝুঁকির মধ্যে থাকলেও আমাদের দেশে এই ঝুঁকিটা বেশ উচ্চমাত্রার। বস্তুত বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের কারণেই আমাদের দেশের সাংবাদিকরা বিভিন্নভাবে নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে রাজনৈতিক দলের নেতা কর্তৃক ঠান্ডা মাথায় গুলি করে সাংবাদিক হত্যার ঘটনা কিছুটা হলেও অভিনব। আর সাংবাদিক শিমুল হত্যার ক্ষেত্রে তা-ই হয়েছে। যদিও পুলিশ ইতোমধ্যেই এই ঘটনার প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে কিন্তু এর ফলাফল নিয়ে আশাবাদী হওয়ার সময় এখনও হয়নি।
কারণ, এই বিষয়ে আমাদের অতীতটা মোটেই সুখকর নয়। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। কিন্তু গত পাঁচ বছরেও মামলার তদন্তে অগ্রগতির কোন খবর নেই। গত ৮ ফেব্রুয়ারি আদালতে মামলার তদন্ত অগ্রগতি প্রতিবেদন দেয়ার কথা থাকলেও তদন্ত সংস্থা র‌্যাব তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই শিমুল হত্যার বিচার নিয়ে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ এখনও সৃষ্টি হয়নি। কারণ, প্রধান অভিযুক্ত তো সরকারি দলের। তাই বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।
যাহোক সাংবাদিক শিমুল হত্যার ঘটনা দেশের বিবেকবান ও শান্তিপ্রিয় মানুষকে আহত করেছে। তারা এই হত্যাকান্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছেন। দেশের সাংবাদিক সংগঠনগুলোও এ বিষয়ে বেশ সোচ্চার বলেই মনে হচ্ছে। এমনকি এই মর্মান্তিক ঘটনা দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু সরকার এই নির্মম হত্যাকান্ডের ঘটনার কোনো দায় নিতে চাচ্ছে না। বরং হত্যাকারীদের বাঁচানোর জন্য বিভিন্ন তৎপরতা চালানোর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। নিহত সাংবাদিক শিমুলের স্ত্রীকে নানাভাবে প্রলোভন ও বিভ্রান্ত করে মামলা প্রত্যাহারের চাপ দেয়া হচ্ছে, যা সত্যিই দুঃখজনক।
পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে একজন গণমাধ্যমকর্মীকে এভাবে হত্যা করা হলো কিন্তু এ ব্যাপারে চোখে পড়ার মত সরকারের কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা গেল না। মূলত রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন করে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা। কিন্তু আমরা বোধ হয় সে ক্ষেত্রে অনেকটাই ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছি। প্রতিনিয়ত সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণির মানুষ নিগ্রহ ও হত্যার শিকার হলেও প্রতিকার হচ্ছে না কালেভদ্রেও। আসলে আমাদের বিবেকের দায়বদ্ধতার পরিসর ক্রমেই সীমিত হয়ে এসেছে। তাই আমরা সাংবাদিক শিমুলসহ কোনো হত্যাকান্ডের ক্ষেত্রেই বিবেকসম্মত কাজটা আমরা করতে পারছি না। আর এ লজ্জাটা আপনার আমার সকলের।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

SHARE